বামন পুরাণ ৩১-৪০ – পৃথ্বীরাজ সেন

বামন পুরাণ ৩১-৪০ঃ লোমহর্ষণ বললেন, মার্কণ্ডেয় মুনির একথা শুনে দেবী সরস্বতী কুরুক্ষেত্রে প্রবাহিত হলেন। প্রথমে রন্তুক ও পরে কুরুক্ষেত্রকে পরিপ্লাবিত করে পশ্চিম দিকে বয়ে যেতে লাগলেন। অনেক তীর্থস্থান আছে সেদিকে। আমি পরমেশ্বরীর প্রসাদে সেই সব তীর্থের বিবরণ দেব।

অতি বড় পাপীও পুণ্য অর্জন করে এই তীর্থ স্মরণ করলে, দর্শন করলে এবং সেখানে স্নান করলে। বিষ্ণুকে স্মরণ করলে তার শরীর ও মন বিশুদ্ধ হয় তা পবিত্র ও অপবিত্র যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন।

মানুষ সকল পাপ থেকে মুক্ত হয় যদি সে বলে আমি কুরুক্ষেত্রে গিয়ে সেখানে বাস করব। ব্রহ্মজ্ঞান, গয়াশ্রাদ্ধ, গো গৃহে মৃত্যু এবং কুরুক্ষেত্রে বসতি–এই চারটি মানুষের পক্ষে মুক্তি বলে কথিত আছে। সরস্বতী ও দৃষন্বতী এই দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ ব্রহ্মাবর্ত দেশ নামে অভিহিত।

এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, সরস্বতী নদীর নিকটবর্তী অঞ্চলে বসবাস করলে ব্রহ্মময় জ্ঞান লাভ হবে।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ – পৃথ্বীরাজ সেন

দেবতা, ঋষি ও সিদ্ধগণ সর্বদা কুরুজঙ্গলের সেবা করেন। অন্তরে ব্রহ্মদর্শন করতে পারে সেই মানুষ যে ওই স্থানের সেবা করবে।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

চঞ্চল মনুষ্য জন্ম লাভ করে যেসব মুমুক্ষু পুরুষ একমনে সেখানে তপস্যা করেন অথবা যেসব দুষ্কৃতকারী ব্যক্তি নিত্য সেই স্থানে বাস করে, তারা সবাই বহু জন্মের সঞ্চিত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে অন্তরে সনাতন দেবের দর্শন লাভ করে থাকে।

সাক্ষাৎ ব্রহ্মবেদী রূপে নির্দিষ্ট কুরুক্ষেত্র। এর নিকটবর্তী হল ব্ৰহ্ম সরোবর, সেখানে না গেলে মানুষের পক্ষে ব্রহ্মপদ লাভ করা সম্ভব নয়।

যদিও বা নক্ষত্র ও তারকা রাজির পতন ভয় আছে, কিন্তু এই স্থানের সেবা করলে অথবা কুরুক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটলে কখনো পতিত হতে হয় না।

সব বাসনা সিদ্ধ হয় কুরুক্ষেত্রে গিয়ে।

সেখানে অবস্থিত হ্রদে ভক্তি করে স্নান করে নিয়ম সহযোগে ব্রহ্ম সরোবর প্রদক্ষিণ করে রন্তুক তীর্থে গিয়ে সরস্বতী নদীর জলে স্নান করে, তারপর সেখানে স্থিত যক্ষকে দর্শন ও প্রণাম করে এবং নৈবেদ্য নিবেদন করে তাকে একথা বলবে–তোমার প্রসাদে আমি, বন, নদী ও তীর্থ সমূহ পর্যটন করবো, তুমি সর্বদা আমার বাধা বিঘ্ন দূর করে দিও।

৩২

ঋষিগণ লোমহর্ষণের নিকট বিনীত অনুরোধ করে বললেন, আপনি অনুগ্রহ করে বিশদভাবে বলুন সাতটি বন, সাতটি নদী, সমগ্র তীর্থ ও সেই সেই তীর্থস্থানের ফল কিরূপ এবং যে যে বিধানে, যে যে তীর্থের ভ্রমণে যেরূপ ফললাভ হয় তার বিস্তৃত বিবরণ প্রদান করুন।

ময় দানব প্রভৃতি দৈত্যগণ নন্দীর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যে যেদিকে পারল প্রাণ ভয়ে পালিয়ে গেল। তখন প্রচণ্ড প্রহারে নন্দীকে ধরাশায়ী করে দিল তারকাসুর।

মহাদেবের সৈন্যদের রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখে শতরূপ ধারণ করলেন গিরিবালা। ফলে অন্ধক চারদিক থেকে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল এই দেবীদের দ্বারা। এদের মধ্যে গিরিবালা গৌরীকে তিনি চিনতেই পারলেন না।

তিনি যে প্রকৃত দেবীকে দেখতে পেলেন না তার কারণ জান্ধ, মদোন্মত্ত ও লোভাক্রান্ত এই চার প্রকৃতির ব্যক্তির কোনো দৈব দর্শন শক্তি থাকে না।

সুতরাং অন্ধক গিরিবালাকে প্রাণপণ চেষ্টা করেও দেখতে পেল না। সমস্ত দেবীই তার কাছে যুবতী গৌরী বলে মনে হল। কিন্তু তাদের সে ধরতে পারল না। তখন অস্ত্রাঘাতে অন্ধককে ধরাশায়ী করে দিয়ে দেবী অন্তর্হিত হলেন।

দানব দলপতিরা অন্ধকের অবস্থা দেখে গর্জন করতে করতে রণোন্মত্ত হয়ে ছুটে এল। দানবদের এই গভীর যুদ্ধ নিনাদ শুনে গণেশ্বর যুদ্ধ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন।

দানবরা তাঁর কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথেই ইন্দ্রের মতো বজ্রাঘাতে পরাজিত করলেন দানবসেনাদের, তারপর তিনি দেবী অম্বিকার চরণ বন্দনা করলেন।

তখন দেবী তার মূর্তিদের মর্ত্যলোকে চলে যেতে বললেন। যাতে তারা মর্তবাসীদের কাছে পূজা পায়। তাদের বাসস্থল নির্দিষ্ট হল উদ্যান, বন, বনস্পতি ও সর্বজাতীয় বৃক্ষে। তারা যেন নিশ্চিন্ত চিত্তে সেখানে চলে যায়। তখন তারা দেবী অম্বিকাকে প্রণাম করে, নানা দিকে প্রস্থান করলেন। তাঁদের স্তব করতে লাগলেন কিন্নরগণ।

অন্ধকাসুর সংজ্ঞা লাভ করে গিরিনন্দিনীকে দেখতে না পেয়ে তার অনুচরদের মতো নিজেও পাতালে পালিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে কামানলে জর্জরিত হয়ে দিনের আহার, রাতের নিদ্রা ছেড়ে দিল এবং গৌরীর অনুপম রূপের কথা সর্বক্ষণ চিন্তা করতে লাগল।

৩৩

নারদ পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইলেন, নন্দীকে নিয়ে অম্বিকা যখন মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ রত ছিলেন, তখন ভগবান শঙ্কর কোথায় ছিলেন? পুলস্ত্য জানালেন যে, ভব হাজার বছর ধরে মহামোহে নিমগ্ন থাকার ফলে নিস্তেজ ও হীনবল হয়ে পড়েন।

মহেশ্বর নিজের তেজ কমে যাবার ফলে তপস্যা করতে উদ্যোগী হন। ভগবান তখন এক মহাব্রতের অনুষ্ঠান করলেন এবং দেবী অম্বিকাকে আশ্বস্ত করে ও পর্বত প্রভৃতিকে তাঁর রক্ষকরূপে নিযুক্ত করে ধরাতলে বিচরণ করতে লাগলেন। তিনি সেখানে মহামুদ্রার ভঙ্গিতে সমাসীন ছিলেন।

তাঁর গলদেশে জড়ানো ছিল মহাসর্প, মহাশঙ্কু মেখলা ছিল কোমরে। ডানহাতে ভিক্ষাপাত্র ও বাম হাতে কমণ্ডল। তিনি বৃক্ষ, পর্বত, পর্বতের তলদেশ, নদ-নদী প্রভৃতি স্থানে একদিন করে বাস করতে লাগলেন। তিনি সমগ্র ত্রিভুবনেই ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। শুধুমাত্র ফল, মূল, জল ও বায়ু খেয়েই তিনি ন’শো বছর কাটিয়ে দিলেন।

একদিন হিমালয় পর্বতের এক শিলাতলে বসে মহাদেব মুখের ভিতর এক খিলি পান ফেলে দিয়ে একেবারে নিরুদ্যম হয়ে পড়লেন। তারপর এই পানের খিলি পরমেশ্বর শঙ্করের মস্তক বিদীর্ণ করে বিশাল দুটা জালের মধ্যে থেকে মাটিতে পড়ে গেল। সেই স্থান তীর্থশ্রেষ্ঠ পবিত্র কেদার নামে বিখ্যাত হল।

এরপর মহাদেব কেদার তীর্থের উদ্দেশে এরূপ বরদান করলেন–যেসব ব্যক্তি সংযমী হয়ে ও মধু, মাংস ভক্ষণ থেকে বিরত হয়ে ব্রহ্মচারী হয়ে এবং পরানে পরান্মুখ হয়ে ছ’মাস পর্যন্ত ব্রত পালন করবে, তাদের হৃদয়মন্দিরে এই শিবলিঙ্গ নিশ্চিতই বিরাজ করবেন।

পাপকাজে তার কখনও মতি হবে না যার হৃদয়ে শিবলিঙ্গ সর্বদা বিরাজ করবে। অক্ষয় হবে তার পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধ। অক্ষয় হয়ে থাকবে এই কেদার তীর্থে স্নান, দান, তপস্যা, হোম কিংবা জপ বা যে কোনো সৎকার্যই। এখানে প্রাণ ত্যাগ করলে প্রাণীর পুনর্জন্ম হয় না।

এভাবে কেদার তীর্থ পবিত্র ও মোক্ষদায়ক হয়ে উঠেছে সাক্ষাৎ ত্রিলোচনের কাছ থেকে বর লাভ করে। এরপর ভানুনন্দিনী কালিন্দী নদীর জলে স্নান করতে গেলেন ভগবান হর। তিনি কালিন্দীর জলে দাঁড়িয়ে দ্রুপদাদি ও গায়ত্ৰীমন্ত্র জপ করতে লাগলেন। হর এরপর সরস্বতীর জলে দেড় বছর নিমগ্ন হয়ে থাকলেন।

এতে ব্রহ্মা থেকে আরম্ভ করে চতুর্দশ ভুবন ও সপ্ত সাগর পর্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ল। নক্ষত্র ও তারকারাজি পৃথিবীতে খসে পড়তে লাগল।

ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাদের আসন নড়ে উঠল। ‘জগতের মঙ্গল হোক’ বলে মহর্ষিরা জপ করতে লাগলেন। দেবতারা এই মহা আলোড়নের কারণ জানার জন্য ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ব্রহ্মা দেবতাদের বললেন, তিনিও এর কারণ বুঝতে পারছেন না। তখন সকলে মিলে বিষ্ণুর কাছে গেলেন এর কারণ জানতে।

এরপর নারদ, পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইলেন, মুরারি কে? তিনি দেব, যক্ষ, কিন্নর, দৈত্য, রাক্ষস কিংবা রাজা যেই হোন না কেন, তার কথা শুনতে চাই। পুলস্ত্য বললেন–সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ–এই তিন গুণের আধার অথচ গুণবান হয়েও নির্গুণ, সর্বগামী, সর্বব্যাপী মধুসূদনই মুরারি।

এবার নারদ জানতে চাইলেন মুর নামক দানব কার পুত্র ছিলেন এবং বিষ্ণু তাকে কিভাবে যুদ্ধে নিহত করেছিলেন? পুলস্ত্য তখন এই বিচিত্র পুণ্যপ্রদ ও পাপনাশক পুরাণকাহিনি বলতে শুরু করলেন।

একসময় নুর নামক দানব ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করতে কঠোর তপস্যায় রত হল। ব্রহ্ম তুষ্ট হয়ে তাকে বললেন,–বর চাইতে।

তখন সেই দানব ব্রহ্মার কাছে এই বর চাইল যুদ্ধক্ষেত্রে যাকেই যে হাত দিয়ে স্পর্শ করব সে যেন অমর হলেও মৃত্যু মুখে পতিত হয়। ব্রহ্মা তার প্রার্থনার সম্মত হলেন। এই বর পেয়ে মহাতেজস্বী মুর দেবলোকে এসে দেব, যক্ষ, কিন্নর সবাইকেই তার এই বরলাভের খবর জানিয়ে দিল।

ফলে কেউ তার সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে এল না। মুর ইন্দ্র ভবনে গিয়ে বলল–আমার সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো স্বর্গ ত্যাগ কর। ইন্দ্রও তখন স্বর্গরাজ্য ত্যাগ করে ভূতলে চলে এলেন।

ইন্দ্রের বজ্র ও ঐরাবত মুর-এর দখলে চলে গেল। ইন্দ্র কালিন্দী নদীর দক্ষিণ তীরে নগর প্রতিষ্ঠা করে পুত্র, স্ত্রী ও অন্য দেবতাদের সাথে সেখানে বাস করতে লাগলেন।

ময় এবং অন্য প্রচণ্ডস্বভাব দানবেরা সে সময় মুর দৈত্যের শরণাপন্ন হয়ে স্বর্গবাসী হল এবং দেবতাদের মতো নানাপ্রকার আমোদ প্রমোদে কাল কাটাতে লাগল।

মহাসুর পৃথিবীতে একাকী হাতির পিঠে চেপে সরযু নদীর তীরে সূর্যবংশীয় রঘুরাজাকে এক যজ্ঞের আয়োজন করতে দেখলেন। দৈত্যপতি সূর্যবংশীয় সেই রাজাকে তার সাথে যুদ্ধ করতে বললে, তিনি যুদ্ধ না করে যজ্ঞ করতে রত হলেন। মহামতি তপস্বী মিত্র বরুণ নন্দন বশিষ্ট তাই বললেন–মনুষ্য সমাজ তো তোমার কাছে পরাজিত হয়েই আছে।

তাই তাদের জয় করবার প্রয়োজন নেই। যারা এখনও বশ্যতা স্বীকার করেনি তাদের জয় করো। একান্তই যুদ্ধ করতে চাইলে যমরাজাকে পরাজিত কর। তিনি বললেন–যম অতি বলবান। তিনি তোমার শাসন গ্রাহ্য করেন না। তাঁকে জয় করতে পারলে অন্য সবাই বশীভূত হবে।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

বশিষ্ঠের কথা শুনে দৈত্যরাজ যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করল। যম খবর পেয়ে মহিষের পিঠে চেপে কেশবের কাছে চলে গেলেন। তাকে অভিবাদন করে দৈত্যের কার্যকলাপ নিবেদন করলেন। কেশব ওই দৈত্যরাজকে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে বললেন। যমরাজ বাসুদেবের কথা শুনে শীঘ্র চলে এলেন। যমরাজের নগরে মুর এসে হাজির হলেন।

তাকে দেখে যম বললেন–তুমি আমার কাছে যা চাইবে তাই আমি দেব। মুর তখন যমকে প্রজাশাসন করা বন্ধ করতে বলল। তার আদেশ অমান্য করলে মস্তক ছেদন করে ভূতলে নিক্ষেপ করবেন।

যম তখন বললেন–মুর তুমি যদি প্রজা নিয়ন্ত্রণ ও তাদের রক্ষা করতে পারে তবে আমি আমার আদেশ পালন করবে। মুর তখন জানতে চাইল, তার চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে। যম বলল শঙ্খ-চক্র গদাধারী বিষ্ণু আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী। তিনিই প্রদানের নিয়ন্ত্রণ করেন। মুর তখন বিষ্ণুর অবস্থান জানতে চাইল।

যম তাকে ক্ষীরোদ সাগরে চলে যেতে বললেন। বিষ্ণু সেখানে আছেন বললেন। মুর বলল–যতদিন নত্রা আমি বিষ্ণুকে হত্যা করে প্রত্যাবর্তন করি, তত দিন যেন কেউ ধর্মনাদায়ন মানুষদের দমন না করে। একথা বলে ক্ষীরোদ সাগরের উদ্দেশ্যে মুর যাত্রা করল। নারদ এবার পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইল, বিষ্ণুকে চতুর্মুর্তি কেন বলা হয়।

পুলস্ত্য বললেন, বিষ্ণু সর্বত্রগামী, অব্যক্ত মূর্তি এক হলেও যে কারণে তাঁকে চতুর্মূর্তি বলা হয়। তাই বলছি শোনো, বাসুদেব-এর নাম পরমাগত, অব্যক্ত অতর্ক, আনন্দিত প্রভৃতি কিভাবে হয়েছে এবং বিষ্ণু সম্বন্ধীয় দ্বাদশ পত্ৰই বা কী? পুলস্ত্য বললেন, এ ব্যাপারে স্বয়ং ব্রহ্মর গূঢ় তত্ত্বকথা বর্ণনা করছি।

নারদ জানতে চাইলেন যে, এই সনকুমার কে? পুলস্ত্য তখন বললেন, অহিংসা ধর্মের পত্নীর নাম। অহিংসার চার পুত্র। তারা সকলে যোগাভ্যাস করতেন। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সনৎকুমার, দ্বিতীয় সনাতন, তৃতীয় সনক ও চতুর্থ সনন্দন।

যোগসাধনা ও তপস্যার আধার ছিলেন সাংখ্যবেত্তা কপিল। যোগসাধনায় পারদর্শিতা দেখে জ্যেষ্ঠ হয়েও কনিষ্ঠকে উচ্চাসন দান করেন। তিনি কপিলকে মৌন গুহ্য মহাযোগ সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছিলেন। এক দিন সনকুমার ব্রহ্মার কাছে যোগজ্ঞান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন।

পদ্মযোনি ব্রহ্মা তখন বললেন, তুমি সাংখ্যযোগসাধনা সম্বন্ধে ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করেও যদি আমার কাছে জ্ঞানতত্ত্ব শুনতে চাও, পুত্র রূপে তাহলে আমার কথা মতো কাজ করো। সনৎকুমার বললেন, –আমি তার পুত্ৰই, কারণ ব্রহ্মা আমার গুরু। গুরু ও শিষ্যের মধ্যেকার সম্পর্ক পিতা ও পুত্রের।

ব্রহ্মা বললেন–ধর্ম কর্মের আচরণ ভেদে শিষ্য ও পুত্রের মধ্যে কিছু বিশেষত্ব আছে। পুন্নাম নরক থেকে ত্রাণ করে বলে তার নাম পুত্র আর শেষ অর্থাৎ পাপ হরণ করে বলে তার নাম শিষ্য। বেদে এইরূপই বলা আছে। সনকুমার ব্রহ্মকে জিজ্ঞাসা করলেন-পুত্র যা থেকে পরিত্রাণ করে সেই পুন্নম নরক কী?

যা হরণ করার জন্য শিষ্য নাম হয়েছে, সেই শেষ অর্থাৎ পাপ কাকে বলে? ব্রহ্মা তাকে সেই পরম পবিত্র পুরাতন কাহিনি বলতে বললেন। এই কাহিনি যোগাঙ্গ সম্পন্ন ও উৎকট ভয় বিনাশক এবং ভক্তিভরে তা শুনলে সমস্ত পাপ দূর হয়ে যায়।

৩৪

ব্রহ্মা বললেন–পরস্ত্রী গমন, পাপাত্মাদের সাথে সংসর্গ এবং সব প্রাণীর প্রতি কঠোর ব্যবহার প্রথম নরক। ফল অপহরণ, নিষ্ফল পর্যটন এবং বৃক্ষাদি ছেদন এগুলি দ্বিতীয় নরক। হেয় দ্রব্য গ্রহণ, অবধ্যের বন্ধন এবং বন্ধুবান্ধবের সাথে বিবাদ–এই সমস্ত তৃতীয় নরক নামে অভিহিত।

অন্যের মনে অকারণ ভয় ঢুকিয়ে তার সংসার নষ্ট করা এবং স্বধর্ম ত্যাগ করা হল চতুর্থ নরক। হিংসা, বন্ধুদের মিথ্যা বলা হল পঞ্চম নরক। ফল জাতীয় জিনিস চুরি করা, ব্রাহ্মণদের নিন্দা করা ও লোকের ওপর অকারণ অত্যাচার করা, যোগসাধনে বাধা সৃষ্টি করা ষষ্ঠ নরক। মোহ বশে রাজভোগ হরণ, রাজপন্থীর গমন এবং রাজার ক্ষতি সাধন সপ্তম নরক।

লোভ, লোলুপতা ও লব্ধ ধর্মার্থের নাশ অষ্টম নরক। ব্রাহ্মণদের ধনসম্পত্তি চুরি, ব্রাহ্মণদের নিন্দা এবং বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনের সাথে ঝগড়া করা নবম নরক। শিষ্টাচার মেনে না চলা, শিষ্ট লোকদের প্রতি হিংসা করা, শিশুকে শাস্ত্ৰচৌর্য ও ধর্মচৌর্য শিক্ষা এই সকল দশম নরক বলে প্রসিদ্ধ।

ষড়াঙ্গ সংহার ও ষাড়গুণ্য প্রতিষেধ–এই দুটি একাদশ নরক, সাধুজনের নিন্দা, সর্বদা চুরি প্রভৃতি অসৎ কাজ করা এবং সংস্কার মেনে না চলা দ্বাদশ নরক নামে অভিহিত। ধর্ম ও কর্মের অপচয় অপবর্গে অপক্ষয় ও সম্বিৎ সম্বোধন ত্রয়োদেশ নরক। ধর্মবর্জিত দান ও অগ্নি প্রদান চতুর্দশ নরক।

এই নরক অত্যন্ত গর্হিত। অজ্ঞান, অসূয়া, অশৌচ এবং অসত্য বাক্য এগুলি পঞ্চদশ নরক। আলস্য, ক্রোধ, পরগৃহে অগ্নিদান, পরস্ত্রী বাসনা, শাস্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধা, অপরের প্রাণ নাশের চেষ্টা ও ঔদ্ধত্য এগুলি ষোড়শ নরক। এটি খুবই নিন্দিত নরক।

পুরুষ যদি উল্লিখিত পুন্নাম নরকে লিপ্ত হয়ে পুত্রের জন্মদান করেন এবং পরবর্তীকালে জগৎপতি জনার্দনকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, তাহলে তিনি এই ঘোরতর পুন্নাম নরক বিনাশ করে থাকেন। এজন্যেই পুত্র এই নাম হয়েছে। এখন শেষ পাপের লক্ষণ বলছি।

দেব, ঋষি, ভূত, নর ও পিতৃ পুরুষের উদ্দেশে যে দ্রব্য দান করা হয়েছে তার প্রতি লোভ, পরধনে লোভ, সর্ব বর্ণে একতা, ওঁকার থেকে নিবৃত্তি, পাপীদের সাথে সংসর্গ, এমন কি তাদের কথা মনে মনে চিন্তা করা, গুরুজনদের নিন্দা, গুরু পত্নীর প্রতি লোভ, ঘি-জাতীয় জিনিস বিক্রি, চণ্ডাল প্রভৃতি নিম্ন বর্ণের সাথে সংসর্গ, নিজের দোষ গোপন রেখে পরের দোষ প্রকাশ করা, নিষ্ঠুরতা, কুকথা, অধর্মবাহ নাম গ্রহণ, অধর্ম সেবা এই সকল ।

পাপ মানুষকে নরকের পথে নিয়ে যায়।

এই পাপ পরম্পরায় লিপ্ত হয়েও যদি জ্ঞানগুরু শঙ্করকে সন্তুষ্ট করা যায়, তবে শেষ পাপ সমূলে বিনষ্ট হয়ে থাকে। তাছাড়াও কায়িক, বাঁচিক ও মানসিক পাপ এবং পিতা, মাতা, ভাই, বন্ধু ও আশ্রিতজনের যাবতীয় ইহলোকের পাপ বিনষ্ট হয়। পুত্র ও শিষ্যের এই ধর্ম।

সুতরাং শিষ্য লাভের জন্য সচেষ্ট হবেন গুরু যদিও শিষ্যও শেষ বা পাপ থেকে উদ্ধার করে, কিন্তু পুত্র সমস্ত পাপেরই পরিত্রাতা। পুত্র ও শিষ্যের এই অর্থ স্বীকার করলে শিষ্যের থেকেও পুত্রের স্থান অনেক ওপরে।

পুলস্ত্য বললেন, সনৎ কুমার ব্রহ্মার মুখে একথা শুনে বললেন–আমি তিন সত্য করে বলছি, আমি ব্রহ্মার পুত্র, সুতরাং যোগসাধনা সম্বন্ধে আপনি আমাকে উপদেশ দিন। ব্রহ্মা বললেন–আমি সনকুমারকে তবেই যোগ বিষয়ে উপদেশ দেব, যদি তোমার পিতা মাতা তোমাকে আমার হাতে দান করেন।

কারণ তখনই তিনি ব্রহ্মার প্রকৃত পুত্র হবেন। সনৎকুমার তখন ব্রহ্মাকে পরিষ্কার অর্থবহ করে কথা বলতে বললেন। ব্রহ্মা তখন সহাস্য বদনে বললেন–এই প্রকার পুত্রের কথা বলা হয়ে থাকে।

যথা–ঔরস, ক্ষেত্রজ, দত্তক, কৃত্রিম, গুড়োৎপন্ন, অপাপবিদ্ধ ঋণ, পিণ্ড, ধন, ক্রিয়া, গোত্ৰসাম্য, কোকিলবৃত্তি ও শাশ্বতী প্রতিষ্ঠা–সমস্ত উক্ত প্রকার পুত্রের ওপরেই নির্দিষ্ট হয়েছে।

এছাড়া আরো পাঁচ-প্রকার পুত্র হল–কানীন সহায়, ক্রীত, পৌনৰ্ভব, স্বয়ংদত্ত ও পারশব। এই শেষোক্ত পুত্রদের সম্বন্ধে ঋণ, পিণ্ড প্রভৃতি কোনো কথারই উল্লেখ নেই। এরা কেবল গোত্র নাম ধারী ও কুলসম্মত। সনৎকুমার এই সকল পুত্রের কথা ব্রহ্মাকে সবিস্তারে বলতে বললেন। ব্রহ্মা বলতে

ক্লীব, উন্মত্ত কিংবা বাসনাসক্ত হয়, তাহলে তার অনুমতি নিয়ে পত্নী যদি অন্য কারো দ্বারা পুত্র উৎপাদন। করে তবে তার নাম ক্ষেত্ৰজ পুত্র হবে।

পিতা-মাতা যদি অন্য কাউকে পুত্র দান করে তাহলে সেই পুত্র দত্তক নামে অভিহিত হয়। মিত্র দত্ত, মিত্র পুত্র কৃত্রিম পুত্র বলে অভিহিত হয়ে থাকে। যে গৃহজাত পুত্রের জন্ম দাতা অপরিজ্ঞাত, তার নাম গুড়োৎপন্ন।

আর বাইরে থেকে স্বয়ং আনীত পুত্রের নাম অপবিদ্ধ, কন্যা থাকাকালীন পুত্রের জন্ম হলে তার নাম কানীন। বিবাহিত স্বগর্ভা স্ত্রী গর্ভজাত পুত্র সহায়। এবং মূল্যদানে গৃহীত পুত্রের নাম ক্রীত। যে কন্যাকে একজনের সাথে বিবাহ দিয়ে আবার অন্য কারুর হাতে সম্প্রদান করা হয়, তার গর্ভজাত সন্তানের নাম পৌনৰ্ভব।

দুর্ভিক্ষে, বাসনাকালে কিংবা অন্য কোনো কারণে যে ব্যক্তি আত্ম সমর্পণ করে তাকে স্বয়ং দত্ত পুত্র নামে অভিহিত করা হয়। বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত শূদ্রাণীর গর্ভে ব্রাহ্মণ কর্তৃক যে পুত্র উৎপাদিত হয় তার নাম পারশব, এ কারণে তুমি নিজে নিজেকে দান করতে পারো না। অতএব তোমার পিতা মাতাকে ডেকে নিয়ে এসো।

ব্রহ্মার কথায় সনকুমার পিতা-মাতাকে স্মরণ করলেন। স্মরণ করা মাত্রই তারা পিতামহের দর্শন লাভ করার জন্যে সে স্থানে এসে হাজির হলেন।

তারা পিতামহ ব্রহ্মাকে ভক্তি ভরে প্রণাম করে বললেন–আমাদের কী করতে হবে, বলুন। তখন সনৎ কুমার বাবা-মাকে বললেন–আমি যোগ বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভের জন্যে ভগবান ব্রহ্মাকে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তিনি এজন্যে আমাকে তাঁর পুত্র হতে বলেন। অতএব পুত্ররূপে আপনারা আমাকে তার হাতে দান করুন।

পুত্রের অনুরোধ অনুসারে তারা যোগ গুরু পিতামহ ব্রহ্মাকে বললেন–এই সনৎকুমার এতদিন পর্যন্ত আমাদের সন্তান ছিলেন, কিন্তু এখন আপনারই পুত্র হলেন। একথা বলেই তারা স্বর্গলোকে চলে গেলেন।

সনৎকুমারকে ব্রহ্মা দ্বাদশপত্ৰক যোগ সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে বললেন–ওঁকার-এর শিক্ষা স্থিত, শেষ শিরোদেশে বিরাজিত। বৈশাখ মাস প্রথম পত্র, ন-কার সুখস্থিত, বৃষ এখানে বিরাজিত এবং জ্যৈষ্ঠ মাস তার দ্বিতীয় পত্র, ম-কার বহু যুগান, কর্কট তাতে অবস্থিত এবং শ্রাবণ মাস তার চতুর্থ পত্র নামে অভিহিত।

গ-কার হৃদয়, সিংহ সেখানে অধিষ্ঠিত এবং আশ্বিন মাস তার ষষ্ঠ পত্র, ত-কার মন নামে খ্যাত, তুলা সেখানে বিরাজমান ও কার্তিক মাস তার সপ্তম পত্র নামে পরিচিত। ব-কার নাভিদেশ, বৃশ্চিক সেখানে অধিষ্ঠিত এবং অগ্রহায়ণ মাস অষ্টম পত্র নামে পরিচিত।

সু-কার জখম স্থল, ধনুর সেখানে বিরাজিত এবং পৌষ মাস তার নবম পত্র। দ-কার পদযুগল, তিমির সেখানে অবস্থিত এবং বিখ্যাত মাঘ মাস তার দশম পত্র নামে পরিচিত।

ব-কার জানুযুগল, কুম্ভের তাতে অধিষ্ঠান এবং ফাল্গুন মাস একাদশ পত্র। য-কার পাদযুগল মীন। সেখানে অধিষ্ঠিত এবং চৈত্রমাস তার দ্বাদশ পত্র। কেশবের চক্র দ্বাদশ নেমি ও দ্বাদশ নাভিযুক্ত, পরমেশ্বর স্বয়ং ত্রিবাহু ও এক মূর্তি। উক্ত এই দ্বাদশ পত্র ভগবানের রূপ। এই রূপ পরিজ্ঞাত হলে পুনরায় আর মরণ হয় না।

ভগবানের দ্বিতীয় মূর্তি সত্ত্বগুণময় চতুর্বর্ণ, চতুর্মুখ ও চতুবাহুযুক্ত এবং শ্রীবৎস চিহ্নে অঙ্কিত। এর অঙ্গ সমূহ উদার এবং কোনো সময়েই বিনষ্ট হয় না। তৃতীয় শেষমূর্তি তামস, এই মূর্তি সহস্র রূপে বিরাজিত ও সহস্রবদনে শোভিত। তাঁর শ্রীসম্মত অপূর্ব এবং সেটি প্রজাবর্গের ধ্বংসকারী।

চতুর্থ মূর্তি রজোগুণময়। তা রক্তবর্ণ, চতুর্মুখ, দ্বিভূজশালী ও বনমালায় বিভূষিত। এই মূর্তিই সৃষ্টিকর্তা আদি পুরুষ। এই ব্যক্ত তিন মূর্তিই অব্যক্ত থেকে আবির্ভূত হয়েছেন। বিষ্ণুর এই অতি প্রাচীন চতুর্ভূজ রূপের বর্ণনা তোমাকে দিলাম। দুবৃত্ত মুর যমরাজের কথামতো বিষ্ণুর কাছে এল। মধুসূদন তাকে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি কেন আমার কাছে এসেছ?

মুর বলল–আমি তোমার সাথে আজ যুদ্ধ করব বলে এখানে এসেছি। বিষ্ণু বললেন–যদি তুমি আমার সাথে যুদ্ধ করার জন্যেই এসে থাক, তবে তোমার বুক কাঁপছে কেন? জরাতুর ব্যক্তি যেমন বারবার কেঁপে কেঁপে ওঠে, তোমারও দেখছি সেই অবস্থাই হচ্ছে।

তোমার মতো ভয়ার্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুতরাং আমি যুদ্ধ করব না। এই শুনে মুর তৎক্ষণাৎ নিজের বুকে হাত রাখল এবং কে কোথায় কিভাবে ইত্যাদি বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

হরি তখন চক্র নিক্ষেপ করে তার দেহ ছিন্ন করে দিলেন। মুর নিহত হলে দেবতারা দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুর চরণবন্দনা করতে লাগলেন। পুলস্ত্য নারদকে বললেন, ভগবান শ্রীহরি কি করে মুরকে। বধ করেছিলেন তা শোনালাম। মুর বধের পর থেকেই বিষ্ণু নরসিংহ মুরারি নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছেন।

৩৫

পুলস্ত্য বললেন–তারপর দেবগণ বিষ্ণু মুরারি সদনে গিয়ে তার পাদবন্দনা করে জগৎ সংক্ষু হয়ে ওঠার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। এরপর তারা সকলে মিলে শিবের ভবনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ শিবের পক্ষেই সবটা জানা সম্ভব।

সকলে বাসুদেবের সাথে মন্দার পর্বতে হাজির হলেন। কিন্তু তারা সেখানে হর, পার্বতী, কার্তিকেয় দেখতে পেলেন না। তারা গিয়ে দেখলেন সেই পর্বত শূন্য। দেবতাদের বিমূঢ় অবস্থা দেখে ভগবান বিষ্ণু বললেন–তোমাদের সামনে দণ্ডায়মান মহেশ্বরকে তোমরা কি দেখতে পারছো না?

দেবতারা বললেন–আমাদের দৃষ্টিশক্তি প্রতিহত হচ্ছে কেন? আমরা সত্যই দেবকে দেখতে পারছি না। বিষ্ণু বললেন–তোমরা স্বার্থের জন্যে দেবীর গর্ভ নষ্ট করে মহা পাপ করেছে।

তাই ভগবান শূলপানি তোমাদের বিবেক লুপ্ত করেছেন। অতএব, ভগবানের দর্শন পেতে হলে তপ্তকৃচ্ছ দ্বারা কায়াশোধন করে শুদ্ধি লাভ করতে হবে। প্রথমে একশো কলস ক্ষীর দিয়ে স্নান, পরে চৌষট্টি কলস দধি দিয়ে স্নান, বত্রিশ কলস হরি দিয়ে স্নান ও পঞ্চগব্যের জন্য ষোলটি কলস বিহিত হয়েছে।

আটটি মধুপূর্ণ কলস-এর দ্বিগুণ জল, কলস স্নানের জন্য উপকল্পিত করবে। পরে একশো আটটি কলস, রোচনা, কুঙ্কুম, চন্দন প্রভৃতি দিয়ে দেবকে ভক্তি ভরে অনুলিপ্ত করার পর বেলপাতা, পদ্ম, চন্দন, অগরু, কর্পূর, মন্দার, পারিজাত প্রভৃতি দিয়ে মহাদেবের অর্চনা করবে এবং রুদ্রের ঋকবেদীয় শতনাম জপ করবে।

এসব অনুষ্ঠান যথাবিধি করলে দেবদেবের দর্শন লাভ করতে পারবে, নতুবা দর্শন লাভ অসম্ভব।

বাসুদেব একথা বলার পর দেবতারা তার কাছে জানতে চাইলেন–ভগবান, যে তপ্তকৃচ্ছ ব্রত পালন করলে সর্বকালীন দেহশুদ্ধি হয়ে থাকে, সেই তপ্তকৃচ্ছের বিধি নিয়ম কী?

বাসুদেব বললেন–তিন দিন গরম জল, তিন দিন শুধু মাত্র গরম দুধ ও তিন দিন শুধুমাত্র গরম ঘি পান করতে হয় এবং পরবর্তী তিনদিন শুধুমাত্র বায়ু ভোজন করতে হবে। তাছাড়া এরপর প্রতিদিন চারপল জল, আট পল দুধ ও দুপল ঘি পান করা কর্তব্য।

বাসুদেবের কাছে বিধি নিয়ম জেনে নিয়ে দেবতারা দেহশোধনের জন্য তপ্তকৃচ্ছ ব্রত আচরণ করলেন। এবং তারা পাপ মুক্ত হলেন।

ব্রত শেষ হবার পর দেবগণ নিষ্পাপ হয়ে বাসুদেবকে বললেন–ভগবান, মহাদেব কোথায় অবস্থান করছেন? আমরা তার অভিষেক ক্রিয়া সাধন করতে চাই দুধ প্রভৃতি, উপকরণ দিয়ে। বিষ্ণু জানালেন–মহাদেব আমার দেহে বিরাজমান, তিনি যোগবলে আমার দেহে প্রতিষ্ঠিত আছেন।

দেবতারা বললেন–আমরা, মহাদেবকে এখনও দেখতে পাচ্ছি না। তারা মহেশ্বর কোথায় আছে জানতে চাইলে, হরি তখন তাদের অন্তরঙ্গ শিবলিঙ্গ দেখালেন।

দেবতারা তখন ঐ অবিচল অব্যয় শিবলিঙ্গ স্নান করাতে আরম্ভ করলেন দুধ দিয়ে। তারা লিঙ্গরূপী শিবের পূজা করলেন সুরভি চন্দনে লিপ্ত করে। পরে বেলপাতা ও পদ্ম দিয়ে। তারপর ভক্তি ভরে ধূপ, জলে শিবের অষ্টোত্তর শতনাম জপ করলেন।

নারদ পুনরায় জানতে চাইলেন–হরি ও শঙ্কর একদেহে কি করে বিরাজ করছিলেন? পুলস্ত্য বললেন, ভগবান তখন বিশ্বমূর্তি ধারণ করেছিলেন।

তাঁর, তিন নয়ন, স্বর্ণ ও অহিকুণ্ডল জটা, গরুড়, বৃষভ, এবং হার ও ভূজঙ্গ দ্বারা ভূষিত, কটিদেশ পীত বসন ও আজিনে আচ্ছাদিত, তার হাতে চক্র, অসি, হল, শাঙ্গ, পিণাক, শূল, অজগরধনু, কৰ্পদ, ঘট, কপাল, ঘন্টা ও শঙ্খ বিরাজমান। দেবগণ সেই হরিহর মূর্তিকে ভক্তি ভরে প্রণাম করলেন।

তাদের চিত্ত তখন হরির প্রতি একনিষ্ঠ হল। দেবতাদের চিত্তের একাগ্রতা লক্ষ করে তাদের নিয়ে নিজ আশ্রম কুরুক্ষেত্রে চলে গেলেন হরি। সেখানে তারা জলমধ্যে মহেশ্বরের স্থানুমূর্তি দর্শন করলেন। এবং স্থানুকে আমরা নমস্কার করি’ বলে সেখানে বসে পড়লেন।

দেবরাজ ইন্দ্র বললেন–হে জগন্নাথ, আপনি এসে আমাদের বর দান করুন। আপনি জলের ভেতর থেকে উঠে আসুন। কারণ সমস্ত জগৎ শুদ্ধ হয়েছে। দেবতাদের মধুর বাক্য শুনে তিনি জলের ভিতর থেকে উঠে এলেন।

জগন্নাথও সকলকে প্রণাম করলেন। দেবতারাও তাকে প্রণাম করে বললেন– আপনি শীঘ্র আপনার মহাব্রত ত্যাগ করুন। কারণ ত্রিভুবন আপনার তেজে বিচলিত হয়ে উঠেছে। তখন তিনি সেই মহাব্রত ত্যাগ করলেন। দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে স্বর্গধামে গমন করলে রুদ্র ভাবলেন, ধরণী কেন কেঁপে উঠল?

মহাদেব মহর্ষি উশনাকে যবতী নদী তীরে তপস্যারত দেখতে পেলেন। তাঁকে তপস্যার কারণ জিজ্ঞেস করলেন এবং তাকে দ্রুত উত্তর দিতে বললেন। কারণ তার তপস্যার জগৎ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। উশনা বললেন–রুদ্রকে সন্তুষ্ট করার জন্যই আমি তপস্যা করছি।

আমি সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করতে চাই। মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে যথাযথ সঞ্জীবনী বিদ্যা দান করলেন। উশনা বর পেয়ে তপস্যা থেকে নিবৃত্ত হলেন। কিন্তু তবুও সাগর, পর্বত, বৃক্ষরাজিসমূহ সমগ্র ধরিত্রী বিচলিত হল। এবার মহাদেব সপ্ত সারস্বত তীর্থে গেলেন। দেখলেন মঞ্চনক নামক মহর্ষি বালকের মতো ভাবাবেগে পা ছুঁড়ে সবেগে নাচছেন। এতেই পৃথিবী কেঁপে উঠেছে।

মহাদেব তখন তাঁর দুই হাত ধরে সহাস্যবদনে বললেন–কেন তুমি এভাবে নৃত্য করছ? তার মনের আনন্দের কারণও জানতে চাইলেন। মহর্ষি মঞ্চনক তখন বললেন–আমি দেহশোধনের জন্য বহু বছর ধরে তপস্যা করছি।

শম্ভু তখন সেই মহর্ষিকে দেখালেন আঘাতে তার ক্ষতস্থান থেকে সাদা ছাই বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তথাপি তার কোনো আনন্দ হচ্ছে না। মহেশ্বর উচ্চারণ করলেনআপনি পাগলে পরিণত হয়েছেন। মঞ্চনক এবার সম্বিত ফিরে পেলেন।

মহেশকে প্রণাম করে নাচা বন্ধ করে সবিনয়ে তার চরণ যুগল বন্দনা করলেন। মহেশ্বর তাকে দুর্লভ ব্রহ্মলোকে চলে যেতে বললেন–ব্রহ্মার সাথে, এই পৃথুদক তীর্থে।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

মহেশ্বর বললেন–পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ ও সুমহান ফলপ্রদ হবে এই পৃথুদক তীর্থ। এখানে সুর, অসুর, গন্ধর্বে, বিদ্যাধর ও কিন্নরদের সমাবেশ ঘটবে। যাবতীয় পাপ বিদূরিত হবে এই তীর্থ দর্শনে এবং এটি ধর্মের প্রধান আধার রূপে পরিণত হবে।

সুপ্রভা, লক্ষ্মী, সুবেণী বিমলোদকা মহোদরা, ওখবতী, বিশাখা, সরস্বতী এই সপ্ত সরস্বতী এখানে নিত্য বিরাজ করবেন।

সকলকে সোমপানের ফল ও পরম পুণ্য দান করবে এই তীর্থ। আর আপনিও কুরুক্ষেত্রে গরীয়সী মূর্তি স্থাপন করে পরম পবিত্র আনন্দ ও দুর্লভ ব্রহ্মলোেকে উপনীত হবেন। মহেশ্বরের কথা শুনে মঞ্চনক কুরুক্ষেত্রে মহেশের লিঙ্গ মূর্তি স্থান করে ব্রহ্মলোকে চলে গেলেন

। তখন আবার পৃথিবী স্থির ও শান্ত হল। পবিত্র মন্দারচলে নিজ বাসভূমিতে এসে মহেশ উপনীত হলেন। এরপর পুলস্ত্য নারদকে বললেন, মহাদেব কেন তপস্যা করার জন্য নিজ বাসভূমি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এবং দেবীকে দেখার জন্য অন্ধকাসুর কেন শূন্য পর্বত ভূমিতে গিয়েছিল?

৩৬

নারদ এবার পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইলেন, অন্ধকাসুর পাতালে চলে গিয়ে কী করেছিল? অন্ধকাসুর কামানলে দগ্ধ হতে লাগল পাতালে গিয়েও। সন্তপ্ত হয়ে উঠল তার সর্বাঙ্গ। আমার, সকল দানবদের ডেকে বলল-যে ব্যক্তি সেই গিরিবালাকে নিয়ে এসে আমার হাতে তুলে দিতে পারবে, সেই আমার সুহৃৎ, বন্ধু ও মাতা-পিতা।

দৈত্যরাজের কথা শুনে প্রহ্লাদ মেঘ গম্ভীর স্বরে বললেন–যে গিরিনন্দিনীর প্রতি তুমি কামাতুরা হয়েছ তিনি ধর্মত তোমার মাতা। এবং তার স্বামী তোমার পিতা। পুরাকালে তোমার ধর্মনিষ্ঠ পিতা হিরণ্যাক্ষ অপুত্রক অবস্থায় পুত্রলাভের জন্য মহাদেবের আরাধনা করেন।

মহাদেব তাকে বর দিয়ে বললেন–আমি যোগমগ্ন হলে আমার কন্যা কৌতূহল বশে আমার চোখ ঢেকে দেয়, তখন জগৎ সংসার সব অন্ধকার হয়ে যায়। সেই অন্ধকার থেকে যে বর্ষাকালীন মেঘের মতো গর্জনকারী ভয়ংকর জীবের আবির্ভাব হয়, সে তোমারই যোগ্য পুত্র। মহেশ তাকেই গ্রহণ করতে বলেন।

কিন্তু এই পুত্র যখন দেবতাদের সাথে শত্রুতা করবে বা ত্রিলোকজননীর প্রতি অভিলাষী হবে, অথবা কোনো ব্রাহ্মণকে অপমান করে বধ করবে তখন তিনি নিজে তার প্রাণ নাশ করবেন।

একথা বলে শম্ভু মন্দার পর্বতে চলে গেলেন। তখন হিরণক্ষ্যও অন্ধককে নিয়ে পাতালে প্রবেশ করলেন। এ কারণেই উমা অন্ধকের জননী, তাছাড়া তুমি শাস্ত্রজ্ঞ, অশেষ গুণবান এবং সকল যুক্তিজ্ঞানের আধার। সুতরাং তোমার মনে এরূপ পাপ সংকল্প পোেষণ করা উচিত নয়, গিরিনন্দিনী সর্ব লোকের প্রভুর সহধর্মিনী, সুতরাং তাকে কামনা করা বৃথা।

তাকে পাওয়া অসম্ভব। প্রমথগণসহ মহাদেবকে পুরোপুরি পরাজিত না করতে পারলে এই বাসনা কখনই পূর্ণ হবে না।

যে শুধু হাতে সাগর অতিক্রম করতে পারবে, সূর্যকে আকাশ থেকে নামিয়ে আনতে পারবে, সেই ব্যক্তিই মহাদেবকে হারাতে পারবে। সুমেরু পর্বতকে উৎপাটিত করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারবে।

তুমি কি এই অসম্ভব সাধন করতে পারবে? প্রহ্লাদ আরো জানালেন, যে রাজা দনবাও পরস্ত্রী বাসনায় মুগ্ধ হয়ে রাজ্য সহ বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন দনুজ। দণ্ড নামে পূর্বে এক রাজা ছিলেন।

তার প্রচুর বলবাহন ছিল। এই রাজা ভার্গব শুক্রকে পুরোহিত রূপে বরণ করেন ও বিবিধ যাগযজ্ঞ করেন। ভার্গব শুক্রের সরজা নামে এক কন্যা ছিল। অসুররাজ বৃস্পৰ্বা তার ভবনে কোনো এক সময় তাকে সাদরে আপ্যায়ন করেন। তিনি বহুদিন রাজগৃহে বাস করতে থাকেন।

সর্বাঙ্গ সুন্দরী শুক্রকন্যা সরজা নিজ গৃহে অগ্নির চর্চায় কালাতিপাত করেন। রাজা দণ্ড একদিন শুক্রের আশ্রমে এসে জানতে চাইলেন, শুক্রাচার্য কোথায় আছেন?

