মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত

মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয়, মহাভারতের বংশ পরিচয় : যে মহাযশা ভরতরাজা স্বীয় নামের গৌরবে ভারতবর্ষ ও ভারত বংশকে চির আখ্যাত করিয়াছেন, তাঁহার কুলের আদি পুরুষ ছিলেন রাজা যযাতি।

যযাতির বংশ :

যদিও যযাতির জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু পিতার অসন্তোষভাজন হওয়ায় স্বয়ং রাজ্যচ্যুত ও পিতার শাপপ্রভাবে তাঁহার বংশধরগণ ক্ষত্রিয়কুল হইতে পতিত হন, তথাপি তাঁহার বংশ যাদব নামে বিশেষ খ্যাতি করিল এবং ভোজ বৃষ্ণি অন্ধক প্রভৃতি বীরগণ জন্মগ্রহণ করিয়া এই বংশে স্ব স্ব নামের মহিমা আরোপিত করিলেন। পরিশেষে সর্বলোক-চিত্তহারী অতুল-শ্রীমান কৃষ্ণ ইহাতে অবতীর্ণ হওয়ায় কোন ক্ষত্রিয়কুল অপেক্ষা যদুবংশের মর্যাদা ন্যূন রহিল না।

মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয়, ভারতের কর্ণাটকের মুরুদেশ্বর মন্দিরে রূপায়িত ব্যাস ও গণেশের মহাভারত রচনা, Karwar Pictures Yogesa
ভারতের কর্ণাটকের মুরুদেশ্বর মন্দিরে রূপায়িত ব্যাস ও গণেশের মহাভারত রচনা, Karwar Pictures Yogesa

পিতার হিতচিকীর্ষ প্রিয়তম কনিষ্ঠ পুত্র পুরুই যযাতির সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়াছিলেন। তাঁহার বংশও শৌর্যে বীর্যে সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিল। এই বংশেই খ্যাতনামা ভরত রাজা জন্মগ্রহণ করিয়া ইহার অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করিলেন। এবং পরে মহাবল কুরু এই বংশেরই গৌরব বর্ধন পূর্বক ইহাকে কৌরব নামে আখ্যাত করিলেন।

দ্বাপরযুগের শেষ ভাগে কুরুবংশাবতংস ধীমান শান্তনু জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। শান্তনু যৌবন প্রাপ্ত হইতেই তাঁহার পিতা প্রতীপ রাজা তাঁহাকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া বিবিধ উপদেশ প্রদানপূর্বক বাণপ্রস্থ অবলম্বন করিলেন।

শান্তনুর সহিত গঙ্গার বিবাহ :

শান্তনুর মৃগয়াতে বিশেষ আসক্তি ছিল। তদুপলক্ষে তিনি কিয়ৎকাল ভাগীরথী তীরে একটি রমণীয় স্থানে আবাস স্থাপন করিয়া বনে বনে পশু অন্বেষণে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। একদিন তিনি এরূপ ভ্রমণাত্তে বহুবিধ মৃগাদি সংগ্রহ করিয়া শিবিরে ফিরিতেছেন, এমন সময়ে দেখিলেন যে, গঙ্গাতীরে এক অপূর্ব সুন্দরী ললনা দণ্ডায়মান থাকিয়া তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতেছে। সেই কামিনীর সুললিত নবযৌবন ও মনোহর বেশভূষা দেখিয়া রাজা বিস্মিত ও বিমোহিত হইলেন এবং তাহাকে প্রিয়সম্ভাষণপূর্বক মধুরবাক্যে জিজ্ঞাসা করিলেন

হে সুন্দরী! দেব দানব গন্ধর্ব বা মনুষ্য, কোন্ জাতিকে তুমি অলঙ্কৃত করিয়াছ?

