বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা – কালিকা পুরাণ

একপঞ্চাশ অধ্যায় – বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতাঃ ঔর্ব কহিলেন,–অতঃপর কালক্রমে ইহারা বলশালী, দীর্ঘকায়, সমুন্নত, সর্বশাস্ত্ৰকুশল, অস্ত্রশস্ত্র-বিশারদ, প্রাপ্তযৌবন, সুন্দরকান্তি, শত্ৰুদিগের দুর্ধর্ষ, বেদপারগ হইয়া উঠিলেন। ১-২

প্রীতিনিবন্ধন বেতাল ও ভৈরব নিত্যসহচর হইলেন, উপরিচর, অলর্ক ও দমন এই তিনটি ভ্রাতাও। ইহারা সর্বদাই পরস্পর মিলিত হইয়া থাকিতেন,-কেহ কাহার সঙ্গ ছাড়িতেন না। ৩

রাজা, উপরিচর প্রভৃতি তিনটি পুত্রের প্রতি সর্বদাই স্নেহ, মমত্ব ও প্রীতি অধিক প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ৪

রাজার স্নেহ, ইহাদিগের প্রতি যেরূপ, বেতাল ও ভৈরবের প্রতি তাদৃশ কিছুই হইল না এবং রাজা, এই দুই জনকে দেখিয়া কখন পুত্ৰজ্ঞানে আনন্দিতও হইতেন না। ৫-৬

কিন্তু এই দুই জনও কালক্রমে ত্রিলোক-জয়ী, সৰ্ব্বশাস্তু-বিশারদ, অস্ত্র ও ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী, মহাবলবান হইয়া উঠিলেন। ৭

বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা - কালিকা পুরাণ

সুতরাং ইহাদিগের দ্বারা কখন কি ঘটিবে, এই ভাবিয়াই রাজা বেতাল ও ভৈরবের নিকট ভীত হইলেন। আরও ইহাদিগের দ্বারা আমার বা আমার পুত্রদিগের অথবা রাজ্যের কখন কি অনিষ্ট হইতে পারে, এইরূপ চিন্তাযুক্ত হইলেন। রাজা, বেতাল ও ভৈরবকে নম্র-স্বভাব ও ধর্মিষ্ঠ দেখিয়াও অতি সাবধানে রহিলেন। ৮-১০

বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা – কালিকা পুরাণ

তারপর পরম রূপবান্ ও রাজলক্ষণাক্রান্ত জ্যেষ্ঠপুত্ৰ উপরিচরকেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। ১১

যুবরাজ উপরিচর সম্পূর্ণ নীতিতে, সকল রাজাকে অনুগত করিলেন। ১২

রাজা, দমন ও অলর্ককেও ধনাদি প্রদান করিলেন, অথচ রাজকোষে অপরিমিত রত্ন ছিল। ১৩

যত রত্নাদি সিংহাসন প্রভৃতি এবং রথ সকল ছিল, সেগুলির ভাগ-ক্রমে তিনি বেতাল ভৈরবকে কিছুমাত্র দিলেন না। ১৪

তখন ইহারা নিরতিশয় দুঃখিত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিল। আবার কখনও ভোগ-বঞ্চিত অকৃত-পরিণয় এই বীরদ্বয় নির্জনে বসিয়া তপ চরণে মনোভিনিবেশ করিল। ১৫

যখন দেবী তারাবতী, বেতাল ভৈরবকে এইরূপ দুর্গতিগ্রস্ত দেখিলেন, তখন তিনি চিন্তান্বিতা হইলেন। যুবরাজ উপরিচর ও পতি চন্দ্রশেখরের নিকট ভীতা হইয়া পুত্রদ্বয়ের নির্জনবাস বিদিত হইয়াও তাঁহাদিগের দুইজনকে কিছুই বলেন নাই। ১৬

ইত্যবসরে সুরতক্রীড়ানুরাগী স্ত্রীসঙ্গপ্রিয় যোগবলপ্রদীপ্ত কাপোত মুনি, সহচারিণী পুত্রবতী চিত্রাঙ্গদাকে পরিত্যাগ করিয়া তপস্যা করিতে যাইবার নিমিত্ত ইচ্ছা করিলেন এবং চিত্রাঙ্গদাকে কহিলেন। ১৭

প্রিয়ে চিত্রাঙ্গদে। আমি তপস্যা করিবার নিমিত্ত তপোবনে গমন করিব। হে সুন্দরি! তোমার কি প্রিয়কাৰ্য এই সময় করিব, তাহা আমাকে বল। ১৮

তখন চিত্রাঙ্গদা কহিতে লাগিলেন, হে তপস্বিন্! আপনার তুম্বুরু ও সুবৰ্চ নামে যে দুইটি পুত্র হইয়াছে, হে মুনিসম! আপনি এই দুই জনের যথোচিত প্রিয়কাৰ্য্য করুন। ১৯

হে পূতহৃদয় দ্বিজোত্তম! আমাকেও আমার ভগিনীগৃহে রাখিয়া, যদি আপনার অভিরুচি হয়, তবে আপনি তপোবনে গমন করুন। ২০

কাপোত ঋষি চিত্রাঙ্গদার এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া তখন অর্থ-সংগ্রহের নিমিত্ত অনুসন্ধানপূর্বক কুবেরভবনে গমন করিলেন। ২১

কুবেরের নিকট প্রার্থনা করিয়া ছয় শত সূবর্ণমুদ্রা ও হাজার নিষ্ক সংগ্রহ করিলেন। ২২

ব্রাহ্মণ তখন চমরী-পৃষ্ঠে করিয়া সুবর্ণের একশত ভার আনিয়া পুত্রদ্বয়কে দিলেন এবং বিশেষ করিয়া স্ত্রীকে দিলেন। ২৩

মুনিবর,-সুবর্চ, তুম্বুরু ও চিত্রাঙ্গদাকে আহ্বান করিয়া করবীরপুরে গমন করিলেন। ২৪

কাপোতমুনি তথায় গমন করিয়া, রাজা চন্দ্রশেখর ও যুবরাজ উপরিচরকে এই কথা বলিলেন। ২৫

হে রাজন! চিত্রাঙ্গদা ককুৎস্থের কন্যা ইহা আপনি জানেন, ইহার গর্ভেই আমার এই সদ্যোজাত দুইটি পুত্র হইয়াছে; হে নৃপ! আপনি এই ধনরাশি দ্বারা আমার এই পুত্র দুইটিকে সমান-দৃষ্টিতে পালন করুন এবং যুবরাজ উপরিচরও ইহাদিগকে রক্ষা করুন। ২৬

