ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ ১১-২০ অধ্যায় – পৃথ্বীরাজ সেন

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ ১১-২০ঃ ১১. সনাতন সূত দ্বিজগণকে সম্বোধন করে বললেন, এবার তত্ত্বদর্শীর দেহে যে সমস্ত উপসর্গ দোষের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে, সেগুলো সম্পর্কে আপনাদের অবহিত করব।

যোগী উপসর্গ দোষযুক্ত হয়ে মনুষ্যভোগ্য বিবিধ অভিলাষ যেমন–ঋতুসুখ, স্ত্রীসম্ভোগ, বিদ্যাদান ফল, অগ্নিহোত্র, দুবির্ষজ্ঞ অনাক্রপাদি মায়ায় কর্ম, ধন ও স্বর্গ বিষয়ে কামনা করে।

অবিদ্যার বশীভূত হলেই যোগীপুরুষ এইসব কর্মে লিপ্ত হন। কিন্তু উপসর্গযুক্ত ঐ যোগীর উচিত বুদ্ধির সাহায্যে এইসব লোভ বর্জন করা। তাই একমাত্র নিত্য ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তিই এইসব উপসর্গ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন।

পূর্বোক্ত উপসর্গগুলো ও শ্বাসবায়ু বশীভূত হলেই সাত্ত্বিক রাজন্ ও তামস্ উপসর্গের আবির্ভাব ঘটে। প্রতিভা, শ্রবণ, দেবদর্শন, ও ভ্ৰমাবর্তা এই চারটি হল এই উপসর্গের সিদ্ধিলক্ষণ।

বিদ্যা, কাব্য, শিল্প, অন্যান্য শাস্ত্র এবং বিদ্যার উপাসনাকে একত্রে প্রভাব বলা হয়।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

উপসর্গকালে যোগীজন শত যোজন দূরে অবস্থিত শ্রবণযোগ্য শব্দ শুনতে পান। তিনি সর্বজ্ঞ ও বিধিজ্ঞ হয়ে উন্মত্তের মতো হয়ে ওঠেন। যোগীদেহে যখন উপসর্গ লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন তিনি যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব ও দিব্য মানুষদের দর্শন করতে থাকেন।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ ১১-২০ অধ্যায় – পৃথ্বীরাজ সেন

দেবতা, দানব, গন্ধর্ব, ঋষি, পিতৃ ও পিতৃ পুরুষদের দর্শন করতে করতে তাঁর তখন উন্মত্তের মতো অবস্থা হয়ে যায়। অন্তরাত্মা তাকে ঘোরায়, আর তিনিও উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকেন। এই বিভ্রান্তির ফলে তার বুদ্ধিবিভ্রম ঘটে।

তাঁর সমস্ত লব্ধ জ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়। তার আত্মার অবচেতন স্তর থেকে বিবিধ বিষয়বার্তা প্রাদুর্ভূত হয়ে তাঁর চিত্তের বিকার ঘটায়। এইভাবে বিষয়বার্তাসংক্রান্ত বুদ্ধির দাপটে যোগীর সকল জ্ঞানই বিনষ্ট হয়ে যায়।

এইরকম অবস্থায় যোগীজন অবিলম্বে পরব্রহ্মকে স্মরণ পূর্বক শুক্লপটে কিংবা শ্বেতকমল দ্বারা আবরিত করে চিন্তা করতে থাকবেন। এহেন অবস্থাতেও যদি কোনো মেধাবী যোগীপুরুষ নিজের সিদ্ধি ইচ্ছা করে থাকেন, তাহলে তিনি আত্মার ঐ উপসর্গ দোষগুলিকে পরিত্যাগ করবেন।

যতদিন পর্যন্ত এইসব উপসর্গ দোষ থাকবে, ততদিন পর্যন্ত পূর্বোক্ত ঋষি, দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ, উরগ, মহাসুর প্রভৃতি বারবার তার মনে উদিত হতে থাকবে।

তা ব্যতিরেকে যোগযুক্ত যোগী সর্বদা লঘু আহার করবেন ও জিতেন্দ্রিয় হবেন এবং একাগ্র চিত্তে মূর্ধদেশের সাতটি সূক্ষ্ম পদার্থের প্রতি মনোনিবেশ করবেন। এর ফলে যোগাসম্পন্ন, যোগার বিঘ্ননাশক অন্যপ্রকার উপসর্গের আবির্ভাব ঘটে।

এরপর যোগী সমগ্র পৃথিবীকে ‘ধারণা’-র অন্তর্গত করবেন। এইভাবে ক্রমে ক্রমে তিনি জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন ও বুদ্ধি, এই সমস্ত পদার্থকেও ধারণার অন্তর্গত করতে থাকবেন। এটা তাঁর কর্তব্য।

ধারণকালে যোগী এক একটি ধারণা করার সময়ে প্রতিটি সিদ্ধির লক্ষণ অনুপুঙ্খ খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। এই অবস্থায় তিনি পূর্ব পূর্ব পদার্থের ধারণা পরিত্যাগ করে পর পর পদার্থের ধারণা গ্রহণ করতে থাকেন।

মনে মনে পৃথিবীর ধারণা করতে করতে প্রথমে যোগীর কল্পজগতে সূক্ষ পৃথিবীর জ্ঞান জন্মায়, পরে তিনি নিজেকেই পৃথিবী বলে ভাবতে থাকেন, আর ধারণার সর্বশেষ পর্যায়ে এই পৃথিবীজ্ঞান থেকেই তাঁর মধ্যে গন্ধজ্ঞান জন্মায়। একই ভাবে অন্য অন্য পদার্থের ধারণা করার সময়ে তাঁর মনে ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানের জন্ম হয়।

যেমন, জলের ধারণা থেকে সূক্ষ্ম জলের জ্ঞান, সেই সূক্ষ্ম জলের সাথে আত্মার অভেদাজ্ঞান আর পরিশেষে তার থেকে রসজ্ঞান হয়ে থাকে। কিংবা তেজের জ্ঞান, পরে সেই যোগী আত্মাকেই তেজোময় প্রকাশ বলে ভাবতে শুরু করেন। এই রকম পরিবর্তন বায়ু, আকাশ, মন সব ধরনের ধারণার সময়েই ঘটতে পারে।

হতে পারে ধারণাসীন যোগী বায়ুর ধারণা করতে করতে প্রথমে সূক্ষ্ম বায়ুর জ্ঞান লাভ করলেন, পরে আত্মাকে বায়ুরূপে উপলব্ধি করায় তিনি নিজেকেই বায়ুর মণ্ডলী ভাবতে থাকেন। আকাশ-এর ধারণা দ্বারা প্রথমে সূক্ষ্ম আকাশ জ্ঞান, তারপর সূক্ষ্ম মণ্ডল দর্শন করে থাকেন।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

কিংবা, মনের ধারণা করতে করতে যোগীচিত্তে সূক্ষ্ম মনের প্রবর্তন ঘটে যায়, যোগী নিজের মনের দ্বারা সর্বভূতের মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন। সবশেষে তাদের বুদ্ধির সাথে তার নিজের বুদ্ধি সম্মিলিত হওয়ায় তিনি সমগ্র পদার্থবিজ্ঞানের সম্যক রূপ উপলব্ধি করতে পারেন।

যে বুদ্ধিমান যোগীপুরুষ এই সাতটি সূক্ষ্ম পদার্থ উপলব্ধি করে বুদ্ধি যোগে এই সব কিছু পরিহার করতে পারেন, তিনিই পরমপদ লাভের অধিকারী হন।

কিন্তু যে যে ঐশ্বর্য লক্ষণে ভূতের সংযোগ আছে, যোগীরা তাতে আসক্ত হয়ে বিনষ্ট হয়ে যান। এইজন্য যে দ্বিজ যোগীপুরুষ উল্লিখিত সূক্ষ্ম পদার্থসমূহ পরস্পর সংযুক্ত বিবেচনা করে পরিত্যাগ করেন, তিনি সহজেই পরমপ্রাপ্ত হন।

পরমপদ লাভের পথ খুব একটা সহজ নয়, দেখা গেছে, অনেক দিব্যদর্শী মহাত্মা ঋষিবর এই সূক্ষ্ম ভাবে আসক্ত রয়েছেন, অথচ আনুপূর্বিক শর্তপূরণ হচ্ছে না।

সেক্ষেত্রেও ঐসব পদার্থ দোষ বলে বিবেচিত হবে। অতএব সূক্ষ্ম পদার্থগুলিতে কখনও নিশ্চয়ভাব বিধেয় নয়, ঐশ্বর্য থেকে রাগ বা অভিলাষ জন্মায় অপরদিকে বিরাগ অর্থাৎ বৈরাগ্যই ব্ৰহ্ম বলে পরিচিত। সুতরাং সপ্ত সূক্ষ্ম পদার্থ ও প্রধান পুরুষ ষড়ঙ্গ মহেশ্বরকে অবগত হয়ে বিনিয়োগ বিজ্ঞানী হতে পারলেই পরম ব্রহ্মপ্রাপ্তি ঘটে।

সর্বজ্ঞতা, তৃপ্তি, অনাদি জ্ঞান, স্বতন্ত্রতা, নিত্য অলুপ শক্তি, অনন্ত শক্তি বিবিধ বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই ছয়টি বিশেষজ্ঞকে মহেশ্বরের ষড়জ্ঞ বলে থাকেন।

নিয়ত ব্রহ্মনিষ্ঠ হয়ে যোগযুক্ত হলে উপসর্গ সমূহ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। যে সকল যোগীজন শ্বাস-প্রশ্বাস, উপসর্গ সমূহ ও অভিলাষাদিকে অতিক্রম করেছেন, তাদের একটি বাহ্যিক সর্ব কামিকী ধারণা জন্ম লাভ করে। এর প্রভাবে তিনি যোগযুক্ত হয়ে যে-কোনো স্থানে মনঃসংযোগ করতে সমর্থ হন।

তাতে প্রবেশ করতে পারেন। আর কেবলমাত্র এই জাতীয় ধারণার দ্বারাই দেহ থেকে দেহান্তরে গমন করা সহজে সম্ভব হয়। বিপরীত ক্রমে সে ঐ দেহ থেকে প্রত্যাবর্তন করার সামর্থ্য লাভ করেন।

