বামন পুরাণ ১১-২০ – পৃথ্বীরাজ সেন

বামন পুরাণ ১১-২০ঃ এরপর প্রমথের উমা প্রসঙ্গের বিস্তৃত বর্ণনা নারদ জানতে চাইলেন। সূর্যদেব আকাশ থেকে সুকেশীকে ভূতলে ফেলে দেন। নারদ জানতে চাইলেন, সুকেশী কে?

কেন তাঁর এরূপ অবস্থা হল? কে তাকে বর দিয়েছিল? পুলস্ত্য জানালেন, তিনি যতটা পুরাণ অনুযায়ী জানেন ততটাই তিনি নারদকে সবিস্তারে জানাবেন। তিনি জানালেন গুণবান সুকেশী ছিলেন বিখ্যাত রাক্ষস রাজ বিদ্যুৎকেশীর পুত্র।

তাঁর গুণের ফলে শিব কর্তৃক তিনি বর প্রাপ্ত হন এবং তার ফলস্বরূপ তিনি আকাশ পুরী লাভ করেন এবং শত্রুগণের অবাধ্য হন।

সুকেশী সর্বদা বরলব্ধ গগনগামী পুরীতে রাক্ষসদের সাথে ঘুরে বেড়াত। এই সুকেশী একদিন মগধদেশের এক বনে গিয়ে মুনিদের অনেক আশ্রম দেখতে পেল। মুনিদের অভিবাদন করে সুকেশী তখন সেখানে মুনিদের কাছে তার একটি সন্দেহের কথা বলল।

বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

বামন পুরাণ ১১-২০ – পৃথ্বীরাজ সেন

সে বলল, তাঁরা যেন তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাকে বাধিত করেন। এরপর তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, ঐহ্যিক ও পরলৌকিক মঙ্গল কি?

কেমন করে সজ্জনদের কাছে পূজনীয় হয়ে ওঠা যায় এবং সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করা যায়। সুকেশীর প্রশ্ন শুনে মুনিগণও তাকে তার প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য রাজী হলেন।

তারা প্রথমেই ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল বিষয়ের কথা বলতে আরম্ভ করলেন। একমাত্র ঐহিক ও পারত্রিক মঙ্গলকর ধর্ম। তাঁরা জানালেন ধর্মই মানুষকে পূজনীয় করে তোলে এবং সুখসমৃদ্ধি এনে দেয়। সুকেশী জিজ্ঞাসা করলেন –কেমন ধর্মাচরণ করলে কেউ দুঃখ পায় না?

এবং সেটা কী ধর্ম? তখন তাঁরা জানালেন, দেবতাদের পরম ধর্ম হল সতত যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান, বেদাধ্যয়ন, তত্ত্ববিজ্ঞান ও বিষ্ণুপুরাণ অনুরূপ দৈত্যদের ধর্ম হল বাহুবল।

মাৎসর্য, যুদ্ধ, সৎকার্য, নীতিশাস্ত্র, অভিজ্ঞতা এবং শিবভক্তি, শিবের প্রতি ভক্তি, বিষ্ণুভক্তি, ব্রহ্মজ্ঞান, যোগসাধনা, বেদাধ্যয়ন প্রভৃতি সাধ্যগণের উৎকৃষ্ট ধর্ম, গন্ধবদের ধর্ম হল উত্তম উপাসনা, নৃত্য ও বাদ্যে দক্ষতা, সুরসতীর প্রতি অবিচল ভক্তি।

বিদ্যাধরদের ধর্ম হল বিদ্যাভ্যাস, অসাধারণ বিজ্ঞানচর্চা, পুরুষকারে মনসংযোগ এবং ভগবতী ভবানীর প্রতি ভক্তি। কিন্নরদের ধর্ম হল গন্ধর্ব বিদ্যায় অভিজ্ঞতা, সূর্যদেবের প্রতি ভক্তি এবং সর্বশিল্পে নৈপুণ্য। ব্রহ্মচর্য, অনভিমান, যোগাভ্যাসে প্রগাঢ় অনুরাগ ও সর্বত্র স্বেচ্ছাভ্রমণ পৌত্রিক ধর্ম।

ঋষি ধর্ম হল ব্রহ্মচর্য, সত্যভাষণ, জপ, জ্ঞান, নিয়ম ও ধর্ম বিষয়ে কুশলতা, মানব ধর্ম হল বেদাধ্যয়ন ব্রহ্মচর্য, দান, যজ্ঞ, অকার্পণ্য, দয়া, হিংসা, ক্ষমা, ইন্দ্রিয় সংযম, শুচিতা, মাঙ্গলিক আচার, শৃঙ্গার, সূর্য ভগবতীর প্রভৃতির প্রতি ভক্তি।

গুহ্যবাদের ধর্ম ধনাধিপত্য, ভোগ, বেদাধ্যয়ন, শিবপূজা, দর্প। পরস্ত্রী গমন, পরার্থে লালসার, বেদনুশীলন ও শিবভক্তি রাক্ষসধর্ম, পিশাচধর্ম হল অবিবেক, অজ্ঞান, অশৌচ, সত্যাচরণ ও সর্বদা আমিষভক্ষণ এই বারো প্রকার ধর্ম ব্রহ্মা নির্দেশানুসারে মূল ধৰ্ম্মের উৎপত্তি স্থল এবং ইহাই পবিত্র ও ভক্তিপ্রদ।

 

এরপর সুকেশী মানবধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। তখন মুনিগণ জানালেন পৃথিবী সাতটি দ্বীপে বিভক্ত এবং সেখানকার বসবাসকারী মানুষদের সম্পর্কে তারা জানাবেন।

পঞ্চাশ কোটি যোজনের এই পৃথিবী নদীবক্ষের ওপর অবস্থিত নৌকার মতো জলের ওপর ভাসমান হয়ে বিরাজিত ব্রহ্মা পৃথিবীপৃষ্ঠে এক অত্যুচ্চ মহাশৈল স্থাপন করেছেন। ব্রহ্মার জন্যই প্রাণী সমূহের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এই মহীমণ্ডলকে নানা দ্বীপে ভাগ করেছেন।

লক্ষযোজন বিস্তৃত জম্বুদ্বীপ নামক একটি দ্বীপ নির্মিত হয়েছে সমগ্র দ্বীপের মধ্যে। লবণসাগর এর চতুর্দিক পরিবেষ্টন করেছে। লবণসাগরের দ্বিগুণ মাপের দ্বীপের নাম পক্ষদ্বীপ।

এর বহির্ভাগে ইক্ষুসাগর বলয়াকারে বিরাজিত। এইভাবে ক্রমান্বয়ে শাল্মলি, কুশ ক্রৌঞ্চ, শাক ও পুষ্কর দ্বীপ বিরাজমান। প্রত্যেকটি দ্বীপ পূর্বের থেকে দ্বিগুণ এবং প্রত্যেকটি বহির্ভাগে এর দ্বিগুণ পরিমাণ বড়। সুরা, শপি, দধি, দুগ্ধ ও স্বাদুই নামে পরস্পর পাঁচটি সাগর বর্তমান।

ভগবান হরি শেষ শয্যায় শুয়ে আছেন শাক্যদ্বীপে। দ্বীপগুলির মোট আয়তন চল্লিশ কোটি নব্বই লক্ষ পঞ্চ যোজন। জম্বুদ্বীপ থেকে আরম্ভ করে ক্ষীরসাগর পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগের আয়তন দু-লক্ষ পঞ্চাশ যোজন। পুষ্কর দ্বীপের পরিমাণও এইরূপ। অনন্ত মহাসাগর এরপরই অনন্ত কটাহে পরিব্যাপ্ত চারিদিক।

এই সমস্ত দ্বীপেই আলাদা আলাদা ধর্ম ও ক্রিয়াকলাপ দেখতে পাওয়া যায়। তারা এই দ্বীপগুলির সম্পর্কে যথাসম্ভব বলতে সম্মত হলেন। প্লক্ষ থেকে শাক দ্বীপ পর্যন্ত দ্বীপে চিরজীবী মানুষেরা বাস করে।

তাদের কাল ও যুগের পরিবর্তন ঘটে না। এরা দেবতাদের মতো সদানন্দে বাস করে। এই দ্বীপের মানুষের কখন বিনাশ ঘটে না। একমাত্র কল্পান্তে কাল ভিন্ন আর কোনো সময় পুষ্কর দ্বীপে যারা বাস করে তারা ভীষণ দর্শন ভয়ংকর তাদের ধর্ম হল পৈশাচ, কর্মনাশ হলে তাদের বিনাশ ও সুনিশ্চিত।

সুকেশী তখন জানতে চাইল, তাঁরা কেন এমন ভীষণভাবে পুষ্করদ্বীপের বর্ণনা করলেন? কর্মক্ষয় হলে অপবিত্র হলে অধিবাসীদের বিনাশের কথাই বা কেন বললেন? ঋষিরা বললেন, উক্ত পুষ্করদ্বীপ ভয়ংকর বহুসংখ্যক নরক আছে। তাই এর বর্ণনা ভীষণ রূপ।

সুকেশী তখন এই নরকে রৌরব সংখ্যা এবং তাদের প্রকৃতির কথা জিজ্ঞাসা করলেন। ঋষিরা জানালেন, নরকের সংখ্যা একুশ। এদের মধ্যে প্রথম হল রৌরব নামক নরক, এর দৃশ্য অতি ভয়ংকর।

এর বিস্তার দুই হাজার যোজন এবং সর্বত্র জ্বলন্ত আগুন পরিব্যাপ্ত, জ্বলন্ত আগুনের তাপে ভূমিভাগ তামাটে হয়ে যায়, দ্বিগুণ আকারের দ্বিতীয় নরকের নাম মহারৌরব তৃতীয় ও চতুর্থ নরকের নাম তমিস্র ও অন্ধতমিস্র।

পঞ্চতম নরক ফলমূত্র। এরপর অপ্রতিষ্ঠিত এবং সপ্তম নরক ঘটীযন্ত্র এরপর বাহাত্তর হাজার যোজন বিস্তৃত অসি পত্রকা। তপ্তকুম্ভ ও কূটসকলী নবম ও দশম নরক। এর পরবর্তী নরকগুলির নাম হল করপত্র, ঋভোজন, সাদংশ, লৌহপিণ্ড, করম্ভসিবাতা, ক্ষারনদী, কীট ভোজন, বৈতরণী, শোণিত পূরঅঞ্জন, সুর ধার শানিত চক্র ও সংশোধন।

১২

সুকেশী জানতে চাইল, কি কাজ করলে মানুষের নরকে স্থান হয়? মানুষরা নিজের কর্মফলে ভোগ করে ও নরকে পতিত হয়। একথা ঋষিগণ তাকে জানালেন।

দেব, বেদ ও ব্রাহ্মণদের যারা নিন্দা করে, পুরাণ ইতিহাসের সদুপদেশ ব্যাপারে যাদের শ্রদ্ধাভক্তি থাকে না, যারা গুরুর নিন্দা ও যজ্ঞকার্যে বাধা সৃষ্টি করে, দাতাকে দানের ব্যাপারে বাধা দেয় তারাই নরকে পতিত হয়।

যমরাজের ভৃত্যরা তাদেরকে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়। যে নরাধমেরা বন্ধু, দম্পতি, সহোদর ভাই, প্রভু, ভৃত্য পিতাপুত্র এবং যজমান, অধ্যাপক প্রভৃতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, একজনকে কন্যা দান করে পরে আবার অন্য ব্যক্তির হাতে কন্যাকে সমর্পণ করে।

যারা অন্যকে কষ্ট দেয়, চন্দন, কেনা ঘাসের মূল ও চামর চুরি করে তারা করম্ভাসকে ভীষণ নরকে পতিত হয়। যে ব্যক্তি দেব কিংবা পিতৃশ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত হয়ে অন্যের কাছে আহার করে নরকের পাখিরা তীক্ষ্ণ ঠোঁটে তাদের দুদিকে টানতে থাকে, যে ব্যক্তি সাধুদের অন্তরে আঘাত দেয় নরকের পাখিরা তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়।

নরকের কাকেরা সাধু সজ্জনের সাথে অসৎ ব্যবহারকারী লোকের জিভ ধরে টানে। নরকের মল মূত্র ও পুঁজের মধ্যে পতিত হয় পিতা, মাতা ও গুরুজনদের অবজ্ঞাকারীরা নরকের এত কদম পুঁজরস খায়, যারা অতিথি, দেবতা, ভৃত্য কিংবা বালক পিতা-মাতা ও ভগ্নী প্রভৃতির খাওয়া না হতেই নিজে খেয়ে নেয় তাদের শরীর পর্বতের মতো বিশাল হয়ে ওঠে।

ক্ষুধার তাড়নায় তারা কাতর হয়ে ওঠে কিন্তু সূচের মতো ছিদ্র মুখ হওয়ায় তারা মুখ দিয়ে খাবার খেতে পারে না। বীত ভোজন নামক নরকে পতিত হয় সেইসব লোকেরা যারা একই পঙক্তিতে খেতে বসিয়ে খাবার দেওয়ার ব্যাপারে ব্যক্তি বিশেষের তারতম্য করে।

যেসব ব্যবসায়ী নিজে সব নিয়ে নেয় ভাগাভাগি না করে তারা নরকের শ্লেষ্ম ভক্ষণ করে তাদের হাতে। অতি ভয়ংকর ফুটন্ত পাত্রে নিক্ষিপ্ত হতে হয় যারা এঁটো হাতে ইচ্ছে করে গরু, ব্রাহ্মণ ও অগ্নি স্পর্শ করে।

যমরাজের ভূত্যরা তাদের চোখে আগুন জ্বেলে দেয় যারা এঁটো অবস্থায় সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রদের দেখে। নরকের অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে তারা যারা পত্নী, বন্ধু, মাতা জ্যেষ্ঠা ভ্রাতা, পিতা, কোন গুরু কিংবা বৃদ্ধ ব্যক্তিকে পা দিয়ে স্পর্শ করে, যমের অনুচররা গরম করা লোহার শিকল দিয়ে এইসব পাপীদের পা বেঁধে ভীষণ রৌরব নরকে ফেলে দেয় যাতে তাদের জানু অবধি পুড়ে যায়।

তাদের মুখের ভিতর গরম তপ্ত লোহা নিক্ষিপ্ত হয় নিন্দা যারা নিজ কানে শোনে। তাদের কানে তপ্ত লৌহ শলাকা ঢোকানো হয়। সেইসব পাপীরা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে কাঁদতে থাকে যারা পরে পাশে জলপানের স্থান, দেবালয়, বিশ্রামালয়, ব্রাহ্মণ গৃহসভা, মঠ, পুকুর, কুয়ো প্রভৃতি ধ্বংস করে।

তাদের শরীর থেকে ছুরি দিয়ে মাংস তুলে নেওয়া হয়। গুরু, ব্রাহ্মণ, সূর্য ও অগ্নির দিকে মুখ করে যারা মলমূত্র ত্যাগ করে নরকের বীভৎস কাকেরা মলদ্বার দিয়ে তাদের নাড়িভুঁড়ি ঠেলে বার করে আনে। নরকের কুকুরযোনি লাভ করতে হয় সেই ব্যক্তির যে স্বার্থচিন্তায় ব্যস্ত হয়ে দুর্ভিক্ষের মতো সঙ্গতিহীন পুত্র, ঠাকুর, স্ত্রী-আত্মীয়দের পরিত্যাগ করে।