অপুত্রকের রাজাই পুত্র, নির্ধনের রাজাই ধন, মাতৃহীনের রাজাই মাতা, পিতৃহীনের রাজাই পিতা। ২৭

অসহায়ের রাজাই সহায়, পতিহীনার রাজাই প্রভু, দরিদ্রের রাজাই সাহায্যকারী, মনুষ্যের রাজাই বন্ধু, রাজা সৰ্ব্বদেবময়; হে রাজন! এই নিমিত্তই আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিলাম। ২৮

ঔব কহিলেন,–তখন রাজা চন্দ্রশেখর, সেই দ্বিজবর মুনি-প্রধানকে কহিলেন, আমি ও আমার পুত্র যুবরাজ উপরিচর-আমরা উভয়েই আপনার আজ্ঞা পালন করিব। ২৯

এই কথা বলিয়া রাজা, মুনিমতানুসারে চিত্রাঙ্গদাকে গ্রহণ করিলেন এবং কাপোতের দুইটী পুত্র ও তাহার প্রদত্ত ধনাদি, নিজপুত্ৰ উপরিচরের নিকট অর্পণ করিলেন। তখন যুবরাজ উপরিচর, রাজ্যের অর্ধাংশ সুবর্চকে প্রদান করিয়া তুম্বুরুকে সচিবাধ্যক্ষ করিলেন। ৩০

অতঃপর কাপোত ঋষি প্রসন্ন হইয়া পুত্রদ্বয়ের মুখাবলোকন ও মহারাজকে সম্ভাষণ করিয়া তপশ্চরণের নিমিত্ত তপোবন যাত্রা করিলেন। ৩১

পথে যাইতে যাইতে দেখিলেন, চন্দ্র-সূর্যের ন্যায় প্রতিভা সম্পন্ন পরম রূপবান মহাদেবের দুইটি পুত্র সহায়শূন্য হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছে। ৩২

আরও দেখিলেন, তাহাদের মুখগুলি বানর-মুখের অনুরূপ। তখন তাপস প্রধান কাপোতমুনি এই সকল পৰ্যবেক্ষণ করিয়া পূর্বকথা সকল স্মরণপূর্বক তাহাদিগের দুই জনকে জিজ্ঞাসা করিলেন। ৩৩

দেবসদৃশ মনুষ্য-প্রধান হইয়া একাকী নির্জনে ভ্রমণ করিতেছ, তোমরা দুইজন কে? তাহা আমাকে বল। ৩৪

বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা - কালিকা পুরাণ

অনন্তর শঙ্করের সেই দুইটি পুত্র যথাবিধি প্রণাম ও সম্ভাষণ করিয়া কাপোত মুনিকে কহিলেন; হে মুনিসত্তম! আমরা তারাবতীর গর্ভ-সম্ভূত রাজা চন্দ্রশেখরের পুত্র, আমরা আপনাকে প্রণাম করি। হে মুনে! আমাদিগের প্রতি রাজার সর্বদা অবজ্ঞা দেখিয়া আমরা একাকী এই নির্জনদেশে মনের কষ্টে ভ্রমণ করিতেছি; হে মহাভাগ! আমরা রাজা চন্দ্রশেখরের বিশেষ বশীভূত ঔরসপুত্র, তিনি কি নিমিত্ত অবজ্ঞা করিয়া আমাদিগকে কিছু মাত্র ধন দিতে ইহা করিলেন না। ৩৫

সেই কারণেই হে দ্বিজোত্তম! আমরা তপস্যা করিবার ইচ্ছা করিতেছি; অতএব আপনি যদি উপদেশ প্রদান করিয়া আমাদিগের দুই জনকে গ্রহণ করেন। ৩৬

তখন কাপোত মুনি বেতাল ও ভৈরবের বাক্য শ্রবণ করিয়া হাস্যপূর্বক তাহাদিগকে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের ঘটনাগুলি কহিলেন। ৩৭

মুনি বলিতে আরম্ভ করিলেন, তোমরা রাজা চন্দ্রশেখরের ঔরসপুত্র নও। শঙ্করের ঔরসে তারাবতীর গর্ভে তোমাদিগের জন্ম। ৩৮

ভৃঙ্গী ও মহাকালনামক শিবের দুইটী অনুচর অভিশাপগ্রস্ত হইয়া সৰ্ব্বতত্ত্বে বীর্যবান্ সদ্যোজাত তোমাদিগের দুইটির মূর্তি ধারণ করিয়া পৃথিবীতে আসিয়াছেন। ৩৯

এই কারণেই রাজা তোমাদিগকে প্রিয় ধনাদি বস্তু দিতে ইচ্ছা করেন নাই। ৪০

এক্ষণে জন্মদাতা মহাদেবের নিকট গমন কর ও তাহারই শরণাপন্ন হও। সেই মহেশ্বরই তোমাদিগের বাসনা সফল করিবেন। ৪১

বহুদিনের পর যাহার ফল হয় সে কঠোর তপস্যার প্রয়োজন কি। ৪২

ত্রিকালজ্ঞ পরমার্থপরিজ্ঞাত কাপোত মুনি এইরূপ আদেশ করিয়া তৎপরেই আবার যেরূপে ভৃঙ্গী মহাকাল শাপাবিষ্ট হইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং যেরূপে হর-পাৰ্ব্বতী মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হন। ৪৩-৪৪

ইতিপূর্বে যেরূপেই বা তারাবতী আপনা কর্তৃক অভিশপ্ত হইলেন; আর তারাবতীর গর্ভেই বা যেরূপে এই দুইটি বালক জন্মগ্রহণ করিল। ৪৫

তাহার পর নারদ আসিয়াই বা যেরূপে রাজা চন্দ্রশেখরের সংশয় সকল অপনীত করিলেন, এই সকল কথা তাহাদিগকে কহিলেন। ৪৬

তখন সদাশয় বেতাল ও ভৈরব এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া যেন সুধাভিষিক্ত হইয়াছেন এইরূপভাবে পরম আনন্দিত হইলেন। বেতাল ও ভৈরব এইরূপ প্রমুদিত হইয়া আবার কাপোত ঋষিকে জিজ্ঞাসা করিলেন। ৪৭-৪৮

হে মুনিসত্তম। মহাদেব আমাদিগের পিতা, কেন না আপনি সত্য কথা কহিলেন; কিন্তু কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত কিরূপভাবে তাহার পূজা করিতে হইবে। ৪১