মনই হল যোগের দ্বারস্বরূপ। মন দেহস্থ ইন্দ্রিয়দের ‘আদান’ অর্থাৎ গ্রহণ করে। এই ‘আদান’ শব্দটি থেকে ইন্দ্রিয়ের আর এক নাম রাখা হয়েছে ‘আদিত্য’।

বিধান অনুসারে যোগী পুরুষ যদি বিবিক্ত ও সূক্ষবর্জিত হয়ে প্রবৃত্তি অতিক্রম করতে পারেন, তাহলে তিনি রুদ্রলোকে অবস্থান করার অধিকার লাভ করেন। ঐশ্বর্য গুণ প্রাপ্ত ব্ৰহ্মভূত সেই প্রভুকে সমস্ত দেবস্থানে নিবৃত করতে হবে।

তিনি পৈশাচ স্থান দ্বারা পিশাচদের, রাক্ষস স্থান দ্বারা রাক্ষসদের, গান্ধর্ব স্থান দ্বারা গান্ধবদের, কৌরব স্থান দ্বারা কুবেরদের, ঐন্দ্র স্থান দ্বারা ইন্দ্রকে, সৌম্য স্থান দ্বারা সৌম্যকে, প্রজাপত্য স্থান দ্বারা প্রজাপতিকে এবং ব্রাহ্ম স্থান দ্বারা প্রভু ব্রহ্মকে আমন্ত্রণ করবেন।

কিন্তু এসব বিষয়ে আসক্ত হলে তাঁকে উন্মত্ত হতে হবে। তাই নিত্য ব্রহ্ম, তৎপর হয়ে যোগাবলম্বন করে ঐসব স্থান তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করবেন। যে দ্বিজবর কোনো স্থানেই আসক্ত নন, তিনিই সর্বগত বিভু হয়ে থাকেন।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

১২.

বিস্তারিতভাবে উপসর্গ দোষের বিষয়ে বর্ণনা সমাপ্ত হলে বায়ু বললেন, এখন আমি ঐশ্বর্য গুণরাশির বিষয় কীর্তন করব। যোগীরা যে বিশেষ যোগ অবলম্বন করে সর্বলোক অতিক্রম করতে সক্ষম হন, সেই যোগবিশেষ অষ্ট গুণযুক্ত ঐশ্বর্যের কথা বলা হয়েছে। আমি সেই সব কিছু যথাক্রমে বর্ণনা করছি, আপনারা শ্রবণ করুন।

অনিমা, লখিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিত্ব, বশিত্ব, কামাবসায়িতা প্রভৃতি হল ঐশ্বর্য। সর্ব কামপ্রদ ঐশ্বর্যকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে–সাবদ্য, নিরবদ্য, সূক্ষ, সংক্ষেপে, পঞ্চভূতময় তত্ত্বের নাম সাবদ্য।

পঞ্চভূতময় ইন্দ্রিয়, মন ও অহংকারের নাম নিরবদ্য এবং পঞ্চভূতময় ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও অহংকারের নাম সূক্ষ্ম। এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ঐশ্বর্য সর্বময় বলে একে আত্মস্থ খ্যাতিও বলা হয়ে থাকে। সবদ্যাদি ঐশ্বর্য-ও অবস্থাভেদে সূক্ষ্মসংজ্ঞক ঐশ্বর্যের অন্তর্গত বলে পরিগণিত হয়।

ভগবান স্বয়ম্ভু এই ত্রিবিধ ঐশ্বর্যের অন্তর্ভূক্ত পূর্বোক্ত ঐ অষ্টবিধ ঐশ্বর্যের লক্ষণ সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, আমি তাই আপনাদের সামনে বিবৃত করছি। ত্রিলোকস্থিত সর্ব-ভূতের মধ্যে জীবের অনিমা শক্তি অনিয়মিতভাবে বিদ্যমান। অনিমা শক্তিতেই সমস্ত ব্যক্ত পদার্থ প্রতিষ্ঠিত। এই ত্রিলোকের যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, যোগী মহাত্মারা তা সবই অনিমা শক্তির প্রভাবে পেয়ে থাকেন।

যোগীপুরুষের দ্বিতীয় ঐশ্বর্য সঘিমা। এই লঘিমা অধিক গুণ সম্পন্ন। লঘিমা লাভ হলে লম্বন, প্লবন ও সকল ভূতে শীঘ্র গমনাদি কাজে সামর্থ্য জন্মায়।

তৃতীয় ঐশ্বর্য হল মহিমা। যে শক্তির প্রভাবে ক্ষুদ্র বস্তু মহৎ হয়, তাকে মহিমা বলে। চতুর্থ ঐশ্বর্য প্রাপ্তি। এর দ্বারা ত্রিলোকোস্থিত সমস্ত ভূতবর্গকে কাছে পাওয়া যায়।

আবার ত্রিলোকমধ্যে সর্বভূতে যথেচ্ছ গমন ও যথেচ্ছ বিষয়ে ভোগকে প্রকাশ্য ঐশ্বর্য বলে। ঈশিত্ব ঐশ্বর্য হল সেই ঐশ্বর্য যার বলে যোগী সুখ-দুঃখের ওপার নিজের আধিপত্য স্থাপন করতে পারেন।

সপ্তম ঐশ্বর্য বশিত্ব। যিনি ত্রিলোকের চরাচর ব্যাপী সর্বভূত-কে বশীভূত করে নিজের সকল কাজে নিযুক্ত করতে পারেন, জানবেন তিনিই বশিত্ব লাভ করেছেন।

অষ্টম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য হল কামাবসায়িত্ব ঐশ্বর্য। যিনি নিজের ইচ্ছা অনুসারে পঞ্চইন্দ্রিয়কে ত্রিলোকের সমস্ত স্থানেই নিযুক্ত ও মুক্ত করতে পারেন, তিনিই কামাবসায়িত্ব ঐশ্বর্যপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে মনে করতে হবে। কামাবসায়িত্ব ঐশ্বর্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি শব্দ, স্পর্শ, রস, গন্ধ, রূপ প্রভৃতি বিষয়ে ইচ্ছেমতন মনকে প্রবর্তিত অথবা অপ্রবর্তিত করতে পারেন।

তিনি জন্ম, মৃত্যু, ভেদ, ছেদন, দহন, ক্ষয়, ক্ষরণ, দুঃখ, মোহ, ত্যাগ, লিপ্ততা প্রভৃতি কোন কিছুতেই প্রভাবিত হন না। তিনি সব কাজই করেন। কিন্তু, কখনও বিকৃত হন না।

তিনি শব্দ, স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ শূণ্য। তিনি নির্মম, নিরহংকার, কামাবসায়িত্ব ঐশ্বর্য-প্রাপ্ত ব্যক্তি বুদ্ধিজ্ঞান বিবর্জিত, অবর্ণ ও নিকৃষ্ট অবস্থায় বিরাজ করেন।

তিনি নিরন্তর বিষয় ভোগ করেন বটে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই বিষয়ের সাথে যুক্ত হন না। এইভাবে তিনি পরম সূক্ষ্ম মোক্ষ অনুভব করেন। এরূপ মোক্ষ ব্যাপক। এই এ জাতীয় মোক্ষপ্রাপ্ত পুরুষও ‘ব্যাপী’ আখ্যা লাভ করেন।

সূক্ষ্মভাব হেতু মোক্ষপ্রাপ্ত পুরুষ ঐশ্বর্য থেকে ভিন্ন অবস্থান করেন। কিন্তু সূক্ষ্ম ঐশ্বর্যের গুণান্তর বলে খ্যাত, অপ্রতিঘাতি ঐশ্বর্য যুক্ত অত্যুত্তম যোগপ্রাপ্তি হলে সেই পুরুষের পরমপদ মোক্ষ্ম লাভ হয়ে থাকে।

১৩.

মহামুনি বায়ু বলতে লাগলেন, উল্লিখিত উপায়ে জ্ঞান লাভ করা সত্ত্বেও অনুরাগবশত কেউ যদি রাজস, বা তামস্ কর্ম করেন, তাহলে সেই কর্মানুসারে তাকে ফল লোগ অবশ্যই করতে হবে।

সুকর্ম অনুষ্ঠান করলে স্বর্গে সেই সুকৃতির ফল ভোগ করবেন, তবে স্বর্গলোকে ফলভোগ করার পর স্বর্গভ্রষ্ট পুরুষটিকে আবার মনুষ্যলোকে নরজন্ম ভোগ করতে হবে। অতএব পরমসূক্ষ্ম পরব্রহ্ম শাশ্বত ব্রহ্মেরই সেবা করা উচিত।

যজ্ঞ পরিশ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। এর ফল হল বারবার মৃত্যুর বশ্যতা। তাই মোক্ষই হল পরম সুখ।

যে ব্রহ্মজ্ঞপরায়ণ ব্যক্তি বিশ্ব পাদশিরোগ্রীবা সম্পন্ন, বিশ্বেশ্বর, বিশ্বভাবন, বিশ্বখ্য, বিশ্বরূপী, বিশ্বগন্ধ, বিশ্বমাল্য ও বিশ্বাম্বরধারী প্রভুপুরুষের ধ্যানে সংযুক্ত, শত শত মন্বন্তরেও তাকে অভিভূত করা যায় না। এক এবং একমাত্র যোগের দ্বারাই তার সাক্ষাৎ মেলে।

যিনি পঞ্চেন্দ্রিয়ের অধীনস্থ হবেন না বলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন, যিনি সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্ম, মহান থেকেও মহান, যিনি কবি, পুরাণকার, অনুশাসক, এই গুণান্বিত নিরিন্দ্রীয় সুবর্ণপুরুষের সাক্ষাৎ যোগের সাহায্যেই পাওয়া যায়, চক্ষু দ্বারা নয়।

অবশ্য ত্রিগুণ, নির্বিকার, লিঙ্গযুক্ত, নিগুণ চেতন, নিত্য, সর্বদা, সর্বগত, শৌচ অচল ও স্বপ্রকাশ এবং লিঙ্গহীন এই পুরুষকে অবশ্য যুক্তি দ্বারাও পাওয়া যায়। ইনি চিন্তনীয় পুরুষ, ইনি তেজে দীপ্যমান। এঁর হস্ত, পদ, উদর, পার্শ্ব, জিহ্বা কিছুই নেই। ইনি অতীন্দ্রিয় অতিসূক্ষ্ম এবং এক।