আশ্রমের পারিচারিকাগণ বলল, ভগবান ভার্গব যাজন কার্যের জন্য বৃষপর্কর বাড়িতে গেছেন। রাজা জানতে চাইলেন, আশ্রমে কি কোনো রমণী আছে? তারা বলল–শুক্র নন্দিনী সরজা এখন আশ্রমে আছেন।

দণ্ড শুক্র কন্যাকে দেখার জন্য আশ্রমে প্রবেশ করলেন এবং তাকে দেখা মাত্রই দণ্ড কামবাণে জর্জরিত হলেন। দণ্ড তখন নিজ অনুচর ও শুক্রের শিষ্য মণ্ডলীকেও বিদায় দিয়ে একাকী সরজার কাছে গেলেন।

ভ্রাতৃজ্ঞানে তার আদর আপ্যায়ন করলেন সরজা। তখন রাজা বললেন, তিনি কামানলে দগ্ধ হচ্ছেন এবং আলিঙ্গন রূপ জল সিঞ্চনে তার দেহের তাপ প্রকাশিত করতে বললেন। সরজা সবিনয়ে বললেন–যে আপনি তো জানেন যে আমার পিতা রাগী, তার অভিশাপে দেবতারাও দগ্ধ হয়।

তাছাড়া ধর্মত আপনি আমার ভাই, আমি আপনার বোন। কারণ আপনি আমার পিতার শিষ্য। তখন দণ্ড বললেন–তোমার পিতার ক্রোধ অনলে হয়ত আমি ভবিষ্যতে দ্বগ্ধ হবো কিন্তু তোমার প্রতি কামানলে আমি এখনই দ্বগ্ধ হচ্ছি। তখন সরজা তাকে বলল–আপনি পিতাকে এ সম্বন্ধে বলুন, তিনি নিশ্চয়ই আমাকে আপনার হাতে দান করবেন।

সরজার কথা শুনে দণ্ড বললেন–অপেক্ষার মতো অবস্থা তার নেই। কারণ এর পরেই হোমের সময় হবে। শুনে সরজা বলল, নারীরা কখনই স্বাধীন নয়। তাই তার একান্ত অনুরোধ যে আপনি আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধব সহ পিতার অভিশাপে নিজেকে বিপন্ন করে তুলবেন না।

 

তখন দেবযুগে চিত্রাঙ্গদা কিরূপ আচরণ করেছিল তা শোনাতে লাগলেন দণ্ড! দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার চিত্রাঙ্গদা নামে এক সর্বাঙ্গ সুন্দরী যৌবনবতী কন্যা ছিলেন। একদিন নৈমিষারণ্যে স্নান করতে গেলেন সেই কমলা লোচনা তাঁর সখীদের নিয়ে। তিনি জলে নামার সাথে সাথেই সুদেব রাজার পুত্র সুরথ সেখানে এসে হাজির হলেন।

রাজকুমার যে মদনবাণে জর্জরিত হয়ে সেখানে গেছে চিত্রাঙ্গদা তা অনুমান করলেন। তাই তিনি কুমারকে আত্মদান করলেন। সখীগণ বললেন–তুমি বালিকা। তোমার পিতা ধর্মনিষ্ঠ ও সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী।

সুতরাং স্বতঃ প্রবৃত্ত হয়ে এই রাজনন্দনকে আত্মদান করা তোমার অনুচিত। রাজকুমার সুরথ মদনবাণে অভিভূত হয়ে চিত্রাঙ্গদার কাছে এসে তাকে বললেন–তোমাকে দেখেই আমি রূপে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। মদন তোমার দৃষ্টি বাণে আমায় দারুণভাবে আহত করেছে। আমি কামানলে ভস্মীভূত হয়ে যা, তোমার স্তন শয্যায় আমাকে স্থান না দিলে।

তখন সখীদের বারণ সত্ত্বেও চিত্রাঙ্গদা তাঁকে আত্মদান করলেন। পূর্বে এভাবেই এক নারী রাজকুমারকে রক্ষা করেছিলেন। শুক্রকন্যা সরজা তখন বললেন–এর পরিণামে চিত্রাঙ্গদার কি দশা ঘটেছিল আপনি তা জানেন না? আমি তা বলছি শুনুন। তাকে তার পিতা অশুচি কাজের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন–তুমি স্ত্রী স্বভাব হেতু ধর্ম পরিত্যাগ করে আত্মদান করেছ, এর ফলে তোমার আর বিয়ে হবে না।

তুমি স্বামী সুখ পাবে না। তোমার পুত্র লাভ ঘটবে না এবং তোমার স্বামীর বিপদে ঘটবে। এই অভিশাপ উচ্চারণের সাথে সাথে রাজনন্দনকে সরস্বতী তেরো যোজন দূরে নিয়ে গেলেন। চিত্রাঙ্গদা মোহে বশীভূত হয়ে পড়ল, রাজা সুরয দূরে চলে যাবার পর।

তখন সখীরা তাকে সরস্বতীর জলে স্নান করাল। নদীর শীতল জলে স্নান করে চিত্রাঙ্গদা মৃতপ্রায় হয়ে পড়ল। সখীরা ভাবল চিত্রাঙ্গদা মরে গেছে। কেউ কেউ বা আগুন জোগাড় করার জন্য ব্যস্ত হয়ে বনের অরণ্যের গভীরে প্রবেশ করল। চিত্রাঙ্গদা এর মধ্যে সংজ্ঞা লাভ করে চারিদিক দেখলেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।

তখন তিনি সরস্বতীর জলে ঝাঁপ দিলেন। কাঞ্চনাক্ষী সরস্বতী তাকে বহন করে নিয়ে মহানদী গোমতীর তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ জলমধ্যে নিক্ষেপ করল।

তারপর গোমতী তাকে বাঘ সিংহে ভরা এক মহারণ্যে নিক্ষেপ করল। চিত্রাঙ্গদার সেখানে কী হয়েছিল তাও আমি শুনেছি। সুতরাং আমি আত্মদানে বাধ্য নই। আমি সর্বতোভাবে রক্ষা করব নিজের চরিত্রের পবিত্রতা।

ইন্দ্রের সম পরাক্রমশালী দণ্ড এসব শুনে সহাস্য বদনে বললেন– অতঃপর চিত্রাঙ্গদার, তার পিতার ও রাজা সুরথের কি অবস্থা হয়েছিল, তা শোনেনা। সেই মহা অরণ্যে দিকভ্রান্ত চিত্রাঙ্গদাকে জনৈক গগনচারী গুহ্যক দেখতে পেলেন, তখন গুহ্যক তাকে বললেন–এসো, সুরথরাজার কাছে তোমায় নিয়ে যাই।

তার সাথে তোমার নিশ্চয়ই মিলন হবে। গুহ্যকের কথা শুনে চিত্রাঙ্গদা সত্ত্বর কালিন্দী নদীর দক্ষিণ-উত্তর তীরে মহাদেবের মন্দিরে শঙ্করকে দর্শন ও কালিনদীর জলে তার অভিষেক করে নত মস্তকে দুপুর অবধি দাঁড়িয়ে থাকলেন। এই সময় মহর্ষি সামবেদ ঋতধ্বজ শিব লিঙ্গকে স্নান করানোর জন্য সেই মন্দিরে এলেন।

ঋতধ্বজ গভীর অরণ্য অবস্থিত ওই মন্দিরে চিত্রাঙ্গদা দেখে ভাবলেন, এই রমণী কে? চিত্রাঙ্গদা তার চরণ বন্দনা করল। তখন ঋতধ্বজ বললেন–তোমাকে দেখে দেবকন্যা বলে মনে হচ্ছে। তুমি কার কন্যা? কেন এই জনমানবহীন বনে এসেছ? চিত্রাঙ্গদা তখন সকল ঘটনা খুলে বলল।

সব ঘটনা শুনে ঋষি ঋতধ্বজ ক্রুদ্ধ হয়ে বিশ্বকর্মাকে বানর হয়ে জন্মাবার অভিশাপ দিলেন। এরূপ অভিশাপ দিয়ে মহাত্মা ঋতধ্বজ যথাবিধি পুনরায় স্নান ও সন্ধ্যাকালীন উপাসনা শেষ করে মহাদেবের অর্চনা করলেন।

তারপর তিনি পতি মিলনে উৎসুক ক্রন্দনরতা সুন্দরী চিত্রাঙ্গদাকে বললেন–তুমি সপ্তগগাদাবরী তীর্থে গিয়ে হটকেশ্বর মহাদেবের উপাসনা করো।

এরপর দৈত্যরাজ কন্দর মালীর বেদবতী নামে কন্যা সে স্থানে আসবে। তাছাড়া অজ্ঞন নামে গুহ্যকের দময়ন্তী নামে এক সে কন্যাও সেখানে আসবে। এই তিন কন্যা সপ্তগোদাবরী তীর্থে মিলিত হলে তুমিও হটকেশ্বর মহাদেবের সাথে সম্মিলিত হতে পারবে।

সেই মুনিবরের কথা মতো চিত্রাঙ্গদা অতি শীঘ্র সপ্তগোদাবরী তীর্থে গেলেন। সেই জ্ঞান প্রবীণ ঋষি মহাত্মা মহাদেবের কাছে এই মর্মে একটি শ্লোক লিখে পাঠালেন যে, দেবতা, অসুর, যক্ষ, মানুষ কিংবা রাক্ষস এদের মধ্যে এমন কেউ কি নেই। যে নিজ পরাক্রমে এই মৃগ নয়না চিত্রাঙ্গদার দুঃখ দূর করতে পারেন?

তারপর তিনি সর্ব ব্যাপী সর্ব পূজণীয় পুষ্করনাথের দর্শন লালসায় পাহোষ্ণী নদীতে গেলেন। যাবার সময় তিনি মনে মনে দুখিনী চিত্রাঙ্গদার কথা চিন্তা করতে লাগলেন।

এই কাহিনী বিবৃত করে দণ্ড তখন শুক্রের কন্যা সরজাকে বললেন–চিত্রাঙ্গদা বীর সুরথের কথা চিন্তা করতে করতে সেই সপ্তগোদাবরী তীর্থে পরম সুখে অনেকদিন কাটিয়ে ছিলেন।

বানর জন্ম লাভ করে বিশ্বকর্মা মেরুপর্বত থেকে ভূতলে নেমে এলেন। তারপর তিনি শালকুনী নদীর তীরে এক বিশাল পর্বতে বাস করতে লাগলেন। সেখানে ফলমূল খেয়ে তাঁর বহু বছর অতিবাহিত হল।

একদিন দৈত্যরাজ করমালী তার কন্যা বেদবতাঁকে নিয়ে সেখানে এলেন। বানর রূপী বিশ্বকর্মা বেদবতাঁকে দেখে তার হাত ধরে টানতে লাগলেন। বানরের এরূপ আচরণে দৈত্য কন্দর খঙ্গ নিয়ে তার দিকে ছুটে গেল তাকে হত্যা করত। তখন বেদবতাঁকে নিয়ে হিমালয়ে পালিয়ে গেল।

সেখানে গিয়ে জনশূন্য এক আশ্রম দেখতে গেলেন। বানর বেদবতাঁকে সেখানে রেখে কালিন্দী নদীর জলে ডুবে গেল। করমালী ভাবল বানর এবং বেদবতী দুজনেই ডুবে গেছে। তখন দৈত্যরাজ পাতালে স্বগৃহে ফিরে এল।

এদিকে কালিন্দীনদী ওই বানরকে শিব নামে এক প্রসিদ্ধ নগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সেই নগরে প্রচুর লোকের বাস ছিল। বানর সবেগে নদী থেকে তীরে উঠে এল। তারপর সে কপিলারণ্যে বেদবতীর কাছে ফিরে যাবার জন্য উদ্যত হল। ঠিক তখনই বানররূপী বিশ্বকর্মা দেখলেন গুহ্যক অঞ্জন কন্যা দময়ন্তীকে নিয়ে সেদিকেই আসছে।

তা দেখে বানর মনে করল, এই কন্যা নিশ্চয়ই কন্দর দুহিতা বেদবতী; সুতরাং নদীর জলে ডুবে তার সব পরিশ্রম ব্যর্থ হল। এই চিন্তা করে বানর সবেগে তার দিকে ছুটে গেল কিন্তু দময়ন্তী তখন ভয় পেয়ে হিরন্বতী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অজ্ঞনও নিজ কন্যাকে নদীর জলে ডুবে যেতে দেখে দুঃখ শোকে সমাকুল হয়ে পর্বতে ফিরে এল এবং সেখানে এসে মৌনব্রত অবলম্বন করে তপস্যাচরণের মাধ্যমে বহু বছর কাটিয়ে দিল।

দময়ন্তী হিরন্বতী নদীর স্রেতের টানে পবিত্র কোশল দেশে এসে হাজির হল। তখন সে সানয়নে যেতে যেতে পথের ধারে একটি বটগাছ দেখতে পেল। এই বটবৃক্ষ প্রচুর শাখা ও ঝুরি দ্বারা পরিবৃত ছিল। তাই একে প্রথমদর্শনেই তার সাক্ষাৎ জটাধারী মহেশ্বর বলে মনে হল। দময়ন্তী সেই বটবৃক্ষের তলদেশে বসে বিশ্রাম করতে লাগল।

তখন সে শুনতে পেল কেউ যেন বলছে–এমনকি কেউ কোনোখানে নেই। যে গিয়ে মহর্ষি ঋতধ্বজকে বলেন যে, তোমার পুত্রকে কেউ বটগাছে বেঁধে রেখেছে। একথা শুনে দময়ন্তী সেই বটবৃক্ষের সর্বত্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। এক উঁচু ডালে কে যেন পাঁচ বছরের এক শিশুকে সযত্নে পিঙ্গলবর্ণ জটাজালে বেঁধে রেখেছে।

তা দেখে দময়ন্তী অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে এই বালককে বললেন–বলো, কে তোমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছে। তখন সেই বালক বলল–পুরাকালে মহেশ্বর মনুপুরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

আমার পিতা ঋতধ্বজ সেখানে বাস করতেন। আমার পিতা যখন তপস্যা মগ্ন ছিলেন, তখন আমি যোগ বলে সর্বশাস্ত্রজ্ঞ হয়েই জন্মগ্রহণ করি। তখন আমার পিতা আমাকে জাবালি মনে করে নমস্কার করে বলেছিলেন–তুমি পাঁচ হাজার বছর পর্যন্ত বালক হয়ে থাকবে। আর দশ হাজার বছর পর্যন্ত কুমার হয়ে থাকবে।

তারপর বিশ হাজার বছর ধরে যৌবন দশা ভাগ করার পর এর দ্বিগুণ কাল বার্ধক্য যাপন করবে। এর মধ্যে পাঁচশো বছর ধরে বালকদশায় তোমাকে দৃঢ়বন্ধন ভোগ করতে হবে। এরপর কুমার দশ হাজার বছর ধরে কায়পীড়ন অনুভব করার পর যৌবনকালে দু-হাজার বছর পর্যন্ত মহাভোগ রাশি উপভোগ করবে।

তারপর বৃদ্ধকালে চৌত্রিশশো বছর পর্যন্ত ভূশয্যায় শয়ন, কদন্ন ভোজনে দুঃখ ভোগ করতে হবে। পিতা এভাবে যখন ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে আমাকে বললেন, তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর এবং সেই বছরেই আমি ঘুরতে ঘুরতে হিরন্বতী নদীতে স্নান করতে গেলাম।

সেখানে এক বানর আমাকে বলল–তুমি বেদবতাঁকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলে সে আমাকে এই অবস্থাতেই ধরে নিয়ে গিয়ে বটগাছের ডালে জটাজালে বেঁধে রাখল। দুর্বুদ্ধি বানর লতাপাতা দিয়ে এমন জাল তৈরি করে তার মধ্যে আমাকে রেখে দিল।

এই মজবুত জালকে কোনো দিক থেকে ছিঁড়ে বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। সেই বানর এরপর অমর পর্বতে প্রস্থান করল। এবার বালক জাবালি দময়ন্তীর কাছে জানতে চাইল, কেন সে দিকভ্রষ্ট হয়ে এই মহারণ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে?

দময়ন্তী তখন জানাল, গুহ্যকরাজ অঞ্জন তার পিতা। জন্মকালে মহর্ষি মুদগল বলেছিলেন, এই বালিকা কালক্রমে রাজমহিষী হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণের সময় স্বর্গে দুন্দুভি বেজে উঠেছিল।

কিন্তু তখন মঙ্গল ও অমঙ্গল দু-রকম বাদ্যধ্বনিই শোনা গিয়েছিল। তা শুনে ঋষি বলেছিলেন, এই বালিকাকে বাল্যকালে মহাসঙ্কটে পড়তে হবে। মহর্ষি মুদগল একথা বলেই দ্রুতপায়ে সেখান হতে প্রস্থান করেন।

তখন পিতার সাথে হিরন্বতীর তীর্থে এসে বানরকে নদীর তীরে দেখে ভয়ে হিরন্বতী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। শেষে এই জনমানবশূন্য স্থানে এসে হাজির হয়েছি, নদীর স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে। বালক তার কথা শুনে দময়ন্তীকে বললেন–তুমি যমুনা তটে শ্ৰীকণ্ঠ শিবের কাছে যাও।

আমার পিতা দুপুরবেলা শিবাৰ্চনার জন্য সেখানে যান। তুমি তার কাছে এই ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলে তিনি তোমায় মঙ্গল লাভের উপায় বলে দেবেন। একথা শুনে দময়ন্তী বিন্দুমাত্র দেরি না করে হিমালয় পর্বকে যমুনা নদীর তীরে তপস্বী ঋতধ্বজের আশ্রমে চলে গেলেন। তারপর তিনি সেখানে কিছু অক্ষর লেখা আছে দেখতে পেলেন।

এই সকল অক্ষর মিলিয়ে তিনি নিজে একটি শ্লোক লিখলেন। যথা–মুদগল বলেছেন, আমি রাজমহিষী হব। কিন্তু বালক জাবালির এই দুরাবস্থা থেকে কেউ কি আমায় পরিত্রাণ করতে পারেন? দময়ন্তী শিলা পটে এই কথা লিখে রেখে যমুনা নদীতে স্নান করতে গেলেন।

সেই সময় দময়ন্তী এক মত্ত কোকিল কুহরিত সুন্দর আশ্রম দেখতে পেলেন। এই আশ্রম দেখে তার মনে হল, নিশ্চয়ই সেই ঋষিবর ঋতধ্বজ এখন আশ্রমে আছেন। দময়ন্তী এরূপ চিন্তা করে সেই মহাশ্রমে প্রবেশ করলেন। সেখানে বেদবতাঁকে দেখে তার মনে হল মুখ শুকনো ও তার দুই চোখ ছিল অত্যন্ত চঞ্চল।

পদ্ম মলিন ও বিবর্ণ হলে যেমন দেখায়, বেদবতাঁকে তখন সেরূপ দেখাচ্ছিল। যাইহোক, দময়ন্তীকে দেখে বেদবতী ভাবলেন, ইনি কে। এদিকে মুনিবর ঋতিধ্বজ ভগবান শ্রীকণ্ঠ মহাদেবকে পূজা করার জন্য আশ্রমে এসে দময়ন্তী কর্তৃক শিলাপটে লিখিত সেই শ্লোক রচনা দেখতে পেলেন।

এবং তা পড়ে মুহূর্তকাল ধ্যানস্থ হয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত জানতে পারলেন। তারপর তিনি দেবের অর্চনা শেষ করে রাজার সাথে দেখা করে তাকে বললেন–আপনার রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশে একটা বানর আমার গুণবান ও সর্বশাস্ত্রজ্ঞ পুত্রকে বেঁধে রেখেছে।

রাজন! একমাত্র আপনার পুত্র ছাড়া আর কারোর পক্ষে আমার পুত্রকে বন্ধনমুক্ত করে আনার ক্ষমতা নেই। আর তাকে মুক্ত করে আনতে হলে কি করতে হবে, তা আপনার পুত্র শকুনি ভালোভাবেই জানেন। ঋষির কথা শুনেই রাজা প্রিয় পুত্র শকুনিকে ঋষিপুত্রকে মুক্ত করে আনার জন্য আদেশ করলেন।

পিতার আদেশে মহাশক্তিশালী শকুনি সহাস্য বদনে ঋষি ঋতধ্বজের সাথে সেই মহারণ্যে গিয়ে হাজির হলেন। তখন সেই অত্যুচ্চ বৃক্ষ তার দৃষ্টি গোচর হল।

তারা দেখলেন, ঐ বটবৃক্ষের অতি উঁচু ডালে ঐ ঋষি পুত্রকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার চারিদিকে সুদৃঢ় লতাজালও তিনি দেখতে পেলেন। তিনি তখন হাতে ধনু নিয়ে তাতে জ্যা রোপণ করলেন এবং ক্ষিপ্রহস্তে তীর ছুঁড়ে সেই লতাজাল ছিন্ন করে ফেললেন।

এরূপে পাঁচশো বছর পরে বানরের তৈরি সেই লতাজাল শরাঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তখন মহর্ষি ঋতধ্বজ দ্রুতপায়ে সেই বটবৃক্ষে আরোহণ করলেন। জবালি নিজের পিতাকে আসতে দেখে বদ্ধ অবস্থাতেও সাদরে মাথা নেড়ে তাকে যথাযোগ্য সম্মান জানালেন।

এখন ঋতধ্বজও পুত্রকে স্নেহভরে আলিঙ্গন করে তাকে বন্ধন মুক্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ় ছিল বলে তিনি সহজে তা ছিঁড়তে পারলেন না।

তখন বলবান শকুনি হাতে তীর ধনু নিয়ে সেই জটাজাল ছিন্ন করার জন্যে ওই বৃক্ষে আরোহণ করলেন। কিন্তু তবুও তিনি জটাজাল ছিন্ন করতে সক্ষম হলেন না। তখন মহর্ষির সাথে গাছ থেকে তিনি নেমে এলেন এবং এক শর মণ্ডলী প্রস্তুত করে দুটি অর্ধচন্দ্রাকার বাণ ছুঁড়ে অতি সহজেই বটগাছের সেই ডাল তিনটুকরো করে দিলেন।

শাখা ছিন্ন হওয়া মাত্রই তপোধন জবালি সেই শরসোপান পথে মাথার সেই তিন টুকরো ডাল নিয়েই গাছ থেকে নেমে এলেন! এরূপে নিজ পুত্র বন্ধন থেকে মুক্ত হলে ঋষি ঋতধ্বজ, ধনুধর রাজকুমার শকুনি ও পুত্র জবালিকে সাথে নিয়ে সূর্যনন্দিনী যমুনা নদীর দিকে যাত্রা করলেন।

৩৭

দণ্ড বলতে লাগলেন–এই সময় যক্ষনন্দিনী ও দৈত্যনন্দিনী দুজনে মিলে মহাদেব ও মহর্ষি ঋতধ্বজকে দেখার জন্যে ঋতধ্বজের আশ্রমে গেলেন। তারা দেখলেন, ঋতধ্বজ আশ্রম থেকে চলে যাওয়ায় বিভু মহাদেব ম্লান হয়ে পড়েছেন। যেসব ফুল দিয়ে তার পূজা করা হয়েছিল, সেগুলো শুকিয়ে গেছে।

এই দুই তম্বী যথাবিধি তার অর্চনা করতে লাগলেন। এই দুই কন্যা যখন সেই আশ্রমে ছিলেন, তখন বিখ্যাত শ্ৰীকণ্ঠ মহাদেবকে দর্শন করার জন্যে মহর্ষি গালব আশ্রমে এলেন। তখন তিনি তাদের প্রথমে দেখে ভাবলেন, এরা কার কন্যা?

তারপর ঋষি গালব যমুনা নদীর জলে স্নান করে আশ্রমে গিয়ে ভগবান শ্রীকণ্ঠের অর্চনা করলেন। পূজার ক্ষণে দুই কন্যা মধুর কণ্ঠে গান করতে লাগলেন। মহর্ষি গালব সেই গান শুনে ভাবলেন, এরা নিশ্চয়ই গান্ধর্বকন্যা। তারপর তিনি যথাবিধি ঈশানের পূজা ও জপ করলেন। তখন সেই দুই কন্যা তাকে অভিবাদন করল।

তিনি আসনে বসে তাদের বললেন–তোমরা দুজনেই বংশের অলঙ্কার। তোমাদের অশেষ ভক্তি আছে ভগবান শিবের প্রতি। তোমরা কার সন্তান বল?

তখন সেই যক্ষ কন্যা ও অসুর কন্যা নিজ নিজ বৃত্তান্ত মুনিবর গালবকে বললেন। সমস্ত বৃত্তান্ত শোনার পর তপস্বীপ্রবর গালব সে রাত্রি সেই আশ্রমেই থেকে গেলেন এবং সকালে গৌরীপতি মহাদেবকে অর্চনা করে সেই কন্যা দুজনের কাছে গিয়ে বললেন–আমি সুপ্রসিদ্ধ পুষ্করারণ্যে যাবার জন্য মনস্থির করেছি।

তোমাদের তা জানালাম। তোমরা আমাকে অনুমতি দাও। দুই কন্যা বললেন–আপনার দেখা পাওয়া দুর্লভ। সহজে সবাই আপনার দর্শন লাভ করতে পারে না। কিন্তু আপনি এখন কেন পুষ্করণ্যে যেতে চাইছেন? গালব গম্ভীর ভাবে উত্তর দিলেন-কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পুষ্করারণ্যে দর্শন করলে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়।

কন্যা দুজন বললেন–আপনি যেখানে যাবেন, আমরাও আপনার সাথে সেখানে যাব। আপনি না থাকলে আমাদেরও এখানে থাকার ইচ্ছে নেই। রাজি হলেন গালব তাদের কথায়।

তারা পুষ্করারণ্যের পথে যাত্রা করলেন মহেশ্বরকে প্রণাম করে। তাদের সঙ্গে আরো হাজার হাজার ঋষি, রাজা ও পুণ্যকামী জনগণ পুষ্করারণ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। একমাত্র ঋতধ্বজ পুষ্করারণ্যে এলেন না।

তারপর যথাসময়ে কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথি এল। ঋষিগণ এবং নাভাগ, ইক্ষাকু ও অন্যান্য রাজারা স্নানের জন্য পুষ্কর হ্রদে নামলেন। পুষ্করের জলে গালবও দুই কন্যাকে নিয়ে নামলেন।

জলে ডুব দিয়ে তিনি একটি মাছকে জলে শুয়ে থাকতে দেখলেন। অনেক মৎস্য কন্যারা তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে। তখন ওই মাছ মৎস্য কন্যাদের স্বেচ্ছাচারী বলছে। একথা শুনে মৎস্যকন্যারা বলল–তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে, ঐ তপস্বী গালব দুজন কন্যার সাথে যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ধর্মাত্মা ও তপস্বী হয়েও যদি তার লোক অপবাদের ভয় না থাকে, তবে তুমি জলচারী হয়ে কেন লোক-অপবাদের ভয় পাচ্ছো? সেই মাছ তখন বলল–এই তপস্বী মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন।

সে জন্য ধর্মলোপ জেনেও ভয় করছেন না। জলচর প্রাণীদের এই কথোপকথন শুনে গালব জলের মধ্যে ডুবে রইলেন লজ্জায় আর জলে থেকে উঠলেন না। খুবই লজ্জিত হলেন মহর্ষি গালব। অন্যদিকে সেই দুই কন্যা স্নান সেরে উঠে গালব মুনির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ঋষি, রাজা ও অন্যান্য লোকেরা যে যার নিজ নিজ স্থানে ফিরে চলে গেল। পুষ্কর যাত্রা শেষ হয়ে গেল। বিশ্বকর্মা নন্দিনী সুন্দরী চিত্রাঙ্গদা একাকিনী সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে চারিদিকে তাকাতে লাগল।

তখন সেই তীর্থক্ষেত্র জনশূন্য হয়ে গেছে। তখন গন্ধর্ব নন্দিনী বেদবতী সে স্থানে এল। তার পিতা ও মাতার নাম পর্জন্য ও ঘৃতাচী। পুষ্করের জলে স্নান করে বেদবতী কন্যা দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন, সে তখন চিত্রাঙ্গদার পরিচয় জানতে চাইল।

চিত্রাঙ্গদা তখন জানাল, সে বিশ্বকর্মার কন্যা। সে নৈমিষারণ্য কাঞ্চনাক্ষী নামে পুণ্যতোয়া সরস্বতী নদীতে স্নান করতে গিয়েছিল। সেখানে বিভিরাজ সুরথ তাকে দেখে কামার্তচিত্তে তার শরণাগত হয়েছিল। কিন্তু সে তার সখীদের বারণ না শুনে আত্মসমর্পণ করেন। এর ফলে তার পিতা তাকে অভিশাপ দেন। এর ফলে, সুরথের সাথে তার চির বিচ্ছেদ ঘটে।

এক গুহ্যক তাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে বাধা দেন। তারপরই তিনি শ্রীকণ্ঠ মহেশ্বরের দর্শন লাভ করার জন্য গোদাবরী তীরে যান। কিন্তু এখনও সে স্বামীর দেখা পায়নি।

যাই হোক এরপর নিজের পরিচয় দান করে চিত্রাঙ্গদা পুনরায় দময়ন্তীকে বললেন, পুষ্কর যাত্রার পুণ্য লাভের লগ্ন পেরিয়ে গেছে। তবে বেদবতী কেন যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তাকে সমস্ত সত্য ঘটনা বলতে বললেন।

দময়ন্তী অঙ্গীকার করে বললেন, যে সমস্ত ঘটনা বলবেন। তিনি বললেন–তাঁর পিতা পর্জন্য এবং– তিনি ঘৃতাচীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেছেন। তিনি বললেন, এক বনে তার সাথে এক বানরের সাক্ষাৎ হয়। সেই বানর তাকে ভূতলস্থ আশ্রম থেকে এই মেরু পর্বতে নিয়ে এসেছে।

সে বলেছিল যে, সে বেদবতী নয়, তথাপি বানর তার কথা শোনেনি এবং তার ফলে তিনি বানরের তাড়া খেয়ে এক গাছে উঠে পড়লে বানর সেই গাছ পদাঘাতে ভেঙে ফেলে।

সে ভয়ে গাছের এক প্রকাণ্ড ডাল ধরলে বানর সেই পুরো গাছটা হিরন্বতী নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ফলে দময়ন্তীও নদীর জলে পড়ে যায়। এতে সকলে হাহাকার করে ওঠে।

মহর্ষি মুদগল নিজে বলেছিলেন, দময়ন্তী ইন্দ্রদ্যুম্মের মহিষী হবেন। যে মনুর পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করে হাজার হাজার যাগযজ্ঞ করবেন। ব্রহ্মা, সিদ্ধ ও গন্ধর্বদের এই কথা শুনে তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েন, তারপর মহারাজ নদীতে জলের স্রোতে দময়ন্তীর বাতাসের বেগে সে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।

এরপর গন্ধর্বনন্দিনী দময়ন্তীর প্রস্তাবে চিত্রাঙ্গদা দুই কন্যার সাথে দেখা করে তার সমস্ত বৃত্তান্ত জানার জন্য উৎসুক হলেন, তারপর তিনজন একত্রিত হয়ে সপ্তগোদাবরীর জলে স্নান করবেন এবং ভক্তি ভরে হটকেশ্বর শিবের অর্চনা করে সপ্তগোদাবরীর তীরে অবস্থান করতে লাগলেন।

শকুনি, জাবালি ও ঋতধ্বজ তাদের খোঁজ করতে করতে বহু বছর কাটিয়ে দিলেন। মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন শাবাল রাজ্যে বাস করছিলেন। তিনি পাদ্য ও অর্ঘ্য নিয়ে এসে জাবালি, ঋতধ্বজ ও শকুনিকে যথাযোগ্য অভ্যর্থনা করলেন। তাকে সমস্ত পৃথিবীতেও খুঁজে পাননি। তারা ইন্দ্রদ্যুম্নের সাহায্য চাইলেন।

তিনিও বললেন, তাঁরও একটি স্ত্রীর হারিয়ে গেছে। তিনিও তাকে খুঁজে বার করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। আকাশ থেকে যে গাছ নদীর জলে পড়েছিল তাকে তিনি টুকরো করে দেন এবং গাছে যে সুন্দরী কন্যা ছিল তাকেও তিনি আলাদা করে দেন। কিন্তু তিনি জানেন না বরবৰ্ণিনী কন্যা এখন কোথায় আছেন।

তিনি আবার তাকে খোঁজার চেষ্টা করবেন, একথা বলে তিনি জাবালি, ঋতধ্বজ ও শকুনিকে একটি করে রথ দিলেন। তারা তখন রথে চড়ে সমগ্র বসুধা অনুসন্ধান করতে লাগলেন।

এভাবে তারা বদরিকা আশ্রমে এসে এক তপস্বীকে দেখলেন। তারা দেখলেন যে তপস্বী কৃশকায় ও দৈন্যগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তার মাথার জটাজাল খুবই মলিন ও নোংরা, তবে তিনি যুবক। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জানতে চাইলেন, কেন তিনি যুবক হয়ে এত কঠোর তপস্যা করছেন। তিনি জানালেন যে, তিনি দারুণ শোক ও দুঃখে এই তপস্যা করছেন।

পরিচয় দানের পর অবশেষে তিনি ইন্দ্রদ্যুম্নের পরিচয় জানতে চাইলেন। তখন ইন্দ্রদ্যুম্ন জানালেন, তিনি শাকল পুরের প্রবল পরাক্রান্ত রাজা, মনু তার পিতা ও ইক্ষাকু তার ভাই।

তারপর তাপস তার পূর্ববৃত্তান্ত বর্ণনা করলে রাজা তাকে বললেন, দুঃখভাবে দেহত্যাগ না করতে। কারণ এই তাপস তার ভ্রাতুস্পুত্র। তারা এবার দুজনে সেই সুন্দরী কন্যার খোঁজ করবেন।

এরপর রাজা সেই তরুণ রথে করে শকুনি, ঋতধ্বজ ও জাবালির কাছে নিয়ে এলেন। তখন ঋতধ্বজ তাপসকে বললেন–যে তারা তাকে সাহায্য করবেন অভীষ্ট সাধনে। তিনি বললেন, তিনি চিত্রাঙ্গদাকে খুঁজছেন, তাকে তিনি দেখেছেন সপ্ত গোদাবরী তীরে। তিনি বললেন–সেখানে আরও তিনজন কন্যার সমাগম হবে।

এরপর তারা রথে চেপে সেখানে গেলেন। ঘৃতাচী তখন শোকে কাতর হয়ে নিজের কন্যাকে খুঁজছিলেন উদয়াচলে। তখন সেখানে বানরের সাথে তার দেখা হয়। বানরের কাছে তিনি জানতে চাইলেন যে, তার কণ্যাকে সে দেখেছে কিনা।

বানর তখন বলল, সে বেদবতাঁকে শ্ৰীকণ্ঠ আশ্রমে রেখে এসেছে। তখন ঘৃতাচী বলল, তার কন্যার নাম দময়ন্তী, বেদবতী নয়। ঘৃতাচীর কথায় বানর দ্রুত পদে কৌশিকী নদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।

এদিকে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন ও সপুত্র ঋতধ্বজ ঘোড়ায় টানা পাঁচটি রথে চড়ে কৌশিকীর তীরে এসে নদীর জলে স্নান করতে গেলেন। ঘৃতাচীও কৌশিকীর পবিত্র জলে স্নান করতে নামলেন। বানর তাকে অনুসরণ করল। তখন জাবালি পিতা ঋতধ্বজ ও অন্যান্যদের বললেন–যে, সেই দুরাত্মা বানর এখানে এসেছে।

এই বানরই তাকে বট গাছে বেঁধে রেখেছিল। জাবালির কথা শুনে শকুনি তাকে মারতে উদ্যত হলেন ধনুকে তীর যোছনা করে। মহর্ষি ঋতধ্বজ শকুনিকে বললেন, পূর্বজন্মের কর্মফলে এসব হয়। তাই কাউকে বধ করা উচিত নয়।

তিনি বললেন–যে, আমার পুত্র আজও মাথায় ডাল বহন করছে এবং বন্ধন খোলার ক্ষমতা আর কারো নেই। হাজার বছর ধরে এই ডাল সে বয়ে বেড়াচ্ছে। তখন বানর জাবালির জটাপাশ খুলে দিল।

ঋতধ্বজ তখন প্রীত হয়ে বানরকে বর দিতে উদ্যত হলেন। একথা শুনে বানর ঋষিকে বলল– আপনি যেন অনুগ্রহ করে অভিশাপ তুলে নিন। আপনি জানেন যে আমি বিশ্বকর্মা। চিত্রাঙ্গদা আমার কন্যা। কিন্তু বানরের স্বভাব দোষে অনেক পাপ করেছি।

ঋতধ্বজ বললেন–আমার প্রদত্ত ওই শাপের তখনই অবসান হবে যখন তার ঔরসে ঘৃতাচীর গর্ভে এক পুত্র জন্মাবে। এরপর বানর সন্তুষ্ট চিত্তে মহানদীতে স্নান করতে গেল। ক্রমে সকলে নিজ নিজ স্থানে প্রস্থান করল।

ঘৃতাচীও স্বর্গের দিকে যাত্রা করলেন। বানর তার পিছনে যেতে যেতে তার প্রতি কামাসক্ত হলে ঘৃতাচীও তার কাম প্রার্থনা করল। ফলে কোলাহল পর্বতে বানর তম্বী ঘৃতাচীর সাথে রমণ আরম্ভ করতে লাগল। তারা রমণে রত হয়ে এভাবে বিন্ধ্যাচলে হাজির হল।

অন্যান্যরা পিপাসার্ত ও শ্রান্ত হয়ে রথে করে সপ্তগোদাবরের তীর্থে হাজির হয়ে স্নান করতে গেলেন। সারথিগণ স্নান করে, ঘোড়াদের স্নান ও জল পান করালেন। তবে তারা ঘোড়াগুলিকে সুন্দর সবুজ জমিতে ছেড়ে দিল। পরে তারা তৃপ্ত হয়ে মহেশ্বর মন্দির অভিমুখে যাত্রা করলেন।

আশ্রমের রমণীরা আশ্রমের ছাদে উঠে চারিদিকে তাকাতে লাগলেন এবং দেখলেন কিছু লোককে মন্দির অভিমুখে আসতে। জটাধারী সেই নবীন তাপসকে দেখে চিত্রাঙ্গদা তাকে রাজা সুরথ বলে চিনতে পারল।

সুরথকে দেখে চিত্রাঙ্গদা সখীদের বললেন–যে, ঐ দীর্ঘবাহু যুবাপুরুষকে আমি পূর্বেই পতিরূপে বরণ করে নিয়েছি।

আর জটাধারী বৃদ্ধ নিশ্চয়ই তপস্বিবর ঋতধ্বজ। এরপর দময়ন্তী হৃষ্ট চিত্তে সখীদের বললেন–এঁদের সাথে যে আর একটি পুরুষ, তিনি ঋতধ্বজের পুত্র। এরপর সকল কন্যারা হে শর্ব, শম্ভু, ত্রিনেত্র ইত্যাদি বলে শম্ভুর কাছে গিয়ে সুমধুর স্বরে তাদের স্তবগান করতে লাগলেন।

তিনি মহেশকে বলতে লাগলেন–ত্রিলোকনাথ, উমাপতি, দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসকারী মহাপুরুষ, সর্বসত্ত্ব, ভয়ঙ্কর, শুভঙ্কর, মহেশ্বর, ত্রিশূলধারী ও উগ্রমূর্তি, চন্দ্রশেখর, জটাধর।

কপালমালা বিভূষিত, শিব, মহাদেব, ইশান, শঙ্কর, ভীম, ভুব, বৃষভ, কৰ্টভ, পৌঢ়, অবিমুক্তক রুদ্র, রুদ্রেশ্বর, স্থানু, একলিঙ্গ, কালিন্দী প্রিয়, শ্ৰীকণ্ঠ, নীলকণ্ঠ ও ও অপরাজিত, রিপু ভয়ঙ্কর সন্তোষপতি, বামদেব, অঘোর মহাঘোর, শান্ত, সরস্বতীকান্ত, সহস্ৰমূর্তি, মহোদ্ভব, বিষ্ণু, হর, মহীধ্ব প্রিয়, হংস, কামেশ্বর, কেদাধিপতি, কৃপান-পানি, বিদ্যারাজ, সোমরাজ, কামরাজ, সমুদ্ৰশাদী, গয়ামুখ, গোকর্ম, ব্রহ্মমণি, হাটেশ্বর তোমাকে প্রণাম করি।

স্তবগীতি শেষ হবার সাথে সাথেই ঋষিগণ ও নৃপতিগণ সকলেই ত্রিলোক বিধাতা হটকেশ্বর দর্শন করার জন্য সেখানে এলেন। তারা দেবদেবের কাছে সুন্দরী কন্যাদের সুমধুর স্বরে স্তবগান করতে দেখলেন। প্রণয়িনী চিত্রাঙ্গদাকে দেখে দারুণ খুশি হলেন রাজা সুরথ। মনে মনে আনন্দ অনুভব করলেন।

ঋতধ্বজও ওই সুন্দরী কন্যাকে দেখে যোগবলে সমস্ত বৃত্তান্ত জানতে পারেন। এরপর সকলেই স্তব করে হটকেশ্বরকে পুজো করতে লাগলেন। চিত্রাঙ্গদা ও তার সখীরা ঋতধ্বজ ও অন্যান্যদের দেখে সকলে মিলে তাদের অভিনন্দন করতে লাগলেন। ঋতধ্বজও তখন হৃষ্টচিত্তে তাদের কাছে এলেন।

এই সময় ঘৃতাচী ও সেই বানর গোদাবরী তীর্থে স্নান করে হটকেশ্বরকে দেখার জন্য সেখানে এসে হাজির হলেন। বেদবতী জননী ঘৃতাচীকে দেখে খুশি হলেন এবং ঘৃতাচীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

মহর্ষি ঋতধ্বজ তখন বানরকে বললেন–তুমি মহাত্মা গুহ্যককে আনার জন্য এখনই পর্বতে চলে যাও এবং পাতাল থেকে করমালীকেও স্বর্গ থেকে গন্ধর্বরাজ পর্জন্যকে অতি শীঘ্র এস্থানে নিয়ে এসো। বেদবতী বানরকে বললেন, সে যেন গালবমুনিকেও এখানে নিয়ে আসে।

তখন বানর নিমন্ত্রণের জন্য বেরিয়ে পড়ল। অঞ্জনকে নিমন্ত্রণ করে সে পর্জন্যের কাছে গেল। এরপর করমালীকে নিমন্ত্রণ জানাতে গেল সপ্তগোদাবর তীর্থ ও পাতালে।

তপোধননিধি গালবের দেখা পেল। মহিষ্মতী নগরে গিয়ে। এরপর হাটেশ্বরের কাছে হাজির হল। যেখানে দময়ন্তী ও বেদবতাঁকে দেখতে পেল। অন্যান্য রাজারাও তপোনিধি গালবকে অভিনন্দন জানাল।

তারপর বানরের নিমন্ত্রণে যক্ষ, গন্ধর্ব ও দানবরা একে একে এসে হাজির হল। তখন ওই কন্যারা নিজ নিজ পিতাকে আলিঙ্গন করল। সকলকে পিতার সাথে মিলিত দেখে বিশ্বকর্মার কন্যা চিত্রাঙ্গদা সজল নয়না হয়ে উঠল। তখন ঋতধ্বজ তাকে জানালেন যে, এই বানরই তার পিতা।

তখন লজ্জায় চিত্রাঙ্গদার চৈতন্য বিলুপ্ত হল এবং সে ভাবল পিতার এই দশা কি করে হল। তিনি নিজেকে কুপুত্রী মনে করলেন। সে ভাবল তার দেহত্যাগ করাই কর্তব্য।

তিনি ঋতধ্বজকে বললেন, তিনি পিতৃঘাতিনী। তাই সে দেহত্যাগের অনুমতি চায়। মুনিবর তাকে দেহত্যাগ করতে নিষেধ করে বললেন–যে, তোমার পিতা দেবশিল্পী হবেন। ঘৃতাচীর গর্ভে সন্তান জন্মালেই তিনি আবার নিজ রূপ ফিরে পাবেন।

এরপর ঘৃতাচী চিত্রাঙ্গদাকে বললেন–তুমি শোক কোরো না। কারণ দশমাসের মধ্যে আমার তার গর্ভে একটি পুত্র জন্মাবে।

একথা শুনে চিত্রাঙ্গদা আনন্দিত হয়ে নিজের বিবাহ ও পিতাকে দেখার জন্যে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। তার সখীরাও তার বিবাহ প্রতীক্ষায় রইল। দশ মাস পরে নল নামক এক পুত্র প্রসব করল ঘৃতাচী।

এবং সাথে সাথে বিশ্বকর্মা নিজের রূপ ফিরে পেলেন। এবং তিনি কন্যাকে আলিঙ্গন করে বিভিন্ন ও সকল দেবগণ সহ ইন্দ্রকে স্মরণ করলেন। হাটক তীর্থে এসে হাজির হলেন অন্যান্য দেবতাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে।

মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন করমালীর কন্যাকে জাবালির হাতে সম্প্রদানের প্রস্তাব করলেন জাবালির পিতা ঋষি ঋতধ্বজকে। দময়ন্তীর সাথে রূপবান শকুনির বিবাহ হোক।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

আর যথাবিধি অগ্নিসাক্ষী করে বেদবতী যেন তাকে বিয়ে করে। ইন্দ্রদ্যুম্নের এই কথায় সম্মত হলেন ঋতধ্বজ। গালব ও ঋত্ত্বিকগণ সুষ্ট ভাবে এই বিবাহ অনুষ্ঠান শেষ করলেন। অপ্সররা নাচ ও গন্ধর্বরা গান করতে আরম্ভ করলেন।

প্রথমে জাবালি পাণি-প্রথা করলেন, তারপর ইন্দ্রদ্যুম্ন ও বেদবতীর। পরে শকুনি পানি গ্রহণ করলেন এবং সবশেষে সুরথ ও চিত্রাঙ্গদা এবং এরপর ঋতধ্বজ ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতা ও দানবদের বললেন–বৈশাখ মাসে সপ্তগোদাবর তীর্থে অবস্থান করতে। এরপর দেবগণ, তথাস্তু বলে স্বর্গধামে প্রস্থান করলেন।

রাজারা পরম সুখে কাল কাটাতে লাগলেন। দণ্ড সরজাকে চিত্রাঙ্গদার পূর্ববৃত্তান্ত শুনিয়ে বললেন–তাকে। বন্দনা করতে। ফলে সরজাও মৃদুবাক্যে উত্তর দিতে আরম্ভ করলেন।

সরজা দণ্ডকে বললেন–আমি কিছুতেই আত্মদান করতে পারব না। আত্মদান না করলে তবেই পিতার অভিশাপ থেকে রক্ষা পাব। প্রহ্লাদ বললেন, দণ্ড রাজা দুর্বুদ্ধিবশতঃ কামা হলে ভার্গব নন্দিনীকে সে জোর করে ধর্ষণ করে। এভাবে দুষ্ট রাজা সরজার চরিত্রকে কলঙ্কিত করে ভয়ে আশ্রম থেকে পালিয়ে যায়।

ধর্ষিতা সরজা তখন আশ্রমের বাইরে নত মস্তকে মহাগ্রহণ গ্রস্ত চন্দ্র প্রণয়িনী রোহিনীর মতো কাঁদতে লাগলেন। বহুক্ষণ পরে শুক্রাচার্য নিজের আশ্রমে ফিরে এলেন যজ্ঞকার্য সমাপ্ত করে।

এসেই তিনি রজঃস্বলা অবস্থায় সরজাকে দেখতে পেলেন এবং জানতে চাইলেন কন্যা, তোমার এই দশা কে করেছে? কার এত স্পর্ধা যে বিষধর সাপ নিয়ে খেলা করে? কে সেই দুরাত্মা? সরজা তখন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কম্পমান শরীরে বললেন–বহু বার বাধা দেওয়া সত্ত্বেও শুক্রাচার্যের শিষ্য দণ্ড আমাকে কলঙ্কিত করেছে।

কন্যার কথা শুনে তার চক্ষু রক্তসম হয়ে উঠল। শুক্রাচার্য নিদারুণ ক্রোধে বললেন–দণ্ড কামান্ধ হয়ে আমার আদেশ, ভয় ও গৌরবকে তুচ্ছ করে দিয়ে সরজাকে ধর্মচ্যুত করেছে। এই দারুণ অপরাধে সে সাত রাত্রির মধ্যে রাজা, ভৃত্য, সৈন্য ও বাহনসহ ভস্মীভূত হবে।

মুনিবর শুক্র দণ্ডকে অভিশাপ দিয়ে সরজাকে পাপ মুক্ত হবার জন্য তপস্যা করলেন এবং দানবপুরী পাতালে চলে গেলেন।

শুক্রাচার্যের অভিশাপ অনুযায়ী দণ্ডও সাত রাতের মধ্যে ভস্মীভূত হলেন। এর ফলে দেবতারা দণ্ডকারণ্য ছেড়ে চলে গেলেন এবং মহাদেব তাকে রাক্ষস বাস ভূমিতে পরিণত করে দিলেন।

এভাবেই নীচ ও কামান্ধ লোকেদের সমূলে বিনাশ করে পরনারীরা। এই কাহিনি সবিস্তারে বর্ণনা করে প্রহ্লাদ অন্ধককে বললেন–অতএব বৎস, তুমি পরনারী উমার প্রতি কামান্ধ হয়ো না।

সাধারণ নারীর যদি এই ক্ষমতা থাকে তবে গিরিকন্যার তো কথাই নেই। মহাদেব ভিন্ন, যার দর্শন লাভ করার স্বীকৃতি নেই তার সাথে রণক্ষেত্রে জয় লাভ করা একেবারেই অসম্ভব।

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, প্রহ্লাদ এরূপ বললে দৈত্যরাজ অন্ধক রোষকম্পিত নেত্রে নিশ্বাস ফেলে সতেজে বললেন–মহাদেবের নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই। তাঁর ভস্ম মাখা দেহধারণ-ই সার। আমাকে স্বয়ং ইন্দ্র ভয় করেন। তাই বৃষবাহন মহাদেবকেও আমার ভয় নেই। অন্ধকের কথাকে প্রহাদ ধর্মবিরুদ্ধ, অর্থহীন ও অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে বললেন–তোমাকে কোনোরূপেই ক্ষমা করা যায় না।

আগুন ও পতঙ্গ, সিংহ ও শৃগাল, হাতি ও মশা এবং সোনা ও পাষাণ-এর মধ্যে যতদূর পার্থক্য আছে মহাদেব ও তোমার মধ্যে তাও নেই। সুতরাং তুমি তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যেও না।

এবার তিনি মহাত্মা মহর্ষি অসিতের কাহিনি বললেন। তিনি বলেছেন–যে ব্যক্তি ধর্মশীল এবং অভিমান ও ক্রোধের বশীভূত নন। যিনি বিদ্বান ও বিনয়ী, কাউকে দুঃখ বা কষ্ট দেন না। যিনি নিজ পত্নীতেই সন্তুষ্ট, এবং পরদারে যিনি পরাঙ্খ তাঁর মতো ব্যক্তির সংসারে কোনো ভয়ের কারণ নেই।

যে ধর্মহীন, কলহপ্রিয়, শাস্ত্র ও শ্রুতিহীন, পরদারে ও পরধনে লোভী এবং অবর্ণসঙ্গমকারী সেই ব্যক্তি কোথাও সুখ পায় না। এই কারণেই সূর্যদেব ধর্মের মর্যাদা লঙ্ঘন করেন না। বারুণ-মুনি রোষনারায়ণ নন, সূর্য-পুত্র মনু বিদ্যান্বিত ও শাস্ত্রজ্ঞানী হয়েছেন এবং অগস্ত্যমুনি সর্বদা নিজ পত্নীর প্রতি অনুরক্ত।

এই মহাপুরুষরা সকলে তেজস্বী কারণ এরা কখনও পাপাসক্ত হন না, সর্বদা সৎ কাজ করেন। এঁরা সবাই শাপ ও বরদানে সক্ষম এবং সবাই দেবতা ও সিদ্ধগণের কাছে নিত্যপূজিত।

পূর্বে উদগমিত ও অধর্মসেবায় লিপ্ত ছিল। বিভু কলহপ্রিয় ছিল। দুরাত্মা নমুচি সর্বদা অপরকে দুঃখ দিত। রাজা সনক অত্যাধিক গর্বিত ছিল। হিরণক্ষ সর্বদা পরধনে লোভ করত। তার ছোট ভাই মূর্খ ও অসৎ ছিল এবং উত্তমৌজা যদু সোনা চুরি করেছিল। এরা সকলে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

অতএব কখনো ধর্ম পরিত্যাগ করা উচিৎ নয়। কি স্বর্গ, কি মর্ত–সর্বত্র ধর্মই একত্রে মানুষের উদ্ধারকর্তা। মানুষ পরকালে পতিত হয় অধর্ম কর্মের ফলেই। অপরের স্ত্রীর প্রতি লালসা থাকে না ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির।

একমাত্র পরদারই একুশটি নরকে পতিত হবার মূল। পরদার পরিত্যাগই পবিত্র ধর্ম। পরধন ও পরদার লোভীকে বহু বৎসর রৌরব নরক ভোগ করতে হয়। এরূপ ধর্ম ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছিলেন দেবর্ষি অমিত পূর্বে গরুড় ও অরুণের জন্য। অজ্ঞ লোকেরা পরদারে আসক্ত হয়ে নরক ভোগ করে থাকে।

প্রহ্লাদের উপদেশের উত্তরে অন্ধক তাঁকে ধর্ম নিয়েই থাকতে বলল। অন্ধক ধর্মাচরণ করতে পারবে না। সে তখন শম্বরকে বলল–এখনই গিয়ে মন্দার পর্বতে শঙ্করকে জিজ্ঞাসা করতে যে কেন তিনি মন্দার পর্বত রক্ষা করছেন?

তার অভিপ্রায় কী? দেবরাজ ইন্দ্র ও অন্য দেবতারা যেখানে অন্ধকের আদেশ উল্লঙ্ঘন করে না, সেখানে শঙ্কর কি করে এমন কাজ করে? আর যদি মন্দার পর্বত মহাদেবের প্রিয় নিকেতন হয় তবে যেন তিনি তাঁর পত্নীকে আমার হাতে তুলে দেন। শম্বরাসুর তখন মন্দার পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।

শম্বরের কথা শুনে ভবানীর সামনেই মহাদেব বললেন– শোনো, ধীমান ইন্দ্র আমাকে মন্দার দান করেছেন। তাই তার আদেশ ছাড়া আমি এই স্থান ত্যাগ করব না। আর গিরিবালার যদি যেতে ইচ্ছে করে তবে সে চলে যাক, তাকে আমি বাধা দেব না।

গিরিকন্যাও বললেন–তুমি গিয়ে আমার কথা মতো সেই দুরাত্মা অন্ধককে এই কথা বলবে। আমাকে বাজি রেখে অন্ধক এবং হর দুজনে প্রাণ রূপ দূতক্রীড়ায় লিপ্ত হয়ে যে জয় লাভ করতে সক্ষম হবে, সেই আমাকে লাভ করবে। শম্বর ফিরে এসে সব কথা অন্ধককে জানাল।

তা শুনে অন্ধক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন–এখনই ওই উদ্ধত রমণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার জন্য দুন্দুভি বাজাতে থাকো। অন্ধকের আদেশেই অসুরগণ রণবাদ্য বাজাতে লাগল।

দৃঢ় তাড়নায় সেই রণভেরী ভৈরব রবে মুহুর্মুহু নিনাদ করতে লাগল। সেই দুন্দুভি ধ্বনি শুনে কি জন্যে এই রণভেরী বাজছে, পরস্পর এরূপ বলাবলি করতে করতে দানবেরা সকলে শীঘ্র অতি সভাক্ষেত্রে এসে হাজির হল।

সমবেত সকল দানবদের সমস্ত বৃত্তান্ত বলল অসুর সেনাপতি বলবান দুর্যোধন। প্রবল অসুরেরা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে হাতি, ঘোড়া, উট ও রথে চেপে মহাদেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে পড়ল।

তখন জম্ভ, কুজম্ভ, হন্ত, তুহুন্ত, শম্বর, বলি, বান, কার্তস্বর, হস্তী, সূর্যশ, মহোদয়, অয়ঃশঙ্কু, শিবি, শান্থ, বৃষপর্বা, বিরোচন, হয়গ্রীব, কালনেমি, সংহ্রাদ, সরভ, কালনাশন, সবল, বৃত্র, দুর্যোধন, পাক, বিপাক, কাল এবং অন্যান্য বহু বলশালী দানব বিবিধ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অন্ধকাসুরের পেছনে চলল। দুরাত্মা দৈত্যপতি অন্ধক দুর্বুদ্ধিবশত কাল পাশে আবদ্ধ হয়েছিল, তাই সে মহাদেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মন্দার পর্বতে গিয়ে হাজির হল।

৩৮

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, মহাদেবও যুদ্ধ ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে নন্দীকে ডেকে বললেন– যাও নন্দী, তোমার সমস্ত অনুচরদের ডেকে নিয়ে এসো। মহেশ্বর আদেশ করার সাথে সাথে নন্দী সমস্ত গণ-নায়কদের স্মরণ করল। তাদের আগমন বার্তা নন্দী মহাদেবকে দিল।

নন্দী মহাদেবের উদ্দেশ্যে বলল এই যে জটামণ্ডিত ত্রিলোচনসমূহকে আপনি দেখছেন, এঁরা সংখ্যায় এগারো কোটি, এঁরা রুদ্র নামে প্রসিদ্ধ। এই বাঘের মতো শক্তিশালী বানরমুখো গণসমূহকে দেখছেন, এঁরা আগে যে গণসমূহের কথা বললাম, তাদের দ্বাররক্ষক

যুদ্ধের জন্য উদগ্রীব হল দ্বাররক্ষকরা। এই ষড়ানন শিখিধ্বজ ও শক্তি নামে অস্ত্রধারী কুমাররা স্কন্দ নামে অভিহিত।

এই সব স্কন্দের সংখ্যা ছেষট্টি কোটি। শাখ নামক গণেরাও ছেষট্টি কোটি। বিশাখের সংখ্যাও একইরূপ। নৈগমেয় নামে গণ সমূহের সংখ্যা সাতশো কোটি। এদের প্রত্যেকের এরূপ সংখ্যাক মাতৃকা আছেন। এই শূলপাণি গণপতিগণের ত্রিনেত্র ও শরীর ভস্মভূষিত। তারা শৈব নামে বিখ্যাত। অন্যান্য পশুপতগণ সংখ্যায় অনেক এবং ভস্মই এঁদের প্রহরণ।

আর পিণাকপানি রুদ্রমূর্তি জটাজালমণ্ডিত কালমুখ গণেরা আপনার পরম ভক্ত। রক্ত চন্দন চর্চিত মহাব্রতধারী গণপতিগণ সবাই বীর্যশালী এবং এদের প্রত্যেকের হাতেই আছে খট্টাঙ্গ নামে যুদ্ধাস্ত্র। এইসব দিগম্বর মূর্তি মুকুটধারী নিরাশ্রয় নামে গণ সমূহের প্রহরণ।

এই বৃষধ্বজি অব্যয় গণসকল পাখির উপর উপবিষ্ট। এঁরা সবাই ত্রিনয়ন ও পদ্মপলাশ লোচন, এঁদের সকলেরই বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন আঁকা আছে। এখানে মহাপাশুপত নামে গণসমূহও এসেছেন। এরা অভিন্নভাবে হরিহর উপাসনা করে থাকেন। এঁদের প্রত্যেকের হাতে চক্র ও শূল আছে।

আপনার রোম থেকে উৎপন্ন বীরভদ্র প্রভৃতি গণপতিগণও এখানে এসেছেন। এঁদের মুখ সিংহের মতো এবং সকলের হাতে আছে শূল, বাণ ও ধনু। অনেক প্রমথও এসেছে, এদের সাহায্য করার জন্য। এবার আপনি এদের আদেশ করুন। নন্দীর পরিচয় দানের পর তারা সকলে মহাদেবকে প্রণাম করল।

তাদের যথাযোগ্য অভ্যর্থনা জানিয়ে মহাদেব সকলকে বসতে বললেন। এদের প্রধান প্রধান ব্যক্তিকে প্রগাঢ় আলিঙ্গন করলেন মহাদেব। এই ব্যাপারে সকল গণপতিরা ভীষণ বিস্মিত হল। তারা ভাবতে লাগল, মহেশ্বর কেন এরূপে তাদের আলিঙ্গন করলেন।

নন্দী তখন মহাদেবকে বললেন–প্রভু আপনি পশুপতগণকে আলিঙ্গন করার ফলে সকলে বিস্মিত হয়েছে। সুতরাং আপনি অনুগ্রহ করে ত্রিভুবনের সমৃদ্ধি বিধায়ক জ্ঞান, রূপ ও বিবেকের বিষয়ে অন্যান্য গণপতিদের কাছে সবিস্তারে বলুন।

প্রমথপতি নন্দীর কথা শুনে ভগবান মহেশ্বর সেই সমস্ত গণদের বলতে লাগলেন- তোমরা অহংকারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বৈষ্ণবপদের নিন্দা করে থাকো। পরন্তু ভক্তি ও ভাবাবেশে হরের অর্চনা করো।

প্রকৃত পক্ষে বিষ্ণু ও হরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একই মূর্তি দুই রূপে অবস্থিত। ভক্তিমান নরশ্রেষ্ঠগণ হর ও বিষ্ণু উভয়কেই জানেন। তোমাদের বুদ্ধি মোহাচ্ছন্ন বলে তোমরা হরির নিন্দা করে থাক।

হরিনিন্দার ফলে তোমাদের জ্ঞান লুপ্ত হয়েছে, ফলে আমি তোমাদের আলিঙ্গন করিনি। তখন গণসমূহরা জিজ্ঞাসা করল–প্রভু আপনি কি করে হরির সাথে এক হয়ে আছেন?

মহাদেব তাদের কথা শুনে সহাস্য বদনে সেই তত্ত্বকথা তাদের বলতে লাগলেন। তাদের তিনি বললেন–সযত্নে ভক্তিশুদ্ধ দেহ ও মন নিয়ে তা শুনতে। দুধ, ঘি, কিংবা সুগন্ধি চন্দন দিয়ে স্নানের মতো আনন্দ উপভোগ হয় এই তত্ত্বকথা কাউকে শোনালে। আমার শরীর দ্বিখণ্ডিত করলে দেখা যাবে সেখানে বিষ্ণু বিরাজমান।

এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে ব্যক্তি একাহারী এবং বিষ্ণুভক্ত তারা দুজনেই সমান। কোনো ব্যক্তিই এক্ষেত্রে কোনো ভেদ কল্পনা করতে পারে না। কিন্তু জগন্নাথকে নিন্দা করার জন্য তোমাদের নরকে নিক্ষেপ করলাম না।

ইনি ভগবান, ইনি সর্বদা সর্বমূর্তি, সর্বব্যাপী ও সর্বগণের ঈশ্বর। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই চরাচর জগতে। তিনি শ্বেত হলদে, লাল নানা বর্ণধারী।

এর চেয়ে পরম সত্য সংসারে আর কিছু নেই। সাত্ত্বিক, রজস, তমস ও মিশ্র এই চাররকম গুণই তার আছে। এই ভগবান সদাশিব ও সর্বপূজ্য। শঙ্করের কথা শুনে নন্দী প্রভৃতি প্রমথ পতিগণ তাকে বললেন–আমাদের কাছে আপনি সদাশিবের বিশেষণ বর্ণনা করুন। এরপর মহাদেব নিজের প্রসিদ্ধ শৈবরূপ তাদের দেখালেন।

ঐ ঈশ্বর রূপের হাজার পা এবং হাত। তিনি দণ্ডপানি দুর্নিরীক্ষ এবং ইতস্তত সর্বলোক পরিব্যাপ্ত। তাদের হাতের দণ্ডে সমস্ত দেবতাদের প্রহরণ দেখা যাচ্ছে। প্রমথগণ আবার শঙ্করকে একমুখশালী রূপে দেখল। তারা দেখল তার দেহ সহস্র শিব ও বিষ্ণু চিহ্নে বিভূষিত। তার শরীরে অর্ধেক বিষ্ণু ও অর্ধেক শিবরূপ।

তাই তখন গরুড়ধ্বজ, বৃষারূঢ় ও গরুড়ারূঢ় বৃষধ্বজ প্রকাশ পেল। গুণশ্রেষ্ঠ ত্রিনয়ন এরূপে যে সে মূর্তি ধারণ করতে লাগলেন, তাতেই মহাপশুপতগণের আবির্ভাব হতে লাগল। তারপর শঙ্কর কখনো বহুরূপী হতে লাগলেন। এভাবে কখনো সাদা, লাল, হলদে, নীল, মিশ্রবর্ণ, বর্ণহীন, মহাপশুপত, রুদ্র, ইন্দ্র, শম্ভু কখনো সূর্যরূপ ধারণ করলেন।

আবার কখনো শঙ্কর, বিষ্ণু, ইন্দ্র ও সূর্যকে অভিন্ন বলে জানতে পারল এবং তাদের অভেদবোধ দেখে শম্ভু প্রীত চিত্তে বললেন–যে, তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। অতএব তিনি মনমতো বর চাইতে বললেন। তারা বলল, তারা যেন মহাপাপ থেকে মুক্তি পায়।

ভগবান শিব তাদের সেই বর দান করলেন এবং তিনি তখন সেই নিষ্পাপ গণদের আলিঙ্গন করলেন। গণাধিপতিগণ ভগবান হরের সাথে মেঘের মতো গর্জন করতে করতে ঘোড়ায় টানা রথে চেপে, মন্দার পর্বতে হাজির হল।

সেই প্রমথগণ চারিদিকে ঘিরে দাঁড়ালে মহাদেবের পাদস্পর্শে শরৎকালের মেঘের মতো শ্বেতকায় ওই পর্বত বলবান হরবৃষভের মতো অত্যাধিক শোভাসম্পন্ন হল।

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, এই সময় মন্দার পর্বতে অন্ধকাসুর সদলবলে এসে হাজির হল। এই পর্বতের গুহাতে প্রমথগণ আগে থেকেই আশ্রয় নিয়েছিল। দানবরা প্রমথগণকে দেখা মাত্রই ‘কিলা কিলা’ ধ্বনি করে উঠল। প্রমথরা তখন বহু দানবকে হত্যা করল ক্রুদ্ধ হয়ে। দানবের এই ‘কিলা কিলা’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠল স্বর্গ, মর্ত।

অন্তরীক্ষ থেকে তা শুনতে পেল বিঘ্ননাশ গণেশ। তিনি দারুণ রেগে পিতার সাথে দেখা করলেন মন্দার পর্বতে গিয়ে। মহেশ্বরকে বললেন–পিতা, আপনি যুদ্ধের জন্য উৎসুক হয়েছেন, অতএব গা ঝাড়া দিয়ে উঠুন। মহেশ্বর অম্বিকাকে বললেন–আমি অন্ধকাসুরকে বধ করতে যাব। পুত্র গণেশ তুমি সাবধানে থেকো।

গিরিবালা স্বামীকে আলিঙ্গন করে প্রেমপূর্ণ নয়নে বললেন–আপনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই করুন। অন্ধককে আপনি নিজে বধ করবেন যেন। শঙ্কর-এর চরণ বন্দনা করলেন গিরিবালা গৌরী।

তখন শঙ্কর মালিনী, জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী, অপরাজিতা প্রভৃতি গৌরীর সখীদের বললেন–তোমরা সাবধানে সুরক্ষিত ঘরে গিরিবালার সাথে থেকো এবং তাকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা কোরো। দেব এরপর বৃষের পিঠে চেপে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন।

গণেরা তাকে অনুসরণ করল। গণপতিরা তার জয়ধ্বনি করতে করতে মন্দার পর্বতে হাজির হল। তার যুদ্ধযাত্রার সময় নানা শুভ লক্ষণ দেখা দিতে লাগল। শিয়ালরা বাঁদিকে সুস্বরে শব্দ করতে করতে চলল। তৃষিত অথচ রক্ত লালসায় হৃষ্ট হয়ে মাংসাশী প্রাণীরা চলে গেল। তার নখ পর্যন্ত দক্ষিণঅঙ্গ কেঁপে উঠল।

পিছন দিকে মুখ ফিরিয়ে উঠে চলল, শকুন ও শুক পাখি। এই সকল লক্ষণ চিহ্নিত করল মহাদেবের বিজয়। নন্দী বলল–এতে কোনো সন্দেহ নেই যে দেবদেব শত্রুদের পরাস্ত করবেন। নন্দীর কথার পর রুদ্রগণকে মহাপাশুপতদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশ দিলেন।

তখন তারা বিবিধ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সবেগে ছুটে গিয়ে বজ্রপাতে বনস্পতির ভূপতিত হবার মতো দানবদের বিধ্বস্ত হবার মতো দানবদের বিধ্বস্ত করতে লাগল। এই যুদ্ধ দেখার জন্য ইন্দ্র, বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও সূর্য অন্তরীক্ষে এসে সমবেত হল। তখন আকাশপথে ঘোর দুন্দুভি শোনা গেল।

মহাপাষণ্ড দানব সেখানে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে সৈন্যদের দলিত মথিত করতে লাগল। শুরু হল গজাধিপতিদের আক্রমণ মহাদেবের দৈত্যদের চতুরঙ্গ বাহিনী বিনষ্ট হতে দেখে দণ্ড নামে এক দানব ক্রোধ ভরে এক ভীষণ লৌহ পরিখ হাতে নিয়ে তাদের আক্রমণ করল। এই পরিখ তখন ইন্দ্ৰধ্বজের মতো দেখাচ্ছিল।

বলবান দানব দণ্ড সেই পরিখ চারিদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে রুদ্র, স্কন্দ প্রভৃতির যাবতীয় গণকেই আহত করতে লাগল। তারা ভয়াতুর হয়ে রণে ভঙ্গ দিল।

বিনায়ক নিজ সৈন্যদলকে পরাস্ত হয়ে পালাতে দেখে তুহুন্তু নামক দানবকে সরেগে আক্রমণ করলেন। দৈত্য গণপতিকে আসতে দেখে তাঁর পেটে পরিখ ছুঁড়ে মারল। ব্রজের মতো পরিখ শত খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেল। দানব সবলে গণপতিকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় মুগুরের আঘাত করতে লাগল।

বিনায়ক দৈত্যবরকে কুঠার দিয়ে আঘাত করল। সে দু-টুকরো হয়ে গেল। দৈত্য কিন্তু তার বাহুপাশ পরিত্যাগ করল না। বিনায়ক তখন বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু সফল হলেন না। মুষল দিয়ে দৈত্যের বাহুতে সজোরে আঘাত করলেন গণেশ্বর।

কুন্তোদের রাহুর হৃদয় বিদীর্ণ করে দিলেন গণধিপতি কুশধ্বজ ‘প্রাস’ নামে অস্ত্রের আঘাতে। তুহুন্তকে নিহত হতে ও রাহুকে পালিয়ে যেতে দেখে গণধিপতিরা আরো তেজোদীপ্ত হয়ে উঠলেন। কালাগ্নির মতো জ্বলে উঠে পাঁচজন গণধিপতি কুড়িজন দানবসেনা সংহার করলেন।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

বলি দৈত্য সেনাদের পরাস্ত হতে দেখে গদা নিয়ে গণ নায়কদের পেটে ও হাতে সজোরে আঘাত করল। এতে কুন্তোদের হাত ভাঙল। মহোদরের মাথা গুঁড়ো হয়ে গেল। ঘটোদরের উরুসন্ধি ও কুশধ্বজের যাবতীয় সন্ধিবন্ধন আলগা হয়ে গেল, বলি তখন স্কন্দ বিশাখাদের সংহার করার জন্য তাদের দিকে ছুটে গেল।

বলিকে ছুটে আসতে দেখে হর নন্দীকে ডেকে তাকে বধ করতে বললেন। নন্দী চক্র নিয়ে বলির মাথায় আঘাত করলেন। বলি মূৰ্ছিত ও ধরাশায়ী হল। কুজম্ভ ভ্রাতুস্পুত্রকে মূৰ্ছিত দেখে নন্দীকে মুষল ছুঁড়ে মাড়ল। নন্দী সেই মুষল ধরে নিয়ে নিজে কুজম্ভকে আঘাত করলেন এবং কুজম্ভ মারা গেল।

নন্দী বজ্রাঘাতে শত শত দৈত্যদের প্রাণ সংহার করলেন। তখন দৈত্যরা সেনানায়ক দুর্যোধনের শরণাপন্ন হল। দুর্যোধন তখন এক পাশাস্ত্র হাতে নিয়ে সবেগে তা নন্দীর দিকে নিক্ষেপ করলেন।

নন্দীও বজ্রপ্রহারে সেই পাশাস্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দিল। এরপর দুর্যোধন ঘুষি পাকিয়ে নন্দীকে আক্রমণ করল। নন্দী তাল ফলের মতো তার মাথা কেটে ফেলল। তখন মুহূর্ত মধ্যে দৈত্য ধরাশায়ী হয়ে নিহত হল।

অন্যান্য দৈত্যরা পালিয়ে গেল। হস্তী দানব নিজ পুত্রকে নিহত দেখে নন্দীকে আক্রমণ করল এবং করাল বাণবর্ষণে তাকে বিদীর্ণ করল কার্তিকেয় এক সুতীক্ষ্ণ অস্ত্রের আঘাতে। গণাধিনায়করা সাহস পেয়ে নন্দীকে সামনে রেখে সক্রোধে দানবদল সংহার করতে সমুদ্যত হলেন। দৈত্যরা প্রথমে পালিয়ে গেলেও পরে দল বেঁধে ফিরে এল।

তাদের ফিরে আসতে দেখে নন্দিষেণ নামে এক বাঘমুখো গণনায়ক খটিশ হাতে নিয়ে আক্রমণ করতে এগিয়ে গেল। কান্তার নামে এক দানব গদা হাতে নিয়ে ভয়ংকর গর্জন করতে করতে তার দিকে ছুটে গেল। বিশাখাকে মুক্ত করার জন্যে একদিকে নৈগমেয় এবং অন্যদিকে শাখ সেই অয়ঃ শিরাকে শক্তি প্রহারে বিধ্বস্ত করে ফেললেন।

অয়ঃশিরা সেই তিন নায়কের হাতে নিপীড়িত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে শম্বরের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে বলল–আমাকে গণনায়কদের হাত থেকে আপনি বাঁচান।

তখন শম্বরের চারপুত্ৰই শক্তি ও পাশ হাতে নিয়ে আঘাত হানার জন্যে প্রস্তুত হল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গণনায়কদের পালটা আক্রমণে তারা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ল। শম্বর ভয়ে পালিয়ে গেল। শঙ্করের পুত্র ও অন্যান্য প্রমথদের হাতে দানব সেনাদল নিহত হতে লাগল। তারা ভয়ে বিবর্ণ ও বিহ্বল হয়ে রণস্থলের থেকে পালিয়ে গেল ও শুক্রাচার্যের শরণাপন্ন হল।

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, প্রমথগণ কর্তৃক কুজম্ভ ও অন্যান্য বহু সৈন্য নিহত হলে মহারথ অন্ধক শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে বলল–যে তার দয়াতেই দেব, গন্ধর্ব ও কিন্নরদের পরাভূত করেছিলেন। কিন্তু এখন কুজম্ভ মারা গেছে। কুরুক্ষেত্রে প্রমথদের সংখ্যাও ক্রমশঃ বেড়ে যাচ্ছে। অতএব আমাদের যুদ্ধ জয়ী হবার উপায় বলে দিন।

অন্ধকের এই অনুরোধে শুক্রাচার্য বললেন, তিনি তীর্থে গিয়ে তার মঙ্গল বিধান করবেন। এই বলে শুচি ব্ৰতালম্বী শুক্র যথাবিধি সঞ্জীবনী বিদ্যা আবৃত্তি করলেন। এই বিদ্যা আবৃত্তির ফলে নিহত দৈত্যরা সঞ্জীবিত হয়ে উঠল।

কুজম্ভ প্রভৃতি দৈত্যরা পুনর্জীবিত হয়ে যুদ্ধের জন্য রণস্থলে এসে হাজির হতে দেখে নন্দী শঙ্করকে বললেন–প্রমথগণ যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব দৈত্যদের বধ করেছিল, শুক্রাচার্যের বিদ্যাপ্রভাবে তারা পুনর্জীবন লাভ করেছে।

শুক্রাচার্যের বিদ্যাপ্রভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের জয় অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়েছে। নন্দীর কথা শুনে মহাদেব শুক্রাচার্যকে নিয়ে আসতে বললেন। তিনি যোগাবলম্বন করে তাকে সংযত রাখবেন।

নন্দী শুক্রকে বন্দী করার জন্য গেলেন। তখন এক ভয়ংকর দানব নন্দীর পথ অবরোধ করল। নন্দীও তাকে বজ্রের আঘাত করলে সে জ্ঞান হারিয়ে ধরাশায়ী হয়ে পড়ল।

এরপর কুজম্ভ, জম্ভ, বল, বৃত্র, রাক্ষস, ময় হ্রাদ প্রভৃতি প্রধান দৈত্য সেনানায়কেরা নন্দীকে লক্ষ্য করে একযোগে বিবিধ অস্ত্র ছুঁড়তে লাগল, সকলে একসঙ্গে নন্দীকে আঘাত করলে ব্রহ্মা তা দেখতে পেয়ে ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের বললেন, দেবদেব শম্ভকে সাহায্য করতে। ইন্দ্র ও অন্য দেবতারা অন্তরীক্ষ থেকে শিবসেনাদের মধ্যে নেমে এলেন।

প্রমথদের সাথে মিলিত হয়ে দেবতারা প্রতিরোধ্য ও দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। দুই পক্ষের গোলমালের মধ্যে নন্দী মহাদেবের কাছে শুক্রকে ধরে নিয়ে গেল এবং তাকে রক্ষক দ্বারা পরিবৃত করে রেখে দিল। তাকে নিজের মুখের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন মহাদেব।

তখন শুক্রাচার্য হরের স্তব করে বলতে লাগলেন–তুমি হর, শঙ্কর, বিশ্বেশ্বর, মহেশ, গুণশালী ও বরদাতা; সকলের জীবন ও সর্বলোকের নাথ, বামদেব সবিতা বিশ্বরূপ বামন সদগতি মহাদেব সর্বত্ত ঈশ্বর ত্রিনয়ন হর, ভব শঙ্কর, উমাপতি, শূলপানি, পশুপতি গোপতি, তৎপুরুষ ও সত্তম ইত্যাদি।

তার স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে শুক্র বলল, তিনি যেন শঙ্করের পেট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। তখন মহাদেব তাকে বেরিয়ে আসতে বললেন। একথা শুনে শুক্র মহাদেবের পেটের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এবং দেখলেন চরাচর নিখিল ভুবন, সমুদ্র ও পাতাল, সেখানে অধিষ্ঠিত আছে আদিত্য, বসু, রুদ্র, বিশ্বদেব যক্ষ, বিশ্ব পুরুষ, গন্ধর্ব ও অপ্সরা, সেখানে বিরাজিত যাবতীয় মণি, সাধ্য পিপীলিকা।

পশু কীট বৃক্ষ গুল্ম সরীসৃপ ফলমূল ওষধি জলচর ব্যক্ত ও অব্যক্ত এবং নিখিল দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীদেরও তিনি সেখানে বিরাজিত দেখতে পেলেন। এসব দেখে তিনি কৌতূহলী হয়ে পরিভ্রমণ করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে শুক্রর আত্মা শ্রান্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি মহাদেবের পেট থেকে বেরোতে পারলেন না।

এরপর শুক্র মহাদেবকে বললেন, হে বিশ্বরূপ, মহারূপ, বিরূপাক্ষ, স্বরূপধর, সহস্রাক্ষ মহাদেব শঙ্কর, শর্ব, শম্ভু, সহস্রাক্ষ, সহস্রপাদ ও ভুজঙ্গ ভূষণ আপনার পেটের মধ্যে সমস্ত বিশ্ব একত্রে বিরাজ করতে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। শুক্রের কথা শুনে শম্ভু তাকে নিজের পুত্র বলে সম্বোধন করলেন।

এবং তার জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে বেরিয়ে আসতে বললেন। শুক্র এরপর মুক্তি পেলেন। এরপর শুক্র দ্রুত মহাসুরের সেনাবাহিনীতে ফিরে এলেন এবং তাকে দেখে সকলে আহ্লাদিত হল।

গণনায়করা দেবতাদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ শুরু হল। অন্ধক নন্দীর সাথে, অয়ঃশিরা শঙ্কু কর্ণের সাথে, বলি কুশধ্বজের সাথে ও বিরোচন নন্দীসেনের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করল।

এরূপে অশ্বগ্রীব, বিশাখা, শাখ ও বৃত্র, নৈগমেয় ও বাণ, বল ও বিনায়ক যুদ্ধে লিপ্ত হল। দানব ও প্রমথদের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হতে লাগল। এরূপে শ্রেষ্ঠ দানবগণ যুদ্ধে লিপ্ত হল। দানব শ্রেষ্ঠ তুহুন্ত বজ্ৰপানি ইন্দ্রের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। কুজম্ভ বিষ্ণুকে আক্রমণের জন্য সেদিকে ছুটে গেল।

সেল্কি দৈত্য ও যম, বরুণ ও পবন, এক্ক ও রণপ্রচণ্ড কালনেমির মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ বাধল। বিদ্যুন্মালী একাদশ রুদ্রের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। অশ্বিনী কুমারদ্বয় ও তারকাসুর, আদিত্যগণ ও শঙ্কর এবং নিবাত কবচ প্রভৃতি অসুরগণ ও সাধ্যরা জ্বম্ভণ রূপিণী মরুদরা দ্বন্দ্বযুদ্ধ আরম্ভ করল। এভাবে দুশো বছর পর্যন্ত দ্বন্দ্ব যুদ্ধ চলল।

দানবরা এরপর দেবতাদের গিলতে শুরু করল এবং এতে দ্রুত দেব সৈন্য নিঃশেষিত হয়ে পড়ল। যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত জায়গা দ্রুত শূন্য হয়ে গেল। রুদ্রদেব জন্তারুপিণী অম্বিকার সৃষ্টি করলেন।

দানবরা তাঁর আক্রমণে অলস ও বিবশ হয়ে পড়ল। তারা আলস্য ভরে হাই তুলতে লাগল। তখন তাদের মুখ থেকে প্রমথ ও দেবগণ বেরিয়ে পড়তে লাগল। মহাত্মা দেবতারা তখন পুনরাবির্ভূত হয়ে যুদ্ধ করে শঙ্করের সাহায্যে দানবদের পরাজিত করতে লাগলেন।

এরপর সাত-আটশো বছর ধরে মহাদেব সান্ধ্য উপাসনায় রত হলেন। আঠারোটি হাত ধারণ করলেন সেই অব্যয় পুরুষ। সরস্বতী নদীর জলে হর স্নান করে কৃতার্থ হয়ে ভক্তি ভরে নিজের মাথায় পুস্পাঞ্জলি ছুঁইয়ে তা সরস্বতী নদীর জলে নিক্ষেপ করলেন। তারপর হিরণ্যগর্ভ ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চারণ করে ভাবগম্ভীর ভাবে নাচতে লাগলেন।

তারপর তিনি সান্ধ্য উপাসনা শেষ করে নাচ বন্ধ করে পুনরায় দানবদের সাথে যুদ্ধ করতে কৃত সংকল্প হলেন। ফলে আবার যুদ্ধ আরম্ভ হল। দানবরা আবার সম্পূর্ণ পরাজিত হল। অন্ধকাসুর তখন তার ভাই সুন্দাসুরকে বললেন–শম্ভুকে আমরা কোনো মতেই জয় করতে পারছি না, অতএব পদ্মলোচনা গিরিবালা যেখানে আছে, চলো আমরাও সেখানে যাই।

সেখানে গিয়ে শম্ভুরূপ ধারণপূর্বক গিরিবালাকে মোহিত করার চেষ্টা করব আর সুন্দর সুর তুমি নন্দীরূপে আমার পাশে থাকবে। তাকে উপভোগ করে পরে এই দেবতা ও প্রমথদের পরাজিত করব। তৎক্ষণাৎ অন্ধক শঙ্কর ও সুন্দাঘুর নন্দীর বেশ ধারণ করল। তারপর মন্দরাচলে হাজির হল। কিন্তু তাদের শরীরে যুদ্ধের ক্ষত চিহ্ন থেকে গেল।

গিরি কন্যা উমা ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে জয়া বিজয়া মালিনী প্রভৃতি সখীদের বললেন–দেখো দেখো, দেবদেব, আমার জন্য যুদ্ধে গিয়ে কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। তাই অবিলম্বে পুরানো ঘি, কাপড়ের টুকরো দই ও নুন নিয়ে এস। কারণ আমি নিজেই পিনাকপাণির ক্ষতস্থান বেঁধে দেব।

সেইহেতু তিনি তখন মহাদেবের শরীরে আরো কোনো জায়গায় ক্ষতচিহ্ন আছে কিনা ভালো করে দেখতে লাগলেন এবং তিনি অন্ধকের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারলেন এবং তিনি সেই স্থান থেকে অবিলম্বে পালিয়ে গেলেন। অন্ধকও তার পিছনে ছুটে গেল। অসুরের হাতে কলুষিত হবার ভয়ে তিনি সখীগণসহ গৃহ ত্যাগ করে উপবন মধ্যে আশ্রয় নিলেন।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

তথাপি তিনি তপস্যার পুণ্য ফল রক্ষার জন্য অভিশাপ দিলেন না। তিনি পবিত্র সাদা অর্ক ফুলের ভেতর প্রবিষ্ট হলেন।

তার সখীরা লতা গুল্মে বিলীন হয়ে গেলেন। পার্বতীকে দেখতে না পেয়ে অন্ধক সুন্দকে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করল। তার ফিরে আসার সাথে সাথে প্রবল যুদ্ধ শুরু হল। বিষ্ণু তখন শঙ্করের কল্যাণ কামনায় অসুরদের বিধ্বস্ত করতে লাগলেন।

তিনি এক একবারে পাঁচ-সাতজন দৈত্যকে সেনানায়ককে তীর বিদ্ধ করলেন। কিছু দৈত্যকে গদাপ্রহারে, কাউকে চক্র নিক্ষেপ, কাউকে খঙ্গাঘাতে, কাউকে দৃষ্টিপাতে ভস্মীভূত করে নিপতিত করলেন।

কিছু দানব হলাকর্ষণে, কিছু মুষল প্রহারে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। গরুড়ও ঠোঁট ও পাখার আঘাতে বেশ কিছু দানব বিনষ্ট করল। পুরাণ-পুরুষ বিধাতা তার পদ্মজলে সকলকে অভিষিক্ত করলেন। এই ব্রহ্মসলিলে অভিষিক্ত হয়ে সকলে উদ্যম শক্তি ফিরে পেল। দানবরা এই বারি স্পর্শে বিনষ্ট হল। দেবতাদের সাহায্যের জন্য ইন্দ্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন।

ইন্দ্রকে দেখে বলাসুর তার দিকে ছুটে গেল। বলাসুরকে দেবতা ও দানব কেউ পরাজিত করতে পারে না। ইন্দ্র তার বজ দিয়ে বলাসুরের মাথায় সজোরে আঘাত করল। কিন্তু বজ্ৰ টুকরো টুকরো হয়ে গেল বলাসুরের মাথায় পড়ে। এবার ইন্দ্র ভয় পেয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে গেল। জম্ভ তাঁকে কটুক্তি করলেও ইন্দ্র ফিরে এলেন না।

ইন্দ্র বিষ্ণুকে বললেন, যে তিনি নিরস্ত্র হয়ে পড়েছেন তাই, বিষ্ণু যেন তাকে অস্ত্র দান করেন। বিষ্ণু ইন্দ্রকে বললেন, তুমি গর্ব পরিত্যাগ করে আমার আশ্রয় নিয়েছ, তাই আমি সন্তুষ্ট হয়েছি এবং এই বলে ইন্দ্রকে এক শক্তি দিলেন অগ্নি। অগ্নি প্রদত্ত এই দারুণ শক্তি নিয়ে জম্ভকে বধ করার জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরলেন ইন্দ্র।

ইন্দ্রকে দেখে জম্ভাসুর ঐরাবতকে সজোরে আঘাত করল। ঐরাবত ধরাশায়ী হয়ে পড়ল। ইন্দ্র তখন ভূতলে পালিয়ে এলেন। সিদ্ধ ও চারণগণ তাকে পালাতে মানা করলেন। ইন্দ্র তখন বললেন, তিনি বিনা বাহনে কেমন করে যুদ্ধ করবেন? তখন দেবতা ও গন্ধর্বরা তার জন্য জগৎ রথ পাঠিয়ে দিল।

গান্ধর্বগণ তখন স্বস্তিক চিহ্ন সম্পন্ন এক বিশাল রথ পাঠালেন যা বানরধ্বজে বিভূষিত। বহু অশ্ববাহিত, কিঙ্কিনীজালে মণ্ডিত এইরথ বিশুদ্ধ স্বর্ণে নির্মিত।

তখন ইন্দ্র কোনো সারথি না দেখে জানতে চাইলেন, কিভাবে তিনি যুদ্ধ করবেন ও ঘোড়াদের কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু গন্ধর্বরা যখন বলল, যে এই রথ তাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তখন ইন্দ্র রথ ত্যাগ করে ধরাতলে পতিত হলেন।

ইন্দ্রকে পতিত দেখে ভূমিতল কেঁপে উঠল। পৃথিবীকে কম্পিত দেখে এক ব্রাহ্মণ মহিলা স্বামীকে বললেন–এই বালককে যথাসুখে ঘরের বাইরে রক্ষা করুন।

ব্রাহ্মণ যখন জিজ্ঞাসা করলেন, কেন বালকটিকে ঘরের বাইরে রাখবেন? তখন ব্রাহ্মণী বললেন–যে, ধরাতলে কেঁপে কেঁপে উঠল যে বস্তু ঘরের বাইরে রাখা যায় তাই দ্বিগুণ হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ নিঃশঙ্ক চিত্তে বালককে ঘরের বাইরে রেখে দিলেন এবং পুনরায় গাভী দুটি নিয়ে যাবার জন্য ঘরে ঢুকলেন।

তখন ব্রাহ্মণী বললেন, গাভীদের বাইরে রাখলে আপনার অনিষ্ট হবে। ব্রাহ্মণীর কথায় সবেগে ঘরের বাইরে এসে দেখলেন দুটি বালক মাটিতে শুয়ে আছে। এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখে ব্রাহ্মণ প্রকৃত তত্ত্ব জানতে চাইলেন এবং জানতে চাইলেন অপর বালকটি কিরূপ গুণবান হবে এবং তার কাজই বা কি হবে?

এ সম্বন্ধে মহর্ষি গালবের তত্ত্ব বলতে বললেন। ব্রাহ্মণী বললেন, যে তিনি আজ কিছুই বলবেন না। ব্রাহ্মণ বললেন–যে, তিনি না শুনে জলগ্রহণ করবেন না।

তখন ব্রাহ্মণী বললেন–এই বালকটি ইন্দ্রের সারথি হবে। একথা শুনেই বালকটি ইন্দ্রের সাহায্যের জন্য যাত্রা করল। গন্ধর্বরা তাদের প্রভাব বলে বালককে আরো তেজস্বী করে তুললেন। সেই বালক তখন ইন্দ্রকে বলল, যে সে তার রথের সারথী।

ইন্দ্র তখন জানতে চাইলেন, সে কার পুত্র এবং কেমন করে ঘোড়াদের নিয়ন্ত্রণ করবে? বালক তখন বলল, সে শমীকের পুত্র এবং ভূতলে জন্মে গন্ধর্ব তেজে পরিপুষ্ট হয়েছে। ইন্দ্র একথা শুনে আকাশ পথে অধিষ্ঠিত হলেন। এই ব্রাহ্মণ তনয় তখন মাতলি নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এবং শমীকনন্দন মাতলি ইন্দ্রের রথের সারথি হলেন।

এই রথে চেপে মন্দার পর্বতে গেলেন এবং এক সুপ্রসিদ্ধ সুবিশাল শরসহ শরাসন দেখতে পেলেন। সুরপতি সেই ধনুক গ্রহণ করে স্বত্ত্ব, রজ ও তমোময় তিন দেবতাকে স্মরণ করে তাতে জ্যারাপন করে শর সন্ধান করলেন। সেই ধনুক থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ নামাঙ্কিত অত্যুগ্র শরসমূহ বেরিয়ে গিয়ে দানব বাহিনী বিমর্দিত করতে লাগলেন।

শরজালে ইন্দ্র সমস্ত পৃথিবী ঢেকে দিলেন। রথের সারথি ঘোড়া শরবিদ্ধ হয় ভুলুণ্ঠিত হল। পদাতিক বাহিনী ধরাশায়ী হল। রণস্থল অসংখ্য হতাহত সৈন্যে ভরে গেল। জম্ভ ও কুজম্ভ ভীষণ গদা হাতে নিয়ে ইন্দ্রের দিকে ছুটে গেল। বিষ্ণু কুজম্ভকে চক্রের আঘাতে নিহত করলেন।

কুজম্ভকে নিহত দেখে জম্ভ ক্রুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে আক্রমণ করল, ইন্দ্রও তখন যমদণ্ডের মতো ভয়ঙ্কর এক শক্তি জম্ভকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলেন। জম্ভাসুর গদা নিয়ে সেই শক্তিকে আঘাত করল।

কিন্তু সেই শক্তি জম্ভের হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল। তাকে নিহত হতে দেখে দৈত্যরা রণস্থল ছেড়ে পালাল। প্রমথগণ তখন হরির অর্চনা করে ইন্দ্রের বীর্যবলের প্রশংসা করতে লাগল।

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, ইন্দ্র অসুররাজ অন্ধককে বললেন–মহাসুরেরা পালিয়ে গেছে। তিনি অন্ধককে মন্দার পর্বতে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করলেন। অন্ধক তখন বলল, সে কখনই রণস্থল ছেড়ে ভয়ে পালিয়ে যাবে না। আজ তার শক্তি ও পরাক্রমের পরীক্ষা হবে। তিনি দেব, দানব, গন্ধর্ব, ইন্দ্র ও মহেশকে যুদ্ধে জয় করবেন।

অন্ধক সারথিকে বলল, রথকে হরের কাছে নিয়ে যেতে। তিনি শর বর্ষণে সমগ্র প্রমথ বাহিনী মন্থিত করবেন। সারথি তখন বিশাল ঘোড়াদের হরের দিকে চালিত করল, ঘোড়াগুলি অবসাদ গ্রস্তের মতো এগিয়ে চলল। ক্রমে তারা প্রমথ বাহিনীর নিকটবর্তী হল।

ঘোড়াগুলি বায়ুর ন্যায় বেগবান হলেও প্রমথ বাহিনীর সম্মুখবর্তী হতে তাদের সম্বৎসর পার হয়ে গেল। অন্ধক এবার তীর ছুঁড়ে ইন্দ্র, উপেন্দ্র ও মহেশকে আঘাত করতে উদ্যত হল। জনার্দন তখন সুরবল বাণাচ্ছন্ন দেখে দেবতাদের বললেন, এভাবে নিহত হওয়া সমীচীন নয়।

শত্ৰু অন্ধকের সারথি ঘোড়াদের উপযুক্ত শিক্ষা দাও, রথ ভেঙে তাদের রথহীন কর, তাকে শঙ্কর ভস্মীভূত করে ফেলবেন। দেবগুরু বললেন–উপস্থিত শত্রুকে উপেক্ষা করত নেই, বাসুদেব এভাবে সকলকে উত্তেজিত করতে লাগলেন। তারা তখন ইন্দ্র, বিষ্ণুদের নিয়ে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হলেন।

জনার্দন হাজার ঘোড়াকে বিধ্বস্ত করলেন গদাঘাতে, কার্তিকেয় অন্ধকের সারথির হৃদয় বিদীর্ণ করে দিলেন।

বিনায়ক, প্রমথ, ইন্দ্র ও দেবতাগণ অসুরদের রথ চুর্ণ-বিচুর্ণ করলেন। অন্ধক তখন গদা নিয়ে দেবতাদের আক্রমণ করল। আটজন দেব যোদ্ধাকে বধ করে অন্ধক মহাদেবকে বলল–তুমি দেব সৈন্যদের সহায়, তাই আমি অসহায় হয়ে পড়লেও তোমাকে যুদ্ধে পরাস্ত করব।

অন্ধকের কথায় মহেশ ইন্দ্র, ব্রহ্মা ও যাবতীয় দৈব সৈন্যদের নিজ দেহে প্রবেশ করিয়ে দিলেন। তারপর অন্ধক এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখে গদা নিয়ে সবেগে শঙ্করকে আক্রমণ করল।

ভবা তার বৃষবাহন পরিত্যাগ করে হাতে শূল নিয়ে গিরিতটে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি অন্ধকের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ করে ভৈরবমূর্তি ধারণ করে অন্ধকের বক্ষস্থলে বিদীর্ণ করে দিলেন, তার বড় দাঁতগুলি করাল হয়ে উঠেছিল।

তাকে কোটি সূর্যের মতো তেজস্বী দেখাচ্ছিল, তিনি সিংহবর্মে আচ্ছন্ন, জটাজালে মণ্ডিত, ভুজঙ্গহারে ধূষিত, মল পঙ্কে পরিলিপ্ত বাঘের মতো বাহু ও আগুনের মতো চক্ষুবিশিষ্ট হয়ে এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করলেন। এবং শূল প্রহারে শত্ৰুকূল সংহার করতে প্রবৃত্ত হলেন।

সেই দানবও তখন শূলাঘাতে শম্ভর হৃদয় বিদীর্ণ করে দিয়ে দ্রুতবেগে এক ক্রোশ দূরে গিয়ে দাঁড়াল। শিব তখন শূলাঘাতে শত্রুকে বিমর্দিত করলেন। অন্ধক তখন মহাদেবের মাথায় সজোরে গদা দিয়ে আঘাত করল, প্রজাপতি পশুপতি সেই গদাঘাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না, কিন্তু তার ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্ত ঝরে পড়ল।

এ রক্তের পূর্বধারা থেকে এক ভৈরবের আবির্ভাব হল। তার নাম বিদ্যারজ। সে আগুনের মতো বর্ণময় ও পদ্মমালা গলায় ভূষিত, অপর রক্তধারা থেকে রুদ্র নামক এক ভৈরবের উৎপত্তি হল।

এই রুদ্র সর্বলোক পূজিত। রক্তের অন্যধারা থেকে আরও তেরজন ভৈরবের আবির্ভাব হল। জনসমাচা তারা-চণ্ড বা পালাদি নামে বিখ্যাত হলেন। মাটিতে মেশা রক্তধারা থেকে ললিতরাজ নামক ভৈরবের উৎপত্তি হল। তার হাতে শূল ছিল।

এরূপ সাতজন ভৈরব ছাড়াও বিঘ্নরাজ নামক এক ভৈরবের উল্লেখ আছে। সর্বমোট আটজন ভৈরব।

মহাদেব মহাসুরকে হঠাৎ দারুণভাবে শূল বিদ্ধ করল। শূলভেদহেতু রক্তস্রাবে মহাদেবের মূর্তি আকণ্ঠ মগ্ন হয়ে গেল। মহাদেবের কপাল হতে ঘাম ঝরে পড়তে লাগল। এই ঘাম থেকে এক রক্তাপ্লুত কন্যা জন্মগ্রহণ করল। ভূতলে পতিত ঘাম থেকে কয়লার মতো কালো এক বালক জন্মাল। সেই বালক তৃষ্ণাতুর হয়ে অন্ধকের রক্ত পান করতে লাগল।

কন্যাটিও অন্ধকের রক্ত চেটে খেতে লাগল। মহাদেব প্রভাতকালীন সূর্যের মতো কান্তিমতী কন্যাকে বললেন–দেবগণ, মহর্ষিগণ, পিতৃগণ এবং যক্ষ, বিদ্যাধর ও মানুষেরা তোমাকে পূজা করবেন এবং তারা বলি, ফুল ও উপহার হাতে নিয়ে তোমার স্তুতি করবেন। এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিত থাকতে পার। অন্ধকাসুরের রক্তচর্চিত হওয়ার জন্য তার নাম হবে বৰ্ধিকা।

শঙ্কর একই কথা বললে বর্ধিক তখন বিন্ধ্যবাসিনী দুর্গার অনুসরণে যাত্রা করলেন। তিনি মহীতলে বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করে পরে হিঙ্গুল পর্বতে পৌঁছলেন। মহাদেব কুজকে সর্বশ্রেষ্ঠ বরদান করে বললেন, গ্রহরাজ হয়ে জগতের শুভাশুভ বিধান করবে। অন্য গ্রহ তার অনিষ্ট করবে না।

এরপর ভগবান অন্ধকের রক্ত পান করে তাকে অস্থিচর্মসার করে তুললেন। শম্ভুর বক্ষ থেকে উৎপন্ন আগুনের স্পর্শে অন্ধকের সকল পাপ দূরীভূত হল। অন্ধক এরপর আদিপুরুষের স্তব করে বলতে লাগল-তুমি ভীম মূর্তি ভৈরব, ত্রিলোকপিতা, সুতীক্ষ্ণ শূলধারী, বাসুকিহারভূষিত, কৃপালমি ও ত্রিনয়ন, সর্বেশ্বর, বিশ্বমূর্তি, সুরাসুরবন্দিত পাদপীঠ, ত্রিলোকের জনক জননী, বৃষকেতন, সকলের আশ্রয়দাতা আমি তোমার শরণাপন্ন হলাম।

দেবগণ তোমায় শিব, সিদ্ধগণ হর, মহর্ষিগণ স্থানু, যক্ষগণ ভীম, মনুষ্যগণ মহেশ্বর, ভূতগণ ভূতাধিপ, নিশাচরের উগ্র, পবিত্ৰচেতা পিতৃগণ ভব নামে অভিহিত করে থাকেন। আমি তোমার দাস। আমার যাবতীয় পাপ দূর কর। তুমি ত্রিযুগ, ত্রিধর্মা, ত্রিপুষ্কার, ত্রিনেত্র সর্বব্যাপী, শ্রুতিরূপী ও অব্যয় পুরুষ।

আমি তোমার শরণাগত, ত্রিপদ প্রতিষ্ঠ, ষড়ঙ্গবিভু, স্ত্রীপুরান্মুখ, ত্রিলোকীনাথ আমায় পবিত্র কর। আমি অপরাধী, আমি কাম রিপুর বশীভূত, এখন তোমার করুণাপ্রার্থী। আমি পাপী, পাপকর্মা, ও পাপাত্মা, আমার পাপ হরণ কর।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

তুমি কর্তা, ধাতা, জয় মহাজয়, মঙ্গল্য, ঈশাণ, ওঁকার, অব্যয় ও ধ্রুবস্বরূপ, ব্রহ্মা, সৃষ্টিকর্তা, সর্বরক্ষক বিষ্ণু, মহেশ্বর, ইন্দ্র, বর্ষাকার, ধর্ম, সূক্ষ্ম, ব্যক্তরূপ, অব্যক্ত, ধীবর ও সচরাচরব্যাপী, আদি, মধ্য, অন্ত, সহস্রপাদ, বিজয়, সহস্রাক্ষ বিরূপাক্ষ, মহাভুজ, অনন্ত, সর্বগামী, সর্বব্যাপী, পরমাত্মা, পুণ্যাধিক, অব্যয়, সুরপতি, রুদ্র পশুপতি, শিব, ত্রিবিদ্যার আধার, জিতক্রোধ, শত্রুজয়ী, জিতেন্দ্রিয়, জয় ও শূলপানি, আমি তোমার শরণাগত।

পশুপতি অন্ধকের স্তবে প্রীত হলেন এবং অন্ধককে তিনি বর দিতে চাইলে অন্ধক তাকে বলল, যেন তার যাবতীয় কায়িক ও মানসিক পাপ দূরীভূত হয়। দানব ভাব বিদূরিত হয় এবং যেন হরের প্রতি অবিচল ভক্তি থাকে। মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে একে সকল পাপ থেকে মুক্ত করলেন।

তিনি বললেন–দৈত্যভাব থেকে মুক্ত হয়ে ভৃঙ্গী নামে ‘আমার গণপতি হও।’ এই বর দানের পর অন্ধককে শূল মুক্ত করে তাকে সুস্থ করে তুললেন। তারপর নিজ দেহ থেকে সকল দেবতাকে বাইরে বার করে আনলেন।

পরে নন্দী ও অন্যান্য গণসমূহকে ভৃঙ্গীকে দেখিয়ে বললেন–এই সেই অন্ধক। ভগবান এবার সকলকে নিজ নিজ স্থানে গিয়ে সুখভোগ করতে বললেন। ইন্দ্ৰ মলয় পর্বতে চলে যান। এবং কাজ শেষ হলে স্বর্গলোকে চলে যাবেন।

এবার ভব সুখাসীন হয়ে প্রমথদেরও বিদায় দিলেন। তারা নিজ নিজ বাহনে চেপে নিজ নিজ স্থানে প্রস্থান করলেন। এই সকল স্থানে গোসমূহ কোম দোহন করে এবং হ্রদসমূহ পায়কর্দমে পরিপূর্ণ থাকে। নদীসমূহ অমৃতধারা বহন করে।

মহেশ্বর এরপর অন্ধককে সাথে নিয়ে নন্দী শৈলে এলেন। দুহাজার বছর পরে ফিরে তিনি গিরিবালাকে সাদা অকফুলের মধ্যে দেখলেন। এবং মহেশকে দেখে তিনি ফুল থেকে বেরিয়ে এসে সখীদের ডাকলেন। দেবীর আহ্বানে জয়া বিজয়া এসে হাজির হলেন। তখন দেবী সখী পরিবৃত হরের অপেক্ষা করতে লাগলেন।

পরে মহাদেব অন্ধক, নন্দী ও গিরিজা তিনজনকেই আলিঙ্গন করলেন। তিনি দেবীকে জানালেন যে, তিনি অন্ধককে তার দাসত্বে নিয়োগ করেছেন। তুমি তাকে তোমার পুত্র রূপে দেখো। তিনি অন্ধককে জননীর শরণাপন্ন হতে বললেন।

অন্ধক ভক্তি বিনম্র চিত্তে গৌরীর স্তব করতে লাগল। সে বলতে লাগল–যিনি দেবপ্রিয়া, শিবপ্রিয়া, লোকধাত্রী, জনায়িত্রী, স্কন্দজননী, মহাদেব প্রণয়িনী, চেতনা, ত্রিলোকমাতা, ধরিত্রী, দেবতা, মাতা শ্রুতি, স্মৃতি, দয়াস, লজ্জা, কামপ্রসবিনী, প্রীতিরূপিণী, সদাপার্বণী, দৈত্যসৈন্য সংহারকারিণী, মহামায়া, সুমায়া, বৈজয়ন্তী, শুভরূপিণী, কালরাত্রি গোবিন্দ প্রসবিনী, গিরিরাজ পুত্রী, সর্বদের বন্দিতা, বিদ্যা, সরস্বতী, ত্রিনেত্র মহিষী ও মৃড়ানী সেই দেবীকে প্রণাম করি।

দেবী তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিতে চাইলেন। ভৃঙ্গী তখন চাইল, তার সব পাপ যেন ক্ষয় হয়। গৌরী “তথাস্তু’ বলে বর দান করলেন এবং বললেন, মহাদেবের পূজা করে গণসমূহের আধিপত্য লাভ কর। পুলস্ত্য এরপর নারদকে বললেন–যে, তিনি এক পবিত্র, পুণ্যদায়ী কাহিনি তাঁকে বর্ণনা করলেন।

৩৯

নারদ পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইলেন, মহেন্দ্র মলয়াচলে গিয়ে কী কাজ করলেন। পুলস্ত্য বললেন, তিনি তার বিবরণ দিচ্ছেন। ময় ও তার দানবরা পরাজিত হয়ে যখন পাতালে যেতে উদ্যত হল, তখন হঠাৎ তারা মলয়াচলের নয়নাভিরাম প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল।

তারা দেখল সিদ্ধগণ পরিবৃত মলয় পর্বতের নানা স্থান লতাবিতানে আবৃত হয়ে আছে। সেখানে মদমত্ত প্রাণীগণ বিচরণ করছে, ভুজঙ্গবেষ্টিত কত শত সুশীতল চন্দন তরু বিরাজ করছে এবং সুগন্ধি ফুলের সৌরভ ভরে সেই স্থান সর্বদাই ভরে আছে। তারা সেখানে বাস করবে বলে মনস্থির করল।

তারা দেবতাদের পতি বিদ্বেষভাব প্রকাশ করতে লাগল। শঙ্কর তখন ইন্দ্রকে মলয় পর্বতে পাঠালেন। ইন্দ্র পথে গোমাতা সুরভির দেখা পেয়ে তাকে প্রদক্ষিণ করে মলয় পর্বতের দিকে তাকালেন।

তিনি দেখলেন দানবরা বেশ আনন্দেই সেখানে বাস করছে। ইন্দ্র তখন তাদের যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। ইন্দ্রের ডাকে তারা তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসতে লাগল।

ইন্দ্র শরবর্ষণে সেই দৈত্যদের সমচ্ছন্ন করে ফেললেন। ইন্দ্র তীর ছুঁড়ে পাক নামক দানবকে বধ করলেন। ইন্দ্র তখন ‘পাকশাসন’ নামে অভিহিত হলেন। তারপর তিনি পুরদানবকে নিহত করে পুরন্দর’ নামে প্রসিদ্ধ হলেন।

ইন্দ্রের হাতে পরাজিত হয়ে দানবরা আবার রসাতলে আশ্রয় নিল। ত্রিলোচন এই কার্য সাধনের জন্য ইন্দ্রকে মলয় পর্বতে পাঠিয়ে ছিলেন। নারদ তারপর জানতে চাইলেন, ইন্দ্রকে গোত্রভিৎ বলা হয় কেন?

পুলস্ত্য বললেন, তিনি সব কাহিনি বলবেন। দিতি তার পুত্র নিহত হবার পর পতি কাশ্যপের কাছে। ইন্দ্রের হন্তাকারী পুত্র প্রার্থনা করল। দিতির প্রার্থনায় কশ্যপ বললেন, সহস্র দিব্য বৎসর ধরে শুদ্ধাচার পালন করলে ত্রিলোকনায়ক ইন্দ্ৰহন্তা পুত্র প্রসব করতে পারবে। দিতি তখনই শৌচাচার পালন করতে লাগলেন।

কশ্যপ তার গর্ভধারণ করে দিয়ে উদয়াচলে চলে গেলেন। তিনি চলে যাবার পর ইন্দ্র দিতির সেবা করার জন্য সেখানে এলেন। নিয়তির প্রেরণায় দিতি ইন্দ্রকে সেবা করার অনুমতি দিলেন। ইন্দ্রও তার সেবা করতে লাগলেন ছিদ্রান্বেষী সাপের মতো। এভাবে দশ বছর পার হবার পর একদিন দিতি শোকার্ত হৃদয়ে স্নান করে চুল খুলে শুয়ে ছিলেন।

দেবরাজ ইন্দ্র তখন দিতির নাকের ছিদ্র দিয়ে তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং দেখলেন একটি বালক কোমরে হাত দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে অবস্থান করছে। ইন্দ্র তার মুখমণ্ডল মাংসপেশী হাত দিয়ে ধরে পিষতে লাগলেন। তখন ওই মাংসপেশী কঠিন হয়ে উঠল।

পরে তা উপরের দিকে অর্ধেক এবং নিচের দিকে অর্ধেক বেড়ে উঠল। তখন তা থেকে এক শতপর্ব বজ্র উৎপন্ন হল। ওই বজ্রের আঘাতে ইন্দ্র দিতির গর্ভকে সাত টুকরো করে দিলেন। গর্ভস্থ বালক উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল। দিতি ইন্দ্রের এই বীভৎস কাজ ও বালকের কান্না শুনতে পেলেন।

ইন্দ্র এরপর সপ্তখণ্ডিত গর্ভের প্রত্যেকটি খণ্ডকে সাত টুকরো করে দিলেন। সেই খণ্ড মরুৎ নামে ইন্দ্রের ভৃত্যরূপে আবির্ভূত হল। ইন্দ্র তখন গর্ভ থেকে বেরিয়ে ভীত হয়ে কৃতকার্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল।

দিতি তখন ইন্দ্রকে বললেন, এতে তোমার কোনো দোষ নেই এ আমার অদৃষ্টলিপি। পূর্বকালে ইন্দ্র এই ভাবে নিজ সহোদরদের বজ্রাঘাতে ছিন্ন করেন এবং গোত্রভি নামে খ্যাত হন।

নারদ মহর্ষি পুলস্ত্যর কাছে জানতে চাইলেন, দিতি থেকে উৎপন্ন যে শ্রেষ্ঠ মরুৎগণের কথা আপনি বললেন, তার। কে এবং পূর্বেই বা কারা মরুৎ নামে প্রসিদ্ধ ছিল–সেসব কাহিনি আমাকে বলুন।

পুলস্ত্য বললেন, স্বয়ম্ভুব মন্বন্তর থেকে বর্তমান মন্বন্তর পর্যন্ত আগেকার মরুৎগণের উৎপত্তি কাহিনি বলছি শোনো। স্বায়ম্ভুব মনুর পুত্র প্রিয়ব্রত। তাঁর যবন নামক ত্রিলোক প্রসিদ্ধ পুত্র হয়েছিল। যবন অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। তখন তাঁর পত্নী সুবেদা শোক বিহ্বল হয়ে কাঁদতে থাকেন।

তিনি তার পতির মৃতদেহ ধরে কাঁদতে থাকলে এই সময় অন্তরীক্ষ থেকে এক আকাশ বাণী আবির্ভূত হয়ে সুবেদাকে কাঁদতে কাঁদতে পতির চিতার আগুনে ঝাঁপ দিতে বলল। তখন রাজপত্নী বলল, এই রাজা নিঃসন্তান, বলেই তিনি কাঁদছেন নতুবা তার কান্নার কারণ নেই। তখন আকাশবাণী বলল ওই রাজার ঔরসে তোমার সাতপুত্র উৎপন্ন হবে।

তুমি চিতার আগুনে ঝাঁপ দাও। সুবেদা তখন স্বামীর চিতার আগুনে ঝাঁপ দিয়ে অগ্নির ধ্যান করতে লাগলেন। তারপর তার স্বামী পূর্বশ্রী ফিরে পেয়ে পত্নী সনন্দিনীকে সাথে নিয়ে চিতা থেকে উঠে এসে অন্তরীক্ষে চলে গেলেন।

কিছুদিন পরে মহিষী রজঃস্বলা হলে রাজা তার সাথে মিলিত হলেন। পরিণামে বলবীর্যশালী পুত্র জন্মাল। এই পুত্ররা সকলে সুবুদ্ধিসম্পন্ন, মহান ও অধিপতি হলেন। পাঁচদিন ধরে রাজা মহিষীর সাথে আকাশে অবস্থান করলেন। পরে ষষ্ঠ ঋতু ব্যর্থ হতে না দেবার অভিপ্রায়ে কামাচারী হয়ে তার সাথে রমণ করলেন।

তখন অন্তরীক্ষ থেকে তার শুক্র স্খলিত হবার পর তিনি পত্নীসহ দিব্যজীবন লাভ করে ব্রহ্মলোকে চলে গলেন। অন্তরীক্ষ থেকে তার স্খলিত শুক্র এক পদ্মফুলের মধ্যে পড়ল। তখন চিত্রা, বিশালা, হরিতা, অনিলীনা প্রভৃতি মুনিপত্নীরা এই ঘটনা দেখতে পেলেন।

তারা মুনিদের সে ব্যাপারে কোনো কথাই বললেন–না। তারা চিরস্থায়ী যৌবন লাভ করার ইচ্ছায় সেই শুক্র পান করলেন। অমনি তাদের ব্রহ্মতেজ নষ্ট হয়ে গেল। তারা কলুষিত হয়ে পড়লে তাদের পতিরা তাঁদের পরিত্যাগ করলেন।

তাদের গর্ভে সাতটি পুত্র উৎপন্ন হল এবং সেই বালকদের কান্নার শব্দে জগৎ বিচলিত হয়ে পড়ল। তখন ব্রহ্মা তাদের বললেন, তারা মরুৎ নামে বিখ্যাত হবে এবং তাদের বয়ঃকাল স্থির থাকবে। ব্রহ্মা তাদের নিয়ে আকাশচারী মরুৎপদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তারা আদি মরুৎ নামে পরিচিত হলেন।

পুলস্ত্য এবার মরুৎগণের কথা বলতে শুরু করলেন। স্বরোচিষের পুত্র ঋতধ্বজ। তার আবার সাত পুত্র। তারা সকলেই সূর্যসম পরাক্রমী ছিল। তারা তপস্যার জন্য মেরুপর্বতে যায়। সেখানে তারা ব্রহ্মার উপাসনা করতে লাগল।

তাদের কঠোর তপস্যায় ভয় পেয়ে ইন্দ্র অপ্সরা পুতনাকে বললেন, মেরু পর্বতে চলে যেতে এবং ঋতধ্বজের পুত্রদের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাতে। তারা যেন কিছুতেই সিদ্ধিলাভ করতে না পারে। আশ্রমের খুব কাছেই একটি ছোট নদী বয়ে যাচ্ছে।

তন্বী পুতনা সেই নদীর জলে স্নান করতে লাগল। তা দেখে রাজকুমারদের মন বিচলিত হয়ে উঠল এবং তাদের বীর্য স্খলিত হল। এক জলচারিণী শঙ্খিনী সেই শুক্র পান করল। তাদের তপঃচ্যুতি ঘটায় তারা নিজ রাজ্যে ফিরে এলেন। এর বহুকাল পরে সেই শঙ্খরূপিণী প্রেয়সী জেলেদের জালে ধরা পড়ল।

জেলে ঋতধ্বজের পুত্রদের সেকথা বলল। তখন রাজকুমাররা সেই শঙ্খিনীকে দীঘির জলে ছেড়ে দিলেন। সেই শঙ্খিনী সাতটি শিশু সন্তান প্রসব করল। এরা ভূমিষ্ঠ হতেই মহাশঙ্খী মারা গেল। তখন এই অনাথ বালকরা দীঘির জলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে স্তন্যপিপাসায় কাঁদতে লাগল। ব্রহ্মা তখন তাদের বললেন–তারা বায়ুস্কন্দ বিহারী হবে।

ব্রহ্মা তাদের নিয়ে আকাশচারী মরুৎপদে প্রতিষ্ঠা করলেন। স্বারোচিষ মন্বন্তরে এভাবেই মরুৎগণের আবির্ভাব হয়েছিল।

এরপর পুলস্ত্য উত্তম মন্বন্তরীয় মরুৎগণের কথা বলতে লাগলেন। রাজা বমান নিষধরাজ্যের অধিপতি ছিলেন। তিনি সূর্যসম পরাক্রমশালী ছিলেন। তার পুত্রের নাম জ্যোতিষ্মন, তিনি গুণশালী ও ধার্মিক ছিলেন। তিনি পুত্রলাভের আশায় মন্দাকিনীর তীরে তপস্যা করেন। তার পত্নী তপস্যাকালীন তাঁকে সেবা শুশ্রূষা করেন।

তিনি অতিথিদের যথাযোগ্য পরিচর‍্যা করতেন। এই পদ্মপলাশ লোচনা সুশ্রোণী এরূপে পতির সেবা করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়লেন। এ অবস্থাতেও তিনি তেজস্বিনী ও সৌন্দর্যশালিনী ছিলেন। সপ্তর্ষিগণ তাঁকে দেখতে পেয়ে তাদের তপস্যার কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাজপত্নী সুশ্রোণী বললেন, আমরা পুত্রকামনায় তপস্যা করছি।

তখন সেই সাত ঋষি দ্বারা তারা বরপ্রাপ্ত হলেন যে, সাত পুত্রের জন্ম দেবেন। তখন রাজর্ষি জ্যোতিষ্মন পত্নীকে সাথে নিয়ে নগরে ফিরে গেলেন এবং মহিষী গর্ভধারণ করলেন রাজার সংসর্গে। তার গর্ভাবস্থাতেই রাজা মারা গেলেন।

তখন পত্নী তার সাথে সহমরণে যেতে বাইলেন। অমাত্যদের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি নিজ প্রতিজ্ঞায় অটল রইলেন। তিনি চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়লে আগুন থেকে শীতল জল পড়তে লাগল। সেই শীতল জলরাশিতে সিক্ত হয়ে রাজমহিষীর গর্ভ সাতভাগে বিভক্ত হয়ে গেল তা থেকেই মন্বন্তরীয় মরুৎগণের উৎপত্তি হয়েছিল।

পুলস্ত্য নারদকে বললেন, এরপর তিনি তামস মরুদগণের উৎপত্তির কাহিনি বলবেন। দন্তধ্বজ নামক তামস মনুর এক বিখ্যাত পুত্র ছিলেন। তিনি পুত্রকামনায় নিজ রক্ত মাংস আগুনে আহুতি দেন।

সেই রাজা তার চুল, রোম, স্নায়ু, অস্থি, মজ্জা, হোমানলে আহুতি দেন, এমনকি শুক্র পর্যন্ত তোমালনে আহুতি দিতে উদ্যত হলে, এইসময় হঠাৎই ‘শুক্র নিক্ষেপ কোরো না তুমি’–এরূপ বাক্য হোমানল থেকে শুনতে পাওয়া গেল।

রাজা তৎক্ষণাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হল। তারপর সেই আগুন থেকে সাতটি তেজস্বী পুত্র আবির্ভূত হয়ে খুব জোরে কাঁদতে লাগল। তাদের কান্না শুনে ব্রহ্মা তাদের মরুৎগণের দেবতা করে দিলেন।

এরাই তামস মন্বন্তরে মরুৎ দেবতা নামে বিখ্যাত হন। এরপর পুলস্ত্য রৈবত মন্বন্তরে যাঁরা মরুৎ হয়েছিলেন তাদের কথা বলতে শুরু করেন।

রৈবতের বংশে রিপুজিৎ নামে এক বলবান রাজা ছিলেন। তাঁর পুত্র সন্তান ছিল না। তিনি পুত্র লাভের ইচ্ছায় সূর্যদেবের আরাধনা করেন। এর ফলে তিনি একটি কন্যা সন্তান লাভ করেন। পিতৃগৃহে বাস কালে এই কন্যার পিতৃবিয়োগ ঘটে এবং কন্যা শোকে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়।

সপ্তঋষিরা তাকে প্রাণ ত্যাগ করতে নিষেধ করেন। কিন্তু রাজকন্যা অবিলম্বে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিল। তখন সেই প্রজ্জ্বলিত আগুন থেকে সাতটি শিশু সন্তান জন্মগ্রহণ করল। এরা মাতৃবিয়োগে কাঁদতে থাকলে ব্রহ্মা তাদের মরুৎ নামের দেবতা করে দিলেন।

এই ভাবেই রৈবত মন্বন্তরে মরুৎগণের উৎপত্তি হয়েছিল। মহিক নামে এক সত্যবাদী পবিত্র তপস্বী সপ্তসারস্বত তীর্থে কঠোর তপস্যা করেন। দেবতারা ভীত হয়ে তার তপস্যায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

ফলে তার শুক্র স্খলিত হয়ে সপ্তসারস্বত তীর্থের জলে গিয়ে পড়ে। তখন মুনিরা তাকে শাপ দিয়ে বলেন, যজ্ঞ কর্মের প্রারম্ভে তোমার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। ঋষিরা তাকে শাপ দিয়ে ফিরে এলেন। তারপর এই সপ্তসারস্বত থেকে সপ্ত মরূৎ অবতীর্ণ হল।

পুলস্ত্য জানালেন, একারণেই বলিকে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। প্রহ্লাদ মন্ত্রী ও শুক্রাচার্য পুরোহিত হন। দানবরা তাকে দেখতে এলে বলি তাদের যথোচিত অর্চনা করে সেখানের অভিজ্ঞদের কাছে জানতে চাইলেন, কি করলে সকলের কল্যাণ হবে। তারা বললেন–যে তার প্রপিতামহ হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত শক্তিশালী, দানবদের পরিপালক, অদ্বিতীয় বীর ও ত্রিভুবনের ইন্দ্র ছিলেন।

বিষ্ণু সিংহ রূপ ধারণ করে দৈত্যপতিকে সর্বজন সমক্ষেই বধ করেন। বিষ্ণু কুজমভাবাও বধ করেন। সুদর্শন, শঙ্খ ও পাক ইন্দ্রের হাতে নিহত হয়। পিতা বিরোচনও দেবতাদের দ্বারা নিহত হন। বলি তখন ইন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করলেন। প্রধান সেনাপতিরা সৈন্যদের আগে চলল।

মাঝে বলি, পিছনে কালনেমি, বাঁ দিকে শাম্ব ও ডান দিকে তারকাসুর, সৈন্যদের পরিচালনা করে নিয়ে যেতে লাগল। এভাবে দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চলল বহু সহস্র, অযুত ও অবুদ দানব।

ইন্দ্রও দেবতাদের নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। সমগ্র আদিত্য, বসু, রুদ্র, সাধ্য, বিশ্বদেব, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, বিদ্যাধর, গুহ্যক, যক্ষ, রাজর্ষি, সিদ্ধ ও ভূতগণ–কেউ রথে, ঘোড়ায়, হাতির পিঠে চেপে কেউ পক্ষিবাহিত বিমানে যেস্থানে দৈত্যসৈন্য সমবেত হয়েছিল সেখানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

বিষ্ণু গরুড়ের পিঠে চেপে যাত্রা করলেন। ইন্দ্র তখন বিষ্ণুর বন্দনা করলেন। কার্তিকেয় দৈবসৈন্যদের সামনে থাকলেন। বিষ্ণু সৈন্যবুহ্যের পশ্চাদভাগে, ইন্দ্র মধ্যে, জয়ন্ত বাঁদিক এবং বলবান বরুণ ডানদিক রক্ষার ভার নিলেন। এভাবে দেবতারা শত্রুপক্ষীয় সৈন্যদের আক্রমণ করল।

উদয় পর্বতের পাদদেশে তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। দেব সেনাপতি কার্তিকেয়র বাহুবলে পরিক্ষিত হয়ে দেবসেনা দানব সেনাদের সংহার করতে লাগলেন। ময়ের আধিপত্যে দানবরা দেবদেরও দলিত মথিত করতে লাগল। রথের চাকার ঘর্ষণে রণস্থল ধূলার অন্ধকার মেঘের মতো হয়ে উঠল।

ক্রমে যুদ্ধ ভয়ানক হয়ে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তস্রোত বয়ে যেতে লাগল। তাতে ধূলারাশি সকল দূর হল, ধূলিজাল দূর হলে দেবতারা সুবিশাল দানবসেনাদের আক্রমণ করলেন।

দেবতারা তখন অমৃত রসের আস্বাদে পরন্মুখ হয়েছিল। অবিলম্বে তারা দানব সেনার হাতে পরাজিত হয়েছিল। বিষ্ণু শরবর্ষণ করতে লাগলেন। বিষ্ণুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে দৈত্যরা কালনেমির কাছে গেল। কালনেমি বিষ্ণুকে আক্রমণ করতে গেল। দেব, যক্ষ, কিন্নর, প্রভৃতি সকলকেই মুখের মধ্যে সে পুরে নিতে লাগল।

নিজ অস্ত্রহীন হয়েও তিনি হাত, পা, ও নখের আঘাতে, ইন্দ্র, বরুণ সূর্য প্রভৃতি দেবসেনাদের বিমর্দিত করতে লাগল।

কালনেমি ক্রমে বিশ্বসংসার পুড়িয়ে ছাই করে দেবার অভিপ্রায়ে পৃথিবী ও আকাশের উপর নিচ আশপাশ সমস্ত দিকই ব্যাপ্ত করে প্রলয় কালীন আগুনের মতো ভীষণ মূর্তি ধারণ করল। দেবতারা ভয়ে যে যেদিকে পারল পালিয়ে গেল। দৈত্যরা তখন বিষ্ণুর দিকে অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে মারতে লাগল।

বিষ্ণুও অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বজ্রকঠিন বাণ ছুঁড়তে লাগলেন। ময়, বলি, কালনেমির আক্রমণে দেবতারা শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। বিষ্ণুর দৃষ্টিপাতে বলি, ময় শরজালে আচ্ছাদিত হয়ে কালনেমির শরণাপন্ন হল।

কালনেমি কেশবকে আক্রমণে উদ্যত হল। কেশব তাকে গদা হাতে আসতে দেখে নিজে ধনুক রেখে চক্র হাতে তুলে নিলেন। কালনেমি কেশবকে দেখে হেসে বলল, এই ব্যক্তি যুদ্ধে তার বিঘ্নকারী। এর মতো ক্রুর লোক আর নেই। যদি বিষ্ণু ভয়ে পালিয়ে না যায় তবে এখুনি তাকে পিষ্ট ও ভস্মীভূত করে দেবে। কালনেমি গদা দিয়ে গরুড়কে আঘাত করল।

বিষ্ণু কালনেমির এই গদাকে চক্রাঘাতে ছিন্ন করে দিলেন। এবং কালনেমির দুই বাহু কেটে দিলেন। তারপর বিষ্ণু চক্র দিয়ে তার মাথাও কেটে ফেললেন।

মস্তক ও বাহুহীন কালনেমি বুড়ো তালগাছ সম হল। গরুড় এরপর ঠোঁট দিয়ে। তার বুকে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিল। কালনেমি নিহত হলে দেবতারা আক্রমণ করলে দানবরা ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাল কেবল বানাসুর ছাড়া।

৪০

পুলস্ত্য বললেন, বানাসুরকে নির্ভীক দেখে দানবরা পুনরায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। বিষ্ণু বানাসুরকে অজেয় জেনে দেবতাদের নির্ভীক চিত্তে যুদ্ধ করে যেতে বললেন–এবং যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে বিষ্ণু অন্তর্হিত হলেন। মাধবের অন্তর্হিত হবার কথা শুক্রাচার্য বলিকে জানালেন।

তখন বলি শুক্রাচার্যের কথা অনুসারে দেবসেনাদের আক্রমণ করল। বহু দেবসেনা বধ করল। মায়াপুর বহু রূপ ধরে যুদ্ধ করতে লাগল। এই সময় দেবসৈন্যদের আক্রমণ করল বিদ্যাজি, পর, ভদ্র, বৃষপর্বা, অসিতাক্ষ, বিপাক, পিঙ্কুর প্রভৃতিরা।

এদিকে জনার্দনকে যুদ্ধক্ষেত্রে না দেখে দেব সেনারা রণে ভঙ্গ দিল। বলি, বান তাদের পশ্চাতে ধাবন করল। ইন্দ্ররা স্বর্গধাম থেকে ব্রহ্মলোকে পালিয়ে গেল। বলি সকলের সাথে স্বর্গরাজ্য ভোগ করতে লাগলেন। বানাসুর যমের, ময় বরুণের, রাহু চন্দ্রের, স্বর্ভানু সূর্যের এবং শুক্র বৃহস্পতির স্থান দখল করলেন।

অন্যান্য অসুররা দেবতাদের স্থান দখল করল। এই সময় ছিল পঞ্চম কলির আরম্ভ ও দ্বাপর যুগের অবসান লগ্ন। ক্রমে সপ্ত পাতাল, ত্রিভুবন বলি দখল করে নিলেন। বলি সুখে স্বর্গে বাস করতে লাগলেন।

গান্ধর্ব গায়কদল তাদের মনোরঞ্জনে নিযুক্ত হল। অপ্সরা তাদের নৃত্যের দ্বারা দৈত্যদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করল। বলি এরপর পিতামহ প্রহ্লাদকে স্মরণ করার সাথে সাথে তিনি পাতাল থেকে স্বর্গে চলে এলেন।

বলি তাঁর চরণ যুগল বন্দনা করলেন। এরপর বলি তাকে বললেন–আমার বাহুবলে বিজিত এই ত্রিভুবন ব্যাপী রাজ্য আপনি ভোগ করুন। আর আমি দাস হয়ে আপনার সেবা করবো। আপনার উচ্ছিষ্ট অন্নে জীবন যাপন করব।

বলির অনুরোধে প্রহাদ বললেন–নিষ্কন্টক রাজ্য শাসন, অন্তরঙ্গ বন্ধুর সম্মান, যথেষ্ট। তিনি এক সময় সংসার ধর্ম পালন করেছেন। এখন তিনি যোগ সাধনেই নিরত, তাই এই রাজ্যভার তিনি বলিকেই সমর্পিত করলেন এবং বলিকে ইন্দ্রের সিংহাসনে বসালেন।

বলি তখন প্রহ্লাদের কাছে জানতে চাইলেন, চতুবর্গের কোন্‌টি তাঁর অবশ্য কর্তব্য। প্রহ্লাদ তখন বললেন, যা ভবিষ্যতে স্থিতিশীল তাই ত্রিভুবনে স্থিত। একমাত্র ধর্মনিষ্ঠ পথেই অর্থ উপার্জন করা উচিত। ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ সাধন করা উচিত। জনসমাজে সম্মান, যশ, কীর্তি পাওয়ার মতো কাজ করা উচিত।

কুলব্য বিপন্ন সখা, আত্মীয় স্বজন পরিত্যক্ত, বৃদ্ধ জ্ঞাতি, গুণী ব্যক্তি এবং ব্রাহ্মণ সসম্মানে যাতে সুখে বাস করতে পারেন তার ব্যবস্থা করলে তুমি যশস্বী হবে। সুতরাং দেবজ্ঞ ও ধর্মজ্ঞ ব্যক্তিরা এ স্থানে বাস করুক, অধীনস্থ রাজারা তোমার আদেশে ধর্মকার্যে রত হোক, ব্রাহ্মণরা যাগযজ্ঞ করুন।

যজ্ঞের আগুনের ধোঁয়াতেই রাজার শান্তি। শাস্ত্রজীবী ক্ষত্রিয়রা বেদপাঠ, যজ্ঞ ও দানধ্যানে সর্বদা নিরত থেকে প্রজা রঞ্জন করুন। বৈশ্যরা অধ্যয়ন ও কৃষিকাজ, এবং শূদ্ররা সেবা শুশ্রূষার কাজে নিযুক্ত হোন। বিভিন্ন বর্ণের লোকেরা নিজেদের ধর্ম পালন করলে তবেই ধর্মের বৃদ্ধি ও রাজার শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে।

প্রহ্লাদের উপদেশ শুনে বলি বললেন–আপনার আদেশ শিরোধার্য করলাম। পুলস্ত্য জানালেন, এরপর বলি রাজধর্মানুসারে রাজ্য পালন করতে লাগলেন। বলি দেখল সত্যযুগের মতো জগতের সর্বত্র ধর্মভাব বিরাজ করেছে। নিয়ম বিরুদ্ধ ব্যাপার দেখে ব্রহ্মার কাছে গেল বলি।

ব্রহ্মাকে বললেন–বলি তার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। ব্রহ্মা তখন জানালেন, যে কেবল তার নয় সমস্ত জগতেরই সে স্বভাব নষ্ট করে দিয়েছে–একমাত্র হরি ছাড়া আর কেউ নেই যিনি বলিকে শাস্তি দিতে পারেন।

ব্রহ্মার কথা শুনে অব্যয়ব বলি পুরুষ বিভীতক বনে গিয়ে আশ্রয় নিল এবং সত্যযুগ উপস্থিত হল। তপস্যা, অহিংসা, সত্য, শৌচ, ইন্দ্রিয়, সংযম, দয়া, দান, অনুসংসর্গ, শুক্রয় ও যজ্ঞকর্ম এসব জগতের সর্বত্র যথাযথ অনুপ্রাণিত হতে লাগল। বলি এরূপে সত্যযুগের সন্তোষসাধন করলেন।

সকল বর্ণই এখন নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে লাগলেন। রাজারা প্রজারঞ্জনে সচেষ্ট হলেন। ধর্মের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। ত্রিলোকলক্ষ্মী বলিতে আশ্রয় করলে বলি তাঁর পরিচয় জানতে চাইল।

পদ্মমালিনী তখন বললেন–বিষ্ণু, দেবরাজকে পরিত্যাগ করেছেন তাই তিনি তাকে ছেড়ে এখানে এসেছেন।

একদা বিষ্ণু চারটি রূপবতী যুবতী সৃষ্টি করেন। তার মধ্যে কেউ সাদা কাপড় পরিহিতা। সাদা মালা। ও সাদা গন্ধদ্রব্যে বিভূষিত হয়ে সাদা হাতির উপর অধিষ্ঠিত। কেউ লাল পোশাক পরিচ্ছদ ও লাল মালায় অলঙ্কৃত হয়ে, লাল গন্ধদ্রব্যে অনুলিপ্ত হয়ে লাল ঘোড়ার অধিষ্ঠিত। এঁর সারা শরীর লাল রাজস গুণান্বিত।

কেউ হলুদে সজ্জিত হয়ে সোনার রথে উপবিষ্ট এ-তামস গুণান্বিত। অন্য একজন নীলে সজ্জিত হয়ে নীল বৃষে অধিষ্ঠিত, এ সত্ত্ব, রজস ও তামস এই তিন গুণেই মণ্ডিত। যে শ্বেতাম্বরা সে ব্রহ্মা, চন্দ্র ও অনুবর্তীদের আশ্রয় করলেন। রক্তবর্ণাকে ইন্দ্র, মনু ও মনুপুত্রের হাতে সম্প্রদান করা হয়।

পীতাম্বরী শুক্র ও প্রজাপতির হাতে সমর্পণ করা হয়। নীলাম্বরী দেব, নৈঋত, গুহ্য ও বিদ্যাধরকে আশ্রয় করলেন। ব্রাহ্মণরা শ্বেত দেবীরূপকে সরস্বতী নামে অভিহিত করলেন।

ক্ষত্রিয়রা রক্তবর্ণাকে জয়শ্রী নামে, পীত বসনকে বৈদ্যরা লক্ষ্মী নামে অভিহিত করেন। নীল বর্ণকে শূদ্ররা প্রিয়দেবী নামে স্তব করতে লাগলেন। বিষ্ণু এরূপে এই চার নারীকে স্থান দিয়েছেন।

সঙ্গ, বেদ, পুরাণ, ইতিহাস ও যাজ্ঞিক অদুক্তি–এই চার নারী স্বরূপের মধ্যেই নিহিত আছে। স্বর্ণ, রথ, রজত, ভূষণ, হাতি, ঘোড়া, রথ এবং পদ্মনিধি রক্তবর্ণা ললনার আশ্রিত।

গো, মহিষ, উট, গাধা, স্বর্ণ, বস্ত্র, জমি, ওষধি পশুপাল ও মহানীলানিধি যুবতীর আশ্রিত। এইসব বস্তুর অধিষ্ঠাত্রী দেবীদের আশ্রয় স্থান বলছি, মহাপদ্মাশ্রিত–পুরুষরা সত্য, শৌচ, বল, দান ও উৎসবে সর্বদা নিরত থাকে।

পদ্মাশ্রিত মানবেরা দৈববিধান মতে যজ্ঞকারী, সৌভাগ্যশালী, দর্পিত, মাল্যবান, বহু দক্ষিণ প্রদারী ও সর্বসামান্য সুখের আধার হয়ে থাকে। মহানীলাশ্রিত মানবরা সত্য ও শিক্ষাবাদী, শরণাগত রক্ষক, যজ্ঞকারী এবং ন্যায় অন্যায়ে আসক্ত হয়ে থাকে।

লাল পোশাকে সজ্জিতা দেবী এলেন বলির নিকট। তিনি বললেন–জয়শ্রী আমি, তোমার কাছে এলাম। আমি সর্বদা শৌর্য ও পরাক্রমশালী পুরুষকে আশ্রয় করে থাকি, ক্লীব বা কাপুরুষ ব্যক্তিকে আমি কখনও আশ্রয় করি না। তুমি বলবান বলে আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট।

তুমি দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করায় আমি খুব খুশি। তোমার অতুলনীয় পরাক্রম দেখে আমি তোমার কাছে এসেছি। তুমি হিরণ্যকশিপুর বংশধর। তাই ইন্দ্রকে পরাজিত করা তোমার কাছে কিছুই নয়। জয়শ্রী এরপর বলির দেহে প্রবেশ করে তাকে উদ্ভাসিত করে তুললেন।

তখন বলিকে আশ্রয় করে সুখে বাস করতে লাগলেন, স্ত্রী কীর্তি। দ্যুতি, ত্যাগ, গতি, ক্ষমা, ভূতি, বিদ্যা, নীতি, দয়া ও মতি এবং প্রতি, স্মৃতি, শক্তি, শান্তি, কৃতি, ক্রিয়া, পুষ্টি ও তুষ্টি বলেছিলেন সকলের রক্ষক। তার শাসনে কেউ ক্ষুধার্ত, মলিন বা হীনদীন হল না–স্বর্গচ্যুত ইন্দ্র এরপর ব্রহ্মাভবনে গেলে তিনি দেখলেন ব্রহ্মা কাশ্যপ ঋষিদের সাথে বসে আছেন।

এরপর তিনি ব্রহ্মাকে বললেন–বলি স্বর্গ রাজ্য অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। ব্রহ্মা বললেন–এসবই তোমার কৃতকর্মের ফল কারণ। তুমি বজ্র প্রয়োগে দিতির গর্ভ টুকরো করেছিলে, তাই জ্বণ হত্যাজনিত পাপ হয়েছে তোমার।

ইন্দ্র বললেন–ওই পাপ মায়ের অশুচিতার ফলে হয়েছিল-কাশ্যপ বললেন–মায়ের দোষ হলেও তোমার বজ্রাঘাতেই ভ্রণহত্যা ঘটে। ইন্দ্র তখন জানতে চাইলেন–কি করলে আমার পাপ খণ্ডন হবে। ব্রহ্মা, বশিষ্ট ও কাশ্যপ বললেন–ইন্দ্রকে দেবাদিদেব মাধবের সাধনা করতে হবে।

বামন পুরাণ ৩১-৪০ - পৃথ্বীরাজ সেন

ইন্দ্র ব্রহ্মা, মরীচি তনয় কাশ্যপও মিশ্রাবর্ণ নন্দন বশিষ্ঠকে নিয়ে সতীতলে এলেন। কালা পর্বতের উত্তরে, হিমালয়ের দক্ষিণে, কৃপাস্থদের পূর্ব এবং বসুপুরের পশ্চিমে এক পবিত্র ও প্রসিদ্ধ স্থান আছে, সেখানে রাজা নয় সাতশত অশ্বমেধের যজ্ঞ করেছিলেন। তিনি সহস্র নরমেধ যজ্ঞ করে অসুর জয় করেন।

এই স্থান মহামেধ নামে প্রসিদ্ধ। এখানে শ্রুতিশাস্ত্রহীন ব্রাহ্মণরা পিতামহের সমকক্ষ হয়ে যাবেন। এখানে মহামেধ যজ্ঞের প্রসন্ন ফল লাভ হয়। ভবিষ্যতে প্রসন্ন হৃদয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করলে তারা পাপমুক্ত হন। মহানদী এইস্থান দিয়েই হিমালয় থেকে নেমে এসে তাকে পাপমুক্ত করেন।

ইন্দ্র সেখানে এক আশ্রম নির্মাণ করে বাস করতে লাগলেন। তিনি একবেলা না খেয়ে মাটিতে শুয়ে তপস্যা করতে লাগলেন। তপস্যার সময় ইন্দ্র তার সকল ইন্দ্রিয়কে জয় করেছিলেন।

এক বছরেরও বেশি সময় পার হল। অবশেষে গদাধর তার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন এবং বললেন–ইন্দ্র তুমি শীঘ্রই রাজত্ব ফিরে পাবে। একথা বলে তিনি ইন্দ্রকে মহানদীর জলে স্নান করতে বলে বিদায় নিলেন।

ইন্দ্র নদীর জলে স্নান করলে তাঁর শরীর পাপ পুরুষ মুক্ত হল এবং পাপী পুরুষদের হিমালয় ও কালাঞ্জর পর্বতের মধ্যবর্তীস্থানে পুলিন্দ নামে স্থানে বাস করতে বললেন–ইন্দ্র।

ইন্দ্র এরপর ধর্মাশ্রমে গেলেন। সেখানে মাতা অদিতিকে নিজের পরিচয় দিলেন। অদিতি তাঁকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ইন্দ্রের কাছে দৈত্যদের হাতে নিজের পুত্রদের পরাজিত হবার কথা শুনে অদিতি শোকগ্রস্ত হয়ে বিষ্ণুর শরণ নিলেন।

নারদ জানতে চাইলে, পুলস্ত্য বললেন, শুক্লপক্ষে সূর্য সপ্তম দিবসে পূর্বাকাশে উদিত হলে দেবমাতা অদিতি উপবাস করে নিয়ত চিত্তে দেবাদিদেবকে স্তব করতে লাগলেন।

অদিতি বললেন–হে পাপরাশি বিনাসক্ত সংসার বৃক্ষের কুঠারাশী, ভাস্কর, দিব্যমূর্তির, ত্রৈলোক্য লক্ষ্মী, পৈতি, নিখিল রোরের কারণ, স্বরূপ সর্বমূর্তি, জগৎপতি, জগন্ময়, সকলের রক্ষক ইত্যাদি হৃষীকেশের স্তব করে অদিতি মাতা রক্তচন্দন ধূপ, দীপ ও করবী ফুল দিয়ে পূজা করে ইন্দ্রের মঙ্গল কামনায় হরিকে নিবেদন করলেন।

উপবাসী হয়ে বিষ্ণুর স্তব করতে লাগলেন। অদিতি স্নান সেরে সোনা, দই ও ঘি ব্রাহ্মণকে দান করে ভক্তি বিনম্রচিত্তে বিষ্ণুর ধ্যানে মগ্ন রইলেন। বাসুদেব তখন অদিতিকে দর্শন দিয়ে বললেন–আমি সন্তুষ্ট হয়েছি তোমার তপস্যায়। তিনি অদিতির গর্ভে জন্মগ্রহণ করে দানবদের পরাভূত করবেন ও পুত্রদের বরদান করবেন।

বাসুদেবের কথায় অদিতির শরীর কেঁপে উঠল। তিনি বাসুদেবকে বললেন–ত্রিভুবনের ধারক, সাত সমুদ্র, পাহাড় পর্বতের অধিপতি তাকে কিভাবে আমি গর্ভে ধারণ করবো।

অতএব যাতে তার বৃথা ক্লেশ না হয় এবং ইন্দ্রও রাজ্য লাভ করে তার ব্যবস্থা করতে বললেন। বিষ্ণু বললেন, ক্লেশ সহ্য করেও তথাপি তিনি অদিতির গর্ভে আসবেন এবং তিনি গর্ভে আসার সাথে সাথে দানবদল নিস্তেজ হয়ে পড়বে। একথা বলেই তিনি অদিতির উদরে প্রবেশ করলেন।

পুলস্ত্য বললেন, অদিতির গর্ভে বিষ্ণু আসার সাথে সাথে দানবরা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। দানবরাজ বলি পিতামহ প্রহ্লাদের কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন।

প্রহ্লাদ ধ্যান থেকে জানতে পারলেন, বাসুদেবের ভয়ে দৈত্যরা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এরপর প্রহ্লাদ ধ্যানযোগে শ্রীহরিকে সন্তানতাল, ভূতল, মেরু পর্বত, লোক পালদের বাসস্থান ও ব্রহ্মার বৈরাজপুরীতে খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে অদিতির মহাপুণ্য জনক আশ্রমে সন্ধান করলেন এবং দেখলেন দেবতা বামনদেহে দেবমাতার উদরে বিরাজিত, তার হাতে শঙ্খ, গদা ও চক্র নেই।

তিনি সব জ্ঞাত হয়ে বলিকে বললেন–যে কি কারণে সকলে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। বলি প্রহ্লাদের কাছে সব শুনে রাগে তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। তিনি নিয়তির বশীভূত হয়ে–জানতে চাইলেন–এই হরি কে? তার অধীনে কত দৈত্য আছে? এরা বাসুদেবের চেয়েও শক্তিশালী।

এই দৈত্যরা দেবতাদের বহুবার পরাজিত করেছে। বিপ্রচিত্ত তার মত যোদ্ধা, অস্ত্রচালনার পারদর্শী দৈত্যটি হলেন তামসন্ধু, শিবি, শঙ্কু, অসিলোমা বিরূপাক্ষ, তিসিরা, মকরাক্ষী, বৃষ পাশ, অসিতাক্ষ। বিষ্ণু এদের ষোলো ভাগের এক ভাগেরও যোগ্য নয়।

শ্রীহরির অবমাননায় প্রহাদ পৌত্রের ওপর রাগে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন এবং ধ্যানান্তে অভিশাপ দিতে লাগলেন। বললেন–তুমি সকলের কাছে নিন্দার পাত্র হবে।

প্রহ্লাদ সক্রোধে বললেন–তোমার পিতারও দুর্ভাগ্য, তুমি তার পুত্র হয়ে সর্বশ্বের বিষ্ণুর নিন্দা করলে। তোমার পিতার পূজণীয় গুরু আমি এবং হরি আমার পূজণীয়, তুমি তার নিন্দা করেছে। এর ফলে তোমার রাজ্য নাশ হবে। তুমি রাজ্য ভ্রষ্ট হয়ে পতিত হবে। এই চতুর্দশ ভুবনে বাসুদেব ভিন্ন আর কোনো আশ্রয় নেই

প্রহ্লাদের অভিশাপে ভীত হয়ে বলি তাঁকে শান্ত হতে বললেন। বলি বললেন–আমি অভিশাপে ভীত নই। কিন্তু পিতামহের কাছে আমি অপরাধী। পিতামহ যেন আমাকে বালক, নীচ ভেবে ক্ষমা করেন। তখন প্রহ্লাদ বললেন–মোহবশতই আমার বিবেক লোপ পেয়েছিল। তাই হরিকে সর্বগামী জেনেও তোমাকে অভিশাপ দিয়েছি।

যে কারণে বলির বিবেক লোপ পেয়েছে সে কারণেই আমারও বিবেক বোধ লোপ পেয়েছিল, কিন্তু রাজ্যভ্রষ্ট হবার জন্য দুঃখ কোরো না, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি এসব কারণে দুঃখিত হয় না।

তিনি তখন বলির কল্যাণের কথা বললেন, তিনি বললেন–বলিকে বাসুদেবের শরণাপন্ন হতে যারা হরির আশ্রয় নেয় তার সমস্ত বিপদ আপদ কাটিয়ে পরম শ্রান্তি লাভ করে থাকে। জনার্দন তোমার মঙ্গল বিধান করবে।

তাই তার আশ্রয় গ্রহণ কর। প্রহ্লাদ বলিকে উপদেশ দান করে বিষ্ণুকে স্মরণ করে তীর্থে বেড়িয়ে পড়লেন।

আরও পড়ুনঃ

শারদাতন্ত্র – কালিকা পুরাণ

কামেশ্বরীতন্ত্র – কালিকা পুরাণ

পূজাপ্রকরণ–ত্রিপুরাতন্ত্র – কালিকা পুরাণ

কামাখ্যা-বিবরণ – কালিকা পুরাণ

দেবীপূজার কর্তব্যতা – কালিকা পুরাণ

বামন পুরাণ

মন্তব্য করুন