তিনিই বা আমাদিগের কিরূপ আরাধ্য বস্তু; আর তিনি যেরূপ স্থলে পূজিত হইলে শীঘ্র প্রসন্ন হইবেন,–হে মুনিবর! সেই সকল উপদেশ আমাদিগকে দিন। ৫০

হে যোগিরাজ! অদ্য আপনা কর্তৃক এরূপ অনুগৃহীত হওয়ায় আমরা ধন্য হইলাম। আপনি এই সকল নিগূঢ় রহস্য প্রকাশ করিয়া আমাদিগের হৃদয় শল্য উদঘাটিত করিলেন। ৫১

হে মুনিসত্তম! আপনি আবার আমাদিগকে বলুন, যে উপায়ে আমরা যোগশ্বর ত্রিপুরারিকে অচিরে পাইতে পারিব। ৫২

মুনি কহিলেন, যেরূপ স্থলে শঙ্কর পূজিত হইলে অচিরে তোমরা তাহার প্রত্যক্ষ করিতে পারিবে, তাহা তোমাদিগকে বলি শ্রবণ কর। ৫৩

মহাদেব যে স্থলে থাকিয়া নিত্য নিত্য আনন্দ ভোগ করেন, সেই গুপ্ত অথচ সর্বজনবিদিত স্থলটী তোমাদিগকে বলি। ৫৪

গঙ্গাতীরে বরুণ ও অগ্নির রক্ষিত চাপাকৃতি পরম মনোহর বারাণসী নামে একটি পুরী আছে। যোগিগণের নিত্য প্রমোদ-প্রদ যোগী মহেশ্বর স্বয়ং যেস্থলে আপনি আপনার চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া বাস করিতেছেন। ৫৫-৫৬

সেই বাসভূমি মহাদেবের যোগবলে সৰ্ব্বদা আকাশমার্গে স্থিত। যে মনুষ্য এই স্থলে মৃত্যু প্রাপ্ত হয়; তাহার মুক্তির নিমিত্ত স্বয়ং মহাদেব তাহাকে দিব্যজ্ঞান প্রদান করেন। ৫৭

পরে সেই স্থলে মৃত হইয়া জন্মান্তরে পরম যোগী হইলে তখন অনায়াসেই শিব-সম্মত নিৰ্বাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ৫৮

ভগবতীর সহিত নিত্য সংপৃক্ত যোগরত মহাদেব, দেব, গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, মনুষ্য, সকলেরই নিত্য আরাধ্য বস্তু। ৫৯

এখন হরের বিষয় জানিতে পারিলে এবং তাহার ক্ষেত্রও প্রকাশ করিয়াছি। এইক্ষেত্রে শঙ্কর কাহারও অভিলাষ শীঘ্র পূর্ণ করেন না এবং কাহারও প্রতি অচিরে প্রসন্নও হন না। বহুকাল ধরিয়া ভক্তির সহিত আরাধিত হইলে তবে নির্বাণ প্রদান করেন। ৬০

এই বারাণসী ক্ষেত্ৰ গৌরীর গমনাগমনশূন্য জানিবে এবং মহাক্ষেত্রে যোগস্থানে গৌরী কখনও গমন করেন না। হে নরসত্তম। অনতিদূরবর্তী সেই বারাণসী ক্ষেত্র যাহা তোমাদিগের নিকট কহিলাম, এখান হইতে তাহা অতি নিকট। ৬১

বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা - কালিকা পুরাণ

পরন্তু অপর একটী গুহ্য পীঠের কথা বলি;–যাহার নাম কামরূপ। চতুৰ্বর্গ-ফলপ্রদ, সৰ্ব্বদা লোক-পূজিত এই পীঠস্থলে হরগৌরী নিত্য বাস করেন; এইখানে থাকিয়া তপস্যা করিলে শীঘ্রই মুক্তিলাভ করা যায়। ৬২

এই জন্য এই পূণ্যজনক পীঠটী অচিরে ফলপ্রদ বলিয়া কথিত হইয়াছে। আর মহাদেব চির-ফলপ্রদ হইলেও তিনি যদি এই স্থলে পূজিত হন, তাহা হইলে অতি শীঘ্রই ফল প্রদান করেন। ঋষিরা এই পীঠস্থান অপেক্ষা অন্য আর উত্তম পীঠস্থান বলেন নাই। ৬৩

মহাদেব, পার্বতীর সহিত এই গুহ্যাদপি গুহ্যতর কামরূপ মহাপীঠে নিত্য বাস করেন, তিনি এই পীঠে পূজিত হইলে শীঘ্রই প্রসন্ন হন। ৬৪

পাৰ্বতীও এই স্থলে শিবভক্তকে অনুগ্রহ করেন ও পরমেশ্বরও ভক্তদিগের অভিলাষ পূর্ণ করেন। এক্ষণে পীঠের বিষয় আরও কিছু বলি, তোমরা দুই জনে শ্রবণ কর। করতোয়া নদী ইহার পশ্চাৎ ভাগে বিরাজিত। দৈর্ঘ্যে ত্রিশ যোজন। ৬৫

ইহা ত্রিকোণ, কৃষ্ণবর্ণ, প্রভূত-পৰ্বত-বেষ্টিত; ইহার চতুর্দিকে শত শত নদী প্রবাহিত হইতেছে। ৬৬

কাম হরকোপানলে দগ্ধ হইয়া আবার মহাদেবের অনুগ্রহেই এই পীঠে আসিয়া রূপ ধারণ করেন, এই নিমিত্ত তদবধি এই পীঠ “কামরূপ” নামে অভিহিত হইলেন। ৬৭

এই পীঠের বায়ুকোণে ও নৈর্ঋত কোণে এবং কোণের মধ্যদেশে আর ঈশান কোণে, অগ্নি কোণে এই উভয়ের মধ্যস্থলে, মহাদেব এই জল ও স্থলে স্বীয় সুন্দর আশ্রম প্রস্তুত করিয়া পার্বতীর সহিত পরম সুখে নিত্য বাস করেন,–পীঠের মধ্যস্থলে দেবীর গৃহ, এখানেও শঙ্কর অবস্থান করেন। অত্রত্য নীলাখ্য পর্বতে পার্বতী বাস করেন। ৬৮-৬৯

ঈশান-কোণ-স্থিত নাটকশৈলে মহাদেবের সুন্দর আশ্ৰম আছে, তথায় শিব ও শিবা উভয়েই বাস করেন। ৭০