যমের অনুচররা তাদের মারতে মারতে যন্ত্রের উপর ফেলে দেয় যারা শরণাগতকে পরিত্যাগ করে ও অকারণে নিরীহ লোকদের বেঁধে রেখে কষ্ট দেয়। যেসব পাপাত্মা ব্রাহ্মণদের পূজার্চনার ব্যাপারে বিঘ্ন সৃষ্টি করে নরকে যমের ভৃত্যের তাদের শিলাতলে পিষে আগুনের তাপে ঝলসাতে থাকে।

যেসব পাপিষ্ঠরা অন্যের দ্রব্য আত্মসাৎ করে নেয়, তারা নরকে শৃঙ্খলবদ্ধ হয়ে কাল কাটায়। ক্ষুধার জ্বালায় তাদের প্রাণ শেষ হয়ে যাবার মতো হয়ে পড়ে। তালু ও ঠোঁট শুকিয়ে যায়। তাদেরকে বিছা কামড়াতে থাকে। আগুনের উত্তপ্ত শাল্মলী তরুকে আলিঙ্গন করতে হয় তাদের যারা উৎসবের দিনে মৈথুন করে।

পরস্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, যেসকল ছাত্ররা একজনকে অপমান করে অন্য অধ্যাপকের কাছে যায় নরকযন্ত্রণা ভোগ করে এবং তাদের অধ্যাপকরা নরকে মাথায় করে পাথর বহন করে। নরকে মল-মূত্র ও দুর্গন্ধময় পুঁজে পতিত হয় তারা।

যারা জলে এইসব বর্জ্যপদার্থ ফেলে, যারা শ্রাদ্ধের দিন অতিথি সৎকারে বাধা দেয় তারা নরকে পরস্পরের মাংস খায়। যমরাজের ভৃত্যেরা তাদের পাহাড় থেকে ফেলে দেয়। যারা বেদ, অগ্নি, গুরু, মাতা ও পিতাকে পরিত্যাগ করে, যারা কন্যা সন্তানকে হত্যা করে বা গর্ভ নষ্ট করে তারা নরকে গিয়ে কৃমি ও পিপীলিকা খায়।

বিভিন্ন নীচ জাতির কাছ থেকে ব্রাহ্মণ দক্ষিণা গ্রহণ করলে কৃমি কীট হয়ে কালযাপন করে। নরকে নেকড়ের মুখে পতিত হয় যারা কীটের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে।

মহারৌরব নরকে পতিত হয় তারা যারা সোনাচুরি করে ব্রাহ্মণ বধ করে সুরা পান করে, গুরুপত্নীর প্রতি আসক্ত হয় পরের জমি দখল করে,

গুরু, স্ত্রী ও শিশু হত্যা করে এবং যে ব্রাহ্মণ, গরু, জল কিংবা বেদাস্ত্র অপরকে বিক্রয় করে প্রাত্যহিক আচরণগুলো নিয়মানুসারে পালন করে না, যে ব্রাহ্মণ শুচিতা পালন করে না ও মামলা মোকদ্দমায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়; তাদের তামিস্ত্র অন্ধ তামিস্ত্র, ঘটীযন্ত্র ও তপ্তকুম্ভ জাতীয় ঘোর নরকে দশ হাজার বছর বাস করতে হয়।

বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

১৩

যে পরের উপকার করতে অস্বীকার করে তার ক্ষতির চেষ্টা করে, সে লোকসমাজে নিন্দিত হয় এবং সকল নরক আগে ভোগ করতে হয়। দেবতাদের মধ্যে বিষ্ণু প্রধান,পর্বতের মধ্যে হিমালয়, অস্ত্রের মধ্যে সুদর্শন, পাখির মধ্যে গরুড়, সাপের মধ্যে অনন্ত, ভূতগণের মধ্যে নদী মধ্যে, গঙ্গা জলজ উদ্ভিদের মধ্যে পদ্ম, দৈত্যগণের মধ্যে শিবভক্ত ক্ষেত্র সমূহের মধ্যে কুরুজঙ্গল,

তীর্থের মধ্যে পৃথুদক, সরোবরের মধ্যে উত্তর মানস, পুণ্যকারীদের মধ্যে নন্দন, ত্রিভুবন মধ্যে ব্রহ্মভবন, ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে সত্যতা, যজ্ঞের মধ্যে অশ্বমেধ, সুখস্পর্শের মধ্যে পুত্র, তপস্বীদের মধ্যে অগস্ত্য, শাস্ত্র মধ্যে বেদ, পুরাণ, মধ্যে মাৎস্য সংহিতা মধ্যে ব্রহ্মশক্তি, পুঁথি মধ্যে মনুসংহিতা, তিথি মধ্যে বেদ, পুরাণ মধ্যে দেবরাজ ইন্দ্র তেজস্বীদের মধ্যে সূর্য, গ্রহনক্ষেত্রের মধ্যে চন্দ্র, হ্রদ মধ্যে জলধি, রাক্ষসদের মধ্যে সুকেশী,

পাশ মধ্যে নাগপাশ, ধানের মধ্যে শালিধান, মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ, চতুষ্পদ প্রাণীর মধ্যে গরু ও সিংহ কুলের মধ্যে জাতি, নগর মধ্যে কাঞ্চী, নারীর মধ্যে রম্ভা, চতুরাশ্রমের বসবাসকারীদের মধ্যে গৃহস্তপুর সমূহের মধ্যে কন্দ, ব্যাধি মধ্যে অজীর্ণ, সাদা জিনিসের মধ্যে দুধ, বস্ত্রের মধ্যে কার্পাস বস্ত্র, কলামধ্যে গণিত, জ্ঞান, বিজ্ঞান মধ্যে ইন্দ্রজাল, শাকের মধ্যে কাকমাচী, রসসমূহে লবণ,

ফল মধ্যে তাল, সরোবর মধ্যে পদ্মা সরোবর, বনবাসীদের মধ্যে ঋক্ষ রাজ, গাছের মধ্যে বট, জ্ঞানীদের মধ্যে শিব, সতীমধ্যে পার্বতী, বৃষমধ্যে নীলবৃষ, দুর্গম স্থানের মধ্যে বৈতরণী, তেমনি যে ব্যক্তি পরের উপকার স্বীকার না করে সে।

পাপীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, পাপিষ্ঠ ব্রহ্মহত্যাকারী ও গোহত্যাকারীদেরও পরিত্রাণ হয় কিন্তু দুবৃত্ত কৃতঘুদের কোনো নিস্তার নেই। শত কোটি জন্মেও নরকযন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। যে বন্ধুর উপকার অস্বীকার করে সে অনিষ্ট সাধন করে।

পুষ্কর দ্বীপের বিশদ বিবরণ শোনার পর সুকেশী জম্বুদ্বীপের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ঋষিরা তখন তাকে তা অবগত করলেন। তাঁরা বললেন–এই দ্বীপের বাসিন্দারা স্বর্গ ও মোক্ষলাভ করে।

এই দ্বীপের মাঝখানে ইলা বৃত, পর্বে ভদ্রশ্য, পূর্ব ও দক্ষিণে হিরন্মান দক্ষিণে ভারতবর্ষ, দক্ষিণ পশ্চিমে হরিবর্ষ, পশ্চিমে কেতুমাল, পশ্চিম ও উত্তরে চম্পক, উত্তরে কুরুবর্ষ। এর পূর্ব ও উত্তরে কিম্পুরুষ বর্ষ। এই সকল বর্ষগুলি মনোরম ও পবিত্র, ভারতবর্ষ ছাড়া বাকি আটটিবর্ষে কোনো কাল পরিবর্তন হয় না।

এর অধিবাসীরা জরা মৃত্যু ভয়ে ভীত নয়। এরা নিরবিচ্ছিন্ন সুখে জীবন কাটায়। সুখের জন্য তাদের বিশেষ চেষ্টা করতে হয় না। এরা কখনও বিপদ-আপদে পড়ে না, এদের মধ্যে উত্তম, মধ্যম ও অধম এরূপ কোনো ভেদ নেই। ভারতবর্ষ নয়টি দ্বীপে বিভক্ত।

এই সব দ্বীপই সাগর দিয়ে ঘেরা এবং একটি থেকে আরেকটিতে যাওয়া কঠিন। এর মধ্যে আটটি দ্বীপের নাম-ইন্দ্রদ্বীপ, কতোরুমা, তাম্রপর্ণ, গঙক্তিমান, নাগ দ্বীপ কাটাহ, সিংহল ও বারুণ, নবমদ্বীপের নাম কুমার। কুমারদ্বীপ দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত সাগরের দ্বারা পরিবৃত।

এই দ্বীপের পূর্বে কিরতি, পশ্চিমে যবন, দক্ষিণে অন্ধ ও তুরস্কদের বাস। এই দ্বীপের অধিবাসী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। যজ্ঞ, যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাতীয় কাজ তারা নিষ্ঠা ও পবিত্রতার সাথে পালন করে। তারা কৃতকার্যের ভালোমন্দ অনুসারে স্বর্গ, মোক্ষ, পুণ্য ও পাপ ভোগ করে। এই দ্বীপে মহেন্দ্র মলয় সহ্য শক্তিমান যক্ষবৃন্দ ও পারিপাত্র নামে সাতটি কুলপর্বত আছে।

এগুলি ছাড়াও বহুসংখ্যক পর্বত আছে। এগুলি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ও অত্যুচ্চ এর তলদেশ অতি রমণীয়। কতগুলি পর্বতের নাম কোলাহল, বৈত্রাজ, মন্দর, দুগ্ধর, কত ধর্ম, বৈদ্যুৎ, মৈনাক, সরস, তুঙ্গপ্রস্থ, নাগগিরি, গোবর্ধন, উজ্জয়নী, পুস্পগিরি, অবুদ রৈবত ঋষ্য মূক, গোমস্ত, চিত্রকূট, কৃতশ্মর, শ্রীপর্বত ও বোবাম।

এছাড়াও শত শত পর্বত আছে। এই সব পাহাড় ঘেরা লোকালয়ে ম্লেচ্ছ প্রভৃতি নানা জাতি বাস করে। এই সব লোকালয়ের অধিবাসীরা যে নদীর জল পান করে তাদের নাম সরস্বতী, পঞ্চরূপা, কালিন্দী, হিরন্বতী, শতদ্রু, চান্দ্রিকা, নীলা, বিতস্তা, ইরাবতী, কুহু, মধুরা, হারারাবী, ইশীরা, ধাতুকীরকম।

গোমতী ধুত পাপা, বাহুদা, দৃশ্যন্বতী, নিঃস্ববা, গন্তকী, চিত্রো কৌশিকী, বধূসরা, সরযূ ও লৌহিত্য এই সব নদী ও নদ হিমালয় পাদদেশে থেকে নির্গত হয়েছে।

পরিপত্র পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়েছে বেদস্মৃতি, বেদসিনী, বৃত্ৰষ্মী, সিন্ধু, পণাসা, নন্দিনী, পার্বানী, মহীশ্চরা, চর্বন্ধতী, উলুপী, বিদিশা, বেণুমতী, চিত্রা ও ঘবতী ও রম্যা। ঋক্ষ পর্বতের পাদদেশ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে শোন, মহানদী, নর্মদা, সুরসা, ক্রিরা, মন্দাকিনী, দশতনা।

চিত্রকূটা, আহি বেদিকা, চিত্রোৎপলা তামস্যা, বারতোয়া, পিশাচিকা, শুক্তি মতী, চক্রিনী, ত্রিদিবাস এবং ফল্কবাহিনী, বিন্ধ্যপর্বত থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে শিবা, পয়েষ্ণী, নির্বিন্ধ্যা, তাপী, নিষধাবতী, কেনা বৈতরণী, সিনিবাহু কুমন্ধতী তোয়ারেবা, মহাগৌরী ও দুর্গন্ধা। এদের জল পরস পবিত্র ও স্বচ্ছ।

সহ্যাদ্রির পাদদেশ থেকে উৎপন্ন জাত নদীগুলি হল গোদাবরী ভীমরথী কৃষ্ণা, বেন্থা, সরিন্ধতী বিশমন্ত্রী, সুপ্রয়োগ, বাহ্যাঁ, কাবেরী দুর্গন্ধ, নলিনী, বারিসেনা, কলস্বনা, শুকিমান পর্বত থেকে বেরিয়ে এসেছে কৃতমালা, তাম্রপণী কঞ্জুলা, উৎপলাবতী, শুনী ও সুদামা।

এরা প্রত্যেকে পবিত্র স্বচ্ছজল পূর্ণ। এই নদীর পুণ্যস্নানে পূণ্যি লাভ হয়। এরা প্রত্যেকে সাগর পত্নী। কুমারদ্বীপে আরো হাজার হাজার ক্ষুদ্র নদী আছে। এদের মধ্যে কিছু নদীতে সর্বদা জল থাকে না।

আবার কিছু নদী বর্ষাকালে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর জল মধ্যদেশীয় লোকেরা ব্যবহার করে। মধ্য দেশীয়রা হলেন কুশূদ্র, কুন্তল, পঞ্চাল, কৌশিক এবং শক, বর্বর, কৌরব কলিঙ্গ অঙ্গবঙ্গ, মর্মক।

উত্তরা পথের অধিবাসীরা হলেন আভীর, শাক্য ধান, বাহ্লীক, অভীর, অপরান্ত, শূদ্র, পল্লব ঘটক, গান্ধার যবন, সিন্ধু সৌবীর, ভদ্রক, শতদ্রব, ললিথা, পারাবত মূষিক, মাবর, কেকয়, দংশন ক্ষত্রিয়, প্রতিবেশত, শূদ্র কূল, কম্বোজ, দরদ, বর্বর, অঙ্গলৌকিক, বেন, তুষার, আত্রেয়, ভরদ্বাজ প্রস্থল, দাশেরক, লম্বক, স্তাবক আরাম, চুড়িব, তঙ্গন, অলস অলিভদ্র, কিরাত, কর্মপন্থী, তামস, গণক, সুপার্শ্ব, কুর্ত, কুহিক, চূর্ণ, তুণপাদী, কুবকুব, মান্তপাদীক্ষ পাণবীয়।

১৪

অঙ্গ, বঙ্গ, মদগুরু, মদংসদ, কলদন্তিক, ব্রহ্মোত্তর, বিজয়, ভাগর, অঙ্গেয়, মর্ষক, প্রাগজ্যোতিষ, পৃষ, বিদেহ, তাম্রলিপ্তক, মালা মগধ ও আনন্দ পূর্বদিকে অবস্থিত দাক্ষিণাত্য রুপে সুবেদিক পুণ্ড কেরল চৌড়, কুল্য, মহারাষ্ট্র, মহিষিক, কলিঙ্গ আভীড়, বেশকত, আরণ্য, শবর, বিন্ধ্য পর্বতের সন্নিকটে অবস্থিত পুলিন্দ, বিদর্ভ, দন্তক, পৌরিক, সরিক, ভোগবদন, অশ্মকনৈমিক, কুন্দন, আন্ধ, উলিদ উদ্ভিদ।