ইনি চক্ষুশূণ্য, তবু দর্শন করেন। ইনি কর্ণবিহীন, তবু শ্রবণ করেন। তার বুদ্ধি না থাকলেও এই জগতে তার অবোধ্য কিছুই নেই। ইনি সর্বজ্ঞ কিন্তু বেদের দ্বারা অভেদ্য। অর্থাৎ বৈদিক শব্দ দ্বারা এর প্রকৃত স্বরূপ কোনো অবস্থাতেই সুস্পষ্ট ভাবে জানা যায় না।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

মুনিগণ এই মহান পুরুষকে আদি, সচেতন, সর্বগত, অতি সূক্ষ্মরূপে অভিহিত করে থাকেন। আর যোগীরা এঁকে চেতনামধ্যে সর্বভূতের প্রসবধর্মী প্রকৃতিরূপে দর্শন করে থাকেন। তারা সর্বত্রই তার হস্ত ও পদ, সর্বদিকে তার অক্ষি, মস্তক ও মুখ প্রত্যক্ষ করেন।

তিনি সর্বত্র কর্ণযুক্ত, তিনি সব কিছুকে আবৃত করে অবস্থান করেন। তিনি ঈশান অর্থাৎ প্রভু। তিনি সনাতনা, সর্বভূতের একমাত্র আশ্রয় পুরুষ। তিনি ভূতাত্মা, মহাত্মা, পরমাত্মা। তিনি অব্যয় অর্থাৎ বিকারহীন। তিনি সর্বাত্মা পরব্রহ্ম। তাঁকে হাজার বৎসর ধ্যান করলেও মোহপ্রাপ্তি ঘটে না।

সর্ব মূর্তিতে বিচরণ করেন বলে বায়ু যেমন ‘গ্রাহ্য’ নামে অভিহিত হন, সেইরকম গগনব্যাপী ব্রহ্মা পুরী অর্থাৎ দেহমধ্যে, অবস্থান করেন বলে ‘পুরুষ’ নামে বিশেষিত হন।

ধর্মলোপ হয়েছে এমন ব্যক্তি তার নিজের বিশেষ বিশেষ কর্মানুসারে স্ত্রী-পুরুষ সহযোগে শুক্ৰশোণিত থেকে বারবার যোনিমধ্যে জন্মগ্রহণ করেন।

গর্ভকালে প্রথমেই কলন উৎপন্ন হয়। তারপর সেই কলন বুদবুদে পরিণত হয়। এই সময় ঘূর্ণিত চক্রের মাঝখানে স্থাপিত মৃতপিণ্ডে হস্তসংযোগ করলে যেমন বিবিধ আকারের বস্তু নির্মিত হয়, তেমনি বায়ুর ক্রিয়ানুসারে সেই কলনোদ্ভূত বুদবুদ থেকে আত্মা ও অস্থির সংযোগে যথাসম্ভব রূপ ও মনোবিশিষ্ট মানুষ উৎপন্ন হয়

। এই উৎপাদন প্রক্রিয়া কয়েকটি পর্যায়ে সম্পাদিত হয়। প্রথমে যে বায়ু জন্মায় সেই বায়ু থেকে জল জন্মায়, জল থেকে প্রাণ এবং প্রাণ থেকে শুক্রের বৃদ্ধি ঘটে।

গর্ভ উৎপত্তির মূল কারণ যে শুক্ৰশোণিত তাতে শোণিত ও শুক্রের শতকরা অনুপাত হল তেত্রিশ ও চোদ্দো।

এই শুক্ৰশোণিতভুক্ত উভয় বস্তুই গর্ভমধ্যে অর্ধপলভাগ প্রবেশ করে ও পঞ্চবায়ু দ্বারা আবৃত হয়। এরপর যখন পিতাপাতার শরীর অনুসারে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি উদ্ভূত হয়, তখন থেকে মাতা যে আহার গ্রহণ করে ও যে পানীয় পান করে সেইসব খাদ্যদ্রব্যাদি নাড়ি নাভি দ্বারা ভ্রণের শরীরে প্রবেশ করে ও তাকে জীবিত রাখে।

এইভাবে নয় মাস অবধি তাকে জীবিত রাখে। এইভাবে নয় মাস অবধি দ্রুণটি সমস্ত শরীর দিয়ে নিজের মস্তক ও উদরকে বেষ্টিত করে অতিকষ্টে অতিবাহিত করে। তারপর দশমাস পূর্ণ হলে নিম্নমুখ হয়ে যোনিছিদ্র দিয়ে নির্গত হয়।

শিশুটি জন্মগ্রহণ করার পরেও যদি পাপধর্মী আচরণ করে তাহলে তাকে অসিপত্রবন ও শালী ছেদভেদ প্রভৃতি দুঃসহ যাতনাময় ঘোর কুম্ভীপাক নরকে গমন করতে হয়। সেখানে ভৎর্সনা, পুঁজ, শোণিত ভোজন, প্রভৃতি নরকনির্দিষ্ট যাতনা সহ্য করার পর ছিন্নভিন্ন হয়ে ভূবিচ্ছিন্ন জলের মতো আবার নিজের স্বরূপ প্রাপ্তি ঘটাতে হয়।

জীব এইভাবে ক্রমান্বয়ে নিজ কৃত পাপাঁচরণের ফলে তপ্ত হতে হতে অপর কোনো কর্মফল জনিত দুঃখ অবশিষ্ট থাকলে তাও ভোগ করতে থাকেন। এক্ষেত্রে একটিমাত্র সুকৃতি দ্বারাই, ভোগ সুখও প্রাপ্ত হয়। অতএব ধর্মাচরণই জীবের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

মৃত্যুকালে কেবলমাত্র কৃতকর্ম ব্যতীত আর কেউই জীবের অনুগমন করে না। যাঁরা অধর্ম আচরণ করেন তারা নিয়তই শমন ভবনে বিভিন্ন দেহ ধারণ করে চিৎকার করতে থাকেন, অনিষ্টকর কর্মের জন্য বহুবিধ চরম অধর্ম যাতনা সহ্য করতে করতে তাদের শরীর ক্রমশ শুষ্ক হতে থাকে।

লোকে কায়মনোবাক্যে যে অভীষ্ট বস্তু কামনা করে, পাপ বলপূর্বক সেই সবকিছুই হরণ করে। অতএব ধর্মাচরণ একান্ত প্রয়োজন।

জীব পূর্বজন্মে যেরকম পাপকর্ম করবেন, পরজন্মে তদনুসারেই দু’রকম তামস জন্ম লাভ করবেন, এটাই বিধিনির্দিষ্ট বিধান। এই জন্মচক্র মানুষ থেকে স্থাবর পর্যন্ত বিস্তৃত। একে ‘তামস-সংসার’ নামে অভিহিত করা হয়। ক্রমানুসারে এই সংসারচক্র মনুষ্য থেকে পশুভাব, পশুভাব থেকে মৃগত্ব; মৃগত্ব থেকে পক্ষীভাব এবং পক্ষীভাব থেকে সরীসৃপত্ব ও সরীসৃপত্ব থেকে স্থবিরতা–এইভাবে বারবার পরিবর্তিত হতে থাকে।

স্থবিরত্ব প্রাপ্তির পর যখন জীবের মনে আবার ধর্মচিন্তা জাগ্রত হয়, তখন সে কুম্ভকারের চক্ৰভ্রমণের মতো আবার মনুষ্যত্ব লাভ করে। ব্রহ্মা থেকে পিশাচ পর্যন্ত সাত্ত্বিক সংসার নামে পরিচিত, এদের স্থান হয় স্বর্গে। ব্রাহ্ম সংসারে সত্ত্বগুণ, স্থাবর সংসারে তমোগুণ ও চতুর্দশ স্থানে কেবল রজোগুণের বাহুল্য লক্ষ্য করা যায়।

আপনাদের মনে আশঙ্কা হতে পারে, বেদনার্ত দেহী কীভাবে কর্মের অবসানে পরম ব্রহ্মকে স্মরণ করবেন, তবে জেনে রাখুন, তাঁরা সংস্কারবশত পূর্ব ধর্মের ভাবনার প্রেরণায় মনুষ্যত্ব লাভে সমর্থ হন। অতএব ধর্মচরণই নিয়ত কর্তব্য।

১৪.

বায়ু বললেন, এইভাবে চতুর্দশ প্রকার সংসার জানার পর সংসারচক্রে পরিভ্রমিত ব্যক্তি স্বাভাবিক নিয়মেই সংসার ভয়ে পীড়িত হয়ে পড়েন। সেক্ষেত্রে এই ভয় থেকে মুক্তি পাবার জন্য ঐ ব্যক্তির এমন কর্ম আচরণ করা কর্তব্য যা দ্বারা আত্মদর্শন হয়।

এজন্য যোগমুক্ত ও ধ্যান পরায়ণ হওয়া উচিত। আত্মাই হল সংসারের আদিভূত জ্যোতিস্বরূপ এবং সর্বোত্তম সেতুবিশেষ। এই আত্মা সকল ভূতের ধারক। এই আত্মা শাশ্বত। সংসার সমুদ্রের সেতুস্বরূপ, অগ্নিস্বরূপ, বিশ্বততন্মুখ, সর্বভূতের হৃদয়স্থিত এই আত্মাই যোগবিধানজ্ঞ ব্যক্তির উপাস্য।

আত্মোপসনার বিশেষ পদ্ধতি আছে। প্রথমে সম্যক শুচি ও তৰ্গত চিত্তে হৃদয়োস্থিত বৈশ্বানরের স্মরণ করে আটটা আহুতি দান করতে হয়। এরপর আচমন সেরে মৌনভাবে বৈশ্বানরের উপাসনা করতে করতে “প্রাণায় স্বাহা” এই মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রণাহুতি নামে আহুতি দান করতে হবে।

এরপর অপানের উদ্দেশে “অপানায় স্বাহা”, সমানের উদ্দেশে “সমানায় স্বাহা”, উদানের উদ্দেশে “উদানায় স্বাহা” এবং ব্যানের উদ্দেশে “ব্যানায় স্বাহা”, বলে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম আহুতি দান করতে হবে। এরপর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা ইচ্ছেমতো ভোজন করে একবার জলপান পূর্বক তিনবার আচমনের পর হৃদয় স্পর্শ করতে হবে।

অনুভব করতে হবে আত্মপ্রাণের গ্রন্থি, আত্মা বিশান্তক রুদ্র, আত্মা রুদ্রেরও প্রাণ। এইভাবে চিন্তা করার সময় নিজের তৃপ্তিবিধানের উদ্দেশে বলতে হবে–তুমি সুরজ্যেষ্ঠ, উগ্র, চতুর ও ইন্দ্র, তুমি আমাদের মৃত্যু-সংহারক, তোমাদের উদ্দেশ অর্পিত এই হবিও আমাদের মঙ্গল করুক।

এই বলে হৃদয় থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণ পদাঙ্গুষ্ঠে দক্ষিণ হস্ত স্থাপন করে নাভি স্পর্শ করবেন, তারপর আবার জল স্পর্শ করে নিজের শরীর স্পর্শ করে দুই চক্ষু, নাসিকা, দুই কর্ণ, হৃদয় ও মস্তককে যথাক্রমে স্পর্শ করতে হবে।

প্রাণ ও আপান, দুইই আত্মস্বরূপ। এর মধ্যে প্রাণবায়ু অন্তরাত্মাস্বরূপ ও আপান বায়ু বহিরাত্মস্বরূপ। অন্ত্র হল প্রাণ আর আপান, মৃত্যু ও জীবিত স্বরূপ অন্নকে ব্রহ্মজ্ঞান করতে হয়।

অন্নই প্রজা উদ্ভবের কারণ, অন্ন থেকে ভূদগাণের উৎপত্তি ও স্থিতি। অন্ন দ্বারাই ভূতগণের বৃদ্ধি। অন্ন বৃদ্ধিকারক বলেই এরূপ নামকরণ হয়েছে। এই অন্ন অগ্নিতে আহুত বলে দেব, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস ও পিশাচগণ তা ভক্ষণ করে।

১৫.

পুরাণ কথক বায়ু সেই অদ্ভুত কর্মা দ্বিজগণের উদ্দেশে বললেন, এবার আমি শৌচাচারের লক্ষণ বিষয়ে আপনাদের জ্ঞাত করাব। এই আচার অনুষ্ঠানে শুদ্ধত্মা ব্যক্তি ইহলোক ত্যাগ করে স্বর্গলোকে যাত্রা করেন। শৌচের শেষে জলের কাজ মুনিদের পক্ষে উত্তম পদ।

যিনি অপ্রমত্ত হয়ে সেই কাজ করেন, তিনি কখনও অবসাদগ্রস্ত হন না। তাঁর কাছে মান-অপমান যথাক্রমে বিষ ও অমৃত বলে পরিগণিত হয়। অথচ অন্য সকলের শৌচাচার সম্পন্ন ব্যক্তি গুরুর প্রিয় কর্মে আত্মনিয়োগ করে এক বৎসর কাল তার গৃহেই বসবাস করবেন। ঐ সময়ে সচেতনভাবে তিনি যমনিয়মাদি সর্বদা পালন করবেন।

এইভাবে ধর্মের অবিরোধী আচরণ করতে করতে যখন উত্তম জ্ঞান লাভের পর্ব শেষ হবে, তখন গুরুর অজ্ঞতা লাভ করে গৃহস্থাশ্রমের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে পৃথিবীতে বিচরণ করবেন। এই সময় তাকে চোখ মেলে পথ চলতে হবে, পাত্রের মুখে বস্ত্র দিয়ে পান করতে হবে।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

এবং অবশ্যই সত্য কথা বলতে হবে। তাঁকে মনে রাখতে হবে ধর্ম হল শাস্ত্রের অনুশাসন। যোগীপুরুষ শাস্ত্রযজ্ঞে আতিথ্য গ্রহণ করবেন না। সদা সর্বদা অহিংস আচরণ করবেন। এ সবই শাস্ত্রীয় বিচারের ফলশ্রুতি।

পরিতৃপ্ত যোগীপুরুষ নিঃসন্দেহে অঙ্গারহীন বক্তির মতো সমস্ত পরিতৃপ্ত জনেরই সংসর্গ করতে পারেন। অবশ্য সবসময় নয়। যেখানে অপমানিত ও পরাভূত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা থাকে সেখানে সত্য ধর্মকে দূষিত না করে ভিক্ষা গ্রহণ করাই যোগীর পক্ষে যুক্তিযুক্ত হবে।

যোগী কেবলমাত্র সদাচারচারী গৃহস্থের গৃহেই ভিক্ষা গ্রহণ করবেন। এই ভিক্ষাই তাঁর পক্ষে সর্বোৎকৃষ্ট। এছাড়া প্রয়োজনে সম্পদশালী গৃহস্থ অথবা শ্রদ্ধাশীল, সংযত, মহাত্মা, ক্ষত্রিয়দের কাছ থেকেও তিনি ভিক্ষান্ন নিতে পারেন। কিন্তু দুষ্টবৃত্তি নিকৃষ্ট বর্ণের গৃহস্থের গৃহে ভিক্ষাগ্রহণ তাঁর পক্ষে নিকৃষ্ট বৃত্তি বলে উপদিষ্ট হয়েছে।

যোগীর সিদ্ধিবর্ধক আহার সামগ্রীগুলি হল–ভিক্ষালব্ধ যবাগু, তন্তু, দুগ্ধ, যব, পক্ক, ফলমূল, পিন্যাক। যে যোগী মাসান্তরে কুশাগ্র দ্বারা জলবিন্দু পান করেন বা যিনি ন্যায় অনুসারে ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা জীবন ধারণ করেন সেই যোগী পূর্বোক্ত সকল যোগী থেকে স্বতন্ত্র বলে বিবেচিত হবেন।

যে-কোনো যোগীর পক্ষেই চান্দ্রায়ণ হল শ্রেষ্ঠ ব্রত। প্রত্যেক যোগীর সাধ্যানুসারে একটি, দুটি, তিনটি, বা চারটি চান্দ্রায়ণ ব্রত পালন করা উচিত। অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অলোভ, ত্যাগ, ভিক্ষাব্রত, অহিংসা, পারমার্থতা, আক্রোশ, গুরুশুশ্রূষা, শৌচ, লঘু আহার, নিত্য বেদপাঠ, প্রভৃতিকে চান্দ্রায়ণ ব্রতের নিয়ম রূপে পরিকীর্তিত করা হয়েছে।

যেমন ভাবে কোনো কোনো লোক অঙ্কুশের সাহায্যে বন্যজন্তুকে অচিরেই নিয়ন্ত্রিত করবেন। এরপর শুদ্ধ জ্ঞান দ্বারা অবিদ্যাবীজ দগ্ধ হলে নিষ্পাপ বন্ধনহীন, শান্ত ঐ যোগী মুক্ত পুরুষ বলে অভিহিত হন।

বেদ গ্রন্থে যাবতীয় যজ্ঞাদি ক্রিয়া উক্ত আছে। জ্ঞানী মহাত্মাদের পক্ষে বিবিধ যজ্ঞের সর্ব সাধন উপাস্য দেবতার কথাও এখানে বলা আছে। উপাস্যের জ্ঞান থেকে আসক্তি-রাজা বর্জিত উপাস্য বিষয়ক ধ্যান আসে। এই ধ্যান এলেই শাশ্বতের উপলব্ধি ঘটে।

বিশুদ্ধ সত্ত্ব জ্ঞানী যোগীরা শ্রম, দম, সত্য, নিষ্পপতা, মৌন, অখিল ভূতে সরলতা প্রভৃতিকে অতীন্দ্রিয় জ্ঞানস্বরূপা বিবেচনা করেন। যাঁরা সমাহিত, ব্রহ্মনিষ্ঠ, অপ্রমাদি, শুচি, আত্মপ্রিয়, জিতেন্দ্রিয়, সেই সব অনিন্দিত মেধাবী অমলমনা মহর্ষিরা এইভাবে শৌচাগারে যোগকে লাভ করে থাকেন।

১৬.

বায়ু বললেন, যোগীপুরুষ পূর্ব পূর্ব তিনটি আশ্রম পরিত্যাগ করে চতুরাশ্রমে গুরুর কাছে এক বৎসর কাল বাস করে থাকেন। সেখানে থাকার সময় তিনি অতি উত্তম জ্ঞান লাভ করেন। তারপর গুরুর আজ্ঞানুসারে পৃথিবীর নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান।

যে জ্ঞান জ্ঞেয় বস্তুর সাধক এবং যে জ্ঞান সকল জ্ঞানের সারভূত–সেই জ্ঞানেরই উপাসনা কর্তব্য হওয়া উচিত। যদি তার বিভক্ত জ্ঞান কেবল এই হল জ্ঞান আর এই হল জ্ঞেয়র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই রকম জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি কল্পনাতেও জ্ঞেয় বস্তু লাভ করতে পারবেন না।

জ্ঞান লাভ করতে হলে আসক্তি পরিত্যাগ, ক্রোধ জয়, লঘু আহার, ইন্দ্রিয় জয় প্রভৃতিকে আত্মস্থ করে বুদ্ধি দ্বারা ইন্দ্রিয়কে আবৃত করে সমগ্র চিত্ত ধ্যানে সমর্পণ করা উচিত। আকাশের মতো অবকাশ স্থানে, গুহায়, নদীতটের সঙ্গে যোগীর নিত্য যোগাযোগ থাকা উচিত।

যাঁর কথার ওপর কর্মের ও মনের সম্পূর্ণ শাসন রাখবার ক্ষমতা জন্মেছে অর্থাৎ যিনি বাগদণ্ড, কর্মর্দণ্ড ও মনোদণ্ড সাধন করেছেন, তিনিই ‘ত্রিদণ্ডী’ নামে অভিহিত হলে থাকেন।

এইভাবে যে যোগী সমাহিত ধ্যানে অনুরক্ত ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে শুভাশুভ উভয় প্রকার কর্মই ত্যাগ করতে সমর্থ হন, তিনিই এই দেহত্যাগের পর মুক্তি লাভ করেন। তাকে আর কোনোদিন জীবধর্মের বশীভূত হয়ে জন্ম-মৃত্যু ভোগ করতে হয় না।

১৭.

বায়ু বলে চললেন, এখন আমি যতিদের কামকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত ও তত্ত্ব আপনাদের কাছে বিবৃত করব।

সূক্ষকর্মবিদরা বলে থাকেন কামকৃত অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত পাপ ত্রিবিধ। বাক্যজ, মনোজ ও কায়জ জগৎ। এই সমস্ত কর্ম দ্বারাই দিবারাত্র আবদ্ধ। এ বিষয়ে পরমা শ্রুতির উক্তি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, কর্ম ও জগৎ কিছুই স্থায়ী নয়। এই ক্ষণিক জগৎ ক্ষণিক আয়ুর পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়।

যোগই হল পরম বল। যোগভিন্ন মানুষের আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। ধার্মিক মনীষীরা এই কারণেই যোগবিদ্যার প্রশংসা করে থাকেন। যাঁরা পরমৈশ্চর্য ও ব্রহ্মলোক লাভ করেন, তারা ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হন।

ভিক্ষুশ্রেণির কিছু সুনির্দিষ্ট ব্রত এবং উপব্রত আছে, তার মধ্যে কোনো একটির ব্যতিক্রম হলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। যেমন, কোনো ভিক্ষু যদি কামনার বশবর্তী হয়ে স্ত্রীগমন করেন তাহলে তাকে প্রাণায়ামের সাথে শান্তপন ব্রত প্রায়শ্চিত্ত রূপে পালন করতে হয়।

এই কৃচ্ছসাধন সমাহিত হলে ঐ ভিক্ষু পুনরায় আশ্রমে ফিরে আসেন এবং জীতেন্দ্রিয় হয়ে ভিক্ষু ব্রত পালন করেন। মহান মনীষীগণ বলে থাকেন যে–ধর্মযুক্ত বচন পীড়াদায়ক হয় না। কোনো প্রসঙ্গেই পীড়াজনক বাক্য প্রয়োগ উচিত নয়। এই বিষয়ে ‘শ্রুতি’র নির্দেশ হল–”পীড়াকর বাক্য আপেক্ষা অধিক অধর্ম আর কিছুতেই হয় না“। দেবতা ও ধী সম্পন্ন মুনিরা বাক্যকেই শ্রেষ্ঠ হিংসা বলে থাকেন।

এই যে বাক্যরূপ ধন তা হল মানুষের বাইরের প্রাণস্বরূপ। যিনি যার ধন হরণ করেন, তিনি তার প্রাণহরণ করেন। যে দুষ্টাত্মা এইরূপে পাপাচারণ করেন তিনি অসদাচারণ হেতু ব্রতচ্যুত হন।

এইভাবে কার্য সম্পাদিত হবার পর পরিতাপ আসলে শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে সংবৎসরের সাধ্য চান্দ্রায়ম ব্রত চারণ করবে–এটিই হল শ্রুতির নির্দেশ। এক বৎসর পূর্ণ হলে তার পাপক্ষয় হবে। পাপক্ষয় হয়ে আবার যখন নির্বেদ জন্মায়, তখন সেই ব্যক্তি আবার অতন্দ্রিত হয়ে ভিক্ষু বৃত্তি অবলম্বন করবেন।

ইন্দ্রিয়

কায়মনোবাক্য সর্বভূতে অহিংসা প্রদর্শনই আমাদের পরম কর্তব্য। যদি কোনো ভিক্ষু অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো পশু বা মৃগের প্রতি হিংসা প্রদর্শন করেন, তবে তার কৃচ্ছাতিকৃচ্ছু চান্দ্রায়ন বিধেয়। যদি কোনো যতির কামিনী দর্শনে ইন্দ্রিয় দর্শনে ইন্দ্রিয় দৌর্বল্য হেতু বেতঃস্খলন হয়, তবে তিনি ষোড়শ বার প্রাণায়াম করবেন।

আর যদি কোনো ব্রাহ্মণ দিনেরবেলায় রেতঃস্থলন করেন তাহলে তাঁর ত্রিরাত্রি উপবাস ও শত সংখ্যক প্রাণায়াম বিধেয়। রাত্রিবেলায় রেতঃস্থলন হলে স্নান ও দ্বাদশ বার প্রাণায়াম বিধেয়। ব্রাহ্মণ প্রাণায়াম দ্বারাই নিষ্পাপ হয়ে শুদ্ধ হন।

একান্ত, মাংস, মধু, আমশ্রাদ্ধ ও প্রত্যক্ষ লবণ ভক্ষণ যতির অভোজ্য। এদের এক একটির লঙ্ঘনে কৃচ্ছ্বপ্রজাপত্য রূপ প্রায়শ্চিত্ত দ্বারা পাপমুক্তির বিধান দেওয়া হয়েছে।

ভ্রমবশত বাক্য ও মন ও কার্যজনিত পাপ কাজ হলে সেখানে সাধুদের সাথে পরামর্শক্রমে প্রায়শ্চিত্ত কর্তব্য, যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ চিত্ত, যাঁর লোষ্ট্রকাঞ্চনে সমান জ্ঞান এবং যিনি সমাহিত চিত্ত হয়ে সর্বভূতে সমানভাবে বিচরণ করেন, তিনিই ধ্রুব, শাশ্বত, অব্যয় এবং সজ্জনোচিত পরম অক্ষয় পদ লাভ করেন। এই স্থান প্রাপ্তির পর তাকে আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না।

১৮.

বায়ু বলতে লাগলেন, এবার আমি আপনাদের অরিষ্ট বিষয়ে অবহিত করব। অরিষ্ট সম্বন্ধীয় বিশেষ জ্ঞানে নিজের মৃত্যুকে চাক্ষুস করা সম্ভব। বলা হয়ে থাকে, যে ব্যক্তি ধ্রুব, অরুন্ধতী, চন্দ্রচ্ছায়া ও মহাপথ দেখতে পান না, তিনি এক বৎসরের পর আর জীবিত থাকেন না।

যিনি সূর্যকে রশ্মিহীন এবং অগ্নিকে রশ্মিময় দেখেন তিনি একাদশ মাসের বেশি জীবিত থাকেন না। যিনি স্বপনে বা জাগরণে মূত্র, করীষ, সুবর্ণ বা রজত বমন করেন, তিনি দশমাসকাল জীবিত থাকেন। যাঁর মাথার ওপর কাক, কপোত, গৃধ্র বা অপর কোনো মাংসাশী পাখি এসে বসে, তার জীবন ছয় মাসও স্থায়িত্ব পায় না।

যিনি ঘন ঘন কাকের সারি বা ধূলিবর্ষণে আবদ্ধ হন, অর্থাৎ যাঁর চারিদিকে কাক উড়তে থাকে বা যাঁর চারপাশে ধুলো উড়তে থাকে অথবা যিনি নিজের বিকৃত ছায়া দেখতে পান, তিনি তার পরে আর চার-পাঁচ মাস জীবিত থাকেন।

বিনা মেঘে যিনি দক্ষিণদিকে বিসুত দর্শন করেন, অথবা ইন্দ্রধনু দর্শন করেন, তিনি এক-দুই বা একাধিক তিন মাস কাল মাত্র জীবিত থাকেন। যিনি জলে বা দর্পণে মাঝে মাঝেই প্রতিবিম্ব দেখতে পান না, অথবা নিজেকে মস্তকহীন দেখেন তিনি কোনো অবস্থাতেই এক মাসের বেশি বাঁচেন না।

অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের শরীর শবগন্ধি বা দুর্গন্দগন্ধি হয়ে ওঠে। এমন হলে বুঝতে হবে তাঁর মৃত্যু ক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। তিনি পনেরো দিনের বেশি বাঁচবেন না।

স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময়েই মৃত্যুর আভাস ফুটে ওঠে। যিনি স্বপ্ন দেখেন যে তিনি ভালুক ও বানরযুক্ত রথে চড়ে বসেছেন আর গান করতে করতে এক কৃষ্ণবস্ত্র পরিহিতা শ্যামাঙ্গি অঙ্গনা তাকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে ঐ ব্যক্তিও অচিরেই মারা যান।

যিনি স্বপ্নে নিজেকে জীর্ণ বস্ত্রাবৃত দেখেন অথবা মনে করেন তিনি শ্রবণ শক্তিহীন তারও মৃত্যু ক্ষণ উপস্থিত। যিনি স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি পাক সাগরে নিমজ্জিত হন তার মৃত্যু আসন্ন জানবেন। স্বপ্নে যদি কেউ ভস্ম, অঙ্গার, কেশ, শুষ্ক নদী ও ভুজঙ্গ দেখেন, তবে সেই ব্যক্তি দশ রাত্রিও আর জীবিত থাকবেন না বলে নিশ্চিত জানবেন।

যিনি স্বপ্নে কৃষ্ণবর্ণ বিকটাকার কোনো ব্যক্তির উদ্যত অস্ত্রের দ্বারা নিজেকে তাড়িত অবস্থায় দেখবেন তিনি যে শীঘ্রই মরণ প্রাপ্ত হবেন তা নিশ্চিত।

যদি দেখা যায় সূর্যোদয় অর্থাৎ প্রত্যুষকালে কোনো শৃগালী চিৎকার করতে করতে কোনো ব্যক্তির দিকে এগিয়ে আসছে, তাহলে তার আয়ু শেষ হল বলে জানবেন। স্নানের সঙ্গে সঙ্গে যাঁর অতীব হৃদয়পীড়া উপস্থিত হয়, অথবা ‘দন্তহর্ষ’ নামে দন্তরোগ জন্মায়, তিনিও গতায়ু বলেই বুঝতে হবে।

যিনি ঘন ঘন নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং যিনি দীপগন্ধ লাভ করেন না, তার জানা উচিত যে, তার মৃত্যু সমুপস্থিত। অন্যদিকে, যার মর্মস্থান বায়ুতে পীড়িত, যাঁর শরীর জলস্পর্শেও হর্ষ লাভ করে না, তার মৃত্যুও নিকটবর্তী।

যিনি রাত্রিবেলা ইন্দ্রধনু ও দিনেরবেলা নক্ষত্রমণ্ডল দর্শন করেন, একে-অপরের চোখে নিজের প্রতিবিম্ব চাক্ষুস করেন না, তিনি বেশিদিন জীবিত থাকেন না।

যার একটি নেত্র দিয়ে জল পড়ে, কর্ণদ্বয় স্থানচ্যুত হয়, নাসিকা বক্রাকৃতি হয়, তার জীবন গতপ্রায় বলে মনে করবেন। যাঁর জিহ্বা খরা ও কৃষ্ণবর্ণ, মুখ রিবর্ণ, দন্ত ও চিবুক রক্তবর্ণ তার মৃত্যু উপস্থিত। যাঁর শরীর থেকে বারবার শ্বেত সর্ষপের মতো স্বেদবিন্দু নিঃসৃত হতে থাকে, তার মৃত্যু সমীপে জানবেন।

যাঁর রক্ত দৃষ্টি নানা দিকে পরিবর্তিত হলেও প্রধানত ঊর্ধ্বদিকে অবস্থান করে, যাঁর মুখ থেকে উত্মা নির্গত হয়, নাভি শুষ্ক হয়, মূত্র অত্যুষ্ণ ও অস্থানে পড়ে, তার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে জানবেন। তাছাড়াও আরও কয়েক প্রকার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করা উচিত।

যিনি স্বপ্নে দেখেন যে তিনি মুক্ত কেশে হাসতে হাসতে গান ও নৃত্যরত অবস্থায় দক্ষিণদিকে যাচ্ছেন, তাঁর জীবনান্ত আসন্ন। যিনি স্বপ্নে দেখেন উট বা গদর্ভযুক্ত কোনো রথ তাঁকে দক্ষিণদিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে তার জীবন অতি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

দিনে বা রাত্রে যিনি স্বপ্নে নিজের ঘাতককে সামনে দেখেন এবং নিজেকে হত বলে মনে করেন তার জীবন সংশয় নিশ্চিত। যে ব্যক্তি স্বপ্নবস্থায় অগ্নিমধ্যে প্রবেশ করেন, কিন্তু স্বপ্নের বিষয়টি স্মরণ করতে পারেন না, তার মৃত্যু অবশ্যই ঘটবে। যে ব্যক্তি স্বপ্নে নিজের বস্ত্র শুক্ল, রক্ত বা কৃষ্ণবর্ণ দেখেন, নিশ্চয় জানবেন তাঁর মৃত্যু সমুপস্থিত হয়েছে।

এই সকল অরিষ্ট সূচিত শরীর এবং কাল আসন্ন হলে ধীমান বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তি ভয় বা বিষাদ ত্যাগ করতে আরম্ভ করবেন। তিনি পূর্বদিকে বা উত্তরদিকে গিয়ে কোনো পবিত্র সমতল নির্জন প্রদেশের সন্ধান করবেন, উপযুক্ত স্থান পাওয়া মাত্র উত্তরমুখে বা পূর্ব মুখে স্বস্তিকাসনে উপবেশন করে আচমন করবেন ও দেবাদিদেব মহেশ্বরকে প্রণাম করবেন।

অন্য কোনোদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে সমস্ত শরীর ও গ্রীবাকে সমানভাবে ধারণপূর্বক মহেশ্বরকে আরাধনা করতে থাকবেন। তাকে দেখে মনে হবে বায়ুহীন স্থানে দীপ যেমন নিষ্কম্প ভাবে অবস্থান করে, সেই একইরকম ভাবে তিনিও উত্তরদিক প্রবণ দেশে যোগাতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তির মতন যোগ অভ্যাস করবেন।

তিনি যোগী-ব্যক্তি, তিনি প্রাণ অর্থাৎ পরম ব্রহ্মে রত থাকবেন, দুই চক্ষুকে স্পর্শ করবেন, শ্রোত্র, মন, বুদ্ধি ও বক্ষে চিত্তের ধারণা’কে ধারণ করবেন।

মৃত্যুলক্ষণগুলি প্রকৃষ্টভাবে জানতে পারার পর গতায়ু ব্যক্তি একশতবার বা আটশতবার ‘ধারণা’ কে মুদ্রায় ধারণ করবেন। তার ‘ধারণা’ নামক যোগের প্রভাবে বায়ু কোনোদিকে পরিবর্তিত হবে না। তাকে এরপর সমাহিত অবস্থায় ওঁকারের দ্বারা দেহকে পূরিত করতে হবে, ওঁকার ধ্যানপরায়ণ যোগীর ক্ষয় নেই। তাই তিনি অমর, অক্ষয়।

১৯.

ধীমান বায়ু বললেন, এরপর আপনাদের ওঁকার প্রাপ্তির লক্ষণ সম্বন্ধে বিস্তারিত বলছি। ওঁকার ব্যঞ্জনাত্মক, এটি ত্রিমাত্রিক রূপে জ্ঞেয়। এর প্রথম মাত্রা বৈদ্যুতী, দ্বিতীয় মাত্রা তামসী, তৃতীয় মাত্রা নিগুণী রূপে বর্ণনা করা হয়। অক্ষর গামিনী মাত্রাকে এইভাবেই জানতে হবে।

ঐ গান্ধারস্বসম্ভবা প্রাণস্বরূপিণী শক্তি গান্ধবীরূপে জ্ঞান করতে হবে। এই শক্তি যখন মস্তিষ্কে অনুভূত হয়, তখন সেই অনুভূতি পিপীলিকার স্পর্শের মতো মনে হয়। ওঁকার উচ্চারিত হয়ে যখন মূর্ধ্বায় উপলব্ধ হয় তখন যোগীপুরুষ ওঁকারময় হয়ে অক্ষরস্বরূপ হয়ে ওঠেন।

‘প্রণব’ হল ধনুঃ স্বরূপ, ‘মন’ হল তার শর, আর ব্রহ্মা হলেন লক্ষ্য। যদি অপ্রমত্তভাবে ঐ লক্ষ্য চিত্ত দ্বারা বিদ্ধ হয়, তবে জীব তন্মস অর্থাৎ ব্রহ্মময় হন। ‘ওঁ’ এই একাক্ষর ব্রহ্ম হৃদ-গুহ নিহিত থাকে। ঋক, যজু, ও সাম এই তিনটি বেদের সমষ্টি হল ‘ওঁকার’।\

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

এদের ওঁকারের স্বরূপও বলা যেতে পারে, এই বেদত্রয়কে বিষ্ণুর তিনটি পদক্রম বা পদক্ষেপ হিসেবেও বর্ণনা করা যায়। ভূঃ, ভূবঃ ও স্বঃ–এই তিনলোক হল তিন অগ্নি। পারমার্থতঃ ওঁকারের চারটি মাত্রা।

যে যোগীপুরুষ তাতে সংযুক্ত হন, তিনি তার সালোক্য লাভ করেন। অকার অক্ষর, উকার স্বরিত, মকার প্লতস্বরূপ–প্রণবের এই তিন মাত্রা তিনটি লোককে নির্দেশ করে। অকার ভূর্লোক, উকার ভুবর্লোক, এবং ব্যঞ্জনসহ মকার স্বলোক বলে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে এই ত্রিলোকাত্মক ওকারে মস্তকদেশই হল ত্রিপিষ্টপ।

ওঁকার ভুবনান্ত সমস্ত লোকের আশ্রয়ভূত। এটি ব্রহ্মপদরূপে অভিহিত হয়ে থাকে। রুদ্রলোক মাত্রা বিশিষ্ট শিবপাদ মাত্রাহীন–এই ধ্যান বিশেষে জীব সেই পদ লাভ করে।

অতএব জীবের উচিত ধ্যানরত হওয়া। এমনটা মনে করা হয় যে, যে ব্যক্তি শাশ্বত পদ লাভ করতে চান, তিনি প্রযত্নে মাত্রাবিহীন অক্ষরের নিত্য উপাসনা করবেন। হ্রস্ব হল প্রথম মাত্রা, দীর্ঘ হল দ্বিতীয় মাত্রা, প্লুত হল তৃতীয় মাত্রা রূপে উপদিষ্ট হয়েছে।

যথাযথভাবে এই মাত্রাগুলিকে আনুপূর্বিক জানতে হবে। যতটা সামর্থ্য এই বিষয়ে ঠিক ততটাই ধারণা রাখতে হবে। আত্মাতে ইন্দ্রিরস মন ও বুদ্ধির উপাসনা করলে যে ফল পাওয়া যায়, এই অষ্টমাত্রা ওঁকার উপাসনা দ্বারাও যোগী সেই ফল লাভ করেন।

ওঁকার মাত্রার এই উপাসনা দ্বারা যে সকল ফল পাওয়া যায়, শতবৎসর ধরে মাসে মাসে অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেও সেই ফল পাওয়া যায় না। বলা হয়ে থাকে শত বৎসর ধরে প্রতিমাসে কুশাগ্র দ্বারা জলবিন্দু গ্রহণ দ্বারা তপস্যা করলে যে পুণ্যফল সঞ্চিত হয়, এই মাত্রা উপাসনাতেও সেই একই ফল লভ্য হয়।

এমনকি প্রভুর জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে যেসব বীরপুরুষেরা প্রাণত্যাগ করে পুণ্য সঞ্চয় করে, মাত্রা উপাসনা অর্থাৎ ওকার সাধনাতেও সেইরূপ ফল লাভ করা যায়। উগ্র তপস্যায় প্রচুর দক্ষিণা যজ্ঞেও সেই পুণ্যফল লাভ করা যায় না।

পূর্বে যে অর্ধমাত্রা ও পুতমাত্রা ওঁকারের কথা বলা হয়েছে, তাঁকে উপাসানর সেসব ঐশ্বর্য তারা সবাই সমান। তবুও এর উপাসক যোগীদের অণিমাদি আটপ্রকার ঐশ্বর্য হয়ে থাকে। অতএব ব্রাহ্মণদের অবশ্য কর্তব্য হল এই ওঁকারের উপাসনায় নিয়ত থাকা।

যোগযুক্ত পুরুষ যদি শুচি, দমনশীল ও জিতেন্দ্রীয় হয়ে উপাসনা করে আত্মাকে লাভ করেন, তাহলে তিনি সংসারের সবকিছুই লাভ করেন। ব্রাহ্মণ মাত্রেই যোগজ্ঞান দ্বারা ঋক্, যজুঃ, সাম বেদোপনিষদের সবকিছুকে জানতে পারেন। উপাসনার ফলে যোগীপুরুষ সর্বভূতের লয়স্থান প্রাপ্ত হন।

নিজে উৎপত্তি প্রভৃতি বিকারবর্জিত হয়ে বীর্য কারণ অতিক্রম করে শাশ্বত পদ লাভ করেন। শুধু তাই নয়, এই ধ্যানের দ্বারা যোগী পুরুষ দিব্য চক্ষু লাভ করে চতুর্মুখী বিশ্বরূপাখ্যা প্রকৃতিকে দর্শন করেন। রক্ত, শুক্ল ও কৃষ্ণ–নিজের অনুরূপ এই ত্রিবর্ণের বহু বহু সন্তান প্রসবকারিণী অথবা বহু বহু কার্য উৎপাদনকারিণী রক্ত, শুক্ল ও কৃষ্ণরূপা।

প্রকৃতির প্রতি অনুরক্ত হয়ে কোনো অজা অর্থাৎ জন্মরহিত অবিদ্যাগ্রস্ত জীব তাকে ভেগ করে। কিন্তু অন্য-অন্য জীব তার ভোগের অবসানে সেই অজাকে অর্থাৎ সেই ত্রিগুণা প্রকৃতিকে ত্যাগ করে। এই অষ্টাক্ষরা যোড়শপানিপাদ চতুমুখী ত্রিশিরা একশৃঙ্গা আদ্যা অজ বিশ্বসৃষ্টিকারিণী স্বরূপাকে জেনে জ্ঞানীপুরুষরা অমৃতত্ত্ব লাভ করেন।

যে ব্রাহ্মণরা ঐ প্রণবের ধ্যান করেন তাদের আর বারবার এই সংসারে যাতায়াত করতে হয় না। যিনি এই অক্ষয় অক্ষয় ব্রহ্মাকে ওঁকার-এর উপাসনা করেন বা অধ্যাপনা করেন, অথবা ধ্যান করেন, তিনি সংসার চক্র অতিক্রম করে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হন। তিনি অচিরেই সেই স্থান লাভ করেন যা অচল, নিগুণ ও মঙ্গলময়।

এতক্ষণ আমি ওঁকার প্রাপ্তির লক্ষণগুলির কথা আপনাদের কাছে বর্ণনা করলাম। মনে রাখবেন, সংকল্পাত্মক জগতের আশ্রয়স্বরূপ লোকেশ্বর মহান মহঘলরূপা।

নির্গুণ সর্বত্রস্থিত সেই পরমব্রহ্মকে নমস্কার করি, যিনি ভক্তযোগীর অভীষ্ট ফল দান করে থাকেন। জলকে ধারণ করে পদ্মপাত্র যেমন বিশুদ্ধ থাকে, তেমনই ওঁকার রূপী ব্রহ্ম এই সৃষ্ট জগৎকে ধারণ করেও তার থেকে স্বতন্ত্র। তিনি সমস্ত পবিত্র বস্তুর মধ্যে পবিত্র। এই যে হ্রস্ব-দীর্ঘ- প্লতবিশিষ্ট ওঁকার তা কিন্তু শব্দের সাম্য নয়।

তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ কিছুই নেই। এই ব্রহ্মই ধ্যানী যোগীর উপাস্য। এই ব্রহ্মকে প্রণাম করি। সমগ্র বিশ্বই তার রূপ। তিনি অবিদ্যার ঈশান অর্থাৎ অবিদ্যার নিয়ন্ত্রক। তিনি দ্যুলোককে উগ্র আর পৃথিবীকে দৃঢ় ও শব্দময় করেছিলেন। তিনি নাক নামক স্বর্গ ও আকাশস্বরূপ ও দেবতাদের হৃদয় বিশ্বের স্বরূপ।

তার প্রাণ ও অপানের সাথে কারো উপমা হয় না। এই ওঁকারই বিশ্ব, যজ্ঞ, বেজ ও নমস্কার স্বরূপ, ইনিই রুদ্র। এই যোগশ্বর অধিপতি রুদ্রকে নমস্কার। যেহেতু এই রুদ্র কামনানুসারে ফল প্রদান করেন, তাই সায়ংকাল, প্রাতঃকাল ও মধ্যাহ্নকালে পরম সিদ্ধিপ্রদ এই রুদ্রকে নমস্কার করি।

অকস্মাৎ বায়ুচালিত হলে পাকা ফল যেমন বৃন্তচ্যুত হয়, তেমনই সিদ্ধিপ্রদ রুদ্রের নমস্কারে সমস্ত পাপ নষ্ট হয়। অন্য দেবতার প্রতি নমস্কারে যে ফল পাওয়া যায় না, রুদ্রের নমস্কারে তাই হয়।

 

অর্থাৎ ইহা সর্বধর্মফলস্বরূপ। সুতরাং যোগী পুরুষের উচিত তিনকালে (প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন, সন্ধ্যা) রুদ্র মহেশ্বরের উপাসনা করা। দশ আঙ্গুল পরিমিত বিস্তৃত স্থান থেকেও বিস্তৃত ব্রহ্মরূপ ওঁকারের উপাসনা সর্বকালেই বিহিত। ওঁকারের উপাসনা করলে মহাযশা হয়। বিষ্ণুত্ব প্রাপ্ত হয়।

যজ্ঞ প্রণবের স্তব করে, নমস্কার যজ্ঞের স্তব করে, রুদ্র নমস্কারের স্তব করে সুতরাং শিবই হলেন রুদ্রপাদ, যে যোগী ব্যক্তি এই যদি রহস্য যথাক্রমে ধ্যান করেন ও অধ্যাপনা করেন, তিনিই নিঃসংশয় ভাবে পরমপদ লাভ করেন।

২০.

রোমহর্ষণ সূত বললেন, সে সময় নৈমিষ আরণ্যবাসী অগ্নিকল্প ঋষিদের মধ্যে সাবৰ্ণি নামে কোনো এক শ্রুতিধর প্রাজ্ঞ ঋষি ছিলেন।

মহাদ্যুতি বায়ুদেবতা সত্ৰ যাজকদের প্রিয় কাজ করতে সর্বদা সতত তৎপর, বাক্যবিশারদ সাবৰ্ণি ঋষি তাই তার কাছে এগিয়ে এলেন, সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে বিভু, আপনি সর্বদর্শী, আপনার প্রসাদে আমরা বেদানুমোদিত পুরাণকথা ভালোভাবে বিস্তার পূর্বক শুনতে ইচ্ছা করি।

আমরা জানতে ইচ্ছা করি, ভগবান হিরণ্যগর্ভ কীভাবে ললাট থেকে তেজঃস্বরূপ নীললোহিত দেবতাকে নিজের পুত্ররূপে লাভ করলেন। কীভাবে ভগবান ব্রহ্মা পদ্ম থেকে উদ্ভূত হলেন। কীভাবে নিজপুত্র শংকরের রুদ্রত্ব প্রাপ্ত হল।

আর কেনই বা সমস্ত দেবতাদের মধ্যে প্রীতির উদ্ভব হল, আর কেনই বা সমস্ত দেবতারা বিষ্ণুময়, সমস্ত গণেরা বিষ্ণুময়, কেন বিষ্ণুনাম বিনা আর কোনো গতি নেই, দেবতারা কেন তাকে সতত কীর্তন করে থাকেন, কেনই বা ভগবান হরি ভবকে প্রণাম করেন?

সূত বললেন, এইরকম অনুরোধ করা হলে ভগবান বায়ু সাবৰ্ণিকে বললেন, হে সাধু সাবর্ণি, আপনি অতি উত্তম প্রশ্ন করেছেন, ব্রহ্মা কীভাবে পদ্মযোনি হলেন, ভব কীভাবে ব্রহ্মার পুত্ররূপে জন্মলাভ করেন।

শংকর কীভাবে রুদ্র’ নামে পরিচিত হলেন, কী প্রকারে বিষ্ণু ও ভবের মধ্যে প্রীতির সঞ্চার হল, শংকরের প্রতি বিষ্ণু কেনই বা সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করেন–এসবই আমি আপনাদের কাছে বিস্তারিতভাবে এবং আনুপূর্বিকভাবে বলছি, আপনারা শ্রবণ করুন। এছাড়াও বর্তমান বরাহকল্পের পূর্ববর্তী যে সপ্তম পদ্মকল্প তার কথাও আমি আপনাদের নিকটে বিস্তারিত ভাবে বলব।

সাবৰ্ণি বললেন, হে সাধুশ্রেষ্ঠ বায়ু, কতখানি সময় নিয়ে এক একটি কল্প হয় এবং কীভাবে হয় তাও

আমাদের জিজ্ঞাসা। তাছাড়া কল্পের প্রমাণ কী? দয়া করে আমাদের এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিন।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-১১-২০ অধ্যায় - পৃথ্বীরাজ সেন

বিভু বায়ু বললেন, আমি সংক্ষিপ্ত আকারে এবং ক্রম অনুসারে সপ্ত মন্বন্তরের কাল সংখ্যা বলছি, আপনারা শুনুন।

দ্বিসহস্র অষ্টশত দ্বিষষ্টিকোটি সপ্ততি নিযুত কাল হল প্রত্যেকটি অর্ধকল্পের পরিমাণ। পূর্বোক্ত গুণচ্ছেদ দুটি বর্ষাগ্র’ নামে খ্যাত। এই বর্ষাগ্রের পরিমাণ হল বৈবস্বত মন্বন্তরের মধ্যবর্তী মানুষ প্রমাণ অনুসারে একশত অষ্টসপ্ততি কোটি ও দুই সহস্র দুই শত নবতি নিযুত।

এই কল্পার্ধকালকে দ্বিগুণ করলে যে কাল পরিমাণ পাওয়া যায়, তাই কল্পকালের পরিমাণ রূপে জ্ঞান করা হয়। কিন্তু অনাগত সপ্তকালের কাল পরিমাণ হল–অশীতিশত অষ্টপঞ্চশত ও চতুশীতি মেশালে যে পরিমাণ হয়, সেই পরিমাণ। বর্ষাগ্রের পরিমাণ প্রত্যেক কল্পের বর্ণনাকালে জানতে পারবেন।

এছাড়া কল্পকালের সপ্তঋষি, মনু, ইন্দ্রাদি দেবগণ প্রমুখ বিষয়েও আপনারা যথাসময়ে অবহিত হবেন, এর মধ্যেই মন্বন্তরের মানবগণ, প্রণবাণত দেবগণ, সাধ্যসমূহ এবং শাশ্বত বিশ্বদেবগণ বর্তমান আছেন। স্বয়ম্ভুবাদি মনু কর্তৃক অধিকৃত এই কল্পের নাম বরাহকল্প।

ঋষিরা প্রশ্ন করলেন, হে বিভু বর্তমান কল্পের নামে কেন কী কারণে বরাহ কল্প রাখা হল, আপনি বিস্তারপূর্বক বলুন ভগবান বরাহ কে, কোন্ যোনিতে তাঁর জন্ম হয়েছে, কীভাবে তিনি প্রাদুর্ভূত হয়েছেন, এসবই আমরা জানতে ইচ্ছা করি।

সর্বজ্ঞ বায়ু বললেন, একটি বিশেষ প্রয়োজন সাধনের উদ্দেশ্যে ভগবান বরাহ রূপ ধারণ করেছিলেন, যেভাবে তা বরাহ কল্পে কল্পিত হয়েছে। এবং এই দুই কল্পের মধ্যবর্তী সময়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে বলে আমি শুনেছি এবং যা আমি যেমন যেমন ভাবে দেখেছি, তা সবই বর্ণনা করব।

আদি লোকসৃষ্টির প্রথমকালেই ‘ভব’ নামক কল্পের ধারণা করা হয়। এই কল্পে ভগবান ‘আনন্দ’ রূপে আবির্ভূত হন। ভবকল্পের অবসানে সেই সপ্তম ভগবান আনন্দ দিব্য ব্রহ্ম স্থান লাভ করেন। পরপর আসে দ্বিতীয় কল্প, যা ‘ভুব’ নামে বিদিত হয়ে আছে।

পরবর্তী তৃতীয় থেকে চতুর্দশ পর্যন্ত কল্পের নাম যথাক্রমে তপঃ’, ‘ভাব’, ‘রম্ভ’, ‘ঋতু’, ‘ক্রতু’, ‘বহ্নি’, ‘হব্যবান’, ‘সাবিত্র’, ‘ভুব’, ‘উশিক’, ‘কুশিক’, এবং ‘গান্ধার’। আবার পঞ্চদশ কল্পের নাম হল ‘ঋষভ’। এই কল্পের লোক মনোহর ঋষভ স্বর এবং ঋষি সমূহ আবির্ভূত হন। এইভাবে ষোড়শ কল্পের নামকরণ করা হয়েছে ষড়জ।

এতে শিশির, বসন্ত, নিদাঘ, বর্ষা, শরৎ ও হেমন্ত নামে ব্রহ্মার ছয়-ছয়টি মানসপুত্র উৎপন্ন হয়েছিলেন। এঁরা প্রত্যেককেই ছিলেন ষড়জ-স্বয়ং সিদ্ধ ঋষি। এঁদের থেকে মহেশ্বর এবং সাগর-সদৃশ ষড়জস্বর জন্মগ্রহণ করেন।

এরপর এল ‘মার্জালীয়’ কল্প নামে সপ্তদশ কল্প। মার্জালীয় নাম ব্রাহ্মকর্মের সংকল্প করা হয়েছিল এর এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। অষ্টাদশ কল্প ‘মধ্যম’ নামে খ্যাত।

এতে ধৈবত স্বর উৎপাদিত হয়েছিল। ঊনবিংশ কল্পে বৈরাজ নামে ব্রহ্মার এক মানসপুত্র মনু জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে এই পর্বের নাম রাখা হয়েছে ‘বৈরাজ’। এই মনুর পুত্র হলেন মহাতেজস্বী, ধর্মাত্মা, ধার্মিক প্রজাপতি দধীচি।

পরবর্তী সময়ে তিনি ত্রিদশাধিপতি হয়েছিলেন। গায়ত্রী এই দধীচি প্রজাপতিকে বিবাহ করেছিলেন। আর দধীচির ঔরসে গায়ত্রীর গর্ভে যজ্ঞেশ্বর নামে দধীচির প্রিয় পুত্র জন্ম নেন।

এরপর এল ‘নিষাদ’ নামক বিংশতি কল্প। স্বয়ম্ভু উৎপন্ন নিষাদের আবির্ভাব সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে হৃষ্ট করেছিল। তাই এই সময়ে তিনি প্রজা সৃষ্টি বিষয়ে বিরত হন।

এই সময়ে নিরাহারী ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে নিষাদও দিব্য পরিমাণে সহস্র বৎসর পর্যন্ত তপস্যা করেন। তার ফলে মহাতেজা লোকপিতামহ ব্রহ্মা তপোম্লান ক্ষৎ-পিপাসাপীড়িত ঊর্ধ্ববাহু শান্ত “নিবৃত্ত হও” অর্থাৎ “নিষাদ” বলে নিষ্ক্রিয় করেন। তাই তার নাম হয় নিষাদ। নিষাদস্বরও এই কল্পে উদ্ভূত হয়েছিল।

একবিংশতি কল্পের নাম ‘পঞ্চম। এই কল্পে ব্রহ্মার পাঁচটি মানস পুত্র আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারা হলেন আপান, সমান, উদান, ব্যান, এবং প্রাণ। এঁরা সুমধুর সমবেত পঞ্চম স্বরে মহেশ্বরের স্তব করতে থাকেন। তাই এই স্নিগ্ধ কল্পের নাম রাখা হয় পঞ্চম।

দ্বাবিংশ কল্প “মেখবাহন” নামে পরিচিত। এই কল্পে মহাবাহু বিষ্ণু মেঘরূপ ধারণপূর্বক দিব্য পরিমাণ সহস্র বৎসর ধরে মহেশ্বর কৃত্তিবাসকে বহন করেছিলেন। এই কল্পের শেষে বিষ্ণু ভারাক্রান্ত হয়ে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাই লোকপ্রকাশক মহাকায় কালের উদ্ভব ঘটে। এই কল্পই ‘কশ্যপপুত্র বিষ্ণু’ নামে খ্যাত।

ত্ৰয়োবিংশতি কল্পের নাম ‘চিন্তক’। প্রজাপতি পুত্র শ্রীমান চিন্তি ও মিথুন একসঙ্গে ব্রহ্মার উপাসনা করতে আরম্ভ করেন এই সময়ে। ফলে চিন্তার উৎপত্তি হয়। এই হেতু এই কল্পেরও নাম রাখা হয় চিন্তক।

চতুর্বিংশতি কল্পের নাম রাখা হয় ‘আকৃতি’। এই কল্পে আকৃতি ও দেবীর উৎপত্তি হয়। পঞ্চবিংশতি কল্পের নাম ‘বিজ্ঞাতি’। এতে বিজ্ঞাতি নাম্নী মহাদেবী মিথুন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই কল্পে পুত্র কামনা করতে করতে ধ্যানমগ্ন হিরণ্য গর্ভের মনোমধ্যে অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের জন্ম হয়।

তাই এই কল্পের নাম বিজ্ঞাতি। ষড়বিংশ কল্প হল ‘মন’। এই কল্পে দেবী শংকরী মিথুন এসব করেছিলেন এবং স্বয়ম্ভু এই সময়ে প্রজা সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করেন। তাই ভাবনার উদ্ভব হয়, সে কারণেই সপ্তবিংশতি কল্প ‘ভাব’ নামে পরিচিত। এই কল্পে দেবী পৌর্ণমাসি সৃষ্টি কামনায় পরমাধ্যানে তৎপর পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার সাথে মিলিত হন।

এই ভাবকল্পে অগ্নি রশ্মিজালে সমাচ্ছন্ন হয়ে মণ্ডলাকার ধারণ করেন এবং বিশাল সেই অগ্নি ভুবলোকে এবং দিব্যলোককে নিয়ন্ত্রিত করে প্রকাশ পেতে থাকলেন।

এইভাবেই সহস্র বর্ষ কেটে গেল। তারপর পরমেষ্ঠী ব্রহ্মা পূর্ণ জ্যোতির্মণ্ডলে উৎপন্ন সূর্যমণ্ডলকে দেখতে পেলেন।

সেই সূর্যমণ্ডল ভূতদের অদৃশ্য। যেহেতু পূর্ণমণ্ডল ভগবান সূর্যদেব এবং তার সাথে সাথে যোগ এবং মন্ত্র–এদের সব কিছুকে দর্শন করা হয়েছিল, এই কারণে এই কল্পকে বলা হয় দর্শকল্প।

পূর্বে ভগবান সোম যে সময়ে পরমেষ্টী ব্রহ্মার মনোমধ্যে পূর্ণতা লাভ করেছিলেন, এই কারণে সেই সময়ের নাম পৌর্ণমাসী, যোগীরা আপন আপন হিত কামনায় পৌৰ্ণমাসীকে উভয়পক্ষের মধ্যে জ্যেষ্ঠ বলে স্বীকার করে থাকেন।

যে দ্বিপাতিরা এই দর্শ ও পৌর্ণমাসীকালে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন, তাঁরা ব্রহ্মলোক থেকে আর কখনও ফিরে আসেন না। অথবা যে লোক অগ্নি স্থাপন করে সংযত হৃদয়ে বীরাচার অবলম্বন করেন এবং ক্ষমাহিত মনে “ত্বমগ্নে রুদ্ৰো অসুরো মহো দিব হৃং শাৰ্ব্বে মারূতং পৃষ্ঠ ঈশিষে।

ত্বং পাশা গান্ধর্ব শিষ্যং পুষা বিধত্তপাশিনা”–এই বলে তারা তীব্রতার সাথে অথচ ধীরে ধীরে এবং মনে মনে উত্তম ভাবে মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন। মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতেই তারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করেন এবং রুদ্রলোকে গমন করেন।

অষ্টবিংশতি কল্পের নাম ‘বৃহৎ’। এই কল্পে পুত্র কামনায় ব্যাকুল ব্রহ্মা সৃষ্টি ইচ্ছায় ধ্যান পরায়ণ পুন। তারপরেই রথন্তর ও কৃত সাপের উৎপত্তি হল। এই কল্পেই সর্বতোমুখ ‘বৃহৎ’-এর উৎপত্তি হয় বলে তত্ত্বচিন্তকরা এই কল্পকে ‘বৃহৎ কল্প’ বলে বর্ণনা করে থাকেন।

অষ্টআশি সহস্র যোজন পরিমিত বিরাট সূর্যমণ্ডলকে রথন্তর বলা হয় থাকে। আর এর মধ্যে যে অভেদ্য সূর্যমণ্ডল আছে তাকে বলা হয় বৃহৎ সোম। কেবলমাত্র দৃঢ়ব্রত যোগাত্মার দ্বিজগণ তাকে ভেদ করে চলে যেতে পারেন।

এতক্ষণ আমি সংঘাত, উপনীত এবং অন্যান্য কল্প অর্থাৎ অধ্যাত্মদর্শনুকুল চিত্তে বিবিধ বিষয়গুলি ব্যক্ত করলাম। এরপর আমি কল্প বিবরণ বিস্তৃত রূপে বর্ণনা করব।

আরও পড়ুনঃ

মন্তব্য করুন