Kurukshetra War মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত

আমি তোমার সৌন্দর্যে নিতান্ত অভিভূত হইয়া তোমার পাণিগ্রহণেচ্ছু হইয়াছি, অতএব তোমার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া আমার আবেগ শান্ত কর। সেই রমণী রাজার এরূপ মৃদুমধুর বাক্য শ্রবণ করিয়া সম্মিত বচনে তাঁহাকে

কহিল মহারাজ! তুমি যখন আমার প্রতি অনুরক্ত হইয়া আমাকে যাচ্ঞা করিতেছ, তখন আমি তোমার পত্নী হইতে সম্মত আছি। কিন্তু এক বিষয়ে আমার নিকট তোমায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকিতে হইবে। আমি যে কোন কার্য করি না কেন, তাহা ভালই হউক বা মন্দই হউক, তুমি আমাকে তিরস্কার বা নিবারণ করিতে পারিবে না। ইহার অন্যথা করিলে আমি তৎক্ষণাৎ তোমায় পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইব।

রাজা প্রণয়পাশে নিতান্ত বদ্ধ হওয়ায় বিচার না করিয়াই এ নিয়ম রক্ষার অঙ্গীকার করিলেন। এবং সেই অলোকসামান্য সৌন্দর্য সম্পন্ন স্ত্রীরত্ব লাভ করিয়া তাহাকে রাজধানীতে লইয়া গিয়া মহিষীরূপে বরণপূর্বক সুখে তাহার সহিত কালযাপন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকাল অতীত হইলে রাজার একটি পুত্র জন্মিল। কিন্তু পুত্র ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র তাহার মাতা নবজাত শিশুকে লইয়া গঙ্গাসলিলে নিক্ষেপপূর্বক বিনষ্ট করিলেন।

এই আচরণে শান্তনু বজ্রাহতের ন্যায় স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন, কিন্তু পত্নীর প্রতি একান্ত অনুরাগবশত কিছুই বলিলেন না। এইরূপে ক্রমে শান্তনুর সাতটি পুত্র জন্মগ্রহণ করিল, কিন্তু সেই রমণী প্রত্যেকটিকে জন্মিবামাত্র গঙ্গায় বিসর্জন করিলেন। রাজা উত্তরোত্তর ক্রুদ্ধ হইতে লাগিলেন, তথাপি স্বীয় প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়া এবং পত্নীর দ্বারা পরিত্যক্ত হইবার আশঙ্কায় তাহাকে নিবারণ করিতে সাহস করেন নাই।

কিন্তু যখন অষ্টম পুত্র ভূমিষ্ঠ হইল এবং তাহাকেও সেই নারী গঙ্গা-তীরে লইয়া চলিল, তখন শান্তনু আর থাকিতে পারিলেন না। পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর হইয়া তিনি পত্নীর পশ্চাতে ধাবমান হইলেন ও পুত্রকে জলে নিক্ষেপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন

আমি আর সহ্য করিতে পারিতেছি না। হে পুত্রঘাতিনি! তুমি কে? কি জন্য এরূপ গর্হিত আচরণে প্রবৃত্ত হইতেছ? এ নিষ্ঠুরতায় ক্ষান্ত হও।

 

Family Tree of Mahabharat 3 মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত

 

রমণী কহিল–হে পুত্রকাম। আমি তোমার অনুরোধে এ পুত্র আর বিনষ্ট করিব না। কিন্তু তোমার অঙ্গীকৃত নিয়ম অনুসারে এক্ষণে তোমার সহবাস পরিত্যাগ করিয়া চলিলাম। তোমার নিকট অবস্থানকালে আমি বিশেষ প্রীতিলাভ করিয়াছি, এই জন্য তোমাকে সকল কথা প্রকাশ করিয়া বলিতেছি। এই ঘটনায় তোমার দুঃখের কোনই কারণ নাই।

আমি মহর্ষি জহ্নুর কন্যা গঙ্গা। মহাতেজা বসুগণ মহর্ষি বশিষ্ঠের শাপে মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। আমি ভিন্ন কোন মর্ত্যনারী তাঁহাদিগকে গর্ভে ধারণ করিবার উপযুক্ত নহে বিবেচনা করিয়া, তাঁহারা আমাকে অনুরোধ করেন যেন আমি তাঁহাদের জননী হই, এবং তাঁহারা ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র তাঁহাদিগকে মর্ত্যবাস হইতে উদ্ধার করি।