পশ্চিম দেশীয় অধিবাসীরা হলেন শূপারক, বারিধান, তাপস তামস, শারস্কর, দারুকৃচ্ছ, সমোদয় সারস্বত, শাৎসীয়, সুরাষ্ট্র অবাস্ত্য ও অবুদ, কারুষ, একলব্য, মেকল উৎকল, উত্তমর্ণ, দশার্ণ, গোল্ড কিবা রথ, শেল, ত্রৈপুর, খেল্লিশ, তুরগ, তুম্বর, নিষেধ, বহেল, অনুপ হন্তিকের, ধীত হোত্র, অবন্তি বিন্ধ্যা পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত।

ত্রিকগই কিরাত, তোমর, শশিখ, আদ্রিক, সুতরাং কুমার দ্বীপের বিবরণ ও ধর্মারণ সুকেশীকে মুনিরা বিশদভাবে শোনালেন।

ঋষিরা সুকেশীকে জানালেন অহিংসা, সততা, চুরি না করা, মন সংযম, ইন্দ্রিয় সংযম, দান, ক্ষমা, অকার্পণ্য, অশৌচ, তপস্যা দশটি বর্ণের সাধারণ ধর্ম। ব্রাহ্মণের জন্য চার প্রকার আশ্রমধর্ম নির্দিষ্ট আছে। এতেও সুকেশীর কৌতূহল নিবারণ হল না। তার আগ্রহ ক্রমশ বেড়ে চলল।

এবার তিনি। চতুরাশ্রমের বিষয় বিশদভাবে জানতে চাইলেন। ঋষিরা বললেন, উপনয়নের পর ব্রাহ্মণরা চর্যানুযায়ী গুরুগৃহে বাস করে।

এই সময়কার ধর্মাচারণ হল গুরুগৃহে বাসকালে বেদাধ্যয়ন, অগ্নি পরিচর্যা, স্নান ও ভিক্ষাবৃত্তি পালন করবে। ভিক্ষালব্ধ দ্রব্য গুরুকে দিয়ে তাঁর অনুমতি নিয়ে খাবে। গুরুর কাজ সর্বদা করবে, গুরুকে খুশি রাখার চেষ্টা করবে। তার আদেশে বেদপাঠ করবে, অধ্যয়নের সময় অন্যত্র মন দেবে না।

গুরুর কাছে সমস্ত বেদশাস্ত্র পড়ে ভালোভাবে শিক্ষালাভ করবে। গুরুর অনুমতি নিয়ে তাকে দক্ষিণা দেবে। ব্রহ্মচর্যের পর ব্রাহ্মণ গৃহস্থ হতে চাইলে গার্হস্থ্য শ্রম পালন করবে। এরপর সে নিজের ইচ্ছেমতো যে কোনো আশ্রম অবলম্বন করতে পারে, বা গুরুর গৃহে তার সেবা করেই জীবন কাটাতে পারে।

কিন্তু গুরু কন্যার নিকট বাস করা উচিত নয়। মনের সব অহংকার ত্যাগ করে গুরুর সেবায় নিযুক্ত থেকে তার সেবা করলে ব্রাহ্মণ মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে।

গুরুগৃহ থেকে ফিরে গার্হস্থ্যশ্রমে প্রবেশ করতে হলে কোন সগোত্র কন্যাকে বিবাহ করতে পারে। নিজ বর্ণের উপযোগী পেশা অবলম্বন করে ধন উপার্জন করবে। সদাচারী ব্রাহ্মণ পিতামাতা, দেবতা ও অতিথিদের খুশি করবার চেষ্টা করবে এই ধন দিয়ে। এরপর সুকেশী এই সদাচারের লক্ষণ জানতে চাইলেন।

ঋষিরা এরপর সুকেশীর কৌতূহল নিবারণের ইচ্ছায় সদাচারের লক্ষণগুলি তাকে বললেন। গৃহস্থ ব্যক্তির সদাচার পালন করা উচিত। যে গৃহস্থর আচরণ মানে না তার ইহকাল, পরকাল মঙ্গল হয় না। যে যজ্ঞ, দান কিংবা তপস্যার লঙ্ঘন করে স্বেচ্ছাচারে বশবর্তী হয় তার কল্যাণ হয় না। এরা ইহকাল ও পরকালে সুখ শান্তি পায় না।

সুতরাং পুণ্যলাভ করার জন্য সর্বদা সদাচার স্বরূপ শুনতে বললেন। সদাচার গাছের মতো যার মূল হল ধর্ম, ধড় হল শাখা-প্রশাখা, কামনা ফুল ও মোক্ষ হল তার ফল। যে এই গাছের পরিচর‍্যা করে সে পুণ্য অর্জন করে, অতিপ্রত্যুষে উঠে দেবতা ও মুনি ঋষিদের স্মরণ করবে।

দেবাদিদেব শিব মঙ্গল গাথার মতই প্রাতঃকালীন মঙ্গল গাথা গাইবে। সুকেশী জানতে চান মানুষের পাপের মুক্তি লাভের কোনো প্রভাত গাথা কি মাহাত্ম গেয়েছেন।

ঋষিরা বললেন, এই গীত শুনলে বা মনে মনে জপ করলে সমস্ত পাপ দূর হয়। শৃঙ্গারের এই প্রভাত গাথা ব্রহ্মা কৃষ্ণ ও শিব, সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি গ্রহ সবাই আমার সুপ্রভাত বিধান করুন।

ভৃগু, বশিষ্ট, ক্রতু, আঙ্গিরা, পুলস্ত্য পুলহ গৌতম রৈভ্য, মরীচি, চ্যবন এবং রিভু সবাই আমার প্রভাতকালীন মঙ্গলসাধন করুন।

সনৎ কুমার জনক সনন্দন সনাতন, সসুরি পিঙ্গল, সপ্তস্বর ও সপ্ত রসাতল, ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম, রস গন্ধ স্পর্শ শব্দ ও মহান সকলেই আমার প্রভাতকালীন মঙ্গল বিধাতা হোন। সপ্তসাগর সপ্তকুলাচল সপ্তঋষি, সপ্তদ্বীপ এবং সপ্তলোক সকলেই তাঁর প্রাতঃকাল মঙ্গলময় করে তুলুন।

এভাবে ঈশ্বরের কৃপায় সুপ্রভাত নিশ্চয় হয়। প্রাতঃকালে ভক্তিভরে এই পরম পবিত্র প্রভাতগাথা পাঠ করবে। ধর্ম ও অর্থ বিষয়ের চিন্তা না করে, হরিকে স্মরণ করবে। এরপর মলমূত্র পরিত্যাগ করার জন্য ঘরের বাইরে যাবে। কখনো গোচরে পশ্চিম ও পূর্বদিকে দেবালয়ে গরু, ব্রাহ্মণ বা আগুনের কাছে, রাজপথে চৌরাস্তায় মলত্যাগ করবে না।

তারপর শৌচক্রিয়া করার জন্য হাতে মাটি নিয়ে মলদ্বারে তিনবার, হাতের তালুতে দশবার, দুই পায়ে সাতবার ও লিঙ্গে একবার লেপন করতে হবে। এই মাটি ইঁদুরের গর্ত থেকে নেওয়া ঠিক নয়। অপরের ব্যবহৃত মাটি বা উই মাটি কখনও নেওয়া উচিত নয়। কিছু শুদ্ধ করবার জন্য অভিষ্ট ব্যক্তি প্রথমে পা ভালো করে ধুয়ে পূর্বদিকে মুখ করে মাটিতে বসবে।

তারপর তিনবার মুখ ধুয়ে পরিষ্কার জলে আমচন করবে এবং হাত দিয়ে ক্রমে ক্রমে কান মাথা টিকি ধুয়ে সন্ধ্যাপসনা করবে।

দেবতা ও পিতৃ পুরুষদের পূজা করতে হয়, চুল আঁচড়ানো, দাঁতমাজা, আয়নায় মুখ দেখা, অবগাহন স্নান শেষ করে কাজের জন্য ঘরের বাইরে বেরোতে হয়, হোম শেষ করে শরীরে মঙ্গলসূচক তিলক চিহ্নাদি ধারণ করে।

কোথাও যাবার সময় দুর্বাঘাস, দই, ঘি, জলভরা কলসী, বাছুর সমেত গাই, ষাঁড়, সোনা, মাটি, গোবর, ব্রজচিহ্ন, ধান, খই, মধু, ব্রাহ্মণ-কন্যা, সুন্দর সাদা ফুল, জ্বলন্ত আগুন, চন্দন সূর্যের দ্বারা অশ্বত্থ গাছ দেখলে মঙ্গল হয়।

নিজ ধর্ম ও পেশা অনুযায়ী নিজের দেশ, বংশ ও গোত্র অনুযায়ী যে ধর্মাচার চালু আছে তা পরিত্যাগ করতে নেই বরং এগুলি গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলা উচিত। এগুলি মেনেই রোজগারের চেষ্টা করা উচিত। অসৎ উপায়ে মিথ্যা বলে রোজগার করা উচিত নয়। বেদ ও শাস্ত্রের অননুমোদিত কোনো নিষ্ঠুর কথা কাউকে বলা উচিত নয়।

সজ্জন লোকের কাছে নিন্দনীয় হতে হয় এমন আচরণ কখনই করণীয় নয়। কখনও ধর্ম লঙ্ঘন করা উচিত নয় বা অসৎদের সাথে মেলামেশা করা উচিত নয়। সন্ধ্যা বা দিনেরবেলা রতিক্রীড়া করা উচিত নয়। পরনারীর দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেবে না, স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো রমণীতে গমন করবে না,রজঃস্বলা নারীর সাথে মিলিত হবে না।

জলের মধ্যে মৈথুন করা নিষিদ্ধ। বৃথা ভ্রমণ, বৃথা দান, বৃথা পশুহত্যা বা বৃথা বিবাহ করা গৃহস্থের পক্ষে ঠিক নয়। বৃথা ভ্রমণে দেহের ক্ষতি হয়। অন্য স্ত্রী ও অন্যের ধর্মের প্রতি সচ্চরিত্ররা কুনজর দেবে না। অন্যের ধন হরণ করা নরকের হেতু। অন্যের পত্নীর দিকে কামার্ত দৃষ্টি দেওয়া হল মৃত্যুর কারণ।

নগ্ন পরস্ত্রীকে দেখবে না। চোরের সাথে কোনো কথা বলবে না। ঋতুমতী নারীকে দেখা বা তার ছোঁয়া ও কথা বলা অনুচিত। পরনারী, নিজ বোন, কন্যা কিংবা বিমাতার সাথে একাসনে বসা অবৈধ। নগ্ন হয়ে কখন স্নান করা বা শুয়ে বা ঘুরে বেড়াতে নেই।

আসন বা বিছানা ছিঁড়লে বা পাত্র ভেঙ্গে গেলে বিশুদ্ধর জন্য পরিত্যাগ করবে। নন্দা তিথিতে গায়ে তেল মাখা, রিক্ততে ক্ষৌর কর্ম, চুল, দাড়ি, নখ, কঠিন এবং জয়ী তিথিতে মাংস পরিত্যাগ করা কর্তব্য।

পূর্ণাতে নারী সঙ্গ পরিত্যাগ করা উচিত। এই নিষিদ্ধ কর্ম সবই ভদ্র তিথিকে করা উচিত। রবি ও মঙ্গলবার গায়ে তেল মাখা, শুক্রবারে ক্ষৌরকর্ম, শনিবারে মাংস খাওয়া এবং বুধে নারী সঙ্গমে অবৈধ। বাকি দিনে অবৈধ নয়। তেল চিত্রা হস্তা, শ্রবণাতে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ

। বিশাখা, অভিজিৎ নক্ষত্রে ক্ষৌরকর্ম এবং মূলা ও মৃগশিরা ও ভাদ্র পদে মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। স্ত্রী সঙ্গম করতে নেই সখ বৃন্তিকা ও উত্তরাদি নক্ষত্রে।

উত্তর ও পশ্চিম মুখে শয়ন করতে নেই। দক্ষিণ-পশ্চিমে মুখ করে করতে নেই। মন্দির শ্মশান, গাছ, চৌরাস্তা বা গুরুজনকে প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করতে হয়।

অভিষ্ট ব্যক্তি অপর কারো মালা, খাবার, কাপড় ব্যবহার করবে না। প্রত্যহ মাথা ডুবিয়ে স্নান করা উচিত, কিন্তু গভীর রাতে উচিত নয়। নিষিদ্ধকালে স্নানের ব্যাপারে কোনো বাধা নেই যদি গ্রহণ উপস্থিত হয় বা আত্মীয় মৃত্যু ঘটে তেল মেখে কাউকে স্পর্শ করতে নেই। স্নানের পর চুল ঝাড়তে নেই।

গা খালি হাতে মুছতে নেই। সেই দেশেই বাস করা উচিত যে দেশের রাজা প্রজাবৎসল ও জনগণ সবসময় ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ। যে দেশে লোকেদের অতি ক্রোধ বা পরশ্রীকাতরতা নেই, যে দেশের অধিবাসীরা ন্যায় পথে থাকে, সেখানে কৃষিকাজে নিপুণ ব্যক্তিরা বাস করে এবং ধান, গম সহজলভ্য সেখানে বাস করা উচিত।

এবং ধনবান ও বেদান্ত ও ব্রাহ্মণের স্থানে যেখানে বিশুদ্ধ জল ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সুব্যবস্থা আছে সেখানে বাস করা উচিত। যে দেশের শাসক প্রজাপালনে বা সুবিচারে অক্ষম, অথচ শাস্তি বিধানে উদ্যত, সেখানে মানুষের মধ্যে সদ্ভাব নেই, একে অপরের ক্ষতিসাধনে সচেষ্ট, সেখানে বাস করা উচিত নয়। ধর্মপরায়ণ লোকের এই সকল কাজ করা উচিত।

তিনি খাদ্য সম্পর্কে বললেন–স্নেহ জাতীয় সুপক্ক, তৈলঘৃত খাবার খাওয়া উচিত; স্নেহজাতীর পদার্থহীন আতপচাল, দই খরগোশ, শজারু গোসাপ, মাছ, কচ্ছপ, কলাই, ডাল খাওয়া উচিত।

মণি, বস্ত্র, প্রবাল, মুক্তফল, পাথর, কাঠের তৈরি জিনিস, মাংস, মূল ওষধি কুলা এবং স্থূপীকৃত ধান, কাপড় ও গাছের ছাল জল দিয়ে শুদ্ধ করা যায়। কার্পাস জলে ধুলে শুদ্ধ হয়। হাতির দাঁত, হাড় বেঁধা দিয়ে চঁছলেই বিশুদ্ধ হয়।

মাটির পাত্র আগুনে পুড়লে বিশুদ্ধ হয়। পবিত্র জিনিস হল অনেক দিনের আনা জিনিস হল রন্ধন শেষের পরের রন্ধনশালা স্তন্যপায়ী শিশু, রমণী ও পূজনীয় ব্রাহ্মণের মুখের থুথু ও গরম জলকণা।

মাটি বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে খুঁড়লে, আগুনে পোড়ালে বা ধোয়া মোছা করলে, এমনকি জমিতে গরু চরলে, গৃহ পবিত্র হয় লেপা মোছা করলে, জল দিয়ে ধুলে বা ঝাট দিলে। ভাতে যদি পোকা পড়ে মুখ দেয়, মাছি বসে তবে মাটি, নুন বা জল দিয়ে শুদ্ধ করা হবে।

