বরাহ শরভসংগ্রাম – কালিকা পুরাণ

ত্রিংশ অধ্যায় – বরাহ শরভসংগ্রাম:  মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তদনন্তর দেবগণ লোকহিতের নিমিত্ত দেবেন্দ্র এবং দেবযোনি-সমূহের সহিত মন্ত্রণা করিতে আরম্ভ করিলেন। ১

এবং ইন্দ্রাদি দেবগণ যুক্তি করিয়া অনাদি দেবাদিদেব শরণাগতপালক ভগবানের শরণ লওয়াই শ্রেয়স্কর বিবেচনায় মুনিগণের সহিত জগৎপতি বাসুদেব গরুড়ধ্বজ গোবিন্দের সমীপে গমন করত প্রণতিপূর্বক স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। ২-৩

হে দেবাদিদেব! আপনি জগৎসৃষ্টির মূলীভূত কারণসমূহের কারণ; হে কালরূপিন! মহাপুরুষ! ভগবন্! আপনি স্থূলরূপে জগদ্ব্যাপী হইয়াও সূক্ষ্ম রূপে প্রকাশ পাইতেছেন। ৪

হে পুরুষোত্তম পরমেশ্বর! আপনি এই জগৎপ্রপঞ্চের সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ কারী। এবং আপনি স্বয়ং মায়া স্বরূপে জগৎ মোহিত করিতেছেন। হে পরমেশ্বর! ভূত-ভবিষ্যৎ-বৰ্তমানাত্মক ত্রিকালের যে কিছু বস্তু আছে, সকলই আপনার স্বরূপ।

বরাহ শরভসংগ্রাম - কালিকা পুরাণ

অর্থাকাঙ্ক্ষী দরিদ্রগণ আপনাকে লাভ করিলে অকিঞ্চিৎকর অর্থাভিলাষে জলাঞ্জলি দিয়া কৃতার্থ হয়। কামুকগণ আপনাকে পাইলে সকাম হইয়া অসুখকর কামক্রীড়া হইতে পরাঙ্মুখ হয়। ৫-৭

ধর্মপরায়ণগণ স্বীয়ধর্মবলে আপনার দর্শন পাইয়া আত্মাকে চরিতার্থ করে এবং মুমুক্ষুগণ আপনার দর্শনে মোক্ষধাম প্রাপ্ত হয়। হে সৰ্বাত্মক। কামুক, অর্থী, ধার্মিক এবং মুমুক্ষু প্রভৃতি সকলেই আপনার স্বরূপ। ৮

বরাহ শরভসংগ্রাম – কালিকা পুরাণ

আপনার মুখ হইতে ব্রাহ্মণ, বাহু হইতে ক্ষত্রিয়, ঊরু হইতে বৈশ এবং চরণ হইতে শূদ্ৰজাতি উৎপন্ন হইয়াছে। ৯

হে বিভো! আপনার নেত্র হইতে সূর্য, মন হইতে চন্দ্র এবং কর্ণ হইতে প্রাণ-অপান-প্রভৃতির সহিত পবনদেব জন্মিয়াছেন। ১০

আপনার মস্তক হইতে স্বর্গাদি উৰ্দ্ধলোক, নাভিমণ্ডল হইতে আকাশ এবং চরণকমল হইতে পৃথিবী উৎপন্ন হইয়াছেন। ১১

আপনার কর্ণের অগ্রভাগ হইতে দিক্‌ এবং জঠর হইতে জগতের উৎপত্তি হইয়াছে। ১২

আপনি নির্গুণ এবং নিৰ্ম্মল হইয়াও গুণবান্ অদ্বিতীয় স্বরূপ হইয়াছেন। হে অচ্যুত জগন্নাথ! আপনি উৎপত্তি, স্থিতি এবং লয় প্রভৃতি দেহি ধর্মহীন পরমেশ্বর। ১৩

আর দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, দেবগণ, সাধ্য, যক্ষ, মরুগণ এবং মুমুক্ষু যোগিগণ আপনার ধ্যানে কাল অতিবাহিত করেন। ১৪

বিশেষজ্ঞ পরাশরাদি নিঃস্পৃহ মুনিগণ আপনাকে চিরানন্দময় বলেন এবং আপনিই সংসাররূপ বৃক্ষের মূল আলবাল (জলদান স্থান) এবং ফলের স্বরূপ। ১৫

হে কমলকর! আপনি হস্তচতুষ্টয় অসি, চক্র, পদ্ম এবং ধনু ধারণ করিয়া পদ্মার সহিত শোভা পাইতেছেন; এবং সুমেরুশিখরোপরি সজল-জলদ যেরূপ শোভা পায়, আপনিও গরুড়োপরি আরোহণ করিয়া তাহা হইতে অধিক শোভায় শোভিত হন। ১৬

আপনিই দেবশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এবং আপনিই সকল বস্তুর স্বরূপ। ব্ৰহ্মা, শিব এবং লোকপাল–আমাদের গুণ, স্মরণ করিবার যোগ্য নহে। অতএব হে ভক্তভয়হারিন্! আমরা ভয় হেতু আপনার আশ্রয় গ্রহণ করিলাম, আমাদিগকে রক্ষা করুন। ১৭

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–ভূতভাবন ভগবান এই প্রকার ইন্দ্রাদি দেবগণের স্তবে তুষ্ট হইয়া মেঘগর্জনের ন্যায় গম্ভীর রবে বলিলেন,–হে দেবগণ! তোমরা যে ভয়-নিমিত্ত আগমন করিয়াছ এবং আমার দ্বারা কি প্রকারে সেই ভয় শান্তি হইবে, তাহা শীঘ্র বল। ১৮-১৯

দেবগণ বলিলেন, যজ্ঞ-বরাহের ক্রীড়াহেতু পৃথিবী প্রতিদিন শীর্ণ বিশীর্ণ হইতেছেন। লোক সকল সেই উদ্বেগে শান্তি লাভ করিতেছে না। ২০

বরাহ শরভসংগ্রাম - কালিকা পুরাণ

শুষ্ক অলাবু ফলের উপরে আঘাত করিলে সে যে প্রকার খণ্ড খণ্ড হয়, যজ্ঞ বরাহের খুরের আঘাতে পৃথিবীও সেইরূপ বিদীর্ন হইতেছেন। ২১

বরাহদেবের সুবৃত্ত, কনক এবং ঘোরনামক প্রলয়াগ্নির ন্যায় তেজস্বী যে তিনটি পুত্র আছেন, তাহারাও আঘাতে পৃথিবীকে জীর্ণ করিতেছেন। ২২

হে জগদীশ্বর! তাহাদের কর্দম-ক্রীড়া-হেতু মানসাদি উত্তম উত্তম সরোবর সকল ভগ্ন হইয়াছে, অদ্যাপি পূর্ববৎ শোভা ধারণ করিতেছে না। ২৩

মহাবল বরাহপুত্রগণ মন্দারাদি দেবতরু সকলকে ভগ্নপ্রায় করিয়াছেন। পারিজাত তরু–পুষ্প, ফল, পত্র প্রভৃতি দ্বারা দেবগণের তৃপ্তিসাধন করিতেছে। ২৪

হে মহাবাহো! যে কালে সুবৃত্তাদি বরাহপুত্রগণ, অত্রি গিরির উন্নতশিখর হইতে লবণ সমুদ্রের জলে লম্ফ প্রদান করেন, সেই সময়ে তাহাদের লম্ফন-বেগে উত্থিত জল-প্রবাহে ত্রিভুবন মগ্নপ্রায় হয়। ২৫

লোক সকল জলমগ্ন হইয়া প্রাণভয়ে চতুর্দিকে পলায়ন করত প্রাণরক্ষার নিমিত্ত পুত্ৰকলহ ত্যাগ করিয়া দেশদেশান্তরে ধাবমান হয়। ২৬

যজ্ঞবরাহপুত্রগণ যেকালে ইচ্ছানুরূপ স্বর্গে গমন করেন, তাহাদের দর্শনে অতিশয় ভীত হইয়া ইতস্তত পলায়ন করিয়াও চিত্তের শান্তিলাভ করিতে পারেন নাই। ২৭

ক্রীড়াপরায়ণ বরাহপুত্রগণ, পৰ্বত সকলের শৃঙ্গ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে নিক্ষেপ করে, পৃথিবীও পৰ্বত-পতন-বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া অধোগামিনী হন। ২৮

হে জগদীশ্বর বৈকুণ্ঠনাথ! এই প্রকার বরাহপুত্রগণের ক্রীড়ায় ত্রিলোক বিনষ্টপ্রায় হইতেছে। অতএব হে ধরাপতে! আপনি ধরার প্রতি সদয় হউন। ২৯

মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–জনার্দন দেবগণের এই প্রকার বাক্য শ্রবণ করিয়া ব্রহ্মা এবং মহেশ্বরকে বিশেষরূপে বলিতে আরম্ভ করিলেন। ৩০

যে নিমিত্ত দেবগণ এবং প্রজাগণ মহাদুঃখ পাইতেছে এবং পৃথিবীও বিদীর্ণ হইতেছে, এই সকল দুঃখের কারণস্বরূপ বরাহদেহ ত্যাগ করিব; কিন্তু সুখাসক্ত সেই দেহকে স্বেচ্ছাক্রমে ত্যাগ করিতে সমর্থ হইতেছি না। ৩১

অতএব হে মহাদেব! তোমার যত্নে আমি বরাহদেহ ত্যাগ করিব। ৩২

ব্ৰহ্মন্! তুমি মহাদেবকে নিজ তেজে পুষ্ট কর। দেবগণ মহাদেবকেও আপ্যায়িত করুন। ৩৩

মহাদেব সকলের উৎসাহে যজ্ঞবরাহকে বিনাশ করুন! রজস্বলার সঙ্গমে এবং ব্রাহ্মণাদির বধহেতু পাপপূর্ণ প্রাণকে স্বচ্ছন্দে ত্যাগ করিব। ৩৪

প্রায়শ্চিত্ত দ্বারা অখণ্ডনীয় পাপের এই প্রকারে প্রায়শ্চিত্ত হইবে। কেননা, প্রাণত্যাগ করিলে সকল পাপ হইতে মুক্তি হয়। ৩৫

প্রজাপণের পালনার্থে আমার জন্ম, সেই প্ৰজাই যখন আমার নিমিত্ত প্রতিদিন মহাদুঃখ অনুভব করিতেছে, তখন প্রজাহিতের নিমিত্ত আমি শীঘ্রই বরাহদেহ পরিত্যাগ করিব। ৩৬

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–ব্ৰহ্মা এবং মহাদেব এই প্রকার ভগবানের বাক্য শ্রবণ করিয়া বলিলেন, হে গোবিন্দ! আপনি আপনার আদেশানুরূপ কাৰ্য্য করুন। ৩৭

ভগবান বাসুদেব দেবগণকে স্ব স্ব স্থানে গমনের আদেশ করিয়া বরাহদেহ হইতে স্বকীয় তেজ আকর্ষণের নিমিত্ত ধ্যানপর হইলেন। ৩৮

মাধব ক্রমশ বরাহ-দেহ হইতে তেজ আকর্ষণ করিলে সেই দেহ সত্ত্বহীন হইল দেখিয়া মহাদেব দেবগণের সহিত তেজোহীন বরাহদেবের সমীপে উপস্থিত হইলেন। ৩৯-৪০

ব্ৰহ্মাদি দেবগণ মহাদেবের তেজ বিস্তারের নিমিত্ত পশ্চাৎ পশ্চাৎ আগমন করিলেন। ৪১

নিজ নিজ তেজ মহাদেবের দেহে সঞ্চার করায় তিনি অত্যন্ত বলবান হইলেন। ৪২

তদনন্তর মহাদেব উৰ্দ্ধ এবং অধোদেশে অষ্টচরণ সমন্বিত ভয়ানক শরভরূপ ধারণ করিলেন। ৪৩

দুইলক্ষ যোজন উন্নত, দেড়লক্ষ যোজন বিস্তৃত, ঊর্ধ্বে একলক্ষ যোজন বিস্তৃত। ৪৪

পার্শ্বে অর্ধ লক্ষ যোজন পরিমাণে দীর্ঘ বরাহশরীর বৃদ্ধি পাইল। ৪৫

বরাহ শরভসংগ্রাম - কালিকা পুরাণ

তদনন্তর যজ্ঞবরাহ, মস্তক দ্বারা চন্দ্র-স্পর্শী সুদীর্ঘ নাসিকা এবং নখরবিশিষ্ট অঙ্গারের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ বিস্তৃতমুখে অষ্ট-দন্ত-শোভিত। ৪৬-৪৭

শরীরানুরূপ-দীর্ঘ পুচ্ছধারী, পৃষ্ঠদেশে পাদচতুষ্টয় দ্বারা বিরাজমান, মুখে ভয়ানক শব্দকারী এবং ইতস্ততঃ শরীরবিস্তারী শরভরূপী মহাদেবকে দর্শন করিলেন। ৪৮

সুবৃত্ত, কনক, ঘোর এই তিন জন মহাবল ভ্রাতা শরভের বেগে আগমন দর্শন করিয়া ক্রোধান্ধ হইলেন! ৪০

তাহারা একেবারে শরভশরীরে পোত্রের দ্বারা প্রচণ্ড আঘাত করিতে আরম্ভ করিলেন। ৫০

বরাহ-পুত্ৰত্ৰয় মায়াতে শরভের ন্যায় দীর্ঘ হইয়া বিষম প্রহারে শরভকে ভূতলে নিক্ষেপ করিল। ৫১

শরভ, বরাহপুত্রগণের বিষম পোত্র-প্রহারে পৃথিবী হইতে গম্ভীর সমুদ্রজলে পতিত হইলেন। ৫২

মকরাদি হিংস্ৰজলজন্তুপূর্ণ মহোদধিতে শরভ পতিত হইলে বরাহপুত্রগণ ক্রোধবশতঃ লম্ফপ্রদান করিয়া সমুদ্রজলে নিপতিত হইল। ৫৩

হে দ্বিজগণ! যজ্ঞবরাহ সুবৃত্তাদির সমুদ্রজলে পতন দেখিয়া পুত্রস্নেহে এবং শত্রুর প্রতি রোষ প্রকাশ করিয়া সমুদ্রে লম্ফ প্রদান করিলেন। ৫৪

তাহাদের পতনবেগে স্বর্গবাসী দেবগণ এবং গ্রহ নক্ষত্রগণ ভগ্ন হইল। ৫৫

কোন কোন দেব নিহত হইয়া পৃথিবীতে পতিত হইলেন। কোন কোন জ্ঞানিদেব মহর্লোক আশ্রয় করিলেন। ৫৬

নক্ষত্ৰগ্ৰহ রাশিচক্র হইতে মহীতলে পতিত হইয়া –হে দ্বিজগণ। পৃথিবীকে দীপ্তিরাশি দ্বারা পরিপূর্ণ করিল। ৫৭।

তাহাদের পতনবেগে যে প্রচণ্ড বায়ু উৎপন্ন হইয়াছিল, সেই বায়ু কর্তৃক চালিত হইয়া বৃহৎ বৃহৎ পৰ্বত সকল পৃথিবীতে ভগ্নশৃঙ্গ হইয়া পতিত হইতে লাগিল। কোন কোন পৰ্বত ঐভাবে সমুদ্রজলে পতিত হইল। ৫৮-৫৯

কোন পৰ্বত, পৰ্ব্বতের উপর পতিত হইয়া পার্বত্য জীবজন্তু এবং বৃক্ষ সকলকে নাশ করত পৃথিবীতে স্থির হইল। ৬০

কোন পৰ্বত বায়ু দ্বারা বিমর্দিত হইয়া পতনবেগে পৃথিবীস্থ জন্তুসকল নষ্ট করিল। অচল সকল পৃথিবীতে পতিত হইয়া পরস্পর সঙ্ঘর্ষণে চলৎশক্তি সম্পন্নের ন্যায় দৃষ্ট হইয়াছিল। ৬২-৬১

সপুত্র যজ্ঞবরাহ, শরভ এবং বিশালশৃঙ্গ পৰ্বতগণ সমুদ্রে পতিত হইয়া জল উচ্ছলিত করিয়াছিলেন। ৬৩

তাঁহাদের পতনবেগে সলিলরাশি উৎক্ষিপ্ত হইলে সাগরসমূহ কিঞ্চিৎকাল পরে নির্জলবৎ হইয়াছিল। ৬৪

তাঁহাদের উৎক্ষিপ্ত জল-প্রবাহে পৃথিবী পূর্ণ হইলে প্রজা সকল নষ্ট হইতে লাগিল। মরণদশাপন্ন প্রজা সকল জলে সন্তরণ করত শরণার্থী হইয়া ম্রিয়মাণ হইল। ৬৫

‘হা পিতঃ! হা মাতঃ! হা ভ্রাতঃ! হা সুত!’ ইত্যাদি সম্বোধনে করুণস্বরে রোদন করিতে করিতে মৃত্যুমুখে পতিত হইতে লাগিল। ৬৬

যে দিকে শরভ, বরাহগণের সহিত নিপতিত হইয়াছিলেন, সেইদিকে পৃথিবী তাহাদের চরণভরে বিদীর্ণ হইয়া মগ্ন হইলেন। ৬৭

অপর দিকে বরাহাদির পরাক্রমে চঞ্চলা পৃথিবী পৰ্বতসহ উত্থিত হইয়া জনলোকে উঠিল। ৬৮

শরভ, সেইকালে ভয় এবং শ্ৰমান্বিত হইয়া বরাহবিক্রম হেতু চঞ্চলা, জন লোকগামিনী পৃথিবীকে সোপানপংক্তির ন্যায় দর্শন করিয়া বিস্ময়ান্বিত হইলেন। ৬৯-৭০

তদনন্তর বরাহগণ পোত্র (মুখাগ্র) প্রহার, খুরাঘাত, দন্তপ্রহার এবং ভয়ানক গাত্রনিক্ষেপ দ্বারা যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। ৭১

শরতও দন্তাগ্রপ্রহার, তীক্ষ্ণ নখাঘাত, পুচ্ছাঘাত এবং ভয়ানক মুখাঘাত দ্বারা যজ্ঞবরাহ এবং তৎপুত্রগণের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। ৭২।

একক শরভ বরাহচতুষ্টয়ের সহিত সমানভাবে সহস্র বৎসর পর্যন্ত তুমুল সংগ্রাম করিলেন। ৭৩

তাঁহাদের বেগের সহিত প্রহার, ভ্রমণ, গমন, আগমন, আস্ফোটন এবং বিকট শব্দে কদ্রুপুত্রগণের সহিত পন্নগসমূহ পাতালমধ্যে প্রবেশ করিল। ৭৪

তদনন্তর তাহারা সমুদ্র হইতে পৃথিবীর উপর উত্থান করিয়া পরস্পর যুদ্ধ করত ভূমিসাৎ হইলেন। ৭৫

অনন্ত কচ্ছপের সহিত অতিকষ্টে বহু পরিশ্রমে পৃথিবী ধারণে যত্ন করিয়া ছিলেন এবং তাহারা অলৌকিক পরাক্রম প্রকাশ করায় ভগ্নমস্তক হইয়া বহু সন্তাপ অনুভব করিয়াছিলেন। ৭৬

অনন্ত, স্ববশে পৃথিবীকে অপেক্ষাকৃত সমভূমিতে পরিণত করিলে, জল প্রবাহে জলজন্তুর সহিত পরস্পর যুধ্যমান বরাহগণ এবং শরভ নিবিষ্ট হইলে উদ্বেল সমুদ্রজলে জগৎ জলমগ্ন হইল। ৭৭-৭৮

তখন সুরজ্যেষ্ঠ ব্রহ্মা হরিকে চিন্তা করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন, ভগবন্! ত্রিভুবনবাসী সুরাসুর মানব সকলে নষ্ট হইয়াছে। ৭১

স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগৎও বিধ্বস্ত হইয়াছে। হে জগন্নাথ! দেব, দানব, গন্ধৰ্ব্ব, দৈত্য এবং সরীসৃপ (সর্পাদি) এবং তপস্বী মুনিগণ সকলে অকালে নষ্ট হইয়াছে। ৮০

হে জগৎপতে! আপনি সকলের পালক এবং প্রভু। অতএব আমাদিগকে এবং পৃথিবীকে রক্ষা করুন। ৮১

বরাহদেবকে উপসংহার করিয়া চরাচরের সহিত পৃথিবীকে সংস্থাপন করুন। ৮২

ভগবান, ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া ত্রিভুবন সংস্থাপনার্থে যত্নবান হইলেন। ৮৩

তদনন্তর বেদপ্রতিপাদ্য এবং বেদস্থাপক হরি, রোহিত মৎস্যরূপী হইয়া লোকহিতের নিমিত্ত সপ্তর্ষিমণ্ডল এবং বেদসকল ধারণ করিলেন। ৮৪

বসিষ্ঠ, অত্রি, কাশ্যপ, বিশ্বামিত্র, গৌতম, জমদগ্নি তপোবন ভরদ্বাজকে পৃষ্ঠে স্থাপন করিয়া উত্তম নৌকায় আরোহণ করত জলমধ্যে উপস্থিত হইলেন। ৮৫

তদনন্তর, ভগবান্ মহাদেবকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত তাহার সহিত বরাহদেবের যে স্থানে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইয়াছিল, সেই স্থানে গমন করিলেন। ৮৬

ভগবান, বরাহগণের পোত্রাঘাতে অতিশয় পীড়িত এবং শ্রমযুক্ত মহাদেবকে বিস্তৃত বদনে দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে সমীপাগত দেখিয়া দেবগণের সম্মুখে নৃসিংহ মূর্তিকে স্মরণ করিলেন। ৮৭

ভগবান স্মরণমাত্রেই যজ্ঞবরাহের হিতের নিমিত্ত লোকস্ৰষ্ঠা নরসিংহদেবের আগমনদৰ্শন করিয়া তদীয় শরীর হইতে নিজতেজ আকর্ষণ করিলেন। ৮৮

বরাহগণ এবং শরভ, নৃসিংহশরীর হইতে সূৰ্য্যসদৃশ তেজ বিষ্ণুতে প্রবিষ্ট হইল দর্শন করিলেন। বরাহ, নৃসিংহদেবকে নিস্তেজ দর্শন করিয়া ঘন ঘন নিশ্বাস ত্যাগ করিতে লাগিলেন। ৮৯

তদনন্তর, বরাহনিশ্বাসে ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ণদন্তবিশিষ্ট বৃহৎপরিমাণ অনেক বরাহ উৎপন্ন হইল। তাহারা নির্ভয় চিত্তে অনেক প্রকার মায়া অবলম্বন করিয়া শরভরূপী মহাদেবকে আঘাত করিতে লাগিল এবং নৃসিংহের সাহায্যে ঘোর সংগ্রাম আরম্ভ করত মহাদেবকে বিমথিত করিল। ৯০

মায়াবলে বরাহগণ কখন ভয়ঙ্কর পক্ষী, কখন গো, অশ্ব এবং মনুষ্য রূপ ধারণ করিয়া কখন নৃসিংহ বরাহ এবং শৃগাল প্রভৃতি নানা প্রকার ভয়ঙ্কর রূপ প্রকটন করিয়া মহাদেবকে অতিশয় ব্যথাযুক্ত করিলে ভগবান্ মহাদেবের সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং শরভরূপী মহাদেবকে নিজ কর দ্বারা স্পর্শ করত নিজ শরীরস্থিত তেজ তাহার দেহে সঞ্চার করিলেন। ১১-৯৩

অনন্তর মহাদেব, সৰ্ব্বলোকনিয়ন্তা বিষ্ণুর স্পর্শে ব্যথাহীন এবং আনন্দিত হইয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক বল ধারণ করিলেন। ৯৪

তদনন্তর পরাক্রমশালী শরভের ভয়ঙ্কর-শব্দে চতুর্দশ ভুবন পূর্ণ হইল। ৯৫

মহাদেবেরও প্রচণ্ড শব্দকালে মুখ হইতে হে ফুৎকারনিকর বহির্গত হইয়া ছিল, সেই ফুৎকার হইতে মহাবল তেজস্বী প্রমথগণ উৎপন্ন হইল। ৯৬

বরাহের নিশ্বাসে নানারূপী যে প্রকার মায়াবিগণ উৎপন্ন হইয়াছিল; তাহা অপেক্ষা বলবান্ কুক্কর, বরাহ, উষ্ট্র, প্লবগ, গোমায়ু, গো, ভল্লুক, মার্জার, মাতঙ্গ, শিশুমার, সিংহ, ব্যাঘ্র, সর্প, ইন্দুর, হয়গ্রীব, হয়মুখ, মহিষ, মনুষ্য, মৃগ, মেষ, কবন্ধ (মস্তকহীন), পাদহীন, বিহস্ত, বহুহস্ত, শরভ, কৃকলাস, মৎস্যবক্ত্র, গ্রীবাবক্ত্র, হ্রস্ব, দীর্ঘ, কৃশ, চতুষ্পদ, অষ্টপাদ, ত্রিপাদ, দ্বিপাদ, একপাদ, ভুরিহস্ত, যক্ষ-কিন্নর-অশ্বাকৃতি, পক্ষযুক্ত, লম্বোদর, মহোদর, দীর্ঘোদর, স্থূলকেশ, বহুকর্ণ, বিকর্ণ, স্থূলাধর, দীর্ঘদন্ত, দীর্ঘশ্মশ্রু প্রভৃতি ত্রিভুবনে যতপ্রকার জন্তু আছে, তাহাদের প্রত্যেকের সমনাবয়ব চতুর্দশটী করিয়া পুত্রের সহিত গণসকল শিবের মুখনিৰ্গত ফেন হইতে উৎপন্ন হইল। ৯৭-১০৩

স্থাবর জঙ্গমাত্মক ভুবনে সে প্রকার কোন জন্তু ছিল না। যাহাদিগের সমানরূপিগণ–শিব হইতে উৎপন্ন হয় নাই। ১০৪

শিবগণ সকলে ভিন্দিপাল, খড়্গ, পরিঘ, তোমর, অঙ্কুশ, অসি, পাশ, শঙ্কু, খট্বাঙ্গ, ত্রিশূল, কপাল, শক্তি, দাত্র, শূলী, রীশাগ্র, যষ্টি, ভিত্তি, কণ্টক, পাশ, শরাতিগ, কোদণ্ড প্রভৃতি অস্ত্রসমূহ দ্বারা ভয়ানক রূপ ধারণ করিয়াছিল; এবং বলবানগণ জটা, চন্দ্র এবং কপাল প্রভৃতি শৈব লক্ষণে উপলক্ষিত হইয়াছিল। ১০৫-১০৮

কোন কোন গণ মহাদেবের রূপ ধারণ এবং বাহনে আরোহণ করিয়া তাহার ন্যায় জটাকীর্ণ মস্তকে অর্ধচন্দ্র ধারণ করত কিরণমণ্ডলে দিন্মণ্ডল উদ্ভাসিত করিয়াছিলেন। কেহ বা মহাদেবের ন্যায় অর্ধাঙ্গে পৰ্বত-নন্দিনীকে ধারণ করিয়া রমণোৎসুক হইয়াছিলেন। ১০৯

হে দ্বিজগণ! সকলেই স্বেচ্ছাক্রমে আকাশাদি বিচরণ করিতে পারেন, কেহ নীলোৎপলের ন্যায় শ্যামবর্ণ, কেহ বা শুক্লবর্ণ, কেহ লোহিতবর্ণ এবং রক্ত, পীত, চিত্র, হরিত, কপিল, অর্ধপীত, অৰ্দ্ধনীল, ধবল, পীন, অৰ্দ্ধকৃষ্ণ, অর্ধশুক্ল, একবর্ণ, দ্বিবর্ণ, ত্রিবর্ণ, বহুবর্ণ, চতুর্থবর্ণ, পঞ্চমবর্ণ, ষষ্ঠবর্ণ এবং দশবর্ণ বিশিষ্ট প্রমথ ডিণ্ডিম, পটহ, শঙ্খ, ভেরী, বংশ, ঝর্ঝর, ঝর্ঝরি, মর্দল, বীণা, তন্ত্রী, পঞ্চতন্ত্রী, নর্দট, দৰ্দর, গোমুখ, নরক, কুণ্ড এবং করতাল প্রভৃতির বাদ্য এবং উচ্চহাস্যদ্বারা ত্রিভুবন আন্দোলিত করিয়া আনন্দিতচিত্তে বরাহের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। ১১০-১১৬

শরভরূপী মহাদেব নিজগণকে আজ্ঞা দিলেন; হে মহাবলগণ! তোমরা ক্রূর নিষ্ঠুর হইয়া ক্রূরকৰ্ম্মা বরাহগণকে নিষ্ঠুর আঘাত কর। ১১৭

তদনন্তর নানাপ্রকার অস্ত্রধারী প্রমথগণ মহাদেবের আদেশে বরাহগণের সহিত ক্রূর দৃষ্টিতে ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। ১১৮

আকাশচারী শরভ এবং বরাহের গণ জলপূর্ণ ভূমণ্ডল ত্যাগ করিয়া আকাশমধ্যেই সমভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। ১১৯

তদনন্তর প্রলয়পবন যে প্রকার পয়োধির দুরবস্থা করে, সেই প্রকার মহাবল প্রমথগণ বরাহের গণকে নষ্ট করিল। ১২০

বরাহ, স্বকীয়গণের সহিত বরাহসমূহের নাশ দেখিয়া পূর্ব পশ্চাৎবৃত্তান্ত চিন্তা করিতে আরম্ভ করিলেন। ১২১

ভগবান, বরাহকে চিন্তান্বিত দর্শন করিয়া সকল বৃত্তান্ত তাহার মনোগোচর করিলেন এবং বরাহও দেহত্যাগ করাই শ্রেয়স্কর বিবেচনা করিলেন। সেই কালে মহাবল শরভরূপী ভর্গ মহাদেব, দন্তাঘাতে নরসিংহকে দুইখণ্ড করিলেন। ১২২-১২৩

নরসিংহ, শরভদন্তাঘাতে দুইখণ্ড হইলে তাহার নররূপ অর্ধ দেহ হইতে মহাতপা দিব্যাকৃতি মুনিরূপী নর এবং সিংহাকৃতি অৰ্ধদেহ হইতে মহাতপস্বী নারায়ণ নামক জনার্দন উৎপন্ন হইলেন। ১২৪-১২৬

মহাত্মা নর এবং নারায়ণ সৃষ্টির প্রধান কারণস্বরূপ; যাহাদের অলৌকিক প্রভাব শাস্ত্র, বেদ, তপস্যাদিতে বিশেষ পারদর্শিতা প্রসিদ্ধ। ১২৭

হরি, নর নারায়ণকে সপ্তর্ষিমণ্ডলের সহিত মৎস্যদেবরক্ষিত নৌকায় সংস্থাপিত করিয়া শরভ এবং বরাহের সমীপে উপস্থিত হইলেন। ১২৮

পরমেশ্বর বরাহদেব “আমি লোকহিতের নিমিত্ত অবশ্যই শরীরত্যাগ করিব।” এই প্রকার প্রতিজ্ঞা করিয়াই হরি ব্রহ্মা এবং শম্ভু সহিত এই উদ্যমে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। ১২৯

এই প্রকার চিন্তা করিয়া পরমেশ্বর বরাহদেব শরভকে বলিলেন–হে মহাদেব। আমি দেব ঋত্বিজ প্রভৃতি সৰ্ব্বলোকের হিতের নিমিত্ত দেহত্যাগ করিব। আমাকে দেহ ত্যাগ করিতে বিসর্জন কর। ১৩০-১৩১

হে মহাত্মন্! আমার অঙ্গসমষ্টিতে যজ্ঞযূপ নির্মাণ করত পৃথক পৃথক্‌ অঙ্গ দ্বারা সমিৎ বাদি যজ্ঞীয় দ্রব্য সকল নির্মাণ করিবে। আমার দেহোৎপন্ন যজ্ঞীয়-দ্রব্যসমূহ বিধিপূর্বক পৃথিবীতে স্থাপন করিবে। ১৩২-১৩৩

এই রূপে যজ্ঞ বিহিত হইলে, সেই যজ্ঞ হইতে দেব এবং অন্যান্য প্রকার প্রজা এবং অন্নাদির সহিত যোগিগণ উৎপন্ন হইবেন। এতদ্ভিন্ন অন্যান্য সকল দ্রব্যই জন্মিবে। যেহেতু এই জগৎই যজ্ঞস্বরূপ। ১৩৪

রজস্বলা পৃথিবী যে গর্ভধারণ করিয়াছেন, হে ভর্গ! এই গর্ভপ্রসূত বালককে চিরকাল রক্ষা করিবে। ১৩৫

পৃথিবী যে কালে ভারাক্রান্ত হইয়া তোমার নিকট পুত্রবধের প্রার্থনা করিবে, সেই কালে পৃথিবীপুত্রকে বধ করিয়া পৃথিবীর ভার হরণ করিবে। ১৩৬

যে কালে পৃথিবী ভারে পীড়িতা হইয়া একশত যোজন পাতাল মধ্যে মগ্ন হইবেন, আমি সেই কালে শৃঙ্গবিরাজিত বরাহ-রূপ ধারণ করত ইহাকে উদ্ধার করিব। ১৩৭

তোমার বীর্যে উৎপন্ন ষান্মাতুর নামে যে পুত্র দেবগণের সেনাপতি হইয়া অসুর-সংহার করিবেন, তিনিই কার্য শেষ হইলে, আমাকে বরাহ-মূৰ্ত্তি ত্যাগ করাইবেন। ১৩৮

হে দ্বিজবরগণ! মহাবল যজ্ঞ বরাহ এই প্রকার বলিলে, তাহার দেহ হইতে কোটি সূর্যের ন্যায় দীপ্তিশালী এবং জবাপুষ্প সমান লোহিত-বর্ণ তেজ নির্গত হইয়া ভগবান্ হরির অঙ্গে প্রবিষ্ট হইল। ১৩৯-১৪০

হে দ্বিজগণ! বরাহ-দেহ হইতে নিঃসৃত তেজ হরির অঙ্গে প্রবিষ্ট হইলে, ভগবান বরাহ;–নিজপুত্র সুবৃত্র, কনক এবং ঘোরের দেহ হইতে নিজ তেজ গ্রহণ করিলেন। ১৪১

যজ্ঞবরাহের ন্যায় সুবৃত্তাদি তদীয় পুত্রগণের দেহ হইতে অগ্নিশিখার ন্যায় দেদীপ্যমান তেজ পৃথক পৃথকরূপে নির্গত হইয়া হরির দেহে প্রবেশ করিল। ১৪২-১৪৩

তদনন্তর হরি এবং ভর্গ মহাদেব, বরাহের বাক্য শ্রবণ করত অঙ্গীকার করিলেন এবং পুত্রের সহিত বরাহের প্রাণ ত্যাগের নিমিত্ত মহান্ যত্ন করিতে লাগিলেন। ১৪৪

তদনন্তর শরভ, বিষম মুখ-প্রহারদ্বারা বরাহের কণ্ঠদেশ হইতে শরীর ছেদন করত সেই জলে নিক্ষেপ করিলেন। ১৪৫

শরভ,–এই প্রকারে প্রথমে বরাহ-দেহকে জলসাৎ করিয়া সুবৃত্তাদি বরাহপুত্রয়ের কণ্ঠদেশ ছেদন করত পূর্ববৎ সমুদ্রজলে নিক্ষেপ করিলেন। ১৪৬

প্রলয়কালীন অগ্নির ন্যায় তেজস্বী বরাহগণ সমুদ্রজলে পতনকালে জলের প্রচণ্ড শব্দ উৎপাদন করিয়াছিলেন। ১৪৭

এইরূপে বরাহগণ পতিত হইলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর মিলিত হইয়া পুনৰ্বার জগৎ সৃষ্টির নিমিত্ত চিন্তা করিতে লাগিলেন। ১৪৮

হে দ্বিজবরগণ! চারিভাগে বিভক্ত ষষ্টিশত সহস্র সংখ্যক প্রমথগণ আগমন করত মহাদেবের অর্চনা করিলেন। ১৪৯

চারিভাগে বিভক্ত প্রমথগণের মধ্যে একভাগে নানারূপধারী জটা এবং অর্ধচন্দ্রবিশিষ্ট যে ষোড়শ সহস্র প্রমথ ছিলেন, ভোগবিমুখ ধ্যানপরায়ণ যোগী, মদ-মাৎসৰ্য-দম্ভ-অহঙ্কার-রহিত নিষ্পাপ সেই মহাত্মাগণ মহাদেবের আনন্দ জন্মাইতেন। ১৫০-১৫১

তাঁহারা কখন কাহারও নিকট কিছু প্রার্থনা করিতেন না। এবং স্রকৃ চন্দনাদি উপভোগ্য বিষয়ে তাঁহাদের অনুরাগ ছিল না। তাঁহারা স্ত্রীপুত্রাদি সংসারসুখে নিরভিলাষ হইয়া নিয়ম অবলম্বন করত যোগশিক্ষার নিমিত্ত ধ্যান পরায়ণ মহাদেবকে চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া ব্ৰতাদি পালন করিতেন এবং শ্রেণীবদ্ধ হইয়া অনাহারে থাকিতে ক্লেশ বোধ করিতেন না। ১৫২-৫৩

যেকালে অম্বিকাপতি মহাদেব জ্যোতির্ময় ব্ৰহ্ম চিন্তা করিতেন, সেইকালে প্রমথগণ তাহাকে বেষ্টন করিয়া থাকিতেন। ১৫৪০

অণিমা লঘিমা প্রভৃতি আট প্রকার ঐশ্বৰ্য্য সমন্বিত সিংহ ব্যাঘ্রাদি স্বরূপে সেই ষোড়শ কোটী প্রমথগণ ব্রতপর ছিলেন। ১৫৫

এতদ্ভিন্ন অন্য প্রমথগণ কামুক এবং মহাদেবের ক্রীড়া বিষয়ে সহায়; বিচিত্র আভরণে অলঙ্কৃত, জটা-অর্ধচন্দ্রবিশিষ্ট, শিবের ন্যায় শুভ্রবর্ণ বৃষারূঢ়, উমার ন্যায় সুন্দরী কামিনীগণ-সেবিত, বিচিত্র মাল্যশোভিত স্বর্গীয় পুষ্পমাল্যধারী উমার সহিত ক্রীড়াপরায়ণ মহাদেবের অনুগামী আট কোটী প্রমথ, রমণোচিত বেশভূষা ধারণ করিত। ১৫৬-১৫৮

মহামনা প্রমথগণ মহাদেবের ন্যায় অর্ধ-অঙ্গে হর এবং অর্ধ-অঙ্গে গৌরীর রূপ ধারণ করত শরীরের বামার্ধে পাৰ্বতীরূপধারী মহাদেবের অনুগমন করিতেন। ১৫৯

মহাদেব পাৰ্বতীর সহিত যেকালে সুখে বিলাসাদি করেন, সেইকাল অর্ধাঙ্গে হর অর্ধাঙ্গে গৌরীর রূপধারী প্রমথগণ দ্বারপাল হন। ১৬০

প্রতিদিন যেকালে মহাদেব আকাশ পথে বিচরণ করেন; উক্ত প্রমথগণ সেই সময়ে তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে বিচরণ করেন। ১৬১

এবং তিনি যেকালে ধ্যান করিতে আরম্ভ করেন, তাহারা সেই সময়ে জলাদি দ্বারা তাহার পরিচর্যা করেন। সেই প্রমথগণ নানাপ্রকার রূপ ধারণ করিতে পারেন। ১৬২

যে মহাবল বীর প্রমথগণ যুদ্ধভূমিতে গমন করত শত্রুবল বিদলিত করেন, তাহাদের সংখ্যা নয় কোটি। ১৬৩

গায়ক প্রমথগণ, মৃদঙ্গ পণব প্রভৃতির বাদ্যানুসারে মধুরস্বরে গান করত মহাদেবের সমীপে নৃত্য করেন। ১৬৪

তিন কোটিসংখ্যক নানারূপ-ধারী সেই প্রমথগণ বিচরণপর মহাদেবের নিরন্তর পশ্চাতে গমন করেন। ১৬৫

সৰ্ব্বশাস্ত্রার্থবিৎ বলবান্ প্রমথগণ সকলেই মায়াবলে সকল কাৰ্য্য সাধন করিতে পারেন এবং সকলেই সৰ্ব্বজ্ঞ, সকলেই ইচ্ছানুরূপ সকল স্থানেই সকল সকল সময়ে যাইতে পারেন। ১৬৬

অধিক কি বলিব, অণিমাদি অষ্ট প্রকার ঐশ্বর্যশালী মহাবল মহাদেব ভক্ত প্রমথগণ মুহূর্তকালমধ্যে ত্রিভুবন গমন করত পুনৰ্বার প্রত্যাগমন করিতে পারেন। ১৬৭।

রুদ্ৰনামক অন্য প্রমথগণ জটা এবং অর্ধচন্দ্র দ্বারা ভূষিত হইয়া সুরেন্দ্রের আদেশে সর্বদা স্বর্গে বাস করিতেন। ১৬৮

এক কোটিসংখ্যক বলবান্ সেই প্রমথগণ নিরন্তর মহাদেবের সেবা করিতেন। ১৬৯

যে প্রমথগণ পাপাত্মাগণকে নিজ মহিমায় বিস্ময়ান্বিত করত ধার্মিক ব্যক্তি সকলকে পরিপালন করিতেন এবং মহাদেবের ব্রতাবলম্বী মনুষ্যগণের প্রতি অনুগ্রহকরত জিতেন্দ্রিয় যোগিগণের সদাতন বিঘ্ন বিনাশ করিতেন, তাঁহারা ছত্রিশ কোটি সংখ্যক ছিলেন। ১৭০

বরাহগণের নিধন দ্বারা জগতের হিতের নিমিত্ত এবং মহাদেবের সেবার জন্য এই প্রমথগণ উৎপন্ন হইয়াছিলেন। ১৭১

শরভরূপী মহাদেব,–বরাহগণ, নরসিংহ এবং হরিকে দর্শন করিয়া কিঞ্চিৎ কাল চিন্তাপূর্বক যে শব্দ করিয়াছিলেন, সেই শব্দ-কালে মুখ হইতে নির্গত শীকর হইতে তাহাদের উৎপত্তি হেতু বহুরূপ ধারণ করিয়াছিলেন। ১৭২-১৭৩

ক্রুর দর্শনে, ক্রূর যুদ্ধে এবং ক্রূর কাৰ্য্যে বরাহগণকে হননেচ্ছু মহাদেবের ইচ্ছা বশত প্রমথগণ ভয়ঙ্কর এবং ক্রূরকৰ্ম্মা হইয়াছিল। ১৭৪

মহাবল প্রমথগণ যদিও ক্রূরকাৰ্য্য করিত না, তথাপি তাহাদের অত্যন্ত ক্রূরতা প্রকাশ করিত এবং যদি কিঞ্চিৎ পরিমাণেও ক্রূরকাৰ্য্য করিত, তাহা হইলে তাহাদের অত্যন্ত ক্রূরতা প্রকাশ পাইত। ১৭৫

তাহারা পৰ্বতপ্রান্তে নিবেদিত ফল, জল, পত্র, পুষ্প এবং মূল প্রভৃতি বন্য দ্রব্য ভোজন করিত। ১৭৬

এবং তাহারা ফল-পুষ্পাদি স্বয়ং আহরণ করিয়াও ভোজন করিত। মহাদেবের যে কিছু দ্রব্য ভোজ্য ছিল, তাহারাও সেই সকল ভোজন করিত। ১৭৬

তাহারা চৈত্রমাসীয় চতুর্দশী ভিন্ন সকলদিনেই আমিষান্ন ভোজন করিত। কিন্তু মহাদেব মধুমাসের চতুর্দশীতেও আমিষান্ন ভোজন করিতেন। ১৭৭

তদনন্তর বরাহগণ বিনষ্ট হইলে প্রমথগণ, সেই মহাদেবের সহিত মাংস ভোজন করিতে আরম্ভ করিল। ১৭৮

তাহারা স্বয়ং চারি ভাগে বিভক্ত হইয়া অতীতকাৰ্য্য সকল কীৰ্ত্তন করিয়া ছিলেন। এই জন্য ব্রহ্মার বাক্যে ভূতগ্রাম সংজ্ঞায় অভিহিত হইয়াছিলেন।১৭৯

লোকে পূৰ্বে চারিপ্রকার ভূতগ্রাম জানিত। ইহারাই ভূতগ্রামপদের অধিকারী হইল। ১৮০

মহাদেবের ভূতগণের যে প্রকার আহার, যে প্রকার অবয়ব, যেরূপ কাৰ্য্য; তাহা তোমাদের নিকট বর্ণন করিলাম। ১৮১

যে ব্যক্তি সাংখ্য-যোগান্তর্গত এই প্রবন্ধ শ্রবণ করিবে, সে ব্যক্তি দীর্ঘজীবী হইয়া নিরন্তর উৎসাহপূর্বক যোগবিদ্যায় বিজ্ঞ হইবে। ১৮২ ত্রিংশ অধ্যায় সমাপ্ত। ৩০

আরও পড়ুনঃ

বরাহ অবতারের কাহিনী । অগ্নি পুরাণ । পৃথ্বীরাজ সেন। পুরাণ সমগ্র

নৃসিংহ অবতারের কাহিনী | অগ্নি পুরাণ | পৃথ্বীরাজ সেন | পুরাণ সমগ্র

বামন অবতারের কাহিনী | অগ্নি পুরাণ |পৃথ্বীরাজ সেন | পুরাণ সমগ্র

মৃত্যুপথযাত্রীর সেবা | অগ্নি পুরাণ | পৃথ্বীরাজ সেন | পুরাণ সমগ্র

কালিকা পুরাণ

মন্তব্য করুন