এই পীঠের অনেক স্থানে হরগৌরীর আরও অনেক প্রাচীন আশ্ৰম আছে। হরপার্বতীর এরূপ পীঠস্থান আর কোথাও নাই; হে সদাশয়! মহাদেব আরাধনা করিবার তোমাদিগের সেইটী উপযুক্ত স্থল, অতএব সেই স্থলে গিয়া মনের সহিত মহাদেবের উপাসনা কর। ৭১

তখন বেতাল ও ভৈরব কহিলেন;–হে মুনে! আমরা কামরূপে গমন করিব এবং যে নাটকশৈলে শঙ্কর, শঙ্করীর সহিত সৰ্ব্বদা বাস করেন, সেই পৰ্বতেই আমরা ভূতভাবন ভবানীপতির আরাধনা করিব। ৭২-৭৩

দ্বিজোত্তম! কি প্রণালীতে শিবের আরাধনা করিতে হইবে, তাহা আমাদিগকে বলুন; এবং কোন্ মন্ত্র দ্বারা তাহার অর্চনা করিলে তিনি শীঘ্র প্রসন্ন হন, তাহাও শুনিতে ইচ্ছা করি। হে মহাভাগ! আমাদিগের প্রতি যদি আপনার অনুগ্রহ থাকে, তবে বলুন। ৭৪

ঋষি কহিলেন;–হে নরসত্তম! তোমরা নাটকাচলে গমন কর; তথায় মহাদেব দুর্গার সহিত বাস করিতেছেন। ৭৫

ব্ৰহ্মার পুত্র বসিষ্ঠ ঋষি, সন্ধ্যা-পৰ্বতে মহাদেবকে আরাধনা করেন, তাঁহার নিকট গমন কর। ৭৬

তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি তোমাদিগকে তদুপযোগী সরহস্য মন্ত্র বলিয়া দিবেন। হে বীরাগ্রগণ্য। এখন আমি তপোবন যাত্রা করি; তোমরা আমাকে পরিত্যাগ কর; আর আমার সময়ক্ষেপ করা উচিত নয়। তখন মহাত্মা কপোত মুনি, এই সকল কথা বলিয়া অরণ্যে গমন করিলেন। বেতাল ও ভৈরব কপোত ঋষিকে প্রণাম করিয়া নিজ গৃহে গমন করিলেন। ৭৭

অনন্তর মহামতি বেতাল ও ভৈরব, একটী শুভদিন দেখিয়া দীক্ষিত হইলেন। পরে পিতা মাতা ভ্রাতা বন্ধু বান্ধব–ইহাদের নিকট অনুমতি লইয়া তপস্যার নিমিত্ত গৃহ হইতে কামরূপে গমন করিলেন। ৭৮

এই সময় হর-পাৰ্বতী বেতাল-ভৈরবকে তপস্যার নিমিত্ত গৃহ হইতে বহির্গত দেখিয়া, তখন ইন্দ্রাদি দেবতাগণকে অনুনয়পূর্বক এই কথা বলিলেন; –হে দেবগণ! সম্প্রতি আমার পুত্রদ্বয় আমার উপাসনার নিমিত্ত তদগত চিত্ত হইয়া কামরূপে গমন করিতেছেন। ৭৯

অতএব হে ত্রিদশবৃন্দ! বেতাল ও ভৈরব আমার এই পুত্ৰদুইটীকে তপশ্চরণাধিকারী করিয়া পরে গাণপত্য প্রয়োগের নিমিত্ত সংস্কার বিধান কর। ৮০

ইহারা এই শরীরেই গাণপত্য প্রাপ্ত হইবে; তপোবলে ইহাদের দেহ মানুষভাব পরিত্যাগপূর্বক যেরূপে দেবভাবাপন্ন হয়, তদ্বিষয়ে উপায় আমিই করিব। ৮১

তখন ভগবতীর সহিত ভগবান্ এই কথা বলিয়া স্নেহনিবন্ধন আকাশ মার্গের দ্বারা কামরূপ গমনকারী পুত্রদ্বয়ের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিলেন। ৮২

তখন ইন্দ্রাদি দেবগণ দিকপালসকল ও আরও অপর অপর লোক, মহাদেবকে পুত্রদ্বয়ের পশ্চাৎগামী দেখিয়া তাহারা সকলে মহাদেবের অনুগামী হইলেন। ৮৩

অনন্তর যখন বেতাল ও ভৈরব, গঙ্গা সদৃশ দৃষদ্বতী নদী প্রাপ্ত হইলেন, তখন কৃষ্ণসার-চৰ্ম্ম পরিধান করিয়া যোগিবেশ ধারণ করিলেন। ৮৪

অনন্তর, তখন পশুপতি-পালিত যোগিরূপধারী বেতাল-ভৈরব, দেবতা দিগের সহিত কামরূপে গমন করিলেন। ৮৫

কামরূপে উপস্থিত হইয়া করতোয়ানদীজলে আচমন করিয়া পরে নন্দি কুণ্ডে স্নান ও আচমনপূর্বক জটোদ্ভবা নদীতে যাইলেন, তথায়ও আচমনাদি করিয়া নন্দীকুণ্ড-সমীপন্থ জল্পিনাশক দেবতার বন্দনা করিয়া নাটক-শৈলে গমন করিলেন। ৮৬-৮৮

তথায় মহাদেবকে প্রণাম করিয়া কাপোত মুনির বাক্য স্মরণ হইলে, শিবোপাসনায় নিয়ম জানিবার নিমিত্ত যে ভাগে সন্ধ্যাচল আছে, সেই দক্ষিণ দিকইে গমন করিলেন। ৮৯

সেইখানে, বশিষ্ঠকর্তৃক আনীত কান্তা-নদী রহিয়াছে, সেই নদীর তীরে ছায়া-প্রধান বৃক্ষলতাদিতে পরিপূর্ণ একটা বৃহৎ পৰ্বত, ব্রহ্মার মানসপুত্র বসিষ্ঠ–এই পৰ্বতে বসিয়া সন্ধ্যা করিয়াছিলেন বলিয়া দেবতারা তাহার নাম সন্ধ্যাচল রাখিয়াছেন। ৯০

এইখানে যাইয়া তাহারা, শিবপূজাপরায়ণ ধ্যানসক্ত-চিত্ত মূর্তিমান অগ্নি স্বরূপ বসিষ্ঠ-ঋষিকে প্রণাম করিয়া তাহার সম্মুখে অবনতমস্তকে বদ্ধাঞ্জলি হইয়া স্তুতিবাদ করিতে লাগিলেন এবং তাহারা প্রণত হইয়া একথাও বলিলেন যে, হে সুব্রত! আমরা রাজা চন্দ্রশেখরের তারাবতী নামক স্ত্রীর গর্ভে উৎপন্ন হইয়াছি। আমাদিগকে মহাদেবের মানুষ পুত্র বলিয়া বিবেচনা করিবেন। ৯১

মহাদেবের আরাধনা করিতে অভিলাষ করিয়াছি, যদি আপনি আমাদের বাঞ্ছিত কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত অনুগ্রহ করেন। ৯২

তখন যোগেশ্বর বসিষ্ঠ ঋষি, বেতাল ভৈরবের বাক্য শ্রবণ করিয়া এই কথা বলিলেন;–তোমরা যে মহাদেবের পুত্র, তাহা আমি নিঃসন্দেহে জানিলাম এবং হে নরসত্তম! এইক্ষণে তোমাদিগের কর্ত্তব্যকর্ম মহাদেবের উপাসনা। হে অরিন্দম। এবিষয়ে আমার কি করিতে হইবে, তাহা তোমরা বল এবং মহাদেবের উপাসনার নিমিত্ত যেটী তোমাদিগের প্রয়োজন, তাহা সিদ্ধ হইয়াছে বলিয়া বিদিত হও। ৯৩

বেতাল-ভৈরব বলিলেন;–যে মন্ত্র দ্বারা পূজিত হইলে মহাদেব আমাদের দুইজনের প্রতি অবিলম্বে পরিতুষ্ট হইবেন, হে মুনে! তাহাই বলুন। ৯৪

আর কোন্ তন্ত্র অবলম্বন করিব? সে তন্ত্রের অনুষ্ঠানক্রমই বা কিরূপ? এই সকল বিষয়ের উপদেশ দিন। ৯৫

আর হে মুনিশ্রেষ্ঠ! যে সদুপদেশে ভবদাশ্রিত আমরা দুইজন, মহাদেবকে পাইতে পারি, আমাদিগকে সেইরূপ উপদেশ করুন। ৯৬

বসিষ্ঠ বলিলেন;–আশুতোষ ও ভগবতী উভয়েই তোমাদিগের প্রতি প্রসন্ন আছেন। ৯৭

আর এ বিষয়ে তিনি স্বয়ংই অনুরাগ প্রকাশ করিলেন; যেহেতু তিনি সস্ত্রীক হইয়া সকল দেবগণের সহিত তোমাদিগের রক্ষাপূর্বক স্বর্গ হইতে আকাশমার্গের দ্বারা এইখানে আসিয়াছেন। ৯৮

কিন্তু তোমরা মনুষ্য, ব্ৰতানুষ্ঠানে তোমাদের সংস্কার বিধান হইলে, তখন স্বয়ং মহাদেব তোমাদিগকে গণেশত্ব লাভ করাইয়া কৈলাসে লইয়া যাইবেন। হে পাৰ্বতীনন্দন! তোমরা যে উপায়ে অনতিবিলম্বে মহাদেবকে পাইবে, তদ্বিষয়ের উপদেশ প্রদান করি, তোমরা একাগ্র হইয়া তাহা শ্রবণ কর। ৯৯-১০০

মহাদেব ধ্যানে বিলম্বে প্রসন্ন হন, ধ্যান ও পূজা দ্বিবিধ অনুষ্ঠানেই আশু প্রসন্ন হন, অতএব সম্প্রতি যথার্থরূপে ধ্যান ও পূজা-প্রকরণ বলি। ১০১

যিনি তেজোময় নিত্যনিরঞ্জন জ্ঞানসুধাস্বাদক জগন্ময় চিদানন্দ ব্রহ্মা ও বিষ্ণু-স্বরূপ বিশ্বরূপ সৰ্ব্বদা মহাযোগরত, তাঁহার যতগুলি মূর্তি আছে, কোন ব্যক্তি সে সকল বলিতে পারে? ১০২-১০৩।

কিন্তু যে যে মূর্তিতে এস্থলে বাস করেন, তাহার মধ্যে আমার যে মূর্তিটি বোধগম্য আছে, তোমাদিগের উদ্দেশ্য বিষয়ে সেই মূর্তিটি ইষ্ট বলিয়া জানি। ১০৪

প্রথম মন্ত্রের বিষয় শ্রবণ কর, পরে ধ্যানের বিষয় বলিব; তাহার পর পূজার পরিপাটি বলিব। ১০৫

হে নরর্ষভ! ঋ ও ৯ ছাড়া স্বরবর্ণের সমস্ত দীর্ঘস্বরের সহিত বিসর্গ ও চন্দ্র বিন্দু যোগ করিয়া পঞ্চাক্ষর বিশিষ্ট মন্ত্র বলা হইয়াছে। এইরূপ ক্ৰমে অন্যান্য বিষয়ও বলিব। সম্মদ, সন্দোহ, নাদ, গৌরব, প্রাসাদ, নির্দিষ্ট এই পাঁচ মন্ত্রের এক একটী মন্ত্র দ্বারা এক একটি বক্ত্র পূজা করিবে অথবা মাত্র প্রসাদমন্ত্রের দ্বারাই মহাদেবকে পূজা করিবে। ১০৬-১০৯

সম্মাদি পাঁচটি মন্ত্রের মধ্যে প্রাসাদ নামক মন্ত্রটিই প্রশস্ত; এই মন্ত্রটি, মহাদেবের প্রসন্নতা হেতু বীৰ্যবান্ হইয়াছে বলিয়াই পূর্ব-ঋষিরা ইহার নাম প্রাসাদ রাখিয়াছেন। ১১০

সেই হেতু সমস্ত মন্ত্রের মধ্যে প্রাসাদ মন্ত্রটিই প্রভুর প্রীতিপ্রদ। আর সম্মদ মন্ত্রটি, মহাদেবের আনন্দকর জানিবে। আর সম্মোহ;–মনের অভিলাষ পূরণ করেন বলিয়াই তাহার ঐরূপ নাম হইয়াছে। শব্দোচ্চারণে ইষ্টদেব আকৃষ্ট হন, তাহার নাম নাদ, আর গুরুত্ব হেতুই মন্ত্রের নাম হইয়াছে গৌরব। তোমরা এই মন্ত্র দ্বারাই ঈশ্বরের আরাধনা কর। ১১১-১১২