তামার পাত্র তেঁতুল দিয়ে, দস্তা বা টিন ও সীসার পাত্র ক্ষারে ও কাঁসা ছাই ও জলে বিশুদ্ধ হয়। কোনো বস্তুর নোংরা মাটি ও জল দিয়ে বিশুদ্ধ করা যায় ও দুর্গন্ধ দূর করা যায়, পুত্ৰ শুচি হয় মাতার অঙ্গ থেকে অবিচ্ছিন্নকারে ঘাম পড়লে। পাখিরা শুচি হয় শাবক প্রসব করলে।

রাস্তা, কাদা জল করা রাস্তার ঘাস এবং ইটের পাকাবাড়ি বাতাসের সংস্পর্শে বিশুদ্ধ হয়। তাতে নোংরা পড়লে ওপরের অংশ ফেলে জল ছিটিয়ে দিলে তা শুদ্ধ হয়ে যায়।

না জেনে অশুদ্ধ ভাত খেলে তিন রাত উপবাস করবে। জেনে খেলে শুদ্ধি ঘটবে না। শববাহন ব্যক্তি রজঃস্বলা নারী ও সূতিকাস্ত্রীকে স্পর্শ করলে স্নান করতে হয়। রস লাগা বস্তু স্পর্শ করলে কাপড় পড়া অবস্থায় স্নান করতে হয়। শুকনো হাড় স্পর্শ করলে আয়েন, গরু স্পর্শ করলে এবং সূর্য দর্পণ করলে শুদ্ধ হওয়া যায়।

রক্ত বা মল ডিঙানো উচিত নয়। উচ্ছিষ্ট ফল, মূত্র পাড়ালে ভালোভাবে পা ধোওয়া উচিত। পরের জলাশয়ে পঞ্চত্ব পিণ্ড দান না করে স্নান করা উচিত নয়।

প্রজ্ঞদের বিকেলে বাগানে বেড়াতে নেই। নিন্দিত চরিত্রের লোক ও রমণীর সাথে কথা বলতে নেই, যারা দেবতা, পিতৃপুরুষ ধর্মশাস্ত্র ও যাগযজ্ঞাদির নিন্দা করে তাদের স্পর্শ করলে সূর্যদর্শন করার পর পবিত্র হওয়া যায়। সতিফ, ষণ্ড, ঝিল ইঁদুর, কুকুই ও চণ্ডাল ও নগ্ন জাতিদের অন্ন ভোজন নিষিদ্ধ।

বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

সুকেশী এবার সূতিকাদের লক্ষণ সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। ঋষির কথায় ব্রাহ্মণী ও ব্রাহ্মণ যখন শেষত্ব প্রাপ্ত হন তখন তারা সূতিকা ভোজন করে তাদের অন্ন নিষিদ্ধ হয়।

ষণ্ড নামে আহিত হয় তারা যার যথা সময়ে রনান, দান ও পূজার্চনা করে না। মার্জার নামে অভিহিত হয় তারা যারা দম্ভবশে জপ তপস্যা ও শাস্ত্র পড়াশোনা করে আখু হলেন। যে ব্যক্তি প্রচুর ধন সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নিজে ভোগ করে না অন্যকে দান করে না, যাগযজ্ঞাদিও করে না, এদের দেওয়া খাবার খেতে নেই।

খেলেও বিশুদ্ধির জন্য কঠোর চান্দ্রায়ন করতে হয়। কুকুট বলা হয় তাকে যে সভ্যদের মধ্যে পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হয়।

এদের অন্ন গ্রহণ করতে নেই। পতিত ব্যক্তি হল যে বিপদ আপদের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও যে নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে পরের ধর্ম গ্রহণ করে, যে দেবতা পিতামাতা ও গুরুকে পরিত্যাগ করে, যে গরু স্ত্রী ও ব্রাহ্মণ বধ করে তাকে তপবিক্ষ বলা যায়। নগ্ন নামে অভিহিত তারা যারা বেদচর্চা শাস্ত্র পাঠ ও ধর্মীয় বিভিন্ন ব্রতপালন করে না।

এদের অন্নও গ্রহণযোগ্য নয়। যারা দানের আশা নিয়েও দান করে না বা দাতাকে দানে নিষেধ করে এবং শরণাগতকে ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে, তারা অতি নরাধাম চণ্ডাল।

কুন্তাশী বলা হয় তাদেরকে যারা, বন্ধু-বান্ধব, ব্রাহ্মণ ও সৎলোকের সম্পর্ক ত্যাগ করে। এদের দেওয়া খাবার খেলে চান্দ্রায়ন করতে হয়। যে ব্যক্তি এই আচরণ পালন করেন, তাদের অন্ন খেলে তিন রাত উপবাস করতে হয়। এবং শুদ্ধিলাভ করা যায়।

জন্ম ও মৃত্যুজনিত অশৌচের জন্য নৈমিত্তিক কার্য পালন বন্ধ করতে নেই। ভৃগুর মতে পিতা সেই কাপড়েই স্নান করতে হয় পুত্র জন্মাবার সাথে সাথেই। কেউ মারা গেলেও মৃত ব্যক্তির বন্ধুদের স্নান করা কর্তব্য। মৃতের জ্ঞাতিরা মৃতদেহকে গ্রামের বাইরে দাহ করে তার উদ্দেশ্যে জলদান করে।

মৃত্যুর সপিণ্ডগণ অশুচি থাকবেন, জল দান করে প্রেত ক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। বিষ খেয়ে, গলায় দড়ি দিয়ে, অস্ত্রাঘাতে, আগুনে পুড়ে কিংবা পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে কারো মৃত্যু ঘটলে বা অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে অথবা অন্য দেশে গিয়ে মরলে সপিণ্ডদের সদ্য শৌচ হবে। ইহা চার প্রকারের।

অশৌচও এই প্রকার হয়। পূর্ণকালে মৃত্যু হলে অশৌচ বিধি স্বতন্ত্র, ব্রাহ্মণের একদিন ও রাত্রি, ক্ষত্রিয়ের তিন দিন ও বৈশ্যের ছয় দিন এবং শূদ্রের বারো দিন। ব্রাহ্মণদের পূর্ণ শৌচ ভিন্ন ভিন্ন। ব্রাহ্মণদের দশ, ক্ষত্রিয়ের বারো, বৈশ্যের পনেরো দিন ও শূদ্রের এক মাস।

সকল বর্ণের লোক নিজ নিজ বর্ণের উপযোগী কাজের অধিকারী হয় এবং নিয়মে অশৌচ পালন করলে, অশৌচের শেষে প্রেতের উদ্দেশ্যে যথাবিধি একোদ্দিষ্ট বা সংবাৎসারিক শ্রাদ্ধ করবে।

এরপর প্রেতের সপিণ্ডীকরণ করতে হয়। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার দিন বেদানুসারে তৃপ্তিবিধান করা উচিত, প্রেতেত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে পিতৃত্ব প্রাপ্ত হলে। পিতার উদ্দেশ্যে ভূমি ও ধনসম্পত্তি দান করে নিজে শ্রাদ্ধ করবে। এই শ্রাদ্ধ করার ফলে সন্তুষ্ট হয়ে পিতৃপুরুষেরা পিতৃলোকে গমন করে।

ঘরের যাবতীয় প্রিয় বস্তু অক্ষয় ফলোভের প্রত্যাশায় পিতার উদ্দেশে গুণবান ব্রাহ্মণকে দান করতে হয়। তিনটি বেদ প্রতিদিন পড়তে হয় প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে। নিজের সাধ্যমতো যাগযজ্ঞ করবে, ধর্মপথে ধনসম্পত্তি রোজগার করে। এরূপ কাজ সকল লোকের করা উচিত যা বিদিত নয়।

সাধুগণে করণীয় কাজ নির্দ্বিধায় অনুসরণ করা উচিত, ইহকাল ও পরকালে ধর্ম অর্থ কাম লাভ করবে যদি কোনো ব্যক্তি সৎগৃহস্থাশ্রমে এই সব সদাচর পালন করে। এরপর ঋষি বানপ্রস্থ আশ্রম সম্পর্কে বলবে ঠিক করলেন।

নিজের আত্মবুদ্ধির জন্য তিনি বানপ্রস্থ নামক আশ্রম অবলম্বন করবেন। যখন গৃহস্থ দেখবেন যে তাঁর পুত্র পৌত্র হয়েও নিজের শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

এই আশ্রমে আসার দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা করবেন। ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করবেন, মাটিতে শোবেন, পিতৃদেব ও অতিথিদের সেবাশুশ্রূষা করবেন, ত্রিসন্ধ্যা স্নান, জটা, বল্কল ধারণ ও হোম করবেন এবং বনজাত বস্তু উপভোগ করবেন।

এই বিধি অনুসারে আশ্রমের বাইরের লোকের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হবে। ব্রহ্মচর্যে নিরহংকার ও ইন্দ্রিয় জয় একান্ত কর্তব্য। এক জায়গায় দীর্ঘদিন বাস করবে না। এই আশ্রমে ভিক্ষার অন্নে জীবনধারণ করতে হবে।

রাগী হবে না এবং আত্মজ্ঞান ও তত্ত্বজ্ঞান লাভের চেষ্টা করবে। এইভাবে চতুরাশ্রম ব্রাহ্মণকে অবলম্বন করতে হবে। এবার পুলস্ত্য ঋষি বিভিন্ন বর্ণের ধর্ম সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন।

ক্ষত্রিয়ের পক্ষে বিহিত গার্হস্থ্য, ব্রহ্মচর্য ও বানপ্রস্থ আশ্রম। কেউ নিজের বর্ণাশ্রম ধর্ম পরিত্যাগ করবে না। দেবী সরস্বতী অন্তরে দুঃখ পান যদি কোনো ব্রাহ্মণ স্বধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন। এই ক্রোধের ফলে ধর্মত্যাগীর বংশনাশ হয় এবং তাঁর শরীর ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে পড়ে।

তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা সূর্যদেব সর্বদাই করেন। সুতরাং কখনই স্বধর্ম ত্যাগ করা যাবে না। কারণ ধর্ম ত্যাগ করার অর্থ নিজ বংশনাশের পথ প্রশস্ত করে দেওয়া। সূর্যদেব দারুণ ভাবে অসন্তুষ্ট হয় স্বধর্ম ত্যাগীর প্রতি। এই সকল তথ্য শোনার পর সুকেশী তাদের প্রণাম করে আকাশপথে নিজ নগরে চলে গেলেন।

১৫

পুলস্ত্য আবার বলতে শুরু করলেন, যে সুকেশী নিজের নগরের সমস্ত রাক্ষসদের এক স্থানে ডেকে তাদের জানালেন মুনিরা তাকে বলেছেন অহিংসা, সত্য, চুরি না করা, সূচি পালন করা। ইন্দ্রিয় সংযম, দান, দয়া, ক্ষমা, ব্রহ্মচর্য নিরহংকার সত্য ও মধুর বাক্য, নিত্য সৎকার্যের অনুষ্ঠান ও সদাচার পালন–সবই পরলৌকিক মঙ্গলজনক ও পুরাতন পরম ধর্ম।

তিনি রাক্ষসদের এই সব ধর্ম মেনে চলার আদেশ দিলেন। পুলস্ত্য জানালেন, এরপর সুকেশীর আজ্ঞায় রাক্ষসরা সবাই সানন্দে ত্রয়োদশী তিথিতে এই ধর্ম গ্রহণ করল। এই ধর্মাচরণের জন্য তারা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠল। রাক্ষস পুত্র ও পৌত্ররা এইসব ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হল। তারা সকলে সদাচার পালন করতে লাগল।

ধর্মাচারণের ফলে রাক্ষসরা অপূর্ব তেজ ধারণ করল, তাদের তেজস্বীতায় সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাশির তেজ কিছুটা কমে গেল। এই সময় রাক্ষস নগরী দিনেরবেলা সূর্যসম দিনে চন্দ্রসম শোভা পেতে লাগল। এইসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটল ত্রিভুবনে। সূর্যের গতি তখন কেউ উপলব্ধি করতে পারল না।

চন্দ্র বলে সকলে ভুল করল চন্দ্রের মতো আলোকিত, রাক্ষস নগরী দেখে স্বয়ং সূর্য দেবও এই উজ্জ্বল নগরী দেখে রাত ভেবে আর উদিত হলেন না। কখন আবার পদ্মও সূর্যোদয় হয়েছে মনে করে রাত্রেই দিনকে রাত মনে করে ভুলে বেরিয়ে কাকেঁদের তাড়া খেতে লাগল।

কখনো রাতকে দিন বলে ভুল করে তাপসরা স্নান করতে নদীতে এলেন এবং গলা পর্যন্ত জলে ডুবে জপ করতে লাগলেন।

রাক্ষস নগরী দেখে চক্রবাক চক্রবাকী আর বিরহ ব্যথা ভোগ করল না। তারা রাতকে দিন মনে করে পরস্পর উচ্চৈঃস্বরে এই রূপ বলাবলি করতে লাগল–নিশ্চয়ই কোনো চক্রবাক প্রিয়বিরহে কাতরভাবে কাঁদতে কাঁদতে নদীর তীরে প্রাণ ত্যাগ করেছে। তাই দয়া করে সূর্যদেব নিজের অস্ত যাওয়া স্থগিত রেখে তীব্র কিরণে জগৎকে উত্তপ্ত করে রেখেছেন।

আবার কিছু চক্রবাক ও চক্রবাকী আলোচনা করল, নিশ্চয়ই কোনো বিরহকাতর চক্রবাক মারা গেছে, তাই তার প্রিয়া চক্রবাকী প্রিয়তমের শোকে কাতর হয়ে অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেছে।

সেজন্যে সূর্যদেব সাধকের সাধ পূরণ করার জন্যে চন্দ্রকে জয় করে নিজেই আজ বিরাজ করছেন, তিনি আর অস্ত যাবেন না, এইভাবে রাতকে দিন বলে ভুল করে যজ্ঞস্থানে গিয়ে যজ্ঞ করার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন যাজ্ঞিকেরা।

বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও শিবের উপাসকরা ভক্তিভরে নিজেদের অভীষ্ট দেবতাদের দিন-রাতই পূজা করতে লাগলেন। রাত্রিকে দিন করে সবসময় জ্যোৎস্না আলোকিত করে রাখার জন্যে কামুকরা চন্দ্রদেবকে ধন্যবাদ দিলেন।

অন্যেরা বলতে লাগলেন, আমরা শ্রাবণ থেকে চারমাস পর্যন্ত অশুশয়ন নামে দ্বাদশী তিথিতে লক্ষ্মী ও নারায়ণকে সুন্দর সুগন্ধ, কুসুমাঞ্জলি দিয়ে ভক্তি ভরে পূজা করেছি, তাই ভগবান সন্তুষ্ট হয়ে রাত্রে তাদের এই উত্তম অশূন্যশয়ন দান করেছেন।

আবার কেউ বলতে লাগল কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্রদেবের শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যেতে দেখে চন্দ্র প্রণয়িনী রোহিণী অক্ষয় অষ্টমী তিথিতে বেদবিধিমতে রুদ্রের জন্যে ঘোরতর তপস্যা করেন, এই তপস্যায় তুষ্ট হয়ে রোহিণীকে রুদ্র বর দিয়েছেন। তাই আকাশে চন্দ্রদেব অক্ষয় হয়ে শোভা পাচ্ছেন।

আবার অনেকে বললেন–চন্দ্রদেব অখণ্ড ব্রতের হরির আরাধনা করেছেন তাই তিনি অখণ্ড রূপে সমস্ত আকাশ উদ্ভাসিত করে বিরাজ করছেন। কেউ বলেন।

অমিত পরাক্রমশালী বিষ্ণুর পূজা করে নিশ্চয়ই চন্দ্রদেব আত্মরক্ষা করেছেন, তাই সূর্যের দীপ্তিতে স্নান করে দিনেরবেলা সূর্যের মতো কিরণচ্ছটায় চারদিক আলোকিত করে আকাশে শোভা পাচ্ছেন।

এরূপ বিভিন্ন কারণে পরিষ্কার হয়ে গেল যে সূর্যের তেজ চন্দ্রদেবের কাছে অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে। সত্যি সূর্যোদয় হয়েছে বলে আবার সরোবরে পদ্ম ফুটে উঠল, ভ্রমরেরা সেখানে গুন গুন রবে উড়ে বেড়াতে লাগল এবং পদ্মদলের সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেল।

কেউ মনে করল যে, সরোবরে যেহেতু শালুক ফুল ফুটেছে আকাশে তখন শোভা বিস্তার করেছেন চন্দ্রদেব। এই ভাবে জল্পনা কল্পনা করতে লাগল।

সূর্যদেব মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এসব কি হচ্ছে? ভগবান ভাস্কর এরূপ চিন্তা করলেন ধ্যানস্থ হয়ে ত্রিভুবনে রাক্ষসরা আধিপত্য করছে। তাঁর কাছে তাদেরই অসাধারণ শ্রীবৃদ্ধির কারণ।

তিনি বুঝলেন রাক্ষসেরা ধর্মপরায়ণ ও সদাচারী হয়ে উঠেছে। ভক্তি করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের পূজা করতে আরম্ভ করেছে। তখন তিনি ভাবলেন, কিভাবে আকাশ থেকে তাদের আধিপত্য নষ্ট করা যায়, কিভাবে তাদের ক্ষতি করা যায়। বহু চিন্তার পর তিনি চিন্তা করলেন ব্রাহ্মণরা স্বধর্ম ত্যাগ করে পর ধর্ম গ্রহণ করেছে।

সুতরাং এই অপরাধে তাদের ধর্মকর্ম সব ব্যর্থ হয়েছে। এই অধর্মের কথা ভেবে দিবাকর ক্রোধে রক্তচক্ষু হয়ে তাদের নগরীর দিকে তাকালেন। রাক্ষস নগরী তখন আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে গেল যেমন আকাশ থেকে জ্যোতিষ্ক খসে পড়ে, সুকেশী উচ্চৈঃ স্বরে শিবকে ডাকতে লাগলেন নগরের এই অবস্থা দেখে।

আকাশের বিচরণকারী চারণরা সুকেশীর কান্না শুনে বলতে লাগল–হায় হায়, শিব ভক্তির একি বিপর্যয় ঘটল। ভগবান শঙ্কর ভাবলেন, কে এই রাক্ষস পুরীকে মাটিতে ফেলে দিল। তিনি জ্ঞাত হলেন সূর্যদেব ছাড়া একাজ অন্য কারো নয়।

তখন মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে সূর্যদেবের দিকে ছুটে গেলেন এবং তাঁর দিকে তাকানোর সাথে সাথে সূর্যদেব মাটিতে খসে পড়লেন।

১৬

নিজের ভারসাম্য হারিয়ে বাতাসে ভাসতে ভাসতে পলাশের মতো অত্যুজ্জ্বল লাল রূপ ধারণ করে কিন্নরদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে সূর্যদেব অন্তরীণ থেকে ভূতলে পতিত হলেন। বানরদের দ্বারা পরিবৃত তালগাছ থেকে খসে পড়া আধপাকা তালের মতো দেখাচ্ছিল কিরণছটা যুক্ত পরিবৃত সূর্যদেবকে।

এই সময় ভূতল থেকে রব উঠল–সূর্যদেব যদি মঙ্গল চাও, তবে হরিক্ষেত্রে গিয়ে পতিত হও। সূর্যদেব তখন মুনি ঋষিদের কাছে জানতে চাইলেন–হরিক্ষেত্র কোথায়? যোগশায়ী থেকে কেশব্দর্শন পর্যন্ত সমস্ত স্থানই হল পবিত্র হরিক্ষেত্র। শঙ্করের অধিষ্ঠিত স্থানই বর্তমানে হরিক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর নাম বারাণসী পুরী। বরুণা ও অসি নদীর মাঝখানে গিয়ে পতিত হলেন সূর্যদেব।

তারপর তিনি এই দুই নদীতে স্নান করতে লাগলেন। শঙ্করের কোপে সূর্যদেব যেভাবে দগ্ধ হচ্ছিলেন তা থেকে কোনোরূপেই তিনি স্বস্তিলাভ করতে পারলেন না। তিনি ঘুরতে লাগলেন জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে। এখন ঋষি, যক্ষ, রাক্ষস, নাগ, বিদ্যাধরী অপ্সরা এবং সূর্যের রথের যাবতীয় ভূতপ্রেত সবাই একযোগে এ খবর জানানোর জন্য ব্রহ্মার কাছে গেল।

দেবতাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ব্রহ্মা দেবতাদের সাথে নিয়ে শঙ্করের আবাসস্থল মন্দার পর্বতে হাজির হলেন। সেখানে মহাত্মা শৃঙ্গরের সাক্ষাৎ পেলেন। শঙ্কর প্রসন্ন হলেন ব্রহ্মার স্তবস্তুতি যুক্ত অনুরোধে।

বারাণসী ধামে ব্রহ্মা তখন তাকে নিয়ে সূর্যকে ওই অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য গেলেন। শঙ্কর সূর্যকে হাত দিয়ে ধরে নিয়ে তাকে লোল নামে অভিহিত করলেন এবং নিজের রথে তুলে নিলেন।

তাঁর নগরকে পুনর্বার আকাশপথে স্থাপিত বন্ধু-বান্ধবকে সুকেশী এভাবে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপিত হবার পর শৃঙ্গার ব্রহ্মাকে আলিঙ্গন করে ও বিষ্ণুকে প্রণাম করে নিজধামে চলে গেলেন।

প্রাচীনকালে ভাস্কর এই রূপেই সুকেশীর বাসস্থান অন্তরীক্ষ থেকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন এবং তার পরিণামেই ভাস্করকে শৃঙ্গারের কোপে দগ্ধ হয়ে ভূপতিত হতে হয়। আবার সূর্যকে যথাস্থানে স্থাপন করেন এবং ব্রহ্মাণ্ড সুকেশী ও তার বাসস্থানকে পুনরায় অন্তরীক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন।

নারদ পুলস্ত্যকে জানালেন যে, রাক্ষস সুকেশীর নগরের জাজ্বল্যমান সৌন্দর্য দেখে ভোগবিলাসীরা এরূপ জল্পনা-কল্পনা করত যে, চন্দ্রদেব নিশ্চয়ই ভক্তিভরে বিষ্ণু ও শিবের আরাধনা করে ও তাঁদের সন্তুষ্ট করে সূর্যের ন্যায় কিরণচ্ছটায় সমস্ত আকাশ উদ্ভাসিত করছেন।

পুনরায় সবিস্তারে সব শুনতে চাইলেন। পুলস্ত্য নারদকে বিষ্ণু ও শিবের আরাধনার কথা ও পুণ্যব্রতের বিশদ বিবরণ দিয়ে দেবাদিদেব বিষ্ণু নাগশয্যায় শয়ন করেন যখন সূর্য, উত্তরায়ণ থেকে আষাঢ়ী পূর্ণিমায় যান। তার শয়নের পর ক্রমান্বয়ে গন্ধর্বরা গুহ্যরা ও দেবমাতারা শয়ন করে থাকেন।

এরপর নারদ দেবতাদের শয়নবিধি এবং বিষ্ণুর শয়নবিধি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পুলস্ত্যর বললেন, সূর্য শুক্লাপক্ষীয় একাদশীতে যখন মিথুনরাশির অভিমুখী হয় তখন ভগবান পরমেশ্বর শয়ন করেন।

ভগবান বিষ্ণুকে অনন্ত ভোগশয্যায় শয়ন করাতে হয় দ্বাদশী দিনে। বিষ্ণু ও ব্রাহ্মণদের পবিত্র ভাবে ও ভক্তিভরে পূজা করতে হয় ব্রাহ্মণদের অনুমতি নিয়ে।

কামদেব শয়ন করেন ত্রয়োদশীর দিন। তার শয়ন কদমফুলের মতো সুগন্ধী ও সুকোমল শয্যায়। মহাদেব স্বর্ণ পদ্মের সুখশীতল শয্যায় শয়ন করেন পূর্ণিমার দিন।

তাঁর মাথায় জটা তখন চামড় দিয়ে বেঁধে রাখেন ও তাঁর শয্যা বাঘছালে ঢাকা থাকে। এরপর সূর্য কর্কট রাশিতে যান। দক্ষিণায়ণ আরম্ভ হয়। এই সময় হল দেবতাদের রাত্রিকাল। এই সময় প্রতিপদ তিথিতে জগতের পথপ্রদর্শক ব্রহ্মা নীল পদ্মময় শয্যায় শয়ন করেন।

এরপর থেকে দ্বিতীয়ায় বিশ্বকর্মা, তৃতীয়ায় হিমালয় কন্যা উমা, চতুর্থীতে বিনায়ক পঞ্চমীতে ধর্মরাজ, ষষ্ঠীতে স্কন্দ, সপ্তমীতে ভাস্কর, অষ্টমীতে কাত্যায়নী, নবমীতে কমল, দশমীতে বায়ুভুক সর্পগণ এবং কৃষ্ণা একাদশীতে সাধুগণ শয়ন করেন। এই হল দেবতাদের শয়ন বিধি।

এরপর শুরু হয় বর্ষাকাল। এই সময় পাহাড়ে আশ্রয় নেয় বকরা, কাকেরা বাসা তৈরি করে এবং স্ত্রীরা গর্ভভারে অলস হয়ে শুয়ে থাকে। অতি পুণ্যজনক তিথি হল বিশ্বকর্মার শয়নকারী দ্বিতীয়া তিথি। গন্ধপুষ্প দিয়ে লক্ষ্মী-নারায়ণকে ভক্তিভরে এই পুণ্য তিথিতে পূজা করতে হয়।

তারপর সুপক্ক ফল নিবেদন করে বিষ্ণুর শয্যায় সেগুলো রেখে বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা জানাতে হবে, তার সাথে লক্ষ্মীর কখনো যেন বিচ্ছেদ না ঘটে, তাঁর আশিষে যেন তাঁদের শয়নও অশুণ্য হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে যেন কোনো বিচ্ছেদ না আসে।

লক্ষ্মী যেমন তোমার দ্বারা, অশুন্য শয়ন যেন গার্হস্থ্য জীবনে কোনো ক্ষতি না করে, বিষ্ণুর কাছে বারবার মিনতি জানিয়ে তেল ও লবণ ছাড়া খাবার খাবে রাত্রিবেলা।

শাস্ত্রেও ব্রাহ্মণকে ফল দান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় দিনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি লক্ষ্মীপতি বিষ্ণু আমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন এই বলে ফল নিবেদন করবে।

এরূপ বিধানে চাতুর্মাস্য ব্রতের অনুষ্ঠান করতে হয় যে পর্যন্ত সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করে। তারপর ক্রমে ক্রমে দেবতারা জেগে ওঠেন। সে সময় দ্বিতীয়া তিথিতে বিষ্ণুর মূর্তি, শয্যা প্রভৃতি নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দান করে। এই প্রকারে ঋষি পুলস্ত্য ব্রতবিবরণ দিলেন। এই ব্রতপালনে কারো কখনও প্রিয়জনের সাথে বিচ্ছেদ ঘটে না।

শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণাষ্টমী অতি পবিত্র তিথি। এই তিথি কালাষ্টমী নামেও অভিহিত হয়। এই তিথিতে মৃগশিরা নক্ষত্রের যোগ হলেও অক্ষয় ফল লাভ হয় এই সময় তার পূজা করলে। এই দিন শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি গোমূত্র ও জলে শিবকে স্নান করাবে ও ধুতুরা ফুল দিয়ে তার পূজা করবে।

পূজার সময় নাগকেশর নামক গন্ধদ্রব্য থেকে তৈরি ধূপ, মধু ও ঘি প্রভৃতি নৈবেদ্য দান করে, দেবাদিদেব মহেশ্বর আমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন–এই প্রার্থনা জানিয়ে ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দেবে। সোনা প্রভৃতি নৈবেদ্য পূজার পর ব্রাহ্মণদের বিতরণ করবে।

আশ্বিন মাসের নবমীর দিনে সংযম ও উপবাস করে শিবলিঙ্গকে গোবর দিয়ে স্নান করিয়ে পদ্মফুল দিয়ে পূজা করবে। মিষ্টান্ন প্রভৃতি নৈবেদ্য দেবে ধূপধুনো জ্বালিয়ে। নবমীর দিন স্নান করবে অষ্টমীর দিন উপবাস করে, তারপর মহাত্মা মহেশ্বর আমার প্রতি প্রসন্ন হোন’ এই বলে তিল সহযোগে দক্ষিণা দেবে।

দেবদারু গাছের আঠা থেকে তৈরি ধূপ, মধু, ও ভাত নৈবেদ্য সহযোগে, করবী ফুল দিয়ে পূজা করবে কার্তিক মাসে শিবলিঙ্গকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে। এই পূজায় ব্রাহ্মণকে রৌপ্য সহযোগে নৈবেদ্য দান করবে এবং ভগবান শিব আমার প্রতি প্রীত হোন’–এই বিনীত প্রার্থনা জানাবে।

অগ্রহায়ণ মাসের অষ্টমীর দিন উপবাসী থেকে নবমীর দিন স্নান করে দই দিয়ে শিবের পূজা করতে হয়। বেল গাছের রস থেকে তৈরি ধূপ, মধু ও ভাত নৈবেদ্য দেবে এবং লাল সালিধান দক্ষিণা দেবে। পরে ‘রুদ্রদেব আমার প্রতি প্রীত হোন’–এই কথা বলবে। সুন্দর টগর ফুল দিয়ে পূজা করবে পৌষমাসে শিবলিঙ্গকে ঘি দিয়ে স্নান করিয়ে।

মহুয়ার রস থেকে তৈরি ধূপ, মধু ও ছাতু নৈবেদ্য দিয়ে সোনা বা রূপার টাকা দক্ষিণা দেবে, তারপর ত্রিলোচনকে নমস্কার করবে। মাঘমাসে শিবলিঙ্গকে কুশ ও গঙ্গাজলে স্নান ।

করিয়ে শালুক ফুল দিয়ে পূজা করবে। এই পূজার নৈবেদ্য হবে কদম গাছের রস থেকে তৈরি ধূপ, তিলসহ ভাত ও পায়েস এবং দক্ষিণা দেবে সোনা বা রূপা। ‘উমাপতি মহাদেব আমার প্রতি প্রীত হোন’–এই প্রার্থনা জানাবে।

ক্রমান্বয়ে দু’মাস ধরে মহাদেবকে পূজা করে এই ব্রত পালন করবে। স্নান করে ত্রিলোচনের পূজা করা কর্তব্য। পার্বণ শেষে নিম্নোক্ত বিধান অনুযায়ী গোরেচনা মিশ্রিত গুড় দিয়ে শিবলিঙ্গকে স্নান করিয়ে পূজা করতে হয়। তারপর প্রার্থনা জানাবে এই বলে আমি এক দীন ব্যক্তি, আমার প্রতি প্রীত হোন ও আমার দুঃখ দূর করুন।

ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণাষ্টমীর নিত্য নৈমিত্তিক যজ্ঞকর্ম যথাবিধি পালন করে উপবাস করবে। চন্দনের ধূপ এবং তামার পাত্রে ঘি সহ গুড় ও অন্নসহ পূজার দক্ষিণা ব্রাহ্মণকে দান করতে হবে এবং রুদ্রের উদ্দেশে নাম উল্লেখ করে তাকে এক জোড়া কাপড় দান করে তাকে সন্তুষ্ট করবে।

চৈত্র মাসে শিবলিঙ্গকে যজ্ঞডুমুর মিশ্রিত জলে স্নান করিয়ে স্বর্গীয় দেববৃক্ষ মন্দার ফুল দিয়ে পূজা করবে এবং হিং-এর ঘি সহ গুগুল, ধূপ ও মিষ্টান্ন দিয়ে নৈবেদ্য দেবে।

তারপর ব্রাহ্মণকে নৈবেদ্য সহ মৃগচার্য দান করবে। তারপর নাগেশ্বরকে প্রণাম করে শ্রদ্ধা সহকারে শঙ্করকে প্রীত করবে। আমের মুকুল, ধূপ, ধূনা, ফল ও ঘি নৈবেদ্য রূপে দান করা কর্তব্য এই পূজায়। পরে জপ করবে রুদ্রদেবের– কালাঘ্ন নাম। এই পূজায় ঐকান্তিক ভক্তি ভরে কলসী, বস্ত্র ও অন্নদান করা কর্তব্য।

জ্যৈষ্ঠ মাসে আমলকী ফলে মেশানো জলে স্নান করিয়ে আকন্দ ফুলে শিবের পূজা করা উচিত। ধূপ, ঘি, ছাতু এই পূজায় নৈবেদ্য দেবে। এরপর ভক্তিভরে নানারকম জিনিসপত্র দেবে। তারপর শঙ্করকে নমস্কার করে তাঁকে প্রীত করবে।

আষাঢ় মাসে বেল ফল মেশানো বিশুদ্ধ জলে স্নান করিয়ে। অগুরু, ধূপ ও ঘি মিশিয়ে পিঠে নৈবেদ্য দেবে। দক্ষিণা হিসাবে দেবে ঘি ও যব। তারপর প্রণাম করবে রুদ্রদেবকে।

বেলফল ও বেলপাতা দিয়ে পুজো করবে শ্রাবণ মাসে ‘ভৃঙ্গার’ নামক এক জাতীয় শাক মেশানো জলে। এই পূজায় অগুরু, ধূপ, দই মেশানো ভাত, খিচুড়ি, পুলিপিঠে প্রভৃতি নৈবেদ্য দেবে।

ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা রূপে দান করবে সাদা ষাঁড়, সাদা গাই, সোনা ও লাল কাপড়। শিবের নাম জপ করবে পূজার শেষে সাধ্যমতো।

বাকি ছয় মাসও এই নিয়মে ভক্তিভরে পালন করতে হবে। এই রূপে নিষ্ঠাভরে ব্রত পালন করলে স্বর্গলাভ হয়। সারা বছর ধরে শিবের পূজা করলে, সমস্ত পাপ দূর হয়। মানুষের কল্যাণ হয়। রুদ্রদেব নিজেই এই ব্রতের কথা বলেছেন। কোনোমতেই এর অন্যথা হবে না।

বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

১৭

পুলস্ত্য বললেন, আশ্বিন মাসে প্রজাপতির নাভিদেশ থেকে পদ্ম নির্গত হয়েছিল। এর থেকে এক মনোরম উদ্যানে পরিণত হয়। এইভাবে অন্যান্য দেবতাদের দেহের অঙ্গ থেকে বিভিন্ন প্রকার গাছ উৎপন্ন হয়।

সুন্দর কদম গাছ উৎপন্ন হয়েছিল মদনদেবের হাতের আগা থেকে, কদম ফুলের প্রতি, বটগাছের প্রতি তার বিশেষ প্রীতি দেখতে পাওয়া যায়। যক্ষদের অধিনায়ক মণি ভদ্রের ছাতি থেকে বটগাছের উৎপত্তি হয়েছিল।

মহাদেব-এর হৃদয় থেকে ধুতুরা গাছের উৎপত্তি হওয়ার ধুতুরা ফুল মহাদেবের বিশেষ প্রিয়। উজ্জ্বল খাদির গাছ তলাবির্ভূত হয়েছে ব্রহ্মার দেহের মাঝখান থেকে ময়বান মুনির মতো।

বিশ্বকর্মার অঙ্গ থেকে অত্যধিক কাঁটাযুক্ত শিমুল, খেজুর প্রভৃতি গাছ, গিরিকন্যা উমার করতল থেকে কু-লতা, গম পতির কুম্ভ থেকে সিন্ধুবার, যমের শরীরের দক্ষিণ অংশ থেকে পলাশ ও উত্তর অংশ থেকে ডুমুর এবং স্কন্ধের দেহ থেকে বন্ধুজীব গাছের জন্ম হয়।

লক্ষ্মীর হাত থেকে বেল, নাগেদের মুখ থেকে গাছের কাত্যায়নী থেকে শর, সূর্য থেকে অশ্বথ গাছের সৃষ্টি হয়। বাসুকির লেজ থেকে দূর্বা ও সাধুদের হৃদয় থেকে হরিচন্দনের উৎপত্তি হয়। এভাবে যে গাছ যে দেবতার দেহ হতে উৎপন্ন হয়, সেই গাছের প্রতি সেই দেবতার বিশেষ অনুরাগ দেখা যায়।

তারপর শুক্লপক্ষীয় একাদশীর আবির্ভাব হয়। এটি এক পরম পবিত্র লগ্ন। এই দিন বিষ্ণুপূজার পক্ষে প্রশস্ত এবং অখণ্ড নামে অভিহিত পাতা, ফুল, ফল, গন্ধ, বর্ণ, রস, নানান কর্ম ওষধি, ঘি, তেল, ধান, যব, সোনা, মণিমুক্তা, প্রবাল, কাপড় এবং তেঁতো, ঝাল, মিষ্টি প্রভৃতি রস ও নানারকম অখণ্ড সামগ্রী দিয়ে শরৎকাল আসা পর্যন্ত এই দিনে মহাত্মা বিষ্ণুর পূজা করতে হয়। এই পূজাব্রত অখণ্ড হয়ে থাকে সারা বছর ধরে।

এরূপ পূজা করলে সাবৎসর অখণ্ড হয় যখন, তখন দ্বিতীয় দিনে সংযম অবলম্বন করে উপবাস, বিষ্ণুকে স্নানের নানা রকম উপকরণ দিয়ে স্নান করানো হয়।

প্রথমে সাদা সরষে ও তিল দিয়ে ভালো করে বিষ্ণুর সারা শরীরে ঘষে দিয়ে পরে ঘি দিয়ে তাঁকে স্নান করাবে। সামর্থ্য অনুযায়ী হোম ও দান করা কর্তব্য। এরপর সোনা, রত্ন, কাপড় ও ফুল দিয়ে ভক্তিভরে বিষ্ণুর পূজা করে তার চারিদিকে ধূপ-ধুনো জ্বেলে দেবে। এই পূজায় চৰ্য্যচূষ্য জাতীয় হবিচান্না নিবেদন করবে।

এভাবে যথাবিধি বিষ্ণুকে পূজা করার পর তাঁর কাছে এরূপ প্রার্থনা জানাবে–হে কেশব পদ্মনাভ, লক্ষ্মীধর, তোমার কৃপায় আমার ধর্ম, অর্থ, অখণ্ড হোক, তুমি যেমন সর্বত্র অখণ্ড, সেই সত্যবলে আমার ধর্ম, অর্থ প্রভৃতি অখণ্ড হোক।

সবরকম সামগ্রী দিয়ে এই ব্রতের পালন করতে হবে সারা বছর ধরে উপবাসী ও সংযমী হয়ে। সব দেবতাই পরিতুষ্ট হয়ে থাকে এই ব্রতের অনুষ্ঠানে। অক্ষয় হয়ে থাকে ধর্ম, অর্থ, বাণী।

পুলস্ত্য নারদকে ভোগ বিলাসীদের উল্লেখিত ব্রতের কথা বললেন। এবার শুভ বিষ্ণু প্রার্থনা সম্পর্কে তিনি বলবেন। তিনি বলতে শুরু করলেন হে দেবেশ বিষ্ণু, আমি তোমার শরণাপন্ন হলাম।

বারবার তোমাকে নমস্কার করলাম। আমার পূর্বদিকে তুমি সুদর্শনচক্র নিয়ে রক্ষা করো। আমার পশ্চিম দিকে তুমি রক্ষা কর কৌমুদকী গদা নিয়ে। উত্তর দিকে রক্ষা কর মুষল হাতে নিয়ে, শাঙ্গধনু ও নারায়ণাস্ত্র নিয়ে ঈশাণ কোণ রক্ষা করো।

অগ্নিকোণ রক্ষা করো মহাশঙ্খ, পাঞ্চজন্য ও পদ্ম নিয়ে। নৈঋতকোণে রক্ষা করো, শত সূর্যের মতো উজ্জ্বল ও বর্ম নিয়ে। বায়ুকোণে রক্ষা করো তোমার গলার হার, গলা থেকে জানু অবধি ঝোলালে পঞ্চবর্ণময়ী মালা ও তোমার বুকের নোম দিয়ে।

গরুড় তোমাকে নমস্কার করছি আমাকে অন্তরীক্ষে রক্ষা কোরো। রসাতলেও তুমি আমাকে রক্ষা কোরো, তুমি রক্ষা কোরো আমার হাত, পা, মাথা সব কিছুই। প্রাচীনকালে ভগবান মহাদেব কাত্যায়নী দুর্গাকে এই মহা বিষ্ণু সম্পর্কে বলেছিলেন, প্রার্থনা এর প্রভাবে কাত্যায়নী মহিষাসুর নামক, রক্তবীজ ও অন্যান্য দানবদের নিহত করেন।

নারদ জানতে চাইলেন, মহিষাসুর কে? রক্তবীজ ও অন্যান্য দৈত্যদের নিধনকারী কাত্যায়নীই বা কে? মহিষের প্রকৃত স্বরূপ জন্মস্থান, পিতৃ পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় ও নামের পরিচয় সবিস্তারে শুনতে চাইলেন।

পুলস্ত্য তখন সমস্ত ঘটনা বলতে লাগলেন। দুর্গা, সর্বদা বরদা হলেন কাত্যায়নী প্রাচীনকালে রম্ভ ও করম্ভ নামে অত্যন্ত পরাক্রমশালী দুজন অসুর ছিল। তারা ভয়ঙ্কর স্বভাবের ছিল।

তাদের অত্যাচারে সমগ্র জগৎ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ল। এরা অপুত্রক ছিল। এরা পুত্রলাভের জন্য তপস্যা শুরু করে। এদের মধ্যে একজন পঞ্চনদের জলের তলায় নিমগ্ন রইল তপস্যাঁতে, পঞ্চাগ্নিসাধ্য তপস্যায় নিরত হল আর একজন।

এরা দুজন পরস্পর সহোদর ছিল। এরা তপস্যা করছিল ফলবটাক্ষ যক্ষের নিকট। করম্ভ এদের মধ্যে জলের তলায় বসে থেকে তপস্যা করছিল। দেবরাজ ইন্দ্র কুমীরের রূপ ধরে এই জলের মধ্যে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। রম্ভ এভাবে ভাইয়ের হত্যায় ভীষণভাবে রেগে গেল। নিজের মাথা কেটে আগুনে আহুতি দিতে উদ্যত হল।

তপস্যাকে আরো কঠোর করতে আত্মহত্যা না করার কথা বলে অগ্নিদেব তাকে বিরত রাখলেন মুণ্ড ছেদন থেকে। অগ্নি বললেন, পরহত্যা জনিত পাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় কিন্তু আত্মহত্যা জনিত পাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না।

অতএব অগ্নিদেব তাকে বর দিতে প্রস্তুত হলেন। মৃত ব্যক্তির কোনো ইচ্ছা পূরণ হয় না, তার নামও বিলুপ্ত হয়ে যায়। রম্ভ বলে যদি আপনি আমাকে বর দেন তাহলে আমার এক ত্রিলোক জয়ী পুত্র হোক এবং সে যেন আপনার চেয়েও অধিক তেজস্বী হয়। দেবতাদের নিকট সে যেন কখনো পরাজিত না হয়।

তার এই পুত্র যেন শক্তিশালী ও সবরকম অস্ত্রশস্ত্র চালনায় নিপুণ হয়। সে যেন ইচ্ছামত রূপ ধারণ করতে পারে। অগ্নি বললেন– তাই তোক। তুমি যার প্রতি মন সমর্পণ করে গৃহত্যাগ করবে, তারই গর্ভে তোমার এইরূপ পুত্র জন্মাবে।

যক্ষের দ্বারা পরিবৃত মালবটের সাথে দেখা যখন হল তখন অগ্নির কথা শুনে সে চলে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল পদ্মনিধি নামে এক যক্ষ সেখানে বাস করছেন। তার চারিদিকে হাতি, মহিষ, ঘোড়া, গরু ও ছাগল আছে।

পশুদের দেখে দানব রাজের মনে কামভাবের উদ্রেক হল। এক তিন বছরের মহিষী ছিল ওই পশুপালের মধ্যে। দানব রাজাকে দেখে সেও কামাতুরা হয়ে পড়ল, ওই মহিষী তারপর সত্য সত্যই রতি মিলনের ইচ্ছা নিয়ে দানবরাজের কাছে গেল। দুজনে ভবিতব্যের প্রেরণায় সঙ্গম করলেন। ফলে মহিষী গর্ভবতী হল।

তখন দৈত্যরাজ তাকে নিয়ে পাতালে নিজ নগরে চলে যান। অন্যান্য দানবেরা তার কাছে সব জেনে নিলেন। কিন্তু এই মহিষীকে গর্ভবতী করার মতো কুকাজ করার জন্য সকলে তাকে ত্যাগ করল। অগত্যা রম্ভ যক্ষের নগরে মহিষীকে নিয়ে পুনরায় ফিরে এল।

সেখানেই কিছুকাল পরে শ্যামাঙ্গিনী মহিষীর গর্ভ থেকে অরণ্য মধ্যে এক পুত্র ভূমিষ্ঠ হল, তার দেহবর্ণ সাদা। শীঘ্রই সে আপন ইচ্ছানুযায়ী রূপধারণ করতে দক্ষ হয়ে উঠল, কিছুকাল পর মহিষী চরিত্র রক্ষার্থে দানবরাজের কাছে গেল। দৈত্যরাজ আপন খঙ্গ নিয়ে ওই মহিষকে মারতে গেল।

কিন্তু মহিষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারল না। মহিষ তার শিং দিয়ে দৈত্যের বুকে আঘাত করল। দৈত্যরাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা গেল। স্বামীর মৃত্যুর পর মহিষী যক্ষদের শরণাপন্ন হল।

যক্ষ ও গুহ্যকরা মহিষকে তাড়িয়ে মহিষীকে রক্ষা করল। যক্ষের তাড়ায় কামাতুরা মহিষ সামনে এক দিব্য সরোবরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার মৃত্যু হল। এই মৃত মহিষ পরে নমর নামে এক বিখ্যাত দৈত্য হয়ে জন্মগ্রহণ করে।

এদিকে মহিষী যক্ষদের আশ্রয়ে বনে বাস করতে থাকে। দৈত্যরাজের সৎকারে নালধনু প্রভৃতি যক্ষরা উদ্যোগী হল।

চিতা প্রস্তুত করে দৈত্যরাজের দেহ তার উপর চাপানো হল। মহিষী মৃত স্বামীর অনুগমন করল। চিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে আগুনের ভেতর থেকে বিশাল পুরুষ উঠে এল।

সে ছিল অতি ভীষণ ও হাতে ছিল খঙ্গ। চিতা থেকে উঠে এসেই সে যক্ষদের তাড়িয়ে দিল। সেখানকার সকল মহিষ তার হাতে নিহত হল।

একমাত্র দানব রম্ভের পুত্র মহিষকে সে বধ করল না, কারণ সে তার রক্ষক। এই ভয়ঙ্কর দৈত্য পুরুষের নাম রক্তবীজ। ইন্দ্র, রুদ্র, সূর্য ও মারুত প্রভৃতি দেবতারা একসময় এই রক্তবীজের হাতে পরাজিত হয়েছিল। এদিকে মহিষাসুরও অসাধারণ পরাক্রমশালী হয়ে উঠল।

তাকেই তাদের রাজা বলে মেনে নিল শম্বর, তারক প্রভৃতি দৈত্যরা। ইন্দ্র, অগ্নি, সূর্য প্রভৃতিরা প্রতিপত্তি বিস্তারে বাধা দিতে না পেরে নিজ নিজ জায়গা থেকে পালিয়ে গেল, তারা সবাই দূরদেশে গিয়ে কালাতিপাত করে দিন কাটাতে লাগল।

১৮

পুলস্ত্য জানালেন দেবতারা নিজ নিজ বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন মহিষাসুরের কাছে। পরাজিত হয়ে। তারা নিজেদের অস্ত্র ও বাহন নিয়ে ব্রহ্মার কাছে গেলেন এবং ব্রহ্মাকে সকলের সামনে রেখে দেবতাগণ চক্রপানি নারায়ণের সাথে দেখা করতে গেলেন।

সেখানে গিয়ে দেখলেন শিব ও বিষ্ণু একই আসনে বসে আছেন। মহিষাসুরের কাছে তাঁদের পরাজয়ের কথা বললেন–এবং দুই দেবতাকে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। তাঁরা জানালেন মহিষাসুরের অত্যাচারে তাঁরা অস্থির।

সকলকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে মর্তে নির্বাসিত করেছে। অশ্বিনীকুমারদ্বয়, অগ্নি, বায়ু, সূর্য, চন্দ্র, বরুণ ও ইন্দ্র প্রভৃতি সমস্ত দেবতাদের বাসস্থান মহিষাসুর আক্রমণ করেছে।

এখন আমরা আপনাদের শরণাপন্ন। আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করুন। না হলে আমাদের রসাতলে আশ্রয় নিতে হবে। তখন বিষ্ণু ও শিব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শঙ্কর দাবানলের মতো জ্বলে উঠে ক্রোধ প্রকাশ করতে লাগলেন। এক জ্যোতির্ময় তেজ ব্রহ্মা বিষ্ণু শঙ্করসহ সমস্ত ক্রুদ্ধ দেবতাদের মুখমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এল।

এক বিশাল পর্বতশৃঙ্গের মতো আকৃতি নিল এই তেজোরাশি কাত্যায়ন মুনির মহাশ্রমে একত্রিত হলো।

মহর্ষী কাত্যায়ন নিজ তেজে তাকে আরো পরিপুষ্ট করলেন। এই তেজ তখন দেদীপ্যমান হয়ে সহস্র সূর্যের মতো উজ্জ্বল আকার ধারণ করল।

তখন কাত্যায়নীর আবির্ভাব ঘটল এই তেজ থেকে, মহেশ্বরের তেজ থেকে তার মুখ, অগ্নির তেজে তিনটি চোখ, যমের তেজে চুল, হরির তেজে আঠারোটি হাত, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যস্থান এবং বরুণের তেজে উরু, জঙ্ঘা, নিতম্ব নির্মিত হল, ব্রহ্মতেজে পা, সূর্য ও ইন্দ্রের তেজে কান এবং অশ্বিনীদ্বয়ের তেজে মদনবাণের মতো শান্তিময় দুটি → গঠিত হল।

এদের তেজরাশি থেকে কাত্যায়নীর উৎপত্তি হল। তখন থেকেই তিনি কাত্যায়নী নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেন।

দেবতারা এরপর সেই তেজঃপুঞ্জ থেকে সৃষ্ট দেবী কাত্যায়নীর হাতে অস্ত্র দিলেন।

মহাদেব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি শক্তি, বায়ু ধনু, সূর্য তৃণ ও অক্ষয় শর, ইন্দ্র ঘন্টা সহ বজ্র, যম দণ্ড, কুবের গদা, ব্রহ্মা অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, বাকল চর্ম ও অসি, চন্দ্র হার ও চামর, সমুদ্র মালা, হিমালয় সিংহ, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা মাথার মুকুটের মণি, কুণ্ডল ও অর্ধচন্দ্র ও কুঠার, গন্ধর্বরাজ পানপাত্র, নাগরাজ বাসুকি নাগহার এবং ঋতুগণ অন্যান্য ফুলের মালা দান করলেন।

এই ত্রিনয়নী তখন অট্টহাসি হাসতে লাগলেন। তাঁর স্তব করতে লাগলেন বিষ্ণু, রুদ্র, অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতারা। সকলে যোগশুদ্ধ দেহে বিরাজকারী সুর গরীয়সী দেবীকে নমস্কার করলেন।

যিনি তৃষ্ণা, লজ্জা, ক্ষুধা, ভয়, শান্তি, স্মৃতি, পুষ্টি, ক্ষমা, ছায়া, শক্তি, কমলা, মেধা, ক্ষান্তি ও যা যা রূপে এই ত্রিলোকে বিরাজ করছেন, তাঁকে নমস্কার। দেবতারা এরূপ স্তব আরম্ভ করলেন।

এরপর অরণ্যবেষ্টিত বিন্ধ্যপর্বতে দেবী চলে গেলেন সিংহের পৃষ্ঠে আরোহণ করে। উঁচু চূড়া সম্পন্ন এই বিন্ধ্য পর্বত অতি বিশাল। অগস্ত্য মুনি চূড়াগুলোকে নিচু করে দিলেন।

কেন এই ঘটনা ঘটল? পুলস্ত্য বললেন, পুরাকালে আকাশচারী বিন্ধ্যাচল দিবাকরের গতি রোধ করে। অগস্ত্যের কাছে তখন সূর্য আসেন।

যজ্ঞকার্যরত অগস্ত্যের হোম শেষ হলে সূর্য বলে, সে দূর দেশ থেকে এসেছে। মুনিবরকে অনুরোধ করেন জগতের উদ্ধার সাধন করতে। তার প্রার্থনা পূরণ করতে অনুরোধ করে তার স্বর্গধামে অনায়াস যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে বললেন।

অগস্ত্য তখন জানালেন, তার কাছ থেকে প্রার্থী কখনো বিমুখ হয় না। তিনি তার প্রার্থনা পূরণ করবেন।

দিবাকর তখন জানালেন, বিন্ধ্যাচল আমার গতিরোধ করেছে। আপনি তাকে অবনত করে দিন।

দিবাকরের এই কথায় অগস্ত্য জানান, বিন্ধ্যকে তিনি অবনত করবেনই। শীঘ্র দিবাকর তার কিরণ-জালে এই পর্বর্তকে জয় করবেন।

তাছাড়া অগস্ত্য মুনির শরণ প্রার্থীর কষ্ট কি? এরপর অগস্ত্য ভক্তিভরে সূর্যের স্তব করলেন এবং তৎক্ষণাৎ দণ্ডকারণ্য পরিত্যাগ করে জরাক্রান্তদেহে বিন্ধ্যাচলে হাজির হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বিন্ধ্যপর্বতকে দক্ষিণ দিকের এক পরম পবিত্র তীর্থের কথা বললেন।

আমি বৃদ্ধ, তাই তোমাকে অতিক্রম করে যাবার ক্ষমতা নেই। তাই তুমি নিচু হও। মুনিবরের কথা শুনে বিন্ধ্যপর্বত মাথা নিচু করল। ঋষি অগস্ত্য বিন্ধ্যকে অতিক্রম করে অপরদিকে গিয়ে বললেন–আমি পুণ্যতীর্থ থেকে বিশুদ্ধ বীরের আশ্রমে না আসা পর্যন্ত সে যেন মাথা উঁচু না করে এবং এও বললেন–তাঁর কথা অমান্য করলে তিনি অভিশাপ দেবেন।

অগস্ত্য মুনি একথা বলে আকাশপথে দক্ষিণে চলে গেলেন। সেখানে এক রমণীয় আশ্রম তৈরি হল। আশ্রমের তোরণগুলি বিশুদ্ধ সোনায় শোভিত হল। মুনিবর সেখানে পত্নী লোপামুদ্রাকে নিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। এছাড়াও আর একটি আশ্রম প্রস্তুত হল আকাশপথে। সেই আশ্রমে এসে প্রতি ঋতু ও পর্বদিনে বাস করতে লাগলেন।

বাকি সময়ে তিনি দণ্ডকারণ্যে তপস্যা করতে লাগলেন। বিন্ধ্য যখন দেখেন অন্তরীক্ষে মুনির আশ্রম তখন আর ভয়ে উঁচু হল না। সে বুঝল মুনি আর ফিরবেন না। তবুও সে আর উঁচু হল না।

download 1 6 বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

নারদ পুলস্ত্যকে জানালেন, এভাবে মুনিবর বিন্ধ্যকে অবনত করেন। এই বিন্ধ্যের সুউচ্চ চূড়াতে দুর্গা দানব দলনের জন্য অবস্থান করেন। কাত্যায়নীকে সন্তুষ্ট করে সেখানে দেব, সিদ্ধ, নাগ, বিদ্যাধর, অপ্সরা ও অন্যান্য প্রাণীরা নিশ্চিন্তে বাস করতে লাগল।

১৯

পুলস্ত্য বললেন–কাত্যায়নী ওই শৃঙ্গে বাস করতে লাগলেন। চন্দ্র ও মুণ্ড নামে দুই দানব এই সময় তাকে দেখতে পেল। মহিষাসুরের দূত ছিল চণ্ড ও মুণ্ড। তারা এসেই মহিষাসুরকে জানাল যে বিন্ধ্যপর্বতে চলুন, সেখানে এক অপূর্ব দেবকন্যা আছেন। তাঁর অবর্ণনীয় সৌন্দর্য তার চুল মেঘকে জয় করেছে।

চন্দ্র ম্লান তার মুখমণ্ডলের কাছে। ত্রিনয়নে অগ্নি, কণ্ঠে শঙ্খ, স্তনদ্বয়ে গঞ্জকুম্ভ চির পরাজিত, মদনদেব নিজেকে সর্বজয়ী মনে করেই এই দেব কন্যার স্তনদ্বয় সুদৃঢ় দুর্গরূপে নির্মাণ করেছেন। তার হাত আঠারোটি, এবং সব হাত সশস্ত্র। সনদদের তার পরাক্রম বুঝেই নিজযন্ত্রের মতো হাতগুলি নির্মাণ করেছে।

তার বুক থেকে নাভি পর্যন্ত ঢেউখেলানো সুশোভন রোমরাজি বিরাজিত, মনে হয় কামদেব নিজেই আরোহণের জন্য সিঁড়ি তৈরি করে রেখেছে। তার এই পরিপুষ্ট স্তন সংলগ্ন রোমরাজির দিকে তাকালে মনে হয় যেন আরোহণের ভয়ে ভীত ও ক্লান্ত হয়ে মদনদেবের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। তার দক্ষিণাবর্তভাবে বিরাজমান সুগভীর নাভিদেশ।

কন্দর্পরাজ যেন নিজ হাতে এই সৌন্দর্য ভাণ্ডারে বিশেষ কোনো চিহ্ন দিয়ে রেখেছে।

এই মৃগনয়নার মেখলা পরিবৃত কটিদেশ দেখলে মনে হয় এ যেন কন্দর্পরাজের প্রাচীর বেষ্টিত সুদুর্গম বাসভবন।

সেই দেবীর উরুদ্বয় সুগোল, সুকোমল ও রোমহীন, দেখলে মনে হয় কামদেবের বসবাসের জন্য যেন দুটি জনপদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। তার জানুদ্বয় অতি উন্নত। দেখলে মনে হয় বিধাতা যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন নির্মাণ করতে করতে এবং করতল দুটি স্থাপন করেছেন নির পণ করার জন্য। তার পা দুটো মনোরম শোভায় উদ্ভাসিত।

বিধাতা এই পা দুটি বিশেষ যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন। এই সুকুমারীর নখগুলি আকাশের নক্ষত্ররাশির মতো শোভাসম্পন্ন।

দেবকন্যার এই রূপ বর্ণনা দেওয়া হল। তা এতটুকুও বাড়িয়ে বলা হয়নি। এটিই তার প্রকৃত সৌন্দর্য। তবে এই রমণীর হাতে অনেক ভীষণ অস্ত্র আছে।

আমরা তাকে ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেছি। কিন্তু সে কার কন্যা বা কামিনী তা জানতে পারিনি। এই দেবকন্যা কেন স্বর্গ ত্যাগ করে ধরাধামে হাজির হয়েছেন আপনি নিজেই বিন্ধ্যাচলে গিয়ে দেখুন। আপনার তারপর যা মন চায় তাই করবেন।

মহিষাসুরের মন দেবকন্যার প্রতি আকৃষ্ট হল তাঁর এই রূপের বর্ণনা শুনে। বিধাতা আগেই মানুষের ভাগ্য ঠিক করে রাখেন। বিধাতার প্রেরণাতেই মানুষ তার গন্তব্যপথ নিজে অনুসরণ করে। তারপর মহিষাসুর চন্দ্র, মুণ্ড, বিড়ালাক্ষ, কার্পল, বাল্কল, উগ্ৰায়ুধ, মিথুবর, রক্তবীজ সকলকে বিন্ধ্যপর্বতে পাঠালেন।

এই সেনাপতিরা অবিলম্বে সুসজ্জিত হয়ে রণবাদ্য বাজাতে বাজাতে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নেমে এল এবং বিন্ধ্যদেশের পাদদেশে শিবির স্থাপন করল এবং আকাশপথে মহিষাসুর দ্রুত পাঠালেন।

ময়দানবের পুত্র দুন্দুভি হল এই দূত। ভীষণ রণনিপুণ দুন্দুভি দানবসৈন্যের অধিনায়ক। তার গলার আওয়াজও ভয়ঙ্কর।

দুন্দুভি অন্তরীক্ষ থেকে দেবীকে বললেন, যুদ্ধে যার সমতুল্য দ্বিতীয় নেই, সে সেই রম্ভনন্দন মহিষাসুরের দূত।

কাত্যায়নী তাকে আমন্ত্রণ জানালো। তিনি জানতে চাইলেন, মহিষাসুর তাকে কি বলেছেন, দেবীর কথায় দুন্দুভি অন্তরীক্ষ থেকে নেমে এসে বলল, দৈত্যরাজ মহিষাসুর তাকে বুলতে বলেছে যে, হীনবল দেবতারা যুদ্ধে আমার কাছে পরাজিত হয়ে ভূতলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কি স্বর্গ, কি মর্ত্য, কি অন্তরীক্ষ, পাতাল, সবই আমার বশীভূত। সমস্ত রাজাই তার বশ্যতা স্বীকার করেছে।

তিনি এখন রুদ্র, ইন্দ্র ও সূর্যের স্থানে অধিষ্ঠিত, ত্রিভুবনে তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য অক্ষুণ্ণ, স্বর্গ, মর্ত্য কি পাতাল’ এমন কোনো বীর নেই যে তার সাথে যুদ্ধ করতে পারে, তার আয়ত্তে ত্রিলোকের যাবতীয় ধন, রত্ন, নরোত্তম স্ত্রী, রত্নের জন্য এই পর্বতে আগমন। সুতরাং তিনি সকলের প্রভু তাই তিনি ভজনার যোগ্য।

ময়পুত্ৰ দুন্দভি কাত্যায়নী সম্পর্কে কথা শুনে বললেন, তিনি স্বীকার করছেন পৃথিবীর প্রভু দৈত্যরাজ। সকল দেবতারা তার হাতে পরাজিত। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে এদেশে একটি প্রসিদ্ধ ধর্ম শুল্ক আছে।

দৈত্যরাজ পণ দিলে তিনি তক্ষুনি তাকে পতিরূপে বরণ করে নেবেন। দুন্দুভি এবার সেই বরপণের কথা জানতে চাইল। দুন্দুভি বলল, যে দৈত্যরাজ তার জন্য মাথা দান করতেও প্রস্তুত। আর এমন কি পণ আছে যা আপনি পাবেন না।

দুন্দুভির কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন কাত্যায়নী, এবং বললেন, আমাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষরা যে পণপ্রথা চালু করে গেছেন তা শোনো।

যে ব্যক্তি তাদের বংশের রমণীকে যুদ্ধে জয় করতে পারবে সেই তার পতি হবে। দুন্দুভি মহিষাসুরকে এই কথা বলল এবং মহিষাসুরও যাবতীয় দৈত্য যোদ্ধা নিয়ে বিন্ধ্যপর্বতে গেলেন এবং দৈত্যবর চিকুর সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত হল।

নমর ওপর ভার পড়ল দৈত্য বাহিনীর সম্মুখ ভাগ সামলানোর। নমর এই কাজে নিযুক্ত হয়ে চতুরঙ্গ সমন্বিত এক বিশাল দানব বাহিনীর একাংশ নিয়ে দুর্গাকে আক্রমণ করল। দেবীকে বর্ম পরার উপদেশ দিলেন ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারা। নমরকে ছুটে আসতে দেখেও কিন্তু দেবী বর্ম বা কবচ কিছুই পরলেন না।

দেবী বর্ম না পরায় তাঁকে রক্ষার জন্য বিষ্ণু পঞ্জর গঠিত হল।

দুর্গা ওই পঞ্জরে রক্ষিত হয়ে মহিষাসুরকে নিষ্পিষ্ট করে ফেললেন। শম্ভ কর্তৃক পুরাকালে এই রূপ বিষ্ণুপঞ্জর গঠিত হয়েছিল। দেবীও তখন পদাঘাতে নিহত করলেন মহিষাসুরকে।

নারদকে পুলস্ত্য জানালেন যে, বিষ্ণু পঞ্জরের এমন প্রভাব যে সমস্ত রক্ষাকবচ বিশেষরূপে গঠিত হয়। তাঁর অধিষ্ঠানে সর্বদা যার অন্তরে, পৃথিবীতে কেউ তাঁর দর্পহানি করতে পারে না।

২০

নারদ পুলস্ত্যকে বললেন–মহিষাসুরকে কাত্যায়নী যেভাবে বধ করেছিলেন তা সবিস্তারে বলতে বারণ। তাঁর মনে সংশয় যে তিনি বিভিন্ন অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত হয়েও কেন তিনি দৈত্যরাজকে পদাঘাতে নিহত করলেন?

পুলস্ত্য জানালেন, এটি অতি প্রাচীন ও পবিত্র ঘটনা। সুতরাং মন দিয়ে ভক্তিভরে শুনতে হবে। কারণ এই কাহিনি শুনলে পাপ দূর হবে।

দানব বাহিনীর সম্মুখে দৈত্যবর নমর ক্রুদ্ধ হয়ে হাতি, ঘোড়া, রথ প্রভৃতি দলবলসহ দেবী দুর্গার সম্মুখীন হল।

দেবী তাকে ভালোভাবে দেখলেন। দৈত্যবর যুদ্ধ শুরু করলে দেবী বাণ বর্ষণ করতে লাগলেন। তখন মনে হল বিদ্যুৎগর্ভ মেঘে স্বর্ণময় পুষ্পরাশি শোভিত হল।

দেবীর বাণ বর্ষণে তখন অসংখ্য দৈত্যসেনা নিপীড়িত হল। গদা ও মুষলের আঘাতে অনেক দানব পতিত হল। দেবীর বাহন সিংহ দানব সৈন্যদের আক্রমণ করল। এই সিংহের আক্রমণে অসংখ্য দৈত্য সেনা মারা গেল। কেউ বজ্রাহত হল। কারো বুকে শক্তিশেল বিদ্ধ হল। কারো ঘাড় লাঙলে বিদীর্ণ হল। কেউ কুঠারের ঘায়ে দু’টুকরো হয়ে মারা গেল।

কাজেই মাথা বিদীর্ণ হল দন্তের আঘাতে। কারো দেহ ছিন্নভিন্ন হল চক্রের আঘাতে, অনেক দানব এই হত্যাকাণ্ড দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগল। কেউ মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল, কেউ যুদ্ধে মেতে উঠল। কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেল।

এইসব দৈত্যদের সংহার করতে লাগলেন করাল বদনা দেবী। তাঁকে কালরাত্রি মনে করে অনেকে পালিয়ে গেল। তখন মত্ত হাতির ওপর থেকে দৈত্যবর নমর দেখল ছত্রভঙ্গ সৈন্যদের। কিন্তু তথাপি দেবী যুদ্ধক্ষেত্রে অটল। তা দেখে দেবীর দিকে সবেগে নমর এগিয়ে গেল ও সিংহের দিকে ত্রিশূল ছুঁড়ে মারল।

সিংহের কোমরে আঘাত করল দৈত্য বাহন হাতি। কিন্তু সব আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে গেল, দেবীর হুঙ্কারে তারা ভস্ম হয়ে গেল। সিংহ লাফিয়ে হাতির পিঠ থেকে মৃতপ্রায় নমরকে টেনে এনে দেবীর সামনে ফেলে দিল।

কাত্যায়নী তখন ক্রোধে নমরকে ডান হাতে ধরে চারিদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে জয়ঢাকের আওয়াজ করতে লাগলেন। তার মুখ থেকে অট্টহাসি বেরিয়ে এল। তাঁর হাসি থেকে তখন অনেক ভূতের উৎপত্তি ঘটল। তাদের মধ্যে কেউ বাঘের মুখের মতো, কেউ শিয়ালের মতো, কেউ ঘোড়া, কেউ মহিষ, আবার কেউ শুকরের মতো।

আবার কিছুর মুখ ইঁদুর ও মোরগের মতো আর কারো মুখ হাতি ও ছাগলের মতো। আবার কিছু ভূতের মুখ চোখ ও পা নানা ধরনের ছিল এবং তাদের হাতে ছিল নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্র।

এই ভূতরা যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে গান করতে লাগল। হাসতে লাগল, খেলতে লাগল, পরস্পর মিলিত ভাবে বাজনা বাজাতে লাগল। অম্বিকার স্তব করতে লাগল কিছু কিছু ভূত। দেবী সে সময় এই ভূতদের সাথে নিয়ে দানব সৈন্য আক্রমণ করলেন, এবং বিদ্যুৎ যেভাবে তৃণরাশি পুড়িয়ে দেয়, ঠিক সেভাবে তিনি দানব সৈন্য বিদীর্ণ করতে লাগলেন।

সেনাপতি চিক্ষুর সেনাদল সাথে নিয়ে দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলেন। সেনানী নমর নিহত হলে মেঘ যেমন পৃথিবীর দিকে বারি বর্ষণ করে, সেনাপতি চিক্ষুর তেমনি তার ধনুক দ্বারা বিপক্ষ সৈন্যের দিকে বাণ বর্ষণ করতে লাগল।

দেবী দুর্গা দানব সেনাপতির সেসব বাণ নিজের ধনুক থেকে বাণ ছুঁড়ে ছিন্ন করে দিয়ে পুনরায় গ্রহণ করলেন।

তারপর তিনি চারটি বাণে দানব সেনাপতির রথের চারটি ঘোড়া, একটি বাণে সারথি ও অপর একটি বাণে রথের পতাকা ছিন্ন করে দিলেন। দানবের বাণসহ ধনু ছিন্ন করে দিলেন একটি মাত্র তিরে।

বলশালী দানব সেনাপতি খঙ্গ ও চর্ম ধারণ করল। খঙ্গ ও চর্ম ছিন্ন হলো দেবীর চারটি বাণে।

দেবীর দিকে তখন হাতে শূল নিয়ে দৈত্য ছুটে গেল, যা দেখে মনে হল যেন বনে শিয়াল সিংহীর দিকে ছুটে যাচ্ছে।

দেবী দুর্গা তখন পাঁচটি বাণ ছুঁড়ে ছিন্ন করে দিলেন দৈত্যের হাত, পা ও মাথা। অসুর সেনানী তখন যুদ্ধক্ষেত্রে ভূপতিত হল নিহত হয়ে।

সবেগে রণক্ষেত্রে ছুটে এল মহাদানব উগ্ৰাস্য দৈত্য সেনার অধিনায়ক হয়ে। কারণ সেনাপতি তখন নিহত হয়ে গেছে। তার সাথে যুদ্ধে যোগ দিল আরো অনেক দানব যোদ্ধা। তাদের মধ্যে বাল্কল, উগ্ৰাকামুক, যুদ্ধর, দুর্মুখ ও বিড়লাক্ষ প্রধান।

কাত্যায়নীর সাথে এছাড়াও অনেক পরাক্রমশালী দানবসেনা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে এলো। তাদের দেখে হাতের বীণা নিয়ে হাসতে হাসতে দেবী বাজাতে লাগলেন, মাঝে মাঝে বাজাতে লাগলেন ডমরুও। ভূতেরা তার বাজনার সাথে তাল রেখে নাচতে ও হাসতে লাগল।

তখন দেবীর দিকে অসুররা অস্ত্র নিয়ে ছুটে এল। দেবী সিংহের পিঠ থেকে লাফ দিয়ে অবলীলা ক্রমে অসুরদের চুলের মুঠি ধরে তাদের পর্বতের তলদেশে নিয়ে এলেন। দেবীর প্রতাপে দানবদের দর্প চূর্ণ হল। তারা সবাই অস্ত্র, বস্ত্র এমন কি প্রাণ পর্যন্ত পরিত্যাগ করল।

প্রধান প্রধান সেনাপতিদের এরূপ শোচনীয় অবস্থা দেখে নিজে দেবীর সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে এল মহিষাসুর, এবং অবিলম্বে ক্ষুর, ঠোঁট ও লেজ প্রবল নিঃশ্বাসে দেবীর সহচর ভৃতগুলোকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। তারপর ছুটলেন দেবীর বাহন সিংহকে বধ করার জন্য।

তখন দেবী ক্ষিপ্ত হয়ে মহিষাসুরকে বহু দূরে নিক্ষেপ করলেন। তখন মহিষাসুর দুর্গার দিকে ছুটে গেল সক্রোধে মাটি বিদীর্ণ করে সাগরে আলোড়ন তুলে এবং মেঘমণ্ডল বিধ্বস্ত করে। দেবী তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললেন।

তখন মহিষাসুর এক মহাস্রাবী হাতির আকার ধারণ করল। তার দিকে শুল নিক্ষেপ করলেন দেবী।

কিন্তু তা ব্যর্থ হল। এবার দেবী হতাশ হয়ে শক্তি নিক্ষেপ করলেও তা পুনরায় ব্যর্থ হল। তখন দেবী ক্ষুব্ধ হয়ে হরির চক্র, কুবেরের গদা, বরুণের, পাশা, যমের দণ্ড, এবং ইন্দ্রের বস্ত্র সমস্তই মহিষাসুরকে ছুঁড়ে মারলেন, কিন্তু তার কিছুই হল না।

মহিষের শিং, ঠোঁট ও ক্ষুর প্রতিহত করল সকল অস্ত্রকে। তখন দেবী সিংহকে পরিত্যাগ করে মহিষাসুর-এর পিঠে চেপে বসলেন। সে সাথে সাথে চারিদিকে ছোটাছুটি করতে লাগল।

দেবী তার পিঠের চামড়া মর্দিত করল তার কোমল পা দিয়ে। দেবীর পদমর্দনে এই অসুর ক্রমেই হীনবল হয়ে পড়ল। তখন দেবী তার গলা ভেদ করল শূলের আঘাতে। সেখান থেকে এক খঙ্গাধারী বীর পুরুষ বেরিয়ে এল।

বামন পুরাণ ১১-২০ - পৃথ্বীরাজ সেন

দেবী সাথে সাথে তার বুকে শূল বিধিয়ে দিয়ে মুহূর্ত মধ্যে তরবারি দিয়ে মাথা কেটে দিলেন। তখন তুমুল হা হা ধ্বনি উঠল দৈত্য সেনাদের মধ্যে। এই ভীষণ দুর্ঘটনায় চন্দ্র, মুণ্ড, ময়, তার, অসিলোম প্রভৃতি দানব ভয় কাতর চোখে চারিদিকে তাকাতে লাগল।

তাদের ভীষণ ভাবে নির্যাতিত করল ভবানী অনুচর ভূতগুলো। তারা ভয়ে পাতালে আশ্রয় নিল।

দেবী যুদ্ধে জয়ী হলেন। দেখে দেবতারা সেই জগত্তারিণী নারায়ণী কাত্যায়নীর নানা স্তব করতে লাগলেন। সুর ও সিদ্ধগণ তার স্তব করতে আরম্ভ করলে কাত্যায়নী বললেন, দেবতাদের ইষ্ট সিদ্ধির জন্য আবার তিনি অবতীর্ণ হবেন।

এই বলে তিনি তৎক্ষণাৎ দেবতাদের ত্যাগ করে শিবের পাদমূলে প্রবেশ করলেন।

আরও পড়ুনঃ

ত্রিপুরার মন্ত্র রহস্য – কালিকা পুরাণ

অষ্টবিধ যোনিমুদ্রা ও মন্ত্ররহস্য – কালিকা পুরাণ

মাতৃকা-ন্যাস – কালিকা পুরাণ

কামাখ্যা-কবচ – কালিকা পুরাণ

নমস্কার – কালিকা পুরাণ

বামন পুরাণ

মন্তব্য করুন