বলিদান বিধি – কালিকা পুরাণ

সপ্তষষিম অধ্যায় – বলিদান বিধি:  ভগবান্ বলিলেন,–হে পুত্রদ্বয়! বলিদানের ক্রম এবং স্বরূপ, অর্থাৎ যে প্রকার রুধিরাদি দ্বারা দেবীর সম্পূর্ণ প্রীতি হয়, তোমাদিগের নিকট কীর্তন করিতেছি। ১সাধকগণ সকল প্রকার বলিদানেই বৈষ্ণবীতন্ত্ৰকল্পকথিত ক্রম সৰ্ব্বদা গ্রহণ করিবে। ২

পক্ষী সকল, কচ্ছপ, গ্রাহ, মৎস্য, নয় প্রকার মৃগ, মহিষ, অজ, আবিক, গো, ছাগ, রুরু, শূকর, খড়্গ, কৃষ্ণসার, গোধিকা, শরভ, সিংহ, শার্দূল, মনুষ্য এবং স্বীয় গাত্রের রুধির, ইহারা চণ্ডিকা দেবী ও ভৈরবাদির বলিরূপে কীর্তিত হইয়াছে। ৩-৫

বলি দ্বারা মুক্তি সাধিত হয়, বলি দ্বারা স্বর্গ সাধিত হয় এবং বলিদান দ্বারা নৃপতিগণ শত্ৰু নৃপতিদিগকে পরাজয় করিয়া থাকেন। ৬

মৎস্য ও কচ্ছপের রুধির দ্বারা শিব দেবী নিয়ত এক মাস তৃপ্তি লাভ করেন এবং গ্রাহদিগের রুধিরাদি দ্বারা তিন মাস তৃপ্তি লাভ করেন।

দেবী, মৃগ এবং মনুষ্যশোণিত দ্বারা আট মাস তৃপ্তি লাভ করেন এবং সর্বদা কল্যাণ প্রদান করেন। ৮

বলিদান বিধি - কালিকা পুরাণ

বলিদান বিধি – কালিকা পুরাণ

গো এবং গোধিকার রুধিরে দেবীর সাংবাৎসরিক তৃপ্তি হয়। ৯

কৃষ্ণসার এবং শূকরের রুধিরে দেবী দ্বাদশ-বার্ষিকী তৃপ্তি লাভ করেন। ১০

অজ ও আবিক রুধিরে দেবীর পঞ্চবিংশতি-বার্ষিকী এবং মহিষ শার্দূল ও খড়্গরুধিরে দেবীর শতবার্ষিকী তৃপ্তি লাভ হয়। ১১

সিংহ, শরভ এবং স্বীয় গাত্রের রুধিরে দেবী সহস্র বৎসর ব্যাপিয়া তৃপ্তি লাভ করেন। ১২

যাহার রুধিরে যাবৎকাল তৃপ্তির কথা হইয়াছে, মাংস দ্বারাও ততকাল তৃপ্তি লাভ হয়। ১৩

কৃষ্ণসারমৃগ, গণ্ডার, রোহিতমৎস্য, যুগল, যুগল বার্ধ্রীণস এই সকল বলি দানের পৃথক্‌ পৃথক্‌ ফল শ্রবণ কর। ১৪

কৃষ্ণসার ও গণ্ডারের মাংসে চণ্ডিকা দেবী পঞ্চশত বর্ষ নিয়ত তৃপ্তি লাভ করেন। ১৫

আমার পত্নী দুর্গা, রোহিত মৎস্যের মাংসে এবং বার্ধ্রীণসের মাংসে তিন শত বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন। ১৬

ক্ষীণেন্দ্রিয় শ্বেতবর্ণ বৃদ্ধ অজাপতির (পাঁটার) নাম বার্ধ্রীণস, দৈব এবং পৈত্ৰ কাৰ্যে ইহার আদর করা হইয়াছে। ১৭

যাহার গ্রীবা নীলবর্ণ, মস্তক রক্তবর্ণ, চরণ কৃষ্ণবর্ণ এবং পক্ষ শ্বেতবর্ণ এরূপ পক্ষীরাজকেও বার্ধ্রীণস বলা হয়, ইহা বিষ্ণু এবং আমার প্রিয়। ১৮

যথাবিধি প্রদত্ত একটি নরবলিতে দেবী সহস্র বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন, আর তিনটি নরবলিতে লক্ষ বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন। ১৯

মনুষ্য মাংস দ্বারা কামাখ্যা দেবী এবং আমার রূপধারী ভৈরব তিন হাজার বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন। ২০

যেহেতু বলির মস্তক এবং মাংস দেবতার অত্যন্ত অভীষ্ট, এই হেতু পূজার সময় বলির শির এবং শোণিত দেবীকে দান করিবে। ২১-২২

বিচক্ষণ সাধক ভোজ্যদ্রব্যের সহিত লোমশূন্য মাংস দান করিবে এবং কখন কখন পূজোপকরণের সহিতও মাংস দান করিবে। ২৩।

রক্তশূন্য মস্তক অমৃত তুল্য পরিগণিত হয়। ২৪

কুষ্মাণ্ড, ইক্ষুদণ্ড, মদ্য ও আসব ইহারাও বলি এবং কৃষ্ণ ছাগতুল্য তৃপ্তি কারক। ২৫

চন্দ্রহাস বা কর্ত্রী দ্বারা বলিচ্ছেদ করাই প্রশস্ত বলিয়া গণ্য হইয়াছে; দাত্র, অসি, ধেনু, করাত বা শঙ্কুল দ্বারা বলিচ্ছেদ মধ্যম এবং ক্ষুর ক্ষুরপ্র ও ভল্ল দ্বারা বলিচ্ছেদ অধম বলিয়া কথিত হইয়াছে। ২৬

এতদ্ভিন্ন শক্তি বা বাণ প্রভৃতির দ্বারা কখনই বলিচ্ছেদ কর্তব্য নয়। বলি দানে যে সকল অস্ত্র উক্ত হইয়াছে, তদ্ভিন্ন অস্ত্র দ্বারা বলিচ্ছেদ করিলে দেবী উহা ভোজন করেন না এবং বলিদানকর্তা শীঘ্র মৃত্যু প্রাপ্ত হয়। ২৭

যে সাধক প্রোক্ষিত পশু বা পক্ষীকে হস্তদ্বারা ছেদ করে, সে অতি দুঃসহ ব্রহ্মহত্যা প্রাপ্ত হয়। ২৮

বিচক্ষণ সাধক খড়গকে মন্ত্রদ্বারা আমন্ত্রিত না করিয়া, কখনও বলিযোগ করিবেন না। ২৯

 

পূৰ্বে মহামায়ার বলিতে খড়্গের আমন্ত্রণবিষয়ে যতগুলি মন্ত্র কথিত হইয়াছে, পণ্ডিতগণ সেই সকল মন্ত্রের সর্বত্রই যোজনা করিবেন। ৩০

শারদাদেবীর বিশেষ করিয়া কামাখ্যাদেবীর পূজার সময় খড়্গাভিমন্ত্রণ বিষয়ে পূর্বোক্ত মন্ত্রের সহিত বক্ষ্যমাণ কতকগুলি মন্ত্রের যোগ করিবে। ৩১

প্রথমে ‘কালী’ এই পদটি দুইবার উচ্চারণ করিবে, তদনন্তর বজ্রেশ্বরী এই পদটি উচ্চারণ করিবে। ৩২

তাহার পর ‘লৌহদণ্ডায়ৈ নমঃ’ এই বলিয়া পূজা করিবে। ৩৩।

এই মন্ত্রদ্বারা খড়্গের পূজা করিয়া, কালরাত্রির মন্ত্রদ্বারা সেই খড়্গকে অভিমন্ত্রিত করিবে। ৩৪

প্রথমে নেত্রবীজের মধ্যের তিনবার আবৃত্তি করিয়া প্রয়োগ করিবে। তদনন্তর কালী কালী এই শব্দের উচ্চারণ করিবে; তদনন্তর বিকটদংষ্ট্রা এই কথাটি বলিবে। হান্ত অর্থাৎ দন্ত্যসকার আদি তৃতীয় অথবা একাদশ স্বর ও চন্দ্রবিন্দুর সহিত যুক্ত করিয়া, তাহার পর আর দুইটি পদের যোগ করিবে। ৩৫

প্রথম ‘ভেৎকারিণী’ পদ দ্বিতীয় ‘খাদয় ছেদয়’ এই পদ। তাহার পর “সৰ্ব্বদুষ্টান্” এই পদটির উচ্চারণ করিয়া “খড়্গেন ছিন্ধি, ছিন্ধি” এবং ‘কিল কিল’ এই পদদ্বয়ের উচ্চারণ করিবে। ৩৬

তাহার পর “চিকি চিকি” এই শব্দ উচ্চারণ করিয়া তদনন্তর ‘পিব পিব’ এই কথা বলিবে তাহার পর “রুধিরং” এই কথা বলিয়া তাহার পর ‘স্ফেঁ স্কেঁ কিরি কিরি’ ইহাও বলিবে। ৩৭

এই মন্ত্র দ্বারা করবালকে অভিমন্ত্রিত করিলে, কালরাত্রি স্বয়ং তাহার উপর প্রসন্ন হইয়া, শত্রুর বধ সাধন করেন। ৩৮-৩৯

পূর্বকথিত বলিদানের মন্ত্রসকল সাধকগণ নিত্য ব্যবহার করিবেন এবং বলির হত্যাদোষ নিবারণের নিমিত্ত বক্ষ্যমাণ মন্ত্র পাঠ করিবেন। ৪০

স্বয়ম্ভু স্বয়ং যজ্ঞের নিমিত্ত পশু সকলের সৃজন করিয়াছেন, এই নিমিত্ত অদ্য তোমার বধ করি। কারণ যজ্ঞে বধ অবধের সমান। ৪১

অনন্তর দেবতার উদ্দেশ করিয়া অথবা নিজের কামনার উল্লেখ করিয়া সেই খড়্গ দ্বারা বলিকে পূৰ্বমুখ রাখিয়া ছেদন করিবে। ৪২

অথবা বলিকে উত্তরমুখ রাখিয়া স্বয়ং পূৰ্বমুখ হইয়া বলি ছেদ করিবে এবং পূর্বোক্ত সৈন্ধব আদিও মুখে সন্নিবেশিত করিবে। ৪৩।

আপনার বিভব অনুসারে রুধির দানের নিমিত্ত সৌবর্ণ, রাজত, তাম্র, বেতপত্রের দোনা, মৃন্ময় খৰ্পর, কাংস্য অথবা যজ্ঞীয় কাষ্ঠ-নির্মিত একটি পাত্র করিবে। ৪৪

লৌহপাত্রে, বল্কলে, পিত্তলপাত্রে, রঙের পাত্রে অথবা কাঁচ পাত্রে কিংবা স্রুক বা স্রুবে বলিদিগের রুধির দান করিবে না। ৪৫

ঐশ্বৰ্য্যাভিলাষী মনুষ্য ঘটে, মাটীর উপর, ক্ষুদ্র পানপাত্রে রুধির দান করিবে না। ৪৬

নরপতি, মনুষ্যের রক্ত মৃন্ময় অথবা তৈজসপাত্রে রাখিয়া সর্বদা উৎসর্গ করিয়া দিবে, পত্রনিৰ্মিত দোনাদিতে কখনই দিবে না। ৪৭

অশ্বমেধ যজ্ঞ ব্যতীত কখন ঘোটক বলি প্রদান করিবে না। রাজা দিকপালমেধ যজ্ঞে হস্তী বলি প্রদান করিবে। ৪৮

দেবীর নিকট কখনই অশ্ব বা হস্তী বলি প্রদান করিবে না। রাজা অশ্বের পরিবর্তে চামর বলি প্রদান করিবে। ৪৯

ব্রাহ্মণ, দেবীর নিকট সিংহ, ব্যাঘ্র, মনুষ্য, স্বকীয় গাত্রের রুধির অথবা মদ্য কখনই বলি প্রদান করিবে না। ৫০

বলিদান বিধি - কালিকা পুরাণ

ব্রাহ্মণ সিংহ, ব্যাঘ্র এবং নরবলি প্রদান করিয়া নরকে গমন করে এবং ইহ লোকে হীন-আয়ু এবং সুখ-সৌভাগ্যহীন হয়। ৫১

ব্রাহ্মণ স্বীয় গাত্রের রুধির দান করিয়া আত্মহত্যার পাপ প্রাপ্ত হয়, আর মদ্য দান করিয়া ব্রাহ্মণ্য হইতে চ্যুত হয়। ৫২

ক্ষত্রিয় কদাপি কৃষ্ণসার বলি প্রদান করিবে না, কারণ, কৃষ্ণসার বলি প্রদান করিলে, তাহার ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়। ৫৩

যে স্থলে ব্রাহ্মণের বলিদানপ্রসঙ্গে সিংহ ব্যাঘ্র অথবা মনুষ্যের বধ বিহিত, সেই স্থলে এইরূপ ক্ৰম হইবে। ৫৪

হে ভৈরব! সে স্থলে ঘৃতময় পিষ্টক বা যবচুর্ণময় ব্যাঘ্র, মনুষ্য অথবা সিংহ নিৰ্মাণ করিয়া তাহাকে পূর্বোক্ত মন্ত্র দ্বারা সংস্কৃত করিবে এবং চন্দ্রহাস অস্ত্র দ্বারা তাহার ছেদ করিবে। ৫৫

সাধক যদি প্রচুর প্রমাণে বলি প্রদান করিতে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে দুইটি বা তিনটি বলিকে সম্মুখে রাখিয়া অবশিষ্ট বলিসকলকে একযোগেই অর্চ্চিত করিবে। ৫৬

হে ভৈরব! বলির পূর্বে আমি সাধারণ পূজামাত্র বলিয়াছি, এক্ষণে যে যে স্থলে বিশেষ হইবে, তাহা আমার নিকট শ্রবণ কর। ৫৭

যখন ভৈরবী দেবী অথবা ভৈরবকে মহিষ বলি প্রদান করিবে, তখন সেই বক্ষ্যমাণ মন্ত্র দ্বারা পূজা করিবে। ৫৮

হে মহিষ! তুমি যেমন অশ্বের সহিত বিরোধ কর এবং চণ্ডিকাকে বহন কর, সেইরূপ আমার শত্রুর বিনাশ কর এবং আমার শুভ বহন কর। ৫৯

হে মহিষ! তুমি যমের বাহন এবং শ্রেষ্ঠরূপধারী এবং অব্যয় তুমি আমাকে আয়ুঃ, বিত্ত এবং যশোদান কর। হে কাসর! তোমাকে নমস্কার করি। ৬০

যে পূজায় গণ্ডার বলি প্রদত্ত হইবে, সেই স্থলে জলদ্বারা অভ্যুক্ষণ করিয়া গুহা হইয়াছে এইরূপ চিন্তা করত একটি মণ্ডল করিবে। ৬১

হে খড়্গ! তুমি দৈব ও পৈত্ৰ কাৰ্য্যে সুভগ এবং খড়্গ তুল্য, তুমি আমার বিঘ্ননিচয়ের ছেদ কর, হে গুহাজাত! তোমাকে নমস্কার করি। ৬২

কৃষ্ণসারের বলিদান সময়ে বক্ষ্যমাণ মন্ত্রের পাঠ করিবে। হে কৃষ্ণসার! তুমি ব্ৰহ্মমূর্তি এবং ব্ৰহ্মতেজের পরিবর্ধনকারী। ৬৩

তুমি চতুৰ্ব্বেদময় এবং প্রাজ্ঞ তুমি আমাকে প্রকৃষ্ট জ্ঞান এবং যশ দান কর। ৬৪

শরভের পূজার সময় বক্ষ্যমাণ মন্ত্র প্রকীর্তিত হইয়াছে। তুমি অষ্টপাদ, বিভ্রষ্টচন্দ্রভাগ হইতে সমুৎপন্ন; হে মহাবাহো! তুমি অষ্টমূর্তি ভৈরবরূপে তোমাকে নমস্কার করি। ৬৫-৬৬

যেমন ভৈরবরূপে তুমি বরাহকে নিহত করিয়াহ, সেই শরভরূপে আমার শত্রু এবং বিঘ্ননিচয়ের বিনাশ কর। ৬৭

বলিদান বিধি - কালিকা পুরাণ

হে সিংহ! তুমি সাক্ষাৎ নারায়ণ, সিংহরূপে যেরূপ চণ্ডিকাকে বহন করিতেছ, সেইরূপ আমার মঙ্গল বহন কর এবং আমার শত্ৰুদিগকে নষ্ট কর, তুমিই সিংহস্বরূপ ধারণ করিয়া জগতের পীড়াকারী হিরণ্যকশিপুকে বধ করিয়াছ। ৬৮-৬৯

এ সিংহের অর্চনার সময় আমি এইরূপ ক্রমের উল্লেখ করিয়াছি। ৭০

হে ভৈরব! এক্ষণে মনুষ্য-বলি ও স্বীয়গাত্রের রুধির বলির অর্চনার ক্রম শ্রবণ কর। ৭১

পীঠপ্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, নিত্য শ্মশানে বলি প্রদান করিবে। ঐ শ্মশান শব্দে হেরুকনামক শ্মশান, উহা কামাখ্যা দেবীর আবাস শৈলে অবস্থিত। ইহা পূৰ্বে তন্ত্রের আদিতে বিধিবৎ প্রতিপাদিত হইয়াছে। ৭২-৭৩

ঐ শ্মশান আমার স্বরূপ এবং উহা ভৈরবনামেও অভিহিত হয়। ঐ শ্মশান তপঃসিদ্ধির নিমিত্ত ত্ৰিভাগে কল্পিত হইয়াছে। ৭৪

উহার পূর্বাঙ্গ ভৈরবনামে প্রসিদ্ধ, তাহাতে তপস্যা করিলে সদ্যঃ সিদ্ধিলাভ হয়; সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। উহার দক্ষিণাঙ্গে ভৈরবীদেবীকে মুণ্ডমালার সহিত মস্তক প্রদান করবে এবং হেরুক নামক পশ্চিমাঙ্গে রুধির প্রদান করিবে। ৭৫-৭৬

মনুষ্যবলিকে অর্চন, দান এবং আগমনক্রমে পীঠস্থানের শ্মশান-ভূমিতে বিসর্জন করিয়া বলিদীপ প্রজ্বলিত করিবে। ৭৭

এইরূপ যেখানে যে মহাবলি প্রদত্ত হইবে, সেইস্থলেই সাধক একস্থানে উৎসর্গ, একস্থানে ছেদন করিবে এক অন্যস্থলে মস্তক এবং অন্যস্থলে রুধির প্রদান করিবে। ৭৮

আর একবার বিসর্জন করিয়া পুনরায় আর তাহার দিকে অবলোকন করিবে না। ৭৯

সুস্নাত, দীপ্ত, পূৰ্বদিনে হবিষ্যাশী, মাংস, মৈথুন এবং ভোগবর্জিত, মালা এবং চন্দন দ্বারা অলঙ্কৃত মনুষ্যকে উত্তরমুখ করিয়া তাহার অবয়ব-নিচয়ে দেবতা সকলের পূজা করিবে এবং তাহাকে দেবতার সহিত অভিন্ন জ্ঞান করিয়া তাহার পূজা করিবে। ৮০-৮১

ব্ৰহ্মরন্ধ্রে ব্রহ্মার পূজা করিবে, নাসিকায় পৃথিবীর পূজা করিবে, কর্ণদ্বয়ে শক্তি এবং আকাশের পূজা করিবে, জিহ্বাতে অগ্নির, নেত্রে জ্যোতির, বদনে বিষ্ণুর, ললাটে আমার, দক্ষিণগণ্ডে ইন্দ্রের, বামগণ্ডে বহ্নির, গ্রীবায় সমবর্তীর, কেশাগ্রে নির্ঋতির, ভ্রূদ্বয়ের মধ্যে বরুণের, নাসিকামূলে পবনের, স্কন্দে ধনেশ্বরের এবং হৃদয়ে সর্পরাজের পূজা করিয়া বক্ষ্যমাণ মন্ত্র পাঠ করিবে। ৮২-৮৫

হে মহাভাগ নরশ্রেষ্ঠ! তুমি সর্বদেবময় এবং উত্তম, তুমি পুত্র, পশু ও বান্ধবের সহিত শরণাপন্ন আমাকে রক্ষা কর। ৮৬

মৃত্যু যখন অপরিত্যাজ্য, তখন তুমি প্রাণত্যাগ কর এবং পুত্র, অমাত্য ও বন্ধুবর্গের সহিত আমাকে রক্ষা কর। ৮৭

হে মহাভাগ। মনুষ্য অতিশয় কঠোর তপস্যা, জ্ঞান এবং যজ্ঞ দ্বারা যাহা লাভ করিতে সমর্থ হয়, তুমি আমাকে তাহা দান কর এবং স্বয়ং শ্রীলাভ কর। ৮৮

তোমার প্রসাদে রাক্ষস, পিশাচ, বেতালগণ, সরীসৃপগণ, নৃপগণ, রিপু গণ এবং অন্যান্য হিংস্রগণ যেন আমাকে বিনাশ করিতে অক্ষম হয়। ৮৯

মরণ যখন অপরিহার্য তখন তুমি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া স্বীয় কণ্ঠনাল হইতে স্খলিত এবং অঙ্গলগ্ন শোনিতধারা দ্বারা তৃপ্তিলাভ কর। ৯০

এইরূপে পূজা করিয়া পূৰ্বতন্ত্রদ্বারা বিধিপূর্বক পূজা করিবে। নরবলি পূজিত হইয়া আমার স্বরূপ দিকপালগণকর্তৃক অধিষ্ঠিত হয়। ৯১

এবং ব্রহ্মা প্রভৃতি অন্যান্য সকল দেবগণকর্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া সেই বলিরূপ নর পূর্বে পাপাচারী হইলেও নিষ্পাপ হইয়া যায়। ৯২

সেই পাপশূন্য বলিরূপ নরের শোণিত অমৃততুল্য হয়, উহা দ্বারা জগন্ময়ী জগন্মায়া মহাদেবী প্রীতিলাভ করেন। ৯৩

সেই বলিরূপী নর মনুষ্যদেহ পরিত্যাগ করিয়া মরিতে মরিতেই গণদিগের অধিপতি হইয়া আমার অধিক সৎকারের পাত্র হয়। ৯৪

এতদ্ব্যতীত অন্যপ্রকার পাপযুক্ত মলমূত্র ও বসাযুক্ত বলি কামাখ্যা দেবী নামমাত্রও গ্রহণ করেন না। ৯৫

অর্চনা দ্বারা অপরাপর মহিষ প্রভৃতির বলির শরীর বিশুদ্ধিলাভ করে, এই নিমিত্ত দেবী তাহা হইতে রক্ত গ্রহণ করেন। ৯৬

অন্যান্য দেবগণকে যে সকল বস্তু প্রদত্ত হইবে, সেই সেই দেবতার পূজা করিয়া এবং দেয়বস্তুও অর্চিত করিয়া দান করিবে। ৯৭

কাণা, বিগতাঙ্গ, অতিবৃদ্ধ, রোগী, গলদ্‌ব্রণ, ক্লীব, অঙ্গহীন, বৃদ্ধলিঙ্গ, গুল্‌ফশূন্য, শ্বিত্রী, হ্রস্বকায়, মহাপাতকী, দ্বাদশ বৎসরের ন্যূনবয়স্ক শিশু, মৃতাশৌচ যুক্ত এবং মহাগুরুনিপাতনিবন্ধন কালাশৌচযুক্ত এইরূপ মনুষ্যদিগকে অর্চনা করিয়াও বলিকর্মে নিয়োজিত করিবে না। ৯৮-১০০

পশু-স্ত্রী, পক্ষিণী বিশেষতঃ মনুষ্য-স্ত্রীকে কখনই বলি প্রদান করিবে না। স্ত্রীকে বলিদান করিলে কর্তা নরকপ্রাপ্ত হয়। ১০১

যেখানে বিশেষ গণনা না করিয়া একেবারে দলে দলে বলি প্রদান করা হয়, সেইস্থলে সমুদয় দল একেবারে অর্চ্চিত করিয়া ভক্তিপূর্বক পশু পক্ষীর স্ত্রী এবং মানুষীকে বলি দিতে পারে। ১০২

তিন মাসের ন্যূনবয়স্ক পশুকে শিবাবলি দিবে না এবং তিনপক্ষের ন্যূনকাল জাত পক্ষীকেও বলি প্রদান করিবে না। ১০৩

কাণ এবং ব্যঙ্গত্বাদিদোষদুষ্ট পশু বা পক্ষীকে দেবীর নিকট বলি দিবে না। যেরূপ দোষে দুষ্ট মনুষ্য বলিদানে নিষিদ্ধ, পশু ও পক্ষীদিগের বিষয়েও সেইরূপ জানিবে। ১০৪

ছিন্নাঙ্গুল কর্ণাদিযুক্ত, দাঁতভাঙ্গা এবং শিংভাঙ্গা প্রভৃতি পণ্ডকে কখনই বলিদান করিবে না। ১০৫

রাজা, দেব এবং দ্বিজগণের উদ্দেশে অর্চিত ব্রাহ্মণ অথবা চাণ্ডালকে বলি প্রদান করিবে না এবং রাজপুত্রকেও বলিদান করিবে না। শত্রু ভূপতির পুত্র যদি যুদ্ধে বিজিত হয়, তাহা হইলে তাহাকে বলি দিতে পারে। ৯০৬-১০৭

নিজের পুত্র, ভ্রাতা, বিরোধকারী হইলেও পিতা, জামাতা, ভাগিনেয় এবং মাতুল ইহাদিগকে বলি প্রদান করিবে না। ১০৮

অনুক্ত বা অজ্ঞাত পশু ও পক্ষীকে কখন বলি প্রদান করিবে না। যদি বলিদানে পশু প্রভৃতির লাভ না হয়, তাহা হইলে গর্দভ ও উষ্ট্রকে বলিদান করিতে পারে, কিন্তু অন্য জীবের লাভ হইলে ব্যাঘ্র, উষ্ট্র বা গর্দভকে বলি প্রদান করিবে না। ১০৯-১১০

পশু বা পক্ষীকে যথাবিধি অর্চিত করিয়া মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক ছেদন করিবে এবং মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক আমাকে নিবেদন করিবে। ১১১

মনুষ্যের মস্তকের রুধির দেবীর দক্ষিণদিকে নিবেদন করিবে, ছাগের শিবরারুধির বামদিকে এবং মহিষের শিরোরুধির সম্মুখে নিবেদন করিবে। পক্ষিগণের শিরোরুধির বামদিকে নিবেদন করিবে এবং শরীরের শোণিত সম্মুখে নিবেদন করিবে। ১১২

মাংসভুক্ পশু ও পক্ষিগণের এবং সর্বপ্রকার জলজ জীবগণের মস্তক ও রুধির বাম পার্শ্বে রাখিয়া নিবেদন করিবে। ১১৩

কৃষ্ণসার, কুৰ্ম্ম, গণ্ডার, শশক, কুম্ভীর এবং মৎস্য ইহাদিগের রুধির সম্মুখে রাখিয়াই নিবেদন করিবে। ১১৪

সিংহের রুধির এবং গণ্ডারের রুধির দক্ষিণে রাখিয়া নিবেদন করিবে। দেবতার পৃষ্ঠদেশে কোন বলির শিরোরুধির দান করিবে না। নৈবেদ্য দক্ষিণে, বামে, অথবা সম্মুখে রাখিয়া নিবেদন করিতে পার, কিন্তু কখন পৃষ্ঠদেশে নৈবেদ্য রাখিবে না। ১১৫

দীপ দক্ষিণে বা সম্মুখে রাখিয়া নিবেদন করিবে, কখনও বামভাগে রাখিবে না। ১১৬

এইরূপ ধূপ বামদিকে বা সম্মুখে রাখিয়া নিবেদন করিবে, কখনও দক্ষিণে রাখিবে না। ১১৭

গন্ধপুষ্প এবং ভূষণ সম্মুখে রাখিয়া নিবেদন করিবে। যদি মণ্ডলে পূজা করে তাহা হইলে তাহার মধ্যভাগে রাখিয়া গন্ধাদি নিবেদন করিবে এবং বাম দক্ষিণের বিচার পূর্বের মত করিবে। ১১৮

মদিরা পৃষ্ঠদেশে রাখিয়া দেবীকে নিবেদন করিবে এবং অন্যান্য পানীয় বস্তু বামভাগে রাখিয়া নিবেদন করিবে। ১১৯

যেস্থলে মদ্য অবশ্য দেয়রূপে বিহিত হইয়াছে, সেইস্থলে ব্রাহ্মণ কাংস্যপাত্রে নারিকেলোদক অথবা তাম্রপাত্রে মধু রাখিয়া দান করিবে। ১২০

আপৎকালেও ব্ৰহ্মাণ কদাচ মদ্যদান করিবে না, তবে পুষ্পাসব অথবা কোটরজাত মধু দান করিতে পারে ১২১

রাজপুত্র, অমাত্য, সচিব এবং সৌপ্তিকগণ রাজার সম্পত্তি ও বিভবের নিমিত্ত নরবলি প্রদান করিবে। ১২২

ইহারা রাজার অননুমতিতে নরবলি প্রদান করিলে পাপগ্রস্ত হইবে। কোনরূপ উপদ্রব উপস্থিত হইলে অথবা যুদ্ধকালে যে কোন রাজসম্পর্কীয় পুরুষ ইচ্ছানুসারে মনুষ্য বলি প্রদান করিবে। ১২৩

অপরে কখনই করিবে না। বলিদান-দিনের পূর্ব দিবসে কৰ্ত্তা সেই বলি ভূত মনুষ্যকে ‘মানস্তোক’ এই মন্ত্র, দেবী সূক্তত্রয় এবং ‘গন্ধদ্বারা’ এই মন্ত্রদ্বারা বলির মস্তকে খড়্গ রক্ষা করিয়া সেই খড়গে গন্ধাদি দানপূর্বক বলিকে অধিবাস করাইবে। ১২৪-১২৬

অনন্তর খড়্গস্থ গন্ধাদি বলির গলায় অম্বে অম্বিকে এই মন্ত্র পাঠ করিয়া রৌদ্র মন্ত্র পাঠ করিয়া অথবা ভৈরবের মন্ত্র পাঠ করিয়া অৰ্পণ করিবে। ১২৭

মনুষ্য এইরূপে সংস্কৃত হইলে দেবী সেই বলিকে রক্ষা করেন, সেই রাত্রিতে ঐ বলির কোনরূপ ব্যাধি বা ক্ষুণ্ণতা হয় না। ১২৮

কোনরূপ মৃতাশৌচ বা জ্ঞাতির উৎপত্তি আদিতে উৎপন্ন অশৌচ তাহাকে দূষিত করে না। ১২৯

ছিন্ন মনুষ্য ও পশু প্রভৃতির মস্তক যে যে স্থানে পতিত হইয়া শুভ বা অশুভ হয়, তাহা শ্রবণ কর। ১৩০

মনুষের ছিন্ন শির ঈশানকোণে বা নৈর্ঋতকোণে পতিত হইলে রাজ্যহানি এবং রাজার বিনাশ সাধন করে। ১৩১

হে ভৈরব! পূর্ব, আগ্নেয়, দক্ষিণ, পশ্চিম এবং বায়ুকোণে ঐ ছিন্ন মস্তক পতিত হইলে যথাক্রমে লক্ষ্মী, পুষ্টি, ভয়, লাভ, পুত্রলাভ এবং ধন উৎপাদন করে। ১৩২

হে ভৈরব! ছিন্ন মহিষের মস্তক উত্তর দিক হইতে এক এক করিয়া বায়ু কোণ অবধি পতিত হইলে যথাক্রমে যে যে ফল লাভ হয়, তাহা শ্রবণ কর। ভোগ্য, হানি, ঐশ্বৰ্য্য, বিত্ত, রিপুজয়, ভয়, রাজ্যলাভ, এবং শ্ৰী। ১৩৩-১৩৪

জলজ এবং অণ্ডজ ভিন্ন ছাগ আদি নিখিল পশুর মস্তক পতনে দিক অনুসারে ঐরূপ ফল লাভ হয় জানিবে। ১৩৫

জলজ এবং পক্ষীদিগের ছিন্ন মস্তক দক্ষিণে ও অগ্নিকোণে পতিত হইলে ভয় এবং অন্যদিকে পতিত হইলে শ্রীলাভ হয়। ১৩৬

মনুষ্য, পশু, পক্ষী ও কুম্ভীরাদির মস্তক ছিন্ন হইলে যদি দাঁতের কটকট শব্দ হয় তাহা হইলে রোগ উৎপন্ন হয়। ১৩৭

যদি মস্তকচ্ছেদ হইবার পর চক্ষু হইতে মল নির্গত হয়, তাহা হইলে যে রাজ্যে এই ঘটনা হয় ঐ রাজ্যের হানি হয়। ১৩৮

মহিষের মস্তক ছিন্ন এবং পতিত হইলে যদি নেত্র হইতে লোতক নির্গত হয়, তাহা হইলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজার মৃত্যু হয়। ১৩৯

অপরাপর বলি পশু প্রভৃতির মস্তক হইতে নির্গত লোতক অতিশয় ভয় এবং পীড়ার সূচনা করে। ১৪০

যদি নরবলির ছিন্ন শির হাস্য করে, তাহা হইলে শত্রুর বিনাশ হয় এবং বলিদাতার সর্বদা লক্ষ্মী ও পরমায়ু বৃদ্ধি হয়, সে বিষয়ে কোন সংশয় নাই। ১৪১

নরবলির ছিন্ন-মস্তক যে যে বাক্য উচ্চারণ করে, তাহা অচিরকালেই সফল হয় এবং হুঙ্কার করিলে রাজ্যের হানি হয় এবং শ্লেষ্মস্রাব করিলে কর্তার পঞ্চত্ব হয়। ১৪২

যদি ছিন্ন মস্তক দেবতাদিগের নাম কীৰ্ত্তন করে, তাহা হইলে বলিদাতা ছয় মাসের মধ্যেই অতুল বিভূতি লাভ করে। ১৪৩

রুধির দানকালে যদি ছিন্ন শরীরের উর্দ্ধ বা অধোভাগ হইতে বিষ্ঠা বা মূত্র নির্গত হয়, তাহা হইলে বলিদাতার নিশ্চয় মৃত্যু হয়। ১৪৪

ছিন্নদেহ বামপাদের আক্ষেপ করিলে মহারোগ উৎপন্ন হয় এবং অপর চরণের আক্ষেপে কল্যাণ লাভ হয়। ১৪৫

সাধক মহিষ এবং মনুষ্যের রক্তের কিঞ্চিৎ অংশ মধ্যমা এবং অনামিকা দ্বারা উদ্ধৃত করিয়া মহাকৌশিক মন্ত্র উচ্চারণ-পূর্বক পূর্ব হইতে নৈর্ঋতকোণে পূতনাদি দেবতার উদ্দেশে মৃত্তিকার উপর বলি প্রদান করিবে। ১৪৬-৪৭

পঞ্চবর্ষীয় মহিষ এবং পঞ্চবিংশতিবার্ষিক মনুষ্যকে দেবীর উদ্দেশে বলি প্রদান করিবে এবং তাহার রক্তই ভূতির নিমিত্ত হয়। ১৪৮

রাজা প্রথমে খড়্গকে আমন্ত্রিত করিয়া শত্রুকে বলি প্রদান করিবে অথবা মহিষ বা ছাগকে শত্রু-নামে আমন্ত্রিত করিয়া বলি প্রদান করিবে। ১৪৯-১৫২

মন্ত্র পাঠপূর্বক বলির মস্তক সূত্ৰদ্বারা তিন প্রকারে বদ্ধ করিয়া বলিচ্ছেদ করিয়া তাহার উত্তমাঙ্গ যত্নপূর্বক দেবীকে অর্পণ করিবে। ১৫৩

যখন যখন শত্রুর বৃদ্ধি দেখিবে তখন তখন তাহার ক্ষয় কামনা করিয়া অপরের শিরচ্ছেদ করিয়া বলি প্রদান করিবে। ১৫৪

ঐ বলিরূপ পশুতে শত্রুর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিবে, ঐ বলির ক্ষয় হইলে শত্রুর বিপদ হয়। ১৫৫

‘বিরুদ্ধ-রূপিণি চণ্ডিকে! বৈরিণং ত্বং খাদয়স্ব স্বাহা’ এই মন্ত্রের নাম খড়্গ মন্ত্র। এই সেই আমার বৈরী, যে সর্বদা আমার উপর দ্বেষ করে; হে মহামারি এক্ষণে পশুরূপধারী উহাকে বিনাশ কর। ১৫৬-১৫৭

‘স্ফেঁ স্ফেঁ খাদয় খাদয়’ এই মন্ত্র পাঠ করিয়া সেই বলির মস্তকে পুষ্পদান করিবে। তদনন্তর তাহার রুধির দ্ব্যক্ষর মন্ত্রদ্বারা উৎসর্গ করিয়া দিবে। ১৫৮

শরৎকালের মহানবমীতে যদি এইরূপ বলিপ্রদান করা হয়, তাহা হইলে ঐ বলির অষ্টাঙ্গ হইতে মাংস লইয়া তাহা দ্বারা হোম করিবে। ১৫৯।

দুর্গাতন্ত্রমন্ত্রদ্বারা শুচিনামক অগ্নি প্রণীত হইয়া তাহাতে উক্তনিয়মে বলিদান করিয়া সাধক শত্রুক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ১৬০

হে প্রিয়ে! সাধক যদি স্বকীয় গাত্র হইতে রুধির দান করে তাহা হইলে নাভির অধোভাগ হইতে অথবা পৃষ্ঠদেশ হইতে কখন রুধির দান করিবে না। ১৬১

ওষ্ঠ চিবুক অথবা বাহ্যেন্দ্রিয় হইতে রুধির দান করিবে না। ১৬২

সাধক কণ্ঠের অগ্রভাগ এবং নাভির উর্ধ্বভাগ হইতে এবং তলদ্বয় ত্যাগ করিয়া বাহুযুগল হইতে রুধির দান করিবে, কিন্তু শরীরের আঘাত প্রকাশ করিবে না। ১৬৩।

গণ্ড, ললাট, ভ্রূর মধ্যে, কর্ণাগ্র, বাহুদ্বয়, স্তনদ্বয়, উদর, কণ্ঠের অধঃ ও নাভির উর্ধ্বস্থিত যাবতীয় হৃদয়ভাগ এবং পার্শ্ব–এই সকল অঙ্গের রুধির দেবীকে দান করিবে। ১৬৪-১৬৫

হে ভৈরব! গুল্ফ, জত্র, বক্ত্র, রোগযুক্ত অঙ্গ অপরকর্তৃক আহত অঙ্গ হইতে রুধির দান করিবে না। ১৬৬

মনুষ্য শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া ঐ রুধির নির্গত করিবার নিমিত্তই অক্ষুব্ধচিত্তে আপনার অঙ্গে স্বয়ং আঘাত করিয়া রুধির নির্গত করিয়া পদ্মপুষ্পের পাত্রে, কিংবা সৌবর্ণ-পাত্রে অথবা কাংস্যপাত্রে সেই রুধির রাখিয়া পূর্বোক্ত মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক উহা দেবীকে দান করিবে। ১৬৭-৬৮

ক্ষুর, ছুরিকা, খড়্গ এবং সঙ্কুল প্রভৃতি যতগুলি অস্ত্র আছে, ইহাদের মধ্যে যত বড় অস্ত্র দ্বারা শরীরে আঘাত করিবে ততই ফলপ্রাপ্ত হইবে। ১৬৯

একটি পদ্মফুলের পাপড়িতে যতটুকু রক্ত ধরিতে পারে, সাধক তাহার চারি ভাগের অধিক রক্ত কখনই দান করিবে না এবং একেবারে কোন অঙ্গের ছেদ করিবে না। ১৭০

যে ব্যক্তি ভক্তি সহকারে আপনার হৃদয়জাত মাষপ্রমাণ অথবা তিল বা মুগপ্রমাণ মাংস দেবীকে অর্পণ করে, তাহার ছয় মাসের মধ্যে সমুদায় কামনা সিদ্ধ হয়। ১৭১-১৭২

যে সাধক স্নেহপাত্র না লইয়া বাহুদ্বয়, স্কন্ধদ্বয় এবং হৃদয়ে দীপবর্তী (সলিতা জ্বালিয়া) দেবীকে দান করে, ক্ষণমাত্র তাদৃশ দীপদানের ফল শ্রবণ কর। ১৭৩-৭৪

সে দেবীগৃহে কল্পত্ৰয় যথেচ্ছাক্রমে বিপুল ভোগ লাভ করিয়া, পরে সাৰ্ব্ব ভৌম রাজা হইয়া জন্মগ্রহণ করিবে। ১৭৫

মহিষের ছিন্নমস্তকে দীপ জ্বালাইয়া, যে ব্যক্তি উহা হস্তদ্বারা গ্রহণ করিয়া দেবীর সম্মুখে একটি সমস্ত দিন ও রাত্রি অবস্থান করে। ১৭৬

সে ইহলোকে চিরায়ু ও পবিত্রমূৰ্ত্তি হইয়া অখিল মনোরম বস্তু উপভোগ করিয়া অন্তে আমার গৃহে যাইয়া গণাধিপত্ব প্রাপ্ত হয়। ১৭৭

যদি সাধক দক্ষিণহস্তে মনুষ্যের মস্তক এবং বামহস্তে রুধিরপাত্র গ্রহণ করিয়া রাত্রিজাগরণ করে। ১৭৮

তাহা হইলে সে ইহকালে রাজা হয় এবং অন্তে আমার লোকে গমন করত গণদিগের অধিপতি হয়। ১৭৯

যে সাধক বলিদিগের শিরোরক্ত করদ্বয়ে মাখাইয়া দেবীর সম্মুখে ধ্যানস্থ হইয়া অবস্থান করে। ১৮০

সে ব্যক্তি ইহলোকে সকল কামনার বস্তু লাভ করিয়া অন্তে দেবীলোকে সম্মানিত হয়। ১৮১

হে মহামায়ে! আপনি জগতে কর্ত্রী এবং সৰ্ব্বকামার্থদায়িনী, আপনাকে এই নিজদেহের রুধির দান করিতেছি, আপনি আমার উপর প্রসন্ন হইয়া বর প্রদান করুন। ১৮২

এই কথা বলিয়া সিদ্ধসন্নিভ বিচক্ষণ মানব প্রণামপূর্বক স্বীয় গাত্রের রুধির প্রদান করিবে। ১৮৩

ঈশ্বর-ভূতিলাভের নিমিত্ত যে সত্য রক্ষা করিয়া আমি আত্মমাংস দান করিতেছি, হে দেবি! সেই সত্য রক্ষা করিয়া তুমি আমাকে নির্বাণ দান কর। হুঁ হুঁ নমঃ নমঃ পণ্ডিত সাধক এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া, আপনার মাংস দান করিবে। ১৮৪-১৮৫

সৌভাগ্যদীপসম্পন্ন পরম পবিত্র প্রদীপ এই মাংসকে উজ্জ্বল করিতেছে, হে হেঁ নমঃ নমঃ এই মন্ত্র পাঠ করিয়া বিচক্ষণ সাধক শরৎকালের মহানবমীর রাত্রিতে স্কন্ধ এবং বিশাখের উদ্দেশে দীপ দান করিবে। ১৮৬

যবচূর্ণময় অথবা মৃন্ময় শত্রুর প্রতিকৃতি করিয়া যথোক্ত মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক তাহার শিরচ্ছেদন করিয়া বলিপ্রদান করিবে। ১৮৭-৮৮

অনন্তর বক্ষ্যমাণ মন্ত্রদ্বারা খড়গের আমন্ত্রণ করিবে। ১৮৯

মন্ত্র যথা,–”রক্তং কিলকিলী ঘোরা ঘোরধারবিহিংসকঃ। ব্রহ্মশিষ্যাম্বিকাশিষ্যা অমুকং চারিসত্তমম্‌”। ১৯০

ছঃ ছং অথবা মঃ মং ক্ৰঃ ক্রং ফট্‌ এই মন্ত্র স্কন্ধ এবং বিশাখের বলিদানে উক্ত হইয়াছে। ১৯১-৯২

বলিরূপ সেই কৃত্রিম শত্রুকে রক্তদ্রব্য দ্বারা অভিষিক্ত করিবে। ১৯৩

তাহার ললাটে রক্তচন্দনের একটি তিলক দান করিবে। তদনন্তর তাহাকে রক্তবস্ত্র পরাইয়া তাহার গলায় রক্তমাল্য দান করিবে। ১৯৪

রক্তসূত্র দ্বারা তাহার কণ্ঠে বন্ধন, নাভিতে কৃত্রিম শল্য দান এবং তাহাকে উত্তরশিরা করিয়া খড়্গ দ্বারা তাহার স্কন্ধ ছেদন করিবে। অনন্তর তাহা স্কন্ধের মূল মন্ত্র দ্বারা মন্ত্রিত করিয়া স্কন্দকে দান করিবে। ১৯৫

সকারের অগ্রবর্তী অক্ষর (হকার) চতুর্দশ স্বর (ঔকার) এবং অগ্নি (রকার) যুক্ত তদনন্তর চন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ হ্রৌঁ ইহাই স্কন্দের মূল মন্ত্র, এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া স্কন্দকে বলি প্রদান করিবে। ১৯৬-৯৭

এইরূপ পবর্গের তৃতীয় (ব) এবং চন্দ্রবিন্দুযুক্ত অর্থাৎ ব্রৌঁ ইহা বিশাখের মন্ত্র। ইহা উচ্চারণ করিয়া বিশাখকে বলি প্রদান করিবে। ১৯৮-১৯৯

এই স্কন্দ এবং বিশাখ-কুটিলাক্ষ, কৃষ্ণপিঙ্গলবর্ণ, রক্তবস্ত্রধারী, উভয়েরই দক্ষিণ দিকের এক হস্তে ত্রিশূল ও অপর হস্তে করবাল। ২০০

বামদিকের এক হস্তে নৃকপাল, অপর হস্তে কপর্দক; উভয়েই ত্রিনেত্র, উভয়েরই বক্ষঃস্থলে নরমুণ্ডমালা। ২০১

উভয়েরই দন্ত অতি বিকট এবং ভীষণ, উভয়েই গণাধিপ এবং দ্বারপাল : এইরূপ ধ্যান করিয়া সৰ্ব্বদা দেবীর সম্মুখস্থিত দুজনের চিন্তা করিবে। ২০২

হে পুত্রদ্বয়! চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বিশেষ চতুর্দশী তিথিতে ছাগ মহিষ প্রভৃতি বলি মধু ও মৎস্য দ্বারা ভৈরবরূপী আমাকে তুষ্ট করিবে; আমি ইহাতেই সন্তুষ্ট হইব। ২০৩

বলিদান বিধি - কালিকা পুরাণ

চণ্ডিকার বলিদান কালে বলির মস্তক জলদ্বারা অভিষিক্ত করিয়া মূলমন্ত্র দ্বারা উহার উৎসর্গ করিবে। ২০৪

পূৰ্ব অর্চিত, অল্প প্রাণযুক্ত এবং বহুধা চলিত ঐ মস্তককে সাধক সিদ্ধি ভাবনা করিয়া কামমন্ত্র দ্বারা নিরীক্ষণ করিবে। ২০৫

“সিতপ্রেতো রথস্তেষাং যোগপীঠ্য সন্নিভঃ। ধ্যায়াম্যস্মিন্‌ মহামায়ে সিদ্ধিং বোধয় তে নমঃ ॥” এই মন্ত্রদ্বারা অভিমন্ত্রিত হইয়া ঐ মস্তক যদি অচিরকাল মধ্যে কম্পিত হয়, তাহা হইলে কার্যের সিদ্ধি হয়, আর ইহার বিপরীত হইলে কার্যের অসিদ্ধি হয়। ২০৬-২০৭

যথোক্ত বিধানানুসারে এইরূপে বলিদান করিয়া বীরসাধক ঐ বলিদান হইতেই চতুৰ্বর্গ এবং সুখ লাভ করে; সে বিষয়ে কোন সংশয় নাই। ২০৮

বলিদান এবং রুধির দানে ক্রম ও স্বরূপ কথিত হইল, এক্ষণে উপচারের বিষয় আমার নিকট হইতে শ্রবণ কর। ২০৯

সপ্তষষ্টিতম অধ্যায় সমাপ্ত। ৬৭

আরও পড়ুনঃ

কামাখ্যা-বিবরণ – কালিকা পুরাণ
দেবীপূজার কর্তব্যতা – কালিকা পুরাণ
দেবী-তন্ত্র – কালিকা পুরাণ

সুতপুত্ৰ উগ্রশ্রবা কর্তৃক গরুড় পুরাণের মাহাত্ম্য বর্ণনা – গরুড় পুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

কালিকা পুরাণ

মন্তব্য করুন