আমি ইহাতে সম্মত হইয়া ভারত-বংশকেই একমাত্র ইহাদের উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া তোমার নিকট মানবী-মূর্তি ধারণ করিয়া আসিয়াছিলাম। তুমি ইঁহাদের জনক হইয়া বিশেষ গৌরবান্বিত হইলে, অতএব আর শোক করিও না। দ্যু নামক যে বসুর অপরাধে এই ঘটনা উপস্থিত হয়, তিনি মহর্ষির শাপপ্রভাবে তোমার এই অষ্টম পুত্ররূপে যাবজ্জীবন মর্ত্যলোকে বাস করিয়া তোমার বংশ উজ্জ্বল করিবেন। আমি স্বয়ং ইহাকে উপযুক্ত রূপে লালনপালন করিব।

এই বলিয়া গঙ্গাদেবী পুত্রকে লইয়া অন্তর্হিত হইলেন। রাজা পত্নী ও পুত্র বিয়োগে অতি বিষণ্ণ মনে রাজকার্যে ব্যাপৃত থাকিয়া শোক উপশমের চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

 

Family Tree of Mahabharat 2 মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত

 

শান্তনু পরম প্রাজ্ঞ এবং ধার্মিক ছিলেন। চতুর্দিস্বতী নৃপগণ তাঁহার সদগুণে প্রীত হইয়া তাঁহাকে সম্রাটপদে অভিষিক্ত করিলেন। তাঁহার সুশাসনে কাহারও শোক ভয় বা পীড়ার আশঙ্কা ছিল না। কিছুকাল “এইভাবে রাজা শান্তনু প্রজাবর্গের সুখ-সম্পদ বর্ধনপূর্বক শান্তচিত্তে রাজ্যচালনা করিয়াছিলেন।

একদিন মৃগয়া কালে তিনি এক বাণবিদ্ধ হরিণীর পশ্চাতে ধাবমান হইয়া গঙ্গাতীরে উপনীত হইলে রাজা সলিল শুষ্কপ্রায় দেখিয়া বিস্ময় বোধ করিলেন। এই অদ্ভুত ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া তিনি দেখিলেন যে এক দেবতুল্য কুমার আশ্চর্য কৌশল প্রদর্শনপূর্বক শরবর্ষণের দ্বারা গঙ্গার স্রোত অবরোধ করিয়াছে। এই কুমার শান্তনুর গঙ্গাদত্ত পুত্র দেবব্রত। কিন্তু জন্মের পর হইতে ইহাকে আর না দেখায় রাজা তাহার পরিচয় লাভ করিতে পারিলেন না।

দেবব্রত পিতাকে চিনিতে পারিয়া সহসা অন্তর্ধানপূর্বক মাতার নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানাইলেন। শান্তনু এই সকল অলৌকিক ব্যাপার দেখিয়া বিস্মিতভাবে দণ্ডায়মান আছেন, এমন সময়ে গঙ্গাদেবী পূর্ববৎ মানবীরূপ ধারণ করিয়া পুত্রকে পিতার সমক্ষে আনিয়া কহিলেন—

মহারাজ! আপনার পুত্র দেবব্রতকে আমি বিশেষ যত্নে পরিবর্ধিত করিয়াছি। বশিষ্ঠ শুক্রাচার্য বৃহস্পতি পরশুরাম প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ গুরুগণ ইহাকে বেদ বেদাঙ্গ অস্ত্রবিদ্যা সমস্তই সম্পূর্ণরূপে শিক্ষা দিয়াছেন। এক্ষণে এই অশেষ গুণসম্পন্ন পুত্র গ্রহণ কর।

শান্তনু দীপ্তিমান পুত্র লইয়া পরমানন্দে রাজধানীতে প্রবেশ করিলেন এবং তাহাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া প্রজাবর্গের বিশেষ প্রীতিসাধন করিলেন।

অনন্তর একদিন রাজা যমুনাতীরে ভ্রমণ করিতে করিতে অকস্মাৎ এক অপূর্ব সৌরভের আঘ্রাণ পাইলেন। এই মনোহর সুগন্ধের কারণ অনুসন্ধান করিতে গিয়া দেখিলেন যে উহা এক দেবরূপ-ধারিণী ধীবরকন্যার গাত্র হইতে সম্ভূত। রাজা কৌতূহল পরবশ হইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন –

হে সুলোচনে! তুমি কে? এখানে কি অভিপ্রায়ে আগমন করিয়াছ? তাহাতে কন্যা উত্তর করিল

মহারাজ! আমি ধীবরকন্যা, আমার নাম সত্যবতী। আমি পিতার আদেশক্রমে এখানে তরণী বাহন করিয়া থাকি।

তখন রাজা সত্যবতীর অনুপম রূপমাধুরী ও অঙ্গসৌরভে মোহিত হইয়া তাহাকে

বিবাহ করিবার মানসে ধীবরের নিকট স্থিত হইয়া স্বীয় অভি ব্যক্ত করিলেন। দাশরাজ কহিল–হে প্রজানাথ! যখন কন্যা জন্মিয়াছে, তখন অবশ্যই বিবাহ দিতে হইবে, এবং আপনি যে ইহাকে যাজ্ঞা করিতেছেন, তাহা অপেক্ষা সুখের বিষয় আর কি হইতে পারে? কিন্তু অগ্রে আমার একটি অভিলাষ পূরণে আপনাকে সম্মত হইতে হইবে। আপনার সহিত বিবাহ হইলে এই কন্যার গর্ভে যে পুত্র জন্মিবে, তাহাকে আপনার রাজ্যে অভিষিক্ত করিতে হইবে।

রাজা যদিও সত্যবতীর প্রতি নিতান্ত আসক্ত হইয়াছিলেন, তথাপি পুত্র দেবব্রতের প্রতি স্নেহবশত ধীবরের এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। নিতান্ত দুঃখিত মনে তিনি রাজধানী হস্তিনাপুরে ফিরিয়া আসিলেন এবং সত্যবতীর রূপচিন্তায় অতি বিষণ্ণ চিত্তে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।

মহামতি দেবব্রত পিতার ভাবের এইরূপ বৈলক্ষণ্য দেখিয়া বিশেষ চিন্তিত হইলেন। অবশেষে থাকিতে না পারিয়া একদিন পিতাকে দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। শান্তনু পুত্রকে সত্যবর্তী সম্বন্ধীয় কোন কথা না বলিয়া কহিলেন— বৎস! তুমি আমার একমাত্র পুত্র এবং সর্বদাই বীরোচিত কার্যে ব্যাপৃত থাক। তোমার কোন অনিষ্ট হইলে আমাদের বংশের কি দশা হইবে মনে করিয়া আমি সর্বদাই চিন্তিত থাকি।

পিতা তাঁহাকে দুঃখের প্রকৃত কারণ খুলিয়া বলেন নাই এই সন্দেহে দেবব্রত কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া যে অমাত্য রাজার সহিত ধীবরের নিকট গিয়াছিল, তাহাকে প্রশ্ন করিলেন। তাহার নিকট সত্যবতী সংক্রান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি কৃতসংকল্পচিত্তে ধীবরের নিকট উপস্থিত হইলেন।

দাশরাজ রাজকুমারের আগমনের কারণ জ্ঞাত হইয়া পরম সমাদরে তাঁহাকে আসনে উপবেশন করাইয়া সমাগত রাজপুরুষগণের সমক্ষে কহিতে লাগিল –