এখন ধ্যান বলি, শ্রবণ কর। পঞ্চমুখ, মহাকায়, জটাজুট-বিভূষিত, চারুচন্দ্রকলা-শোভী, অহিগণপরিবেষ্টিত-মস্তক, দশ-হস্ত, ব্যাঘ্রচর্মধারী, বিষপূর্ণ কণ্ঠ, ফণিভূষণ, এক একটি বক্ত্রে তিনটি তিনটি নেত্র, অতএব পঞ্চদশ নেত্র শোভী, ষড়জ্যেতিঃপূর্ণ বৃষবাহন, হস্তিচৰ্ম্মাচ্ছাদিত। ১১৩-১৫

তাহার পাঁচটি মুখের নাম;-সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ, ঈশান (এই পঞ্চমুখের স্বরূপকথন।)। ১১৬

নিৰ্ম্মলস্ফটিক সদৃশ সদ্যোজাত। বামদেব পীতবর্ণ অথচ সৌম্য ও মনোহর। অঘোর, নীলবর্ণ ভয়জনক দন্তবিশিষ্ট। তৎপুরুষ, রক্তবর্ণ দেবমূর্তি ও মনোরম। ঈশান, শ্যামবর্ণ নিত্যশিবরূপী। পশ্চিমদিকে সদ্যোজাত, উত্তরে বামদেব, দক্ষিণে তৎপুরুষ, সৰ্বমধ্যে ঈশান,–এইরূপ ক্রমে ভক্তির সহিত তাহাকে ধ্যান করিবে। ১১৭-১২০

দক্ষিণদিকের পাঁচ হস্তে শক্তি, ত্রিশূল, খট্বাঙ্গ, বরদ, অভয় এই পাঁচটি রহিয়াছে। বামদিকের পাঁচ হস্তে অক্ষসূত্র, বীজপুর, ভুজঙ্গ, ডমরু, উৎপল (পদ্ম) এই পাঁচটি রহিয়াছে। অণিমাদি-অষ্ট ঐশ্বৰ্য-যুক্ত মহাদেবের এইরূপ মূর্তি হৃদয়ে চিন্তা করিবে। ধ্যানকালে জগৎপতি মহাদেবকে এইরূপ চিন্তা করিয়া গণেশাদি দ্বারপালদিগকে পূজা করিবে। ১২১-১২৩

তাহার পর ভূতশুদ্ধি সম্পাদন করিয়া মহাদেবের অষ্টমূর্তি অষ্টনামের দ্বারা পূজা করিবে; পরে আসন সকলের পূজা করিয়া ভাবাদি অষ্ট পুষ্প রচনাপূর্বক তাহাদিগকে যথাস্থানে নিযুক্ত করিবে। নারাচ মুদ্রা দ্বারা তাড়ন করিবে। পরে ধেনুমুদ্রার দ্বারা বিসর্জন করিয়া চণ্ডেশ্বর বুদ্ধিতে যথাবিধি নির্মাল্য ধারণ করিবে। ১২৪-১২৬

হে নরোত্তম। পূর্বোক্ত সম্পদাদি পঞ্চ মন্ত্রদ্বারা যাবৎ অঙ্গ এক এক করিয়া মার্জনা করিবে, তদনন্তর বামা, জ্যেষ্ঠা, রৌদ্রী, কালী, কলবিকরিণী, (কলা বিকারিণী) বলপ্ৰমথিনী, সৰ্ব্বভূতদমনী, মনোন্মথিনী–এই অষ্টদেবীকে শম্ভুর প্রীতির নিমিত্ত যথাক্রমে পূজা করিবে। ১২৭-১২৯

এইরূপে ধ্যান-তৎপর হইয়া মহাদেবের পূজা করণানন্তর, গুরু ও মন্ত্র ধ্যান করিয়া পরে মালা-গ্রহণপূর্বক জপ করিবে। তদগত চিত্তে পঞ্চাক্ষর মন্ত্র অথবা মাত্র প্রাসাদ জপ করিলে শীঘ্রই সিদ্ধি লাভ করিতে পারিবে। ১৩০-১৩১

এখন তোমাদিগকে ধ্যান, মন্ত্র ও অর্চনাক্ৰম সকলই বলা হইল। অতএব নাটকশৈলে গমন কর, সেইখানে শঙ্কর আছেন, তাহার আরাধনা কর। ১৩২

বেতাল ও ভৈরব বলিলেন,–হে মুনে! আপনার অনুমত্যনুসারে এই পঞ্চাক্ষর মন্ত্রই অবলম্বন করিলাম, ইহার দ্বারাই মহাদেবকে ভক্তির সহিত পূজা করিব। ১৩৩

হে নৃপ! এই কথা বলিয়া তখন বেতাল ও ভৈরব, বসিষ্ঠ ঋষিকে প্রণাম করিয়া তাহার উপদেশক্রমে নাটকশৈলে গমন করিলেন। ১৩৪

তথায় চিরনিৰ্ম্মল সলিলপূর্ণ প্রফুল্ল-কমল-কুলবিরাজিত, সুদীর্ঘ পরম রমণীয় একটি সরোবর আছে। ১৩৫

তাহার তীরেই প্রশস্ত অতি মনোহর মহাদেবের এক আশ্ৰম আছে। হে নরশার্দূল! সেইখানে দেব দানব কিন্নর প্রমথাদি, সৰ্ব্বদা নৃত্য ও বাদ্য করিতেছেন। ১৩৬।

ইহাদিগের নৃত্যবাদনাদি-হেতুক মহাদেবও সেস্থলে কৌতুকপর হইয়া নিত্যই নৃত্য করিয়া থাকেন। ইহাদিগের নটনহেতুকই সেই আশ্রম নাটকশৈল নামে পরিচিত হইয়াছে। ১৩৭

এই নাটক-শৈল, ছত্রাকার শঙ্করপ্রিয় ও সুদৃশ্য। তখন বেতাল ও ভৈরব অনুসন্ধানপূর্বক সরোবরে যাইয়া তথায় মহেশ্বরের মহাশ্রম দেখিতে পাইলেন না। ১৩৮

হে নৃপ! তাহারা তথায় যাইতে সক্ষমও হইলেন না। তদনন্তর মহাদেবকে প্রণাম করিয়া সেই সরোবরের তীরে তৎক্ষণাৎ একটি সুন্দর স্থণ্ডিল (ব্ৰতানুষ্ঠানের ভূমি) প্রস্তুত করিয়া বশিষ্ঠের উপদেশানুসারে বেতাল ও ভৈরব, হরোপসনায় নিযুক্ত হইলেন। ১৩৯-১৪০

তখন, সেই পৰ্বতে দেবগণের সহিত, মহাদেব আপনার পুত্রদ্বয়কে শিবোপাসনারত দেখিয়া পার্বতীর সহিত নাটক-শৈলের অধিত্যকায় বাস করিলেন। ১৪১

নিম্নে, সরোবরের তীরে বেতাল-ভৈরব তপস্যা করিতে লাগিলেন, ঊর্ধ্বে, মহাদেবও দেবগণের সহিত থাকিলেন। ১৪২

সেখানে হরের নিত্যই যে নৃত্য ও মার্দলের শব্দ হইত, তাহা তাহারা শুনিতে পাইত, কিন্তু তাহা দেখিতে বা সেখানে যাইতে পারিত না। ১৪৩

হে ভূমিপ! মহাদেব, সকল দেবতাদিগের সহিত সেই পৰ্বতে আরূঢ় হইলে, পৰ্বতটী ইন্দ্রসভার ন্যায় শোভা পাইয়াছিল। ১৪৪

পরে মহাদেব, ইহাদিগকে ধ্যান-নিযুক্ত দেখিয়া তৎক্ষণেই ধ্যানমার্গে সুস্থির হইয়া বসিলেন। ১৪৫

হে রাজন! বেতাল ও ভৈরব যখন পূজা করেন, কি যখন গমন করেন, বা অবস্থান করেন, সকল সময়েই হৃদয়ে মহাদেবকে স্মরণ করিতে লাগিলেন।১৪৬

পঞ্চাক্ষর মন্ত্রদ্বারা মহাদেবের পূজা করিতে ইহাদিগের সহস্র বৎসর অতি বাহিত হইয়াছিল। ১৪৭

ইহারা উপবাস, ভোজ্যনিয়ম, মহাদেব-পরিচিন্তন, এই সকল বিষয়ে তৎপর হইয়া তপোবলে বর্ষসহস্রকে একবৎসরের মতন জ্ঞান করিয়াছিলেন। ১৪৮

এইরূপে সহস্রবৎসর অতিবাহিত হইলে মহাদেব প্রসন্ন হইয়া স্বয়ং তাহা দিগকে দর্শন দিলেন। ১৪৯

তখন বেতাল ও ভৈরব তাহাকে প্রত্যক্ষ করিয়া সম্মুখস্থিত ধ্যানগম্য বৃষধ্বজকে স্তব করিতে লাগিলেন। ১৫০

তখন সম্মুখে তেজোময় সম্যক্ পরিচিন্তিত, হৃদয়স্থিত-হররূপকে দেখিয়া মনে মনে বসিষ্ঠকে পূজা করিলেন, পরে বেতাল ও ভৈরব বলিতে আরম্ভ করিলেন। ১৫১

পঞ্চবক্ত্র প্রশান্ত-শরীর সৰ্ব্বজ্ঞানময় পরমাত্মা সংসারসাগরের পরিত্রাণ কারী মহাদেবকে প্রণাম করি। ১৫২

আপনি পর ও পরমাত্মা এবং পরেশ ও পুরুষোত্তম; আপনি কূটস্থ পরিবর্তনশূন্য জগদ্ব্যাপী সৰ্ব্বপ্রধান পরমেশ্বর; আপনি পরমাত্মা, আপনিই মহাত্মা, আপনি তত্ত্বজ্ঞানময় প্রভু। আপনি সাংখ্যযোগের আলয় ও নির্মল এবং গুণত্রয়বিভাগবিৎ। ১৫৩-১৫৪

আপনি নিত্য, আপনিই অনিত্য, আপনি জগৎকৰ্ত্তা, আপনিই জগৎ সংহারক, আপনি এক হইয়া অনেকের স্বরূপ। আপনি নিষ্ক্রিয় ও জগন্ময়। ১৫৫

আপনি নির্বিকার নিরাধার, নিরানন্দ ও সনাতন; আপনি বিষ্ণু, আপনি মহেন্দ্র, আপনি ব্রহ্মা, আপনি জগৎপতি। ১৫৬

আপনি সবিশেষ রূপবান্ অণিমাদি অষ্ট ঐশ্বর্যমুক্ত, বন্ধনশূন্য–স্ব-ইচ্ছায় ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ হইয়াছেন; আপনি সৰ্ববিদিত ও সৰ্ব্বসংহারক এবং দুর্জ্ঞেয়, আপনি যোগেশ্বর ও জ্ঞানমার্গানুসারী। ১৫৭

আপনি সামান্য ধবল-বর্ণ গিরির ন্যায় ফণীন্দ্রবেষ্টিত ও অমৃতভোগ-পরায়ণ আপনি সূক্ষ্ম অথচ অব্যয়, তত্ত্বজ্ঞানীদিগের দর্পচূর্ণকারী, আপনি দেবদেব ও সকল দেবতাদির আশ্রয়। ১৫৮

আপনি প্রলয়কালেও অপরিত্যক্তদেহ ও পুতাত্মাদিগের হৃদয়ে বাস করেন। আপনি মহান ও নিত্য। আপনি বর্ধিষ্ণু অথচ উগ্র এবং মহাত্মা পুরুষ। আপনি একাদশ ইন্দ্রিয়ের চালনায় বিশেষ অভিজ্ঞ। ১৫৯

আপনি প্রভুর প্রভু; এইজন্য সকল বস্তুর জন্মহেতু, মুনিগণের গতিকারক এবং পরম যোগীদিগেরও প্রাপ্য। আপনি পৃথিবী-পালক এবং অনন্তরূপে অনন্ত শরীর ধারণ করেন। আপনি বিশ্বরূপী; আপনার প্রপঞ্চ বহুতর। ১৬০

আপনি জ্ঞানামৃতের ধারাসম্পাদক পূর্ণচন্দ্র। মোহান্ধকারের উজ্জ্বল প্রদীপ; ভক্ত-পুত্রদিগের পরম-পিতা, আপন ইচ্ছায় পঞ্চানন রূপ ধারণ করিয়াছেন। ১৬১

আপনি যাবৎলোকের প্রথম শাস্তা (উপদেশক), আপনি সূৰ্য্য ও বহ্নি এবং সর্বপাপমুক্ত। আপনি ব্রহ্মার রূপ ধারণ করিয়া সৃষ্টি করিতেছেন ও বিষ্ণুরূপে পালন করিতেছেন। ১৬২

রুদ্ররূপ (সংহারমূর্তি) অবলম্বন করিয়া বিনাশ করিতেছেন। অতএব এই জগতে আপনার তুল্য অন্য বস্তু নাই। আপনি চন্দ্র, আপনি সূৰ্য্য, আপনি অনিল, অনল, জল ও ক্ষিতি। ১৬৩

আপনি আকাশ, আপনি যজ্ঞস্থলীয় হোতা যজমান, আপনার এই অষ্ট মূর্তির জন্য আর কিছুই নাই। আপনি অনন্তমূর্তি; কিন্তু এই কয়েকটি মূর্তির প্রধানত্ব-নিবন্ধন জগতে এই অষ্টমূর্তিরই কথা বলিয়া থাকে। ১৬৪

আপনি ত্র্যম্বক, আপনি ত্রিপুরারি, আপনি শম্ভু, ঈশ, শমন ও বিধাতা। ১৬৫

আপনি সহস্রবাহু, হিরণ্যবাহু, আপনি সহস্রমূর্তি; কিন্তু সম্প্রতি পঞ্চবক্ত্র। আপনি প্রভূত নেত্র হইলেও ত্রিনেত্র এবং প্রভূতবাহু হইলেও দশবাহু। ১৬৬

আপনি ঐশ্বর্যশালী, প্রচুরভোগী এবং মিতভোগযুক্ত। আপনি ভোগ্য বস্তুর অনুগত কিন্তু তাহাতে অনাসক্ত। ১৬৭

আপনি নিত্যানিত্য-স্বরূপ এবং নিত্যধামস্বরূপ, আপনি পরতত্ত্বস্বরূপ এবং শিৰাত্মা আপনাকে নমস্কার। ১৬৮

ব্ৰহ্মা ও বিষ্ণু–আপনার স্বরূপের অন্ত প্রাপ্ত হন নাই। হে বৃষধ্বজ! আমরা আর আপনাকে কি স্তব করিব? ১৬৯

দেবগণ ও দানবেরা যাঁহার স্বরূপ জানিতে পারেন নাই, আমরা বালক হইয়া দেবাদি-দুল্লভ পরমেশ্বর আপনাকে কিরূপে স্তব করিব? ১৭০

হে বৃষধ্বজ! হে দেবেশ! আমরা মাত্র ভক্তির সহিত আপনাকে প্রণাম করিতেছি, হে গৌরীশ। পুনর্বার আপনি আমাদিগের বার বার প্রণাম গ্রহণ করুন। ১৭১

ঔর্ব কহিলেন,–হে রাজেন্দ্র! মহাদেব, মহাত্মা বেতাল ও ভৈরব কর্তৃক এইরূপে স্তুত হইলে তখন তিনি প্রসন্ন হইয়া তাহাদিগকে কহিলেন। ১৭২

হে বৎস! আমি তোমাদিগের প্রতি সন্তুষ্ট হইয়াছি, তোমরা বাঞ্ছিত বর প্রার্থনা কর, তোমাদিগকে বর প্রদান করিব। ১৭৩

হে বৎস! আমি তপোব্রত, স্তুতি, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, সৰ্ব্বদা নির্জনধ্যান-এই সকলের দ্বারা সম্যক্ প্রসন্ন হইয়াছি,-তোমাদিগের অভিলাষ পূর্ণ করিব। ১৭s

বেতাল ও ভৈরব কহিলেন, হে বৃষবাহন! যদ্যপি আপনি আমাদিগের প্রতি সত্যই পরিতুষ্ট হইয়া থাকেন, আর যদি আমরা আপনার বাস্তবিক পুত্ৰই হই–তবে আপনি আমাদিগকে অভিলষিত বর প্রদান করুন। ১৭৫

আপনি আমাদিগের জগদীশ্বর পিতা, যেরূপে পুত্রভাবে আমরা আপনার সর্বদা অনুগত থাকিতে পারি, সেইরূপ বর আমাদিগকে প্রদান করুন। ১৭৬

আমরা রাজ্যাভিলাষ করি না, ধন বা অন্য কিছুই চাহি না; হে বৃষধ্বঙ্গ। কেবল তদগত ভক্তিতে আপনার সেবা করিতে ইচ্ছা করি। ১৭৭

আপনি প্রসন্ন হইলে আপনার শ্রীপাদ-পদ-দ্বন্দ্বে আমাদিগের নয়নদ্বয় সৰ্ব্বদা ভ্রমর-স্বভাবত্ব প্রাপ্ত হউক। ১৭৮

আপনার ধ্যান, আপনার অর্জন–এই সকল কর্মের দ্বারা আমাদিগের কোটি কোটি কল্প সম্যকরূপে অতিবাহিত হউক। ১৭৯

তখন মহাদেব, সকল দেবগণের সহিত হাসিতে হাসিতে বেতাল ও ভৈরবের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাদিগকে দেবত্ব প্রদান করিলেন। ১৮০

ইন্দ্রের সম্মতিতে স্বর্গ হইতে অমৃত আনিয়া শঙ্কর তাহাদিগকে পান করাইলেন। তখন তাহারা দুইজন অমৃত পান করিয়া শিবশক্তি দ্বারা মনুষত্ব পরিত্যাগ করত অমরত্ব লাভ করিলেন। ১৮১-১৮২

সেই সময় বলশালী স্বয়ং বেতাল ও ভৈরব,-দৈবশক্তি, দৈবজ্ঞান, দৈবরূপ লাভ করিলেন। ১৮৩

মহাদেব তখন অভিন্নরূপে দেবত্বপ্রাপ্ত আনন্দযুক্ত পুত্রদ্বয়কে বলিলেন। ১৮৪

আমি তোমাদের প্রতি তুষ্ট হইয়াছি। যদি আমার প্রদত্ত ইষ্ট ইচ্ছা কর, তাহা হইলে আমার দয়িতা ঈশ্বরী আদ্যাশক্তির সেবা কর; আমি তদ্ব্যতিরেকে অব্যয় ইষ্টফল দিতে পারিব না; অতএব হে বৎস! তাহার আরাধনার নিমিত্ত তাহাকে আশ্রয় কর। ১৮৫-১৮৬

যাহাতে শীঘ্র তিনি প্রীতিলাভ করিতে পারেন। যেখানে সেখানে থাকিয়া তাহার উপাসনা করিতে পার। ১৮৭

একপঞ্চাশ অধ্যায় সমাপ্ত। ৫১

আরও পড়ুনঃ

বেতাল-ভৈরবের উপাখ্যান – কালিকা পুরাণ
শিব-বিবাহ – কালিকা পুরাণ

কালীর তপস্যা – শিব মহাপুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

মদন-ভস্ম – কালিকা পুরাণ

কালিকা পুরাণ

“বেতাল ভৈরবের গণাধ্যক্ষতা – কালিকা পুরাণ”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন