বসিষ্ঠ শাপ – কালিকা পুরাণ

একাশীতিতম অধ্যায় – বসিষ্ঠ শাপঃ ঔর্ব বলিলেন;–পূৰ্বকালে সকল লোকেই মহাপীঠ কামরূপে তত্রত্য নদীতে স্নান, তদীয় জল পান, এবং তথাকার দেবতা পূজা করিয়া স্বর্গে যাইতে লাগিল। ১

কাহার কাহারও বা নিৰ্বাণ মুক্তি লাভ কিম্বা শিবত্ব প্রাপ্তিও হইতে লাগিল। ২

যম, পার্বতীর ভয়ে তাহাদিগকে বারণ করিতে বা নিজভবনে লইয়া যাইতে সক্ষম হইলেন না। ৩

যমদূত তথায় যাইতে গেলে শঙ্করগণেরা বাধা দেয়–যাইতে দেয় না; এই জন্য যমদূতেরা প্রেরিত হইলেও তাহাদিগের ভয়ে তথায় যায় না। ৪

যম, গতিক দেখিয়া কাজ-কর্ম বন্ধ করিলেন; একদা তিনি বিধাতার নিকট গিয়া বলিলেন,–বিধাতঃ! মানুষগুলি কাম-রূপে স্নান, পান ও পূজাদি করিয়া মরণান্তে কামাখ্যাদেবীর বা শিবের পার্শ্বচর হইতেছে। ৫-৬

আমার সেখানে অধিকার নাই; তাহাদিগকে বারণ করিতে আমি অসমর্থ। যদি অসম্ভব না হয়, তাহা হইলে এ বিষয়ে উপযুক্ত উপায় বিধান করুন। ৭

বসিষ্ঠ শাপ - কালিকা পুরাণ

লোকপিতামহ ব্রহ্মা যমের এই কথা শুনিয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়াই বিষ্ণু ভবনে গমন করিলেন। ৮

বসিষ্ঠ শাপ – কালিকা পুরাণ

সৰ্ব্ব-লোকেশ ব্ৰহ্মা, যমের কথিত সকল কথাই বিষ্ণুর নিকটে গিয়া অবিকল বলিলেন, বিষ্ণুও তাহা মনোযোগের সহিত শুনিলেন। ৯

তখন বিষ্ণু, যম বিরিঞ্চি-সমভিব্যাহারে শিবের নিকট যাইলেন। শিব, আদর অভ্যর্থনা করিয়া আগমন প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করিলে ভগবান বিষ্ণু এই মিতবাক্যে বলিলেন। ১০

এই কাম-রূপ সকল দেবতা, সকল তীর্থ এবং সকল ক্ষেত্র দ্বারা পরিব্যাপ্ত হইয়াছে; ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান আর নাই। ১১

মানুষ, এই পীঠে আসিয়া তাঁহার পর মরিলে, অনেকেই স্বর্গ পাইতেছে; মুক্তি এবং তোমাদিগের পার্শ্বচরত্বও কেহ কেহ পাইতেছে; তাহাদিগের উপর যমের আর ক্ষমতা থাকিতেছে না। ১২

অতএব হে মহাদেব! এমন কোন উপায় কর, যাহাতে মনুষ্যাদির উপর যমের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। যমের ভয় না থাকিলে এই পীঠেও ঠিক নিয়ম প্রতিপালিত হইবে না। ১৩

ঔর্ব বলিলেন,–শিব, বিরিঞ্চি-সহিত বিষ্ণুর এই কথা শুনিয়া তাহাদিগের বাক্য পালন করিতে মনে মনে স্থির করিলেন। ১৪

বৃষবাহন শম্ভু, ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং যমকে বিদায় দিয়া নিজে স্বগণ সমভিব্যাহারে কাম-রূপ মধ্যে গমন করিলেন। ১৫

শঙ্কর, দেবী উগ্রতারাকে এবং সমুদয় নিজগণদিগকে বলিলেন,–অহে গণসকল! সত্বর এই কাম-রূপ পীঠ হইতে লোক সকল দূর কর; মহাদেবি! উগ্রতারে! তুমিও লোক-অপসারণে যত্নবতী হও। ১৬

বসিষ্ঠ শাপ - কালিকা পুরাণ

তখন, গণসমস্ত এবং অপরাজিতা দেবী উগ্রতারা, সেই কাম-রূপ পীঠকে গোপনীয় করিবার জন্য তথা হইতে লোক সকল দূর করিয়া দিতে লাগিলেন। ১৭

সমস্ত লোক, চতুৰ্বর্ণ, এমন কি দ্বিজাতি পর্যন্ত উৎসারিত হইতে থাকিলে, সন্ধ্যাচল-স্থিত মুনিবর বসিষ্ঠ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন। ১৮

উগ্রতারাদেবী গণসমভিব্যাহারে আসিয়া তাহাকেও যখন তাড়াইবার জন্য ধরিলেন, তখন তিনি নিদারুণ অভিসম্পাত প্রদান করত বলিলেন। ১৯

হে বামে! আমি মুনি; তথাপি তুমি যে আমাকে তাড়াইয়া দিবার জন্য ধরিলে, এই কারণে তুমি মাতৃগণসহ বামভাবে (শ্রুতি-বিরুদ্ধ পথানুসারে) পূজনীয়া হইবে। ২০

তোমার প্রমথগণ, মদ-মত্ত চিত্তে ম্লেচ্ছের ন্যায় ভ্রমণ করিতেছে বলিয়া ইহারা এই কাম-রূপ ক্ষেত্রে ম্লেচ্ছ হইয়া থাকিবে। ২১

আমি শম-দম-সম্পন্ন বেদপারগ তপোধন মুনি; মহাদেবও যে ম্লেচ্ছবৎ বিবেচনাশূন্য হইয়া আমাকে নিঃসারিত করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এইজন্য তিনিও ম্লেচ্ছপ্রিয় ভস্ম ও অস্থিধারী হইয়া এখানে অবস্থিতি করুন। ২২-২৩

এই কাম-রূপ-ক্ষেত্ৰ ম্লেচ্ছসঙ্কুল হউক। স্বয়ং বিষ্ণু, যতদিন এখানে না আসেন ততদিন ইহা এইরূপ ভাবে থাক। ২৪

কাম-রূপের মাহাত্ম্য-প্রতিপাদক তন্ত্র সকল বিরল-প্রচার হউক। তবে যে পণ্ডিত, বিরল প্রচার কাম-রূপ-তন্ত্র অবগত হইবে, সেই ব্যক্তিই যথাকালে সম্পূর্ণ ফল প্রাপ্ত হইবে। বসিষ্ঠ, এই কথা বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন। ২৫-২৬

সুরালয় কাম-রূপ পীঠে প্রমথগণ ম্লেচ্ছ হইল; উগ্রতারা বামা হইলেন; মহাদেবও ম্লেচ্ছ-রত হইলেন। ২৭

কাম-রূপ-মাহাত্ম্য-প্রতিপাদক তন্ত্র সকল বিরল-প্রচার হইল। বসিষ্ঠ-শাপে সেই কাম-রূপ, ক্ষণমধ্যে বেদ-মন্ত্রহীন এবং চতুৰ্বর্ণশূন্য হইল। ২৮

বিষ্ণু আগমন করিলে, কাম-রূপ পীঠ শাপমুক্ত হইয়া সম্পূর্ণ ফলপ্রদ হইলেও দেবতা ও মনুষ্য পূৰ্ব্ববৎ আর তথাকার মাহাত্ম্য অবগত হইবেন না। তখন, ব্ৰহ্ম সমস্ত কুণ্ড গোপনের জন্য উপায় নির্ধারণ করিলেন। ২৯-৩০

অপুনর্ভব কু-ণ্ড, সোমকু-ণ্ড, ব্ৰহ্মকুণ্ড, উৰ্বশীকুণ্ড, পূৰ্ব্বে কথিত ও অকথিত নানাবিধ নদী পোপনের জন্য অর্থাৎ লোকে যাহাতে সমস্ত কুণ্ড ও নদীকে এক বলিয়া মনে করে, তদ্বিষয়ে একটি উপায় করিলেন। ৩১-৩২

বসিষ্ঠ শাপ - কালিকা পুরাণ

ব্ৰহ্মা, শান্তনু মুনির ভার্য্যা অমোঘার গর্ভে জলময় নিজতনয় উৎপাদন করিয়া সুবুদ্ধি জামদগ্ন্য পরশুরাম দ্বারা অব্যগ্রভাবে উহাকে অবতারিত করেন; কাম-রূপ সমস্তই তাহাতে প্লাবিত হইয়া যায়। ৩৩-৩৪

সেই জলময় ব্রহ্মপুত্র বীর, কাম-রূপের সমস্ত কুণ্ড প্লাবিত ও সকল তীর্থ আবৃত করিয়া অত্যন্ত গুপ্তভাবে রাখিলেন। ৩৫

যে সকল ব্যক্তি তথায় অন্যতীর্থ বা কুণ্ডের অস্তিত্ব জানেন না কেবল, লোহিত্য (ব্ৰহ্মপুত্র) নদের অস্তিত্ব অবগত আছেন, তাহারা তাহাতে স্নান করিলে কেবল ব্ৰহ্মপুত্ৰস্নানফলই প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। এই তীর্থ-গোপন, বসিশাপেই হইয়াছে। ৩৬-৩৭

যে নরশ্রেষ্ঠ, তথায় তীৰ্থকুণ্ডাদির বিশেষ বিবরণ অবগত আছেন, তাহারা ব্রহ্মপুত্রে স্নান করিলেই তথাকার সতীর্থস্নানের ফল সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্ত হন। ৩৮

বসিষ্ঠ শাপ - কালিকা পুরাণ

ব্ৰহ্মপুত্ৰ লৌহিত্য, সকল নদী ও সৰ্ব্বতীর্থ প্লাবিত করিয়া দক্ষিণ সমুদ্রে মিলিত হইয়াছেন। ৩৯

রাজন! আমি কামরূপের বিবরণ এই তোমার নিকট কীর্তন করিলাম। এখন যাহা অভিলাষ হয় জিজ্ঞাসা কর, বলিতেছি। ৪০

একাশীতিতম অধ্যায় সমাপ্ত। ৮১

আরও পড়ুনঃ

কামাখ্যা-কবচ – কালিকা পুরাণ
নমস্কার – কালিকা পুরাণ
নৈবেদ্য – কালিকা পুরাণ

তারকাসুর বধ – মৎস্য পুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

কালিকা পুরাণ

মন্তব্য করুন