হে রাজকুলপ্রদীপ। আপনি শস্ত্রধরশ্রেষ্ঠ এবং শান্তনুর একমাত্র পুত্র, আপনিই সকল বিষয়ের কর্তা। অতএব আপনাকে সকল কথা বলি, শ্রবণ করুন। দেখুন, আপনাদের সহিত সম্বন্ধ ত্যাগ করিতে স্বয়ং ইন্দ্রেরও ইচ্ছা হয় না। এই কন্যার পাণিগ্রহণার্থে মহর্ষি পরাশর বার বার আমার নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু রাজসম্বন্ধই ইহার উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া আমি কিছুতেই সম্মত হই নাই। কিন্তু হে রাজকুমার।

Family Tree of Mahabharat 1 মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত

আমার বড় ভয় হয় পাছে রাজা ইহাকে বিবাহ করিলে, ইহার সন্তান লইয়া আপনাদের রাজ্যে ঘোর বৈরানল প্রজ্বলিত হয়। আপনি যাহার সপত্ন হইবেন তাহার কি আর রক্ষা থাকিবে? এই বিবাহে এই একমাত্র দোষ দৃষ্ট হইতেছে, আর কিছুই নহে। এক্ষণে আমি কন্যাদান করিতে পারি কি না, তাহা আপনিই বিবেচনা করিয়া দেখুন।

মহামতি দেবব্রত ধীবরের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া পিতার সুখের নিমিত্ত অনায়াসে স্বার্থত্যাগপূর্বক কহিলেন— হে দাশরাজ! তোমার ভয়ের কোন কারণ নাই। আমি তোমার অভিলাষ বুঝিতে পারিয়াছি, এবং তাহাই পূর্ণ করিবার অঙ্গীকার করিতেছি। তোমার কন্যার গর্ভজাত পুত্রই এই রাজ্যের অধীশ্বর হইবে। তখন ধীবর প্রীত হইয়া বলিল —

হে পরন্তপ! আপনি যদি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ না হন তাহা হইলে আমি আর একটা কথা বলি। আপনি সত্যবাদী বলিয়া জগতে বিখ্যাত, আপনি যখন সত্যবতীর পুত্রকে রাজত্ব দিতে প্রতিশ্ৰুত হইয়াছেন, তখন আর সে সম্বন্ধে কাহারও সংশয় হইতে পারে না। কিন্তু ভবিষ্যতে আপনার বংশধরেরা যদি ইহার অন্যথা করে, তাহার কি উপায় হইবে?

ভীষ্মের জন্ম [ দেবব্রত হতে ভীষ্ম ]

তখন মহানুভব দেবব্রত পিতার সুখকে সর্বাগ্রে স্থাপনপূর্বক উপস্থিত ক্ষত্রিয়মণ্ডলীর সমক্ষে ধীবরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন

হে দাশরাজ! আমার এই সত্যব্রত শ্রবণ কর। আমি পূর্বেই সাম্রাজ্য ত্যাগ করিয়াছি, এক্ষণে আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে আমি বিবাহ না করিয়া অদ্যাবধি ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিব। তাহা হইলে সত্যবতীর পুত্রের রাজত্ব পাইবার আর কোন বাধা থাকিবে না।

দেবব্রতের এই মহৎ স্বার্থত্যাগে সকলেই সাধু! সাধু! করিতে লাগিল এবং স্বর্গ হইতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করিলেন। এই ভীষণ পণ গ্রহণ করায় তদবধি সকলে দেবব্রতকে ভীষ্ম বলিয়া সম্বোধন করিত।

ধীবরের অভিলাষ পূর্ণ হওয়াতে সে পরম আহ্লাদ সহকারে শান্তনুর সহিত তাহার কন্যার বিবাহ দানে সম্মত হইয়া সত্যবতীকে ভীষ্মের হস্তে সমর্পণ করিল।

ভীষ্ম শান্তনুর নিকট তাহাকে লইয়া গিয়া পিতার দুঃখ মোচনপূর্বক কৃতার্থ হইলেন। রাজা পরম প্রীত হইয়া ভীষ্মকে ইচ্ছামৃত্যু বর প্রদান করিলেন। সত্যবতীর চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য এই দুই পুত্র হইবার পর শান্তনু ইহলোক পরিত্যাগ পূর্বক স্বর্গে গমন করিলেন। প্রথমে মাতা সত্যবতীর সম্মতিক্রমে ভীষ্ম চিত্রাঙ্গদকে রাজ্যে অভিষিক্ত করেন। কিন্তু তিনি অল্পকাল মধ্যেই এক গন্ধর্বের হস্তে প্রাণত্যাগ করিলে, ভীষ্ম অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন।

বিচিত্রবীর্য ভীষ্মের উপদেশ অনুসারে রাজ্যচালনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর বিচিত্রবীর্য যৌবনপ্রাপ্ত হইলে ভীষ্ম তাহার বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিলেন। এই সময়ে কাশিরাজের তিন কন্যা— অম্বিকা এবং অম্বালিকা স্বয়ম্বরা হইবেন এই কথা ভীষ্মের কর্ণগোচর হইল। মহারথী ভীষ্ম মাতার অনুমতি লইয়া বারাণসী নগরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন তথায় দেশ দেশান্তর হইতে বহুতর ভূপতি বিবাহাৰ্থী হইয়া আসিয়াছেন।

স্বয়ম্বরের ফলাফল অনিশ্চিত বিবেচনা করিয়া ভীষ্ম কন্যাত্রয়কে রথে আরোহণ করাইয়া তাহাদিগকে সভা হইতে বলপূর্বক অপহরণ করিলেন। উপস্থিত ভূপতিগণের সহিত এই উপলক্ষ্যে ভীষ্মের ঘোরতর যুদ্ধ বাধিয়া উঠিল। কিন্তু গঙ্গাদেবীর যত্নশিক্ষিত পুত্রের সহিত যুদ্ধে কেহই জয়লাভ করিতে সক্ষম হইল না। ভীষ্মের অসাধারণ রণনৈপুণ্য ও আত্মরক্ষা-কৌশল দর্শনে শত্রুপক্ষীয়েরা ভূরি ভূরি ধন্যবাদ দিতে লাগিল।

এই দুরূহ কার্য সম্পাদনান্তে ভীষ্ম কন্যাত্রয়কে হস্তিনাপুরে আনয়ন করিয়া ভ্রাতার বিবাহের আয়োজন করিতে লাগিলেন। ইত্যবসরে জ্যেষ্ঠা কন্যা অন্বা লজ্জাবনত বদনে ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন—

হে বীর! আমি ইতিপূর্বেই মনে মনে শাল্বরাজকে পতিত্বে বরণ করিয়াছি, তিনিও আমায় প্রার্থনা করিয়াছিলেন, স্বয়ম্বরকালে আমার তাঁহাকেই বরমাল্য দিবার সঙ্কল্প ছিল। আমার পিতাও এই বিবাহে সম্মত ছিলেন। এক্ষণে বলপূর্বক অন্যের সহিত আমার বিবাহ দেওয়া কি আপনার উচিত হয়?

ভীষ্ম এই কথা শ্রবণ করিয়া অতিশয় চিন্তাকুল হইলেন, এবং অম্বার বাক্যের যাথার্থ্য অনুভব করিয়া অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁহাকে শাল্বরাজের নিকট গমনের অনুমতি প্রদান করিলেন। অম্বিকা ও অম্বালিকার সহিত বিচিত্রবীর্যের বিবাহ কার্য যথারীতি সম্পন্ন হইল।

এদিকে অম্বা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ও ধাত্রীর দ্বারা পরিরক্ষিত হইয়া শাল্বপতির সমীপে উপস্থিত হইয়া কহিলেন— আমি আপনাকেই পূর্বে পতিত্বে বরণ করিয়াছি, আপনিও আমাকে প্রার্থনা

করিয়াছিলেন, সেই নিমিত্ত আমি আপনারই নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলাম।

কিন্তু শাল্বরাজ অম্বাকে পরস্ত্রী বিবেচনা করিয়া এবং স্বয়ম্বর সভায় ভীষ্মের নিকট স্বীয় পরাজয় স্মরণে ক্ষুণ্ন হইয়া ঈষৎ হাস্য সহকারে কহিলেন— তুমি স্বয়ম্বর সভায় যাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিলে, তাহার নিকট যাও;

তোমাতে আমার কোন প্রয়োজন নেই।

শাল্বরাজ কর্তৃক এইরূপে প্রত্যাখ্যাত হইয়া অম্বা অভিমানভরে সে-স্থান ত্যাগপূর্বক প্রস্থান করিলেন, কিন্তু আর হস্তিনাপুরে ফিরিতে তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। পিতার নিকট প্রত্যাগমন করিতেও নিতান্ত লজ্জাবোধ হইল। অনন্যোপায় হইয়া অম্বা পিতাকে ভীষ্মকে শাল্বরাজকে এবং আপনাকে বারম্বার ধিক্কার দিতে দিতে অনাথার ন্যায় পথে পথে রোদন করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।

অবশেষে ভীষ্মকেই সমস্ত অনিষ্টের মূল বিবেচনা করিয়া তাঁহার প্রতি অম্বা একান্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং প্রতিশোধ লইবার উপায় অনুসন্ধান করিয়া ঋষিগণের আশ্রমে আশ্রমে ঘুরিতে লাগিলেন।

একদিন এক আশ্রমে সমবেত তাপসবৃন্দকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানাইয়া তাঁহাদের সহিত তিনি কর্তব্য অবধারণ করিতেছেন, এমন সময়ে তাঁহার মাতামহ রাজর্ষি হোত্রবাহন তথায় উপস্থিত হইলেন। অম্বার দুঃখের কথা ব্যথিত চিত্তে শুনিয়া তিনি তাঁহাকে মহর্ষি জামদগ্ন্যের আশ্রয় লইবার পরামর্শ দিয়া কহিলেন—

বৎসে! মহাত্মা পরশুরাম আমার প্রিয় বন্ধু এবং ভীষ্মের গুরু, তুমি আমার পরিচয় দিয়া তাঁহার নিকট সমস্ত দুঃখ নিবেদন করিলে, তিনি নিশ্চয়ই তোমার প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্বক ভীষ্মের উপযুক্ত দণ্ডবিধান করিবেন।

এই বলিয়া রাজর্ষি হোত্রবাহন দৌহিত্রীকে সঙ্গে লইয়া যে স্থানে পরশুরাম শিষ্যগণপরিবৃত হইয়া অবস্থান করিতেছিলেন, তথায় উপস্থিত হইলেন। অম্বা মহর্ষির পাদবন্দনপূর্বক ক্রন্দন করিয়া কহিলেন

হে ভগবন্! আমাকে এ ঘোর শোক হইতে উদ্ধার করুন।

মহাত্মা পরশুরাম বন্ধুর দৌহিত্রীকে এরূপ লাবণ্যযুক্ত ও দুঃখে অভিভূত দেখিয়া স্নেহার্দ্রচিত্তে সম্ভাষণ করিয়া বলিলেন হে রাজনন্দিনি! তোমার দুঃখের কারণ আমার নিকট বর্ণন কর, আমি তোমার

অভিলাষ পূর্ণ করিব। অম্বার মুখে আনুপূর্বিক সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তিনি পুনশ্চ কহিলেন—

বৎসে! তোমার ইচ্ছা হয় ত আমি শাল্বরাজকে তোমায় বিবাহ করিতে আদেশ করিতে পারি, অথবা ভীষ্মের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া তাহাকে তোমার নিকট মার্জনা ভিক্ষা করাইতে পারি।

তদুত্তরে অম্বা বলিলেন –

মহাভারত

দেব! শাল্বরাজ যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন তখন আমার আর তাঁহার সহিত বিবাহের ইচ্ছা নাই। ভীষ্মকেই আমার সমস্ত দুঃখের মূল বিবেচনা করি, