কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তি – কালিকা পুরাণ

পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায় – কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তিঃ ঋষিগণ বলিলেন,–ব্রহ্মন্! আপনি কালী হর-সম্বন্ধীয় পাপহর শ্রুতিসুখ প্রদ পুণ্য বিচিত্র শ্রেষ্ঠ আখ্যান শ্রবণ করাইলেন। ১

পুনৰ্বার বলুন, কালী কি জন্যে শিবের অর্ধাঙ্গ গ্রহণ করিলেন? কি কারণেই বা কালী গৌরাত্ব প্রাপ্ত হইলেন? হে মুনিশ্রেষ্ঠ! হে দ্বিজোত্তম, সেই বিষয় যথার্থরূপে বলুন। ২-৩

মার্কণ্ডেয় বলিলেন, হে মহর্ষিগণ! সেই মহদাখ্যান, আপনাদিগকে বলিতেছি, আপনারা যথার্থরূপে শুভপ্রদ আখ্যান শ্রবণ করুন। ৪

ইহার পূর্বে সগর রাজা ঔৰ্বমুনিকে ইহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাহা আপনাদিগকে বলিতেছি। ৫

পূৰ্বে সগর নামে রাজা সূৰ্য্যবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। সগর, অত্যন্ত শোভাশালী বলবান, ক্ষমতাপন্ন ও সৰ্ব্বশাস্ত্র পারদর্শী হইলেন। ৬

তিনি এক রথারূঢ় হইয়াই সমস্ত রাজকুলকে জয় করত সকল রাজগুণসম্পন্ন সার্বভৌম নরপতি হইলেন। ৭

রাজ্য প্রাপ্ত হইলে, পার্থিবোম সগররাজাকে মুনিগণ সম্মান করিবার জন্য তৎসমীপে উপস্থিত হইলেন। ৮

 কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তি - কালিকা পুরাণ 

পশ্চিম-দেশীয়, উত্তর-দেশীয়, পূর্ব-দেশীয় ও দক্ষিণ-দেশীয় মহাত্মা মুনি ও ব্রাহ্মণগণ, রাজাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত আগমন করিলেন। ৯

সকলে আগমন করিলে জ্বলনসদৃশ মহাত্মা ঔর্ব-নামা শ্ৰীসম্পন্নমুনি, নৃপকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত আগমন করিলেন। ১০

তাহার পর অভ্যাগত মুনিকে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় দেখিয়া সগর বিবিধ পূজোপকরণদ্বারা তাহাকে পূজা করিলেন। ১১

কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তি – কালিকা পুরাণ

পাদ্য, অর্ঘ্য ও আচমনীয় ইত্যাদি দান করিয়া মুনিশ্রেষ্ঠকে উত্তম আসনে বসাইলেন। ১২

হে দ্বিজগণ। তৎপরে সগররাজা প্রণাম করত মহাত্মা ঔৰ্বকে জিজ্ঞাসা করিলেন, মুনে! আপনার যথাযোগ্য কুশল ত? ১৩

 

মুনিশ্রেষ্ঠ বলিলেন, নররাজ! আমার সকল বিষয়ে কুশল, বিশেষ আপনাকে দর্শন করিয়া আরও কুশল চেষ্টা করিতেছি। ১৪

এই পৃথিবীতে সকল রাজবর্গের মধ্যে আপনা হইতে অন্য কুশলী কে আছে? এই ধরাতলে অন্য কোন শুভদৃষ্ট ব্যক্তি সমস্ত পার্থিববর্গকে জয় করিয়াছে? ১৫

হে রাজশ্রেষ্ঠ! আপনার নিরন্তর কুশল বৃদ্ধি হউক। হে ভূপতে! প্রকৃষ্ট নীতি অনুসারে সদা সদ্ব্যবহারে পৃথিবী শাসন করুন। ১৬।

যেরূপ নিশাকরের বৃদ্ধিতেই সাগরের বৃদ্ধি হইয়া থাকে, সেইরূপ আপনার বৃদ্ধি হইলেই জগতের বৃদ্ধি; অতএব বৃদ্ধি বিষয়ে চেষ্টা করুন। ১৭

হে নৃপতে! প্রথমতঃ বন্ধুগণের সহিত স্বয়ং সদ্ব্যবহারে সম্পূর্ণরূপে মিলিত হউন। তাহার পর আপনার গুণের অনুরূপা ভাৰ্য্যাকে মহিষী করুন। ১৮

যদি নীতিক্রমে সঙ্গতা হইয়া থাকে, তাহা হইলে স্বকীয় প্রভূত গুণদ্বারা ব্রত ধারণ করত প্রবেশ করিয়া স্বয়ং বনিতা হইবে। ১৯

আমি শুনিয়াছি, হিমালয়-সুতা শম্ভুর সঙ্গম মানস করিয়াছিলেন, তৎপরে বহুযত্নবশতঃ শম্ভু সে ক্রিয়া সম্পাদন করেন। ২০

তাহার পর শম্ভুর অত্যন্ত প্রেমপাশে আবদ্ধ হইয়া পার্বতী তাহার অনুমতি জমে শরীরার্ধস্বরূপা হইলেন, তজ্জন্য সেই অবধি শঙ্কর অর্ধনারীশ্বর হইলেন।

হে নৃপশ্রেষ্ঠ। তিনি অন্য ভাৰ্য্যা গ্রহণ করেন নাই; অতএব রাজেন্দ্র; আপনিও নিজের পত্নীকে গুণযুক্ত করুন, তাহার পর তনয়কেও গুণযুক্ত করুন। ২২-২৩

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সগর ঔর্ব-বাক্য শ্রবণ করিয়া হর্ষযুক্ত হইলেন এবং নৃপতি, ঈষৎ হাস্য করিয়া মুনিকে এই কথা বলিলেন,–হে মুনিশ্রেষ্ঠ! কিজন্য সতী গিরিজা, শঙ্করের কায়ার্ধ গ্রহণ করিলেন, তাহাই শুনিবার নিমিত্ত উৎসাহিত হইয়াছি। ২৪-২৫

কোন নীতিতে আত্মা, ভাৰ্য্যা, অথবা পুত্র ইহাদিগকে যোগ করা কর্তব্য। সদাচারময় সেই নীতিই শ্রবণ করিবার নিমিত্ত ইচ্ছা করিতেছি। ২৬

হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। রাজনীতি, সজ্জনদিগের নীতি এবং অন্য কৃতাত্মাদিগের নীতি আমি শুনিবার নিমিত্ত অভিলাষী হইয়া আপনার নিকট প্রার্থনা করিতেছি। ২৭

হে ব্ৰহ্মন। যদি গোপনীয় বিষয় না হয়, তাহা হইলে শুনিবার নিমিত্ত ইচ্ছা করি, কিন্তু শুনিবার নিমিত্ত ইচ্ছুক হইয়াই আপনাকে যে আজ্ঞা করিতেছি তাহা নহে। ২৮

যদি আপনার বক্তব্য হয়, তাহা হইলে কৃপা করিয়া আমাকে বলুন। ২৯

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সগর এই সমস্ত কথা বলিলে, দ্বিজসত্তম সগররাজের প্রতি কৃপালু হইয়া তাহাকে প্রত্যুত্তর দিতে লাগিলেন। ৩০

রাজন! যে যে বিষয় আপনি জিজ্ঞাসা করিতেছেন, তাহা বলিতেছি, শ্রবণ করুন, পূর্বে যেরূপ পাৰ্বতী শঙ্করের শরীরার্ধ গ্রহণ করিয়াছেন। ৩১

যেরূপ নীতি যে যে স্থলে আপনার অবলম্বন-যোগ্য; হে নৃপোত্তম। তৎসমস্ত, ক্ৰমে বলিতেছি শ্রবণ করুন। ৩২

যে সময়ে মহাত্মা শঙ্কর হিমাচল-সুতাকে বিবাহ করিলেন, সেই সময়ে কিয়ৎকাল উমার সহিত যাপন করিলেন। ৩৩

 কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তি - কালিকা পুরাণ 

সানু-কন্দর কুঞ্জমধ্যে উমার সহিত রমমাণ হইয়া বিহার করিলেন এবং হর সেই স্থানে পার্বতীকে শোভা দ্বারা বিশেষ আনন্দযুক্তা করিলেন। ৩৪

অনন্তর কালক্রমে শম্ভু, গণ ও ভাৰ্য্যার সহিত ত্রিদিবোপম কৈলাস পর্বতে গমন করিলেন। ৩৫

পার্বতীকে নিরন্তর চিন্তা করত ধ্যানাদি সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া তাহার মুখরূপচত্রে নিজ নেত্ৰসমূহকে চকোরের ন্যায় করলেন। ৩৬

গিরিজার প্রতি শঙ্কর অনুরাগবশতঃ কোন সময়ে পুষ্প আহরণ করত অত্যন্ত মনোহর সর্বাঙ্গে দান করিবার উপযুক্ত মালা রচনা করেন। ৩৭

কোন সময়ে বৃষধ্বজ আদৰ্শতলে এক সময়ে নিজ মুখ ও অপর্ণার মুখ একত্র দর্শন করেন। ৩৮

কোন সময়ে স্মরান্তকারী শিব মৃগনাভির লেপনের দ্বারা গন্ধযুক্ত পত্রাবলী পার্বতীর নিবিড় স্তনযুগে অঙ্কিত করেন। ৩৯

তাহার ললাটে গন্ধদ্রব্য বিলেপন করত মনোহর চন্দ্রের ন্যায় তিলক অঙ্কিত করিলেন। ৪০

নিবিড় সন্ধিস্থলে নির্যাস-সংসক্ত কেশপাশে চন্দন, অগুরু এবং কস্তূরী দ্বারা নানারূপ চিত্র অঙ্কিত করিলেন। ৪১

তাহাতে উমার কেশপাশ অত্যন্ত মনোহর শোভাযুক্ত হইল। কখন তিনি নর্তনের নিমিত্ত বিকীর্ণ অথচ সমান শিখিপুচ্ছ ধারণ করিলেন। ৪২

বৃষধ্বজ উমার অঙ্গে সুবর্ণময় উৎকৃষ্ট এবং মনোহর অলঙ্কার সমস্ত অর্পণ করিলেন। ৪৩

সেই সুবর্ণময় অঙ্গস্থিত অলঙ্কার সমূহে, গিরিজার অঙ্গ-নিবিড় মেঘরাশিতে তড়িন্মালার অবস্থানে তাহার যেরূপ শোভা হয়, সেইরূপ শোভা পাইল। ৪৪

নানারত্নময় দিব্য অলঙ্কারে এবং মনোহর বস্ত্রে সম্পূর্ণরূপ ভূষিতা কালী প্রকৃতির সাদৃশ্য ধারণ করিলেন। ৪৫

এইরূপ সৰ্ব্বদা কালীতে অনুরক্ত জগৎপতি শম্ভু, জগতের হিতের নিমিত্ত, দয়িতা কালিকার সহিত ক্রীড়া করিতে লাগিলেন। ৪৬

জগন্মাতা জগৎ-স্বরূপা মহামায়া যোগনিদ্রা জগতের ভূতি-স্বরূপা বিদ্যা ও অবিদ্যা-স্বরূপা পরমা মূর্তি এবং সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কারিণী প্রকৃতি কালী জগতের হিতাভিলাষে যত্নবশতঃ হরকে মোহিত করিয়া সুধাংশুর সহিত চন্দ্রিকার ন্যায় তাহার সহিত ক্রীড়া করিতে লাগিলেন। ৪৭-৪৯

অনন্তর, এক সময়ে স্মরহর, উমার সহিত কৈলাস পর্বতের অগ্রভাগে আনন্দিত-চিত্তে ক্রীড়া করিতেছেন, এরূপ সময়ে কতকগুলি অপ্সরাকে দেখিতে পাইলেন। ৫০

তাহারা রূপযৌবনশালিলী সমস্ত সুলক্ষণযুক্তা; তাহাদের মধ্যে উর্বশী নামে বেশ্যা অত্যন্ত মনোহরা। ৫১

অপ্সরাগণের মধ্যে সকলেই গৌরাঙ্গী সমস্ত অলঙ্কার-ভূষিতা; তাহারা– মুনিদিগের অবিচলিত মনও হঠাৎ মোহিত করিতে পারে। ৫২

বেশ্যাগণ হর ও মনোরমা গিরিজাকে দেখিয়া প্রণাম করত কিছু ভয়াকুল চিত্তে নতমস্তকে বদ্ধাঞ্জলি হইয়া তাহার অগ্রে অবস্থান করিতে লাগিল। ৫৩

অনন্তর ভর্গ পাৰ্বতীকে তাহাদের সমক্ষে অপ্রিয়বৎ অদ্ভুত কথা বলিলেন। ৫৪

ভিন্নাঞ্জনশ্যামলে! কালি। এই প্রদেশে তুমি স্ত্রীস্বভাব অবলম্বন করিয়া উৰ্বশী প্রভৃতির সহিত সম্ভাষণ কর, এই কথা বলিলেন। ৫৫

ঊর্বশী উপযুক্ত সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া অপ্সরাদিগকে আহ্বান করত কালীর সম্মুখ হইতে চলিয়া গেলেন। ৫৬

অনন্তর পাৰ্বতী কালী ভিন্নাঞ্জন-শ্যামলা, এইরূপ শম্ভুবাক্য শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত ক্রোধপরবশা হইলেন। ৫৭

গিরিজা অপ্সরাদিগের সমক্ষে শশিশেখরের ব্যাজ নিন্দায় ক্রোধান্বিভা হইয়া সহ্য করিতে পারিলেন না। ৫৮

তাহার পর পাৰ্বতী রোষপরবশা হইয়া বৃষভবাহনকে পরিত্যাগ করত শৈলশিখরে গুপ্তা হইয়া প্রকৃতি-ভাব প্রাপ্ত হইলেন। ৫৯

অনন্তর বৃষধ্বজ, বিরহব্যাকুল হইয়া পাৰ্ব্বতীকে অন্বেষণ করিতে আরম্ভ করিলেন, ক্ষণকাল অন্বেষণ করত সেই পৰ্বতশ্রেষ্ঠে তাঁহাকে পাইলেন না। ৬০

তাহার পর পাৰ্বতী হরকে ব্যাকুল জানিতে পারিয়া সেই সুগুপ্ত গিরি সানুতে স্বয়ং দর্শন দিলেন। ৬১

তাহাকে প্রাপ্ত হইয়া শম্ভু, বিশীর্ণের ন্যয় বলিলেন, প্রিয়ে! মনের মলিনতারূপ মান করিয়াছি কেন? ৬২

স্বামীর অপরাধই স্ত্রীদিগের মানের কারণ; কিন্তু সেই অপরাধ না করিলেও অপরাধ মনে করিয়া ভীরু ব্যক্তিকে কটু উক্তি শ্রবণ করিতে হয়। ৬৩

এক্ষণে অয়ি কমলাননে! তুমি কিজন্য রাগ করিয়াছ? কান্তে। তুমি শীঘ্র বল, না হইলে আমার মন প্রসন্ন হইতেছে না। ৬৪

এই বলিয়া শঙ্কর দেবীকে আলিঙ্গন করিবার নিমিত্ত উদ্যত হইলেন, কালী তাহাকে বারণ করিয়া এই কথা বলিলেন। ৬৫

হে ভূতেশ! আপনি কি পূৰ্বে দর্শন করেন নাই যে, অপ্সরাদের সমক্ষে আমাকে অঞ্জন-সদৃশ বলিয়া উপহাস করিলেন। ৬৬

জাতিহীন, বিত্তহীন, রূপহীন, অনুদার, হীনাঙ্গ, অতিরিক্তাঙ্গ এই সমস্ত দোষ কীৰ্ত্তন করা উচিত নহে। ৬৭

এইটি ব্রহ্মা পূর্বে বেদসমূহে নিশ্চয় করিয়াছেন; তাহা অবজ্ঞা করিয়া আপনি পূর্বোক্তরূপে পরিহাস করিয়াছেন। ৬৮

অতএব আমি সত্য বলিতেছি, যে পর্যন্ত আমার শরীর স্বর্ণের ন্যায় গৌর না হয়, সে পর্যন্ত আপনার সহিত সম্ভোগাদি করিব না। ৬৯

হে শম্ভো! তোমা ভিন্ন শরীরের গৌরতাকে প্রাপ্ত হইব না, তাহার সন্ধান শ্রবণ করুন, আমি শিরে হস্ত দিয়া শপথ করিতেছি। ৭০

এই কথা বলিয়া কালী শিবের সমক্ষেই মহাকোষী-প্রপাত নামক হিমালয় সানুতে গমন করিলেন। ৭১

সৰ্বজ্ঞ মহাদেবও ভাবী বিষয় জ্ঞান দ্বারা নিশ্চয় করিয়া পত্নীর গমনে প্রতিরোধ করিলেন না। ৭২

কালী গমন করিয়া পূর্বের ন্যায় শম্ভুতে মনোভিনিবেশ কত শত বর্ষ পর্যন্ত বৃষধ্বজের আরাধনা করিলেন। ৭৩

এক পদ উত্তোলন করিয়া বামপদের দ্বারা ক্ষিতিতে অবস্থান করিলেন এবং উত্তরাভিমুখে অনশনে নিরন্তর ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করিয়া উৰ্দ্ধমুখে জ্যোতির্ময় শ্রেষ্ঠ শান্ত, মঙ্গলজনক শিবকে আতু-স্বরূপ তত্ত্ব ও জ্ঞান-তত্বের দ্বারা আরাধনা করিতে আরম্ভ করিলেন। ৭৪-৭৫

নিশ্চলশরীরে, নিশ্চলমনে, পরমপদার্থের চিন্তায় আসক্তা কালীকে মুনিগণমধ্যে যাহারা না জানিত, তাহারা শাখা-পল্লবাদিশুন্য বৃক্ষ বলিয়া মনে করিল। ৭৬

নৃপসত্তম! এইরূপে তপস্যা করিতে করিতে এক শত বৎসর অন্যের এক বৎসরের ন্যায় অতীত হইল। ৭৭

শত বৎসর পরে যোগতৎপর শঙ্কর কালীকে সলজ্জ হইয়া ক্ৰমে দর্শন দিলেন। প্রথম ব্ৰহ্মারূপে, তাহার পর হরিরূপে, তৎপরে শম্ভুরূপে, অনন্তর এই সমস্তের একতারূপে দর্শন দিলেন। ৭৮-৭৯

সেই রূপ–জ্যোতির্ময়, শুদ্ধ এবং সকলের হেতুভূত। তাহার পর শঙ্কর, পুনর্বার শম্ভুরূপ দর্শন করাইলেন। ৮০

যোগনিদ্রা মহামায়া বৈষ্ণবী কালিকাত্মিকা এইরূপ তাহাকে প্রথম দর্শন করাইয়া পরে কালীর প্রকৃতিরূপে দর্শন করাইলেন; তাহার পর পার্বতীকে ক্রমে এইরূপ কালীকে দর্শন করাইলেন। ৮১-৮২

পাৰ্বতী, তপঃসম্ভূত জ্ঞানের দ্বারা এবং অন্তর্দৃষ্টি ও বহির্দ্রিষ্টি দ্বারা সমস্তের যাথার্থ্য জানিতে পারিলেন। ৮৩

শম্ভুকে জগন্ময় বিবেচনা করিলেন, আপনাকে জগন্ময়ী বলিয়া জানিলেন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হর ও শম্ভু এই সমস্তই এক শম্ভুর স্বরূপ। ৮৪

আমিই যোগনিদ্রা প্রভৃতি সমস্ত প্রকৃতি-স্বরূপ। দেবী ধ্যানে এই বিষয় জানিয়া সেই সময়ে ধ্যান পরিত্যাগ করিলেন এবং নয়ন উন্মীলন করিয়া বাহিরেও শম্ভুকে দেখিতে পাইলেন। ৮৫

দেবী, উমাপতি জিতেন্দ্রিয় যোগতৎপর শঙ্করকে দেখিয়া অভিলষিত বাক্য দ্বারা স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। ৮৬

পাৰ্বতী বলিলেন, হে জগন্নাথ! তুমি কেশব, অচ্যুত ও প্রধান পুরুষ অতীতকারণ কারণত্রয়স্বরূপ শম্ভু, তোমাকে প্রণাম করি। ৮৭

শম্ভু! যোগ, মোহ, মনোরাগ, ধর্মাধর্মময় বিদ্যা, অবিদ্যা প্রভৃতি তোমার শরীরের স্বরূপ। ৮৮

তুমি নিঃশ্রেয়স-শ্রেয়োযুক্ত দৃশ্য-অদৃশ্য এবং মানসিক যোগমূর্তি; তুমি। শ্রদ্ধারূপ পৌরুষ বিষয়ে তত্ত্বস্বরূপ; তুমি জ্যোতিঃ এবং শান্তি-স্বরূপ। ৮৯

তুমি ব্ৰহ্মা-বিষ্ণু-হর-বাসব-স্বরূপ এবং তুমি আদিত্য, বায়ু, অগ্নি, কুবের; তুমি বরুণ, তুমি শমন ও রাক্ষসেশ্বর তুমি শেষ-স্বরূপ; এই জগতে তোমা ভিন্ন কেহই নাই। ৯০

তুমি ভূমি, আকাশ, জল এবং পথ; তুমি স্থাবর, জঙ্গম ও ভূতল; তুমি জ্ঞান, জ্ঞেয়, ধ্যানগম্য এবং পরাপর তত্ত্বস্বরূপ ও শত্ৰুদিগের সম্বন্ধে ব্যক্তরূপ। ৯১

তুমি পুরুষ, পরমাত্মা এবং প্রধান রূপ; তুমি জ্যেষ্ঠ এবং জ্ঞানগম্য আগম স্বরূপ; তুমি ভাব ও করণীয় বিষয় এবং পঞ্চরূপী, সমস্ত জগৎ প্রত্যক্ষরূপে তোমার রূপ দেখিতে পায়। ৯২

তুমি কীর্তি, কাৰ্য্য, স্তব-বিষয়, স্তুতি, দ্রষ্টা, দৃশ্য, স্থৈর্য্যশীল এবং ভাবনা যোগ্য; তুমি নিত্য, অনিত্য, নিত্য-যোগ, বিয়োগ, হীন হইতেও হীন, ভেদ ও সামের প্রয়োগ স্বরূপ। ৯৩

তুমি নীতি, নয়, উদার, সার ও অসার; তুমি বিধানকর্তা ও বিধেয়; আর্য-অনার্য্য, রূপহীন স্বরূপ, মনুষ্য ও অমনুষ্য। ৯৪

তুমি মৃত্যু, স্রষ্টা, পালক, পাল্যরূপ, চিত্ত-স্বরূপ, চেতনোৰ্মিযুক্ত, ঊর্মি, বিদ্যা, অবিদ্যা এবং বেদবাক্যস্বরূপ; তুমি রূপ, অরূপ, তীক্ষ্ণরূপ এবং সৌম্য রূপ। ১৫

তুমি ভাব, অভাব, শোভাশালী, শুদ্ধরূপী, নিরন্তর শান্ত এবং মুনিদিগের উগ্রা শান্তি। তুমি দ্বন্দ্ব, অদ্বন্দ্ব, সৰ্ব্বগ ও অসৰ্বগত; তুমি ভ্রান্ত, অভ্রান্ত, সিদ্ধ ও সিদ্ধপ্রদ। ৯৬

 কালীর গৌরীমূর্তি ও শিবের অর্ধাঙ্গতা প্রাপ্তি - কালিকা পুরাণ 

তুমি একস্থ, সৰ্ব্বলোক-প্রাপ্ত-দেহ, দেহশূন্য এবং একদেহ। তুমি স্থূল, সূক্ষ্ম, নির্বিকার এবং শরীরী ও বিশ্বাত্মা; তুমি নাস্তিবাদ শূন্য। ৯৭

যাহার রূপ কাৰ্য্য ও অকাৰ্য্য সমস্ত ব্যাপ্ত ও অব্যাপ্ত ভাগহীন অতি পূর্ণ, যিনি নিত্য স্থানাভিলাষীর যোগ জ্ঞান, যাহার শ্রীপদ নিত্য-রূপ, তাহাকে প্রণাম করি। ৯৮

যিনি প্রধান পুরুষেরও বিধাতা, যিনি কালরূপী এবং প্রধান পুরুষ; সেই উগ্র প্রভাশালী, বরপ্রদ এবং শ্রেষ্ঠ, চিত্ত-নীতির বিতান স্বরূপ ঈশ্বরকে প্রণাম করি। ৯৯

হে বিশ্বাত্মন। বৃষধ্বজ! মহেশ্বর! যিনি অক্ষয়, অব্যয়, সকল কার্যের সাক্ষি-স্বরূপ এবং ক্ষেত্রজ্ঞ, ক্ষেত্রধারী, তাহাকে প্রণাম করিতেছি। ১০০

যাহার চিত্তরূপ চন্দ্রমা, জ্ঞানরূপ-অমৃত-নিস্যন্দী, সেইরূপ আমি কেবল ভক্তিতে কিরূপে জানিতে পারিব? তথাপি তাহাকে করজোড়ে প্রণিপাত করি। ১০১

ঔর্ব বলিলেন, সৰ্ব্বভূতানুকম্পন মহাদেব এইরূপ স্তুত হইয়া প্রফুল্ল বদনে পার্বতীর সন্তোষসাধন করিয়া বলিলেন, দেবি! তোমার স্তবে তুষ্ট হইয়াছি, অভিমত বর প্রার্থনা কর; তোমার তপঃপ্রভাবে আমি, ব্ৰহ্মা ও হরি সকলেই আপ্যায়িত হইয়াছি। ১০২-১০৩

তপস্যাশীল এবং সচ্চরিত্র তোমার সমান কেহই নাই। প্রিয়ে! তোমা ভিন্ন কিছুতেই তৃপ্তি বোধ হইতেছে না, তোমার যা ইচ্ছা, কর। ১০৪

তাহার পর হিমালয়-সুতা মায়াতে মোহিত হইয়া বলিলেন, সম্প্রতি আমার শরীর সুবর্ণ সদৃশ গৌর হউক এবং হে শম্ভো! আপনিও আমা ভিন্ন অন্য কান্তাতে অভিলাষী হইতে পারিবেন না। ১০৫-১০৬

পাৰ্বতী এই কথা বলিলে মহাদেব, পার্বতীকে আকাশগঙ্গার তোয়সমূহে স্নান করাইলেন। ১০৭

তাহার পর সেই সলিল হইতে উত্তীর্ণ গিরিজা বিদ্যুতের ন্যায় গৌরবর্ণা হইলেন, শুভ্র সলিলে অবস্থিতি সময়ে দেবী শরৎকালীন মেঘে তড়িন্মালার ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন। ১০৮

তৎপরে শম্ভু অঙ্গীকার করিলেন, প্রিয়ে! তোমাকে সত্য বলিতেছি, আমি তোমা ভিন্ন অন্য স্ত্রীকে মনের দ্বারাও গ্রহণ করিব না। ১০৯

ঔৰ্ব বলিলেন, অনন্তর পাৰ্বতী তোয় হইতে উত্তীর্ণ হইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং শরৎকালীন চন্দ্রের চন্দ্রিকার ন্যায় তাঁহার তপঃক্লেশ পরিত্যক্ত হইল। ১১০

অনন্তর বৃষধ্বজ দেবী পার্বতীকে গ্রহণ করিয়া স্বকীয় আশ্রম কৈলাস পৰ্বতে শীঘ্র গমন করিলেন। ১১১

কৈলাসে গমন করিয়া হর, দেবীকে বিবিধ বসন ভূষণাদিদ্বারা ভূষিত করিয়া পূর্বের ন্যায় হাস্য জনক বিবিধ বাক্যদ্বারা আনন্দ উৎপাদন করিতে লাগিলেন। ১১২।

সুবর্ণের ন্যায় গৌরাঙ্গী গিরিজাও স্বকীয় মনোহর রূপ দর্শন করত এবং সময়ানুসারে শম্ভুকে প্রাপ্ত হইয়া অত্যন্ত আনন্দিতা হইলেন। ১১৩

এইরূপ শিব ও গৌরী, পরস্পরে ক্রীড়াতে আসক্ত হইলে, কিয়ৎকাল কৈলাস পর্বতেই অতীত হইল। ১১৪

অনন্তর একদিন হিমালয়সুতা মহাদেবসমীপে উপবেশন করিয়া দেখিলেন, স্বীয়চ্ছায়া তাহার বক্ষঃস্থলে পতিত হইয়াছে। ১১৫

গিরিজা-স্ফটিকের ন্যায় শুভ্র, মনোহর, যোগিগণের জ্ঞানের আদর্শস্থল শম্ভুর বক্ষঃস্থলে পতিত বামভাগে প্রতিবিম্বিতা মনোহরাঙ্গী ছায়াকে হাস্যযুক্ত মনোহরবদনা বনিতার স্বরূপ দর্শন করিলেন। ১১৬

তাহার দৃষ্টির বিভ্রমবশতঃ ছায়াতে বনিতাজ্ঞান এই বুদ্ধি হইল,–গিরিশ সত্য করিয়াও পুনর্বার মায়াদ্বারা শরীরে স্থাপিতা কুটিলা এবং চঞ্চলা অন্যস্ত্রী গ্রহণ করিলেন? ১১৭-১১৮

এইরূপ ভাবিয়া তাহার বদন মলিন হইল এবং ভ্রু কুঞ্চিত হইল; মহাদেবও সেই সত্যভঙ্গপাতকেই যেন শ্যামরূপ হইলেন। ১১৯

পাৰ্বতী বিষ্ণুমায়ায় বিমোহিত হইয়া ছায়াকে দর্শন করত প্রচ্ছন্নভাবে গিরিকুঞ্জে প্রবেশ করিলেন। ১২০

তৎপরে শঙ্কর বিরহাকূলচিত্তে তাহাকে অন্বেষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। কিয়ৎকাল পরে শিব, গিরিকুঞ্জে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিত দেবীকে প্রাপ্ত হইলেন। মহাদেব মলিন-বদনা প্রিয়াকে প্রাপ্ত হইয়া ক্রোধের কারণ যথার্থরূপে জানিতে ইচ্ছা করিয়া বলিলেন। ১২১-১২২

অয়ি কোপনে! বরারোহে। তুমি আমার প্রতি কোপ করিয়াছ কেন? সেই কোপের কারণ জানিবার নিমিত্ত তোমার নিকট আসিয়াছি, আমি তোমার সমীপে বাক্য মন শরীরের দ্বারা কোন অপরাধ করি নাই; তবে ভামিনি! কোপ করিয়াছ কেন? ১২৩-১২৪

দেবী বলিলেন, পর্বে তপস্যাদ্বারা প্রতিজ্ঞানুসারে আপনি প্রার্থিত হইয়াছিলেন, কিন্তু কিজন্য আমাকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যভাৰ্য্যা গ্রহণ করিলেন? ১২৫

হে হর! আমি প্রত্যক্ষরূপে দেখিয়াছি, জলসেকে ভস্ম দূরীভূত হইলে বক্ষঃস্থলে মনোহরশরীরা কোন এক বনিতা অবস্থান করিতেছেন। ১২৬

আপনি সৰ্ব্বজ্ঞ, সৰ্বগ এবং পরমেশ্বর; হে পরমেশ। তপঃসমূহে তোষিত হইয়াও কি আমার প্রতি তুষ্ট হন নাই? ১২৭

তাহা হইলে পুনৰ্বার আমি তপস্যা করিবার নিমিত্ত ইচ্ছা করি। হে শম্ভো! আমাকে তপোবনগমনে অনুমতি করুন, বৃথা বিলম্ব করিবেন না। ১২৮

এইরূপ পার্বতীর বাক্য শ্রবণ করিয়া হাস্যযুক্ত-বদনে শঙ্কর ভামিনী পার্বতীকে স্নেহের সহিত বলিলেন। ১২৯

আমি অন্য স্ত্রীকে বিবাহ করি নাই এবং আমি সত্যভ্রষ্টও হই নাই। তোমার মিথ্যা তত্ত্ব জ্ঞান হইয়াছে এবং তুমি মুগ্ধা হইয়াছ। ১৩০

পাৰ্বতি! তাহার কারণ, যদি তুমি শুনিতে ইচ্ছা কর, তাহা হইলে মানিনি! আমি বলিতেছি, তুমি মান করিও না। ১৩১

বিস্তীর্ণ এবং দর্পণের ন্যায় স্বচ্ছ আমার বক্ষঃস্থলে প্রতিবিম্বিত তোমার শরীরের ছায়াকে দেখিয়াছ। ১৩২

তাহা এখন নিশ্চয় অবধারণ কর। তোমা হইতে সে ভিন্ন নহে। অয়ি হৃদয়সংস্থিতে, গিরিজে! এই বিষয়ে মান করা তোমার কর্তব্য নহে। ১৩৩

দেবী বলিলেন, হে বৃষধ্বজ! আমি থাকিলেই ছায়া আছে, অতএব ছায়া আমা হইতে ভিন্ন নহে; কিন্তু আপনার বক্ষঃস্থলে যে ছায়া পড়িয়াছিল ইহা কিরূপে আমি জানিতে পারি, তাহা আপনি বলুন। ১৩৪

ঈশ্বর বলিলেন, অয়ি মনোহরে! তুমি গবাক্ষর ভিতরে থাকিয়া বিশেষ জ্ঞানপূর্বক আমার শরীরের ভূতিলেপ সলিলদ্বারা দর্শন কর এবং পূনৰ্বার আদর্শস্থলে স্বীয় ভূষিত দেহ দর্শন কর; তাহার পর আমার হৃদয়সমীপে আসিয়া সেইরূপ ছায়া দেখ। ১৩৫-১৩৬

অয়ি মনোহরে! যেরূপ স্বীয় দেহ দেখিবে, সেই রূপ-বিশিষ্ট নিজ ছায়া আমার বক্ষে দেখিতে পাইবে, কিন্তু সেই ছায়া তোমা হইতে ভিন্ন নহে। ১৩৭

সেইটি বিশেষরূপে জানিয়া মান পরিত্যাগ করত আমার প্রতি কৃপা কর। ১৩৮

ঔৰ্ব বলিলেন, অনন্তর চন্দ্রশেখর শিব, এই কথা বলিলে, পার্বতী জল দ্বারা হৃদয় ধৌত করিয়া স্বকীয় ছায়া দেখিলেন, পার্বতী আদর্শতলে নিজ বক্ত্র ও দেহ দর্শন করিয়া পুনর্বার শঙ্করবক্ষে দেখিলেন,-যেরূপ দেবী কপট নেত্রবিভ্রম করিলেন, ছায়াও সেইরূপ করিল এবং তদীয় কর-কম্পাদির অনুকরণ করিল। ১৩৯-১৪১

তাহার পর হিমাদ্রিসুতা পুনৰ্বার গবাক্ষ-জালসমীপে থাকিয়া ভূতিশূন্য শম্ভুর হৃদয়ে দেখিলেন, কিন্তু সেই বৃষধ্বজের বক্ষে কোন বনিতা দেখিতে পাইলেন না, কেবলমাত্র জালের মণ্ডল দেখিলেন। ১৪২-১৪৩

ভবাঙ্গনা দেবী বহুবিধ উপায় দ্বারাও দেখিতে না পাইয়া সংশয় দূরীভূত হইলে অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া অধোমুখী গিরিজাকে শম্ভু বাহুদ্বারা আলিঙ্গন এবং চুম্বন করিলেন। ১৪৪-১৪৫

মহাদেব, দেবীকে আশ্বাসবাক্যে বলিলেন, অয়ি মহাভাগে! তুমি লজ্জিতা হইও না, কাহার ভ্রান্তি না আছে? ১৪৬

এবং স্ত্রীদিগের মানও শ্রেষ্ঠকাৰ্য, যেহেতু মানই সুন্দর ও প্রেমোৎপাদক। দেবি! তুমি হঠাৎ মান করিও না। ১৪৭

হে দ্বিজগণ! মহাদেব, মৈনাক-সহোদরাকে এই কথা বলিলে তিনি শঙ্করকে প্রণয়ের সহিত মধুর স্বরে তাহাকে বলিলেন। ১৪৮

হর! যেরূপে আমি ছায়ার ন্যায় আপন অনুগত হইয়া সহচারিণী হইতে পারি, তাহাই করুন। ১৪৯

আমি সর্বদা আপনার শরীর সংস্পর্শ এবং অবিচ্ছিন্ন আলিঙ্গনসুখ ইচ্ছা করি, অতএব আমাকে সেই সুখভাগিনী করাই আপনার উচিৎ। ১৫০

ভগবান বলিলেন, ভামিনি। যাহা তুমি ইচ্ছা করিয়াছ, যদি আমাতে সেইরূপ সুখভোগের অভিলাষ থাকে, তাহা হইলে তাহার উপায় আমি বলিতেছি, যদি সক্ষমা হও তবে সেই উপায় অবলম্বন কর। ১৫১

হে মনোহরে! তুমি আমার শরীরের অর্ধভাগ গ্রহণ কর, তাহা হইলে আমার অর্থভাগ নারীরূপ হইবে এবং অর্থভাগ পুরুষ থাকিবে। ১৫২

যদি তুমিও শরীরার্ধ গ্রহণ করিতে পার, তাহা হইলে আমি তোমার শরীরার্ধ গ্রহণ করিব। ১৫৩

তাহা হইলে তোমারই দেহের অর্ধভাগ পুরুষ হউক, অৰ্দ্ধভাগ নারীরূপই থাকিবে-তোমার সেই শরীরার্ধ পুরুষরূপে আমার শক্তিই থাকিবে। তবে সে বিষয়ে আমাকে অনুমতি কর। ১৫৪

দেবী বলিলেন, হে বৃষধ্বজ আমিই আপনার শরীরার্ধ গ্রহণ করিব। হে হর! আমি এক অভিলাষ করি, কিন্তু তাহা আপনার অভিলষিত হইলে হয়। ১৫৫

আমি আপনার অর্ধদেহ গ্রহণ করিয়া অবস্থান করিব, কিন্তু যে সময়ে সেই দেহাৰ্দ্ধ পরিত্যাগ করিব, সেই সময়ে উভয় দেহ যেন পুনর্বার সম্পূর্ণরূপ হয়। ১৫৬

এইরূপে অৰ্দ্ধভাগ গ্রহণ করা যদি অভিমত হয় তবে আমি আপনার শরীরার্ধ গ্রহণ করিব। ১৫৭

ঈশ্বর বলিলেন, এইরূপই তোমার ইপ্সিত বিষয়, ইহা নিশ্চয় সম্পূর্ণ হইবে, অতএব শরীরার্ধ গ্রহণ করাই তোমার কর্তব্য। ১৫৮

ঔর্ব বলিলেন, অনন্তর গৌরী পূর্বানুভূত তপস্যা সময়ে স্বীয় যোগনিদ্রা স্বরূপ চিন্তা করিলেন। ১৫৯

প্রথমত: হরকে প্রণাম করিয়া তৎপরে ব্রহ্মা ও জগৎপ্রভু নারায়ণকে প্রণাম করিলেন এবং জগন্ময়ী তাহাদের একরূপতা ও আপনাকে যোগনিদ্রাস্বরূপ চিন্তা করত স্বশরীরের দক্ষিণভাগে শিব-শরীরার্ধভাগ ধারণ করিলেন ও তাহাতে বাসাদি প্রীতি-সহকারে নিবেশ করিলেন। ১৬০-১৬২

শিবও গৌরীর প্রীতি-সাধনের নিমিত্ত প্রেমবশতঃ নিজ দেহার্ধ গৌরীদেহে নিবেশ করিলেন। ১৬৩

তারপর শিব কালীর সহিত চিরকাল এক থাকিয়া শরীরার্ধ পরিত্যাগ করত যেন পৃথকরূপে দীপ্তি পাইতে লাগিলেন। ১৬৪

কালী স্বয়ং স্বর্ণসদৃশ গৌরবর্ণা হইয়া শঙ্কর-দেহাৰ্দ্ধ প্রাপ্ত হইলেন। তাহাতে অসীম আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলেন। ১৬৫

পরমেশ্বরী এইরূপে হরদেহার্ধ গ্রহণ করিয়া হরগৌরীরূপে অতিশয় শোভা পাইতে লাগিলেন। ১৬৬

তাঁহার অর্থভাগ সংযত-কেশ-পাশযুক্ত, অৰ্দ্ধভাগ জটাজুট-বিভূষিত; এক ভাগ স্বর্ণখচিত শ্রবণালঙ্কারে শোভিত, অপরভাগে শ্রবণকুণ্ডলযুক্ত। অর্ধ মৃগলোচন, অর্ধ বৃষভাক্ষ। ১৬৭-১৬৮

নাসিকা একদিকে স্থূল, অপরদিকে তিল-কুসুর-সদৃশ। একভাগ দীর্ঘ শ্মশ্রুমুক্ত অপরভাগ শ্মশ্রু-রহিত। ১৬৯

একদিকে আরক্ত দশন এবং রক্তবর্ণ ওষ্ঠ অপর দিকে শুক্লবর্ণ বিপূলনেত্র ও দীর্ঘদন্ত। ১৭০

অর্ধ গলদেশ নীলবর্ণ, অপরার্দ্ধ মনোহর হারে শোভিত। তাহার এক বাহু কনকময় কেয়ুর-ভূষিত, অপর বাহু নাগরূপ কেয়ুর-যুক্ত, স্থূল ও দীপ্তি হীন এবং একবাহু মৃণাল-সদৃশ আয়ত অপরটি করিকর-সদৃশ স্থূল। ১৭১-১৭২

একটি হস্ত দীপ্তিশালী শাখাস্বরূপ, অপরটি তাহা নহে, বক্ষের অর্ধভাগ এক স্তনযুক্ত, অপরার্দ্ধ লোমাবলীবিরাজিত। ১৭৩

এক পার্শ্বস্থিত ঊরু রম্ভাতরু-সদৃশ, পার্ষ্ণি মনোহর এবং চরণতল অতি কোমল, অপরপার্শ্বের ঊরু স্থূল, কটি পর্যন্ত বদ্ধ। ১৭৪

একটি জঙ্ঘা মৃদু এবং মনোহর, অপরটি দৃঢ়রূপে পদ ও কটি পর্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৭৫

দেবীর শরীরের একাংশ ব্র্যাঘ্রচর্ম ও ভূতিযুক্ত, অপরাংশ চন্দন-সিক্ত মৃদু বস্তু শোভিত। এইরূপ অৰ্দ্ধভাগ স্ত্রীলক্ষণসম্পন্ন হইল, অপরার্দ্ধ সুদৃঢ় পুরুষাকৃতি হইল। ১৭৬-১৭৭

কালিকা-সদৃশী গিরিজা সতী কালিকা জগতের হিতের জন্য শম্ভুর শরীরার্ধ গ্রহণ করিলেন। ১৭৮

হে রাজেন্দ্র! কালীর শরীরার্ধ হরদেহাৰ্ধযুক্ত হইলে ত্রিভুবনে তাহার উপমার উপযুক্ত বস্তু–বিশেষ অন্বেষণেও অপ্রাপ্য হইল। ১৭৯

হে নরেশ্বর! সন্তান, কল্পবৃক্ষে, পারিজাত এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ একান্ত বিশদ তরুগণ পৃথকৃরূপে কিংবা শ্রেণীবদ্ধ হইয়াও তাহাদিগকে সেবা করিবার উপযুক্ত হইল না। শিব অর্ধনারীশ্বর হইয়া বিশেষ সুখাসক্ত হইলেন। ১৮০-১৮১

যদিও ভূতপতি স্বয়ং কালীকে তপস্যা ব্যতীতই গৌরবর্ণা করিতে পারিতেন, তথাপি সৰ্ব্বভূতের আদি-কারণ মহাদেব গিরিসুতাকে প্রথমতঃ নানাবিধ ক্রিয়া এবং তপস্যা আচরণ করাইয়া তাহার তপোবিশুদ্ধ অঙ্গকে গৌরবর্ণ করিয়াছেন। এবং শরীরার্ধও প্রদান করিয়াছেন। ১৮২-১৮৪

এইরূপ তপস্যা আচরন এবং শরীরার্ধ প্রদান,-ইন্দ্রাদি দেবগণ ইহার তত্ত্ব কিছুই জানেন না। ১৮৫

কিন্তু মহাত্মা মহাবল নন্দী ভৃঙ্গী মহাকাল ও কালভৈরব প্রভৃতি বীতভয় মহাকালের অঙ্গভূত অনুচরবর্গ অর্থাৎ যাঁহারা তপোবলে মনুষ্যশরীরেই গণের আধিপত্য এবং পূর্ণব্রহ্ম ভূতেশকে জানিয়াছেন, সেই তত্ত্ব তাহারাই জানেন। ১৮৬-১৮৭

হে নৃপসত্তম। এইরূপ স্বানুগতা বনিতাকে সৎক্রিয়া ও সদুপায়ে যোগ করিয়া ভাৰ্য্যা পদে প্রতিষ্ঠা করিবেন, তাহা হইলে বিশেষ মঙ্গলাস্পদ হইবেন। ১৮৮

যে ব্যক্তি এইরূপ হরগৌরীর প্রীতিকর শরীরার্ধ গ্রহণ এবং কালিকার গৌরীত্ব-প্রাপ্তিরূপ পুণ্যকথা নিত্য শ্রবণ করে, সে কোনরূপ বিঘ্নাক্রান্ত না হইয়া দীর্ঘায়ু, সুখী এবং পুত্র-পৌত্রযুক্তও শ্রেষ্ঠ পুণ্যবান্ হয়। ১৮৯-১৯১

যে ব্যক্তি এইরূপ হরগৌরীর অদ্ভুত চরিত লোকদিগকে শ্রবণ করায়, তাহার শিব-লোক-প্রাপ্তি হয় এবং সে শিব-বল্লভ হয়। ১৯২

পঞ্চত্বারিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ৪৫

আরও পড়ুনঃ

শিব-বিহার – কালিকা পুরাণ

ধ্যানযোগে মহাদেবের বিশ্বদর্শন – কালিকা পুরাণ

শিব-বিবাহ – কালিকা পুরাণ

মন্তব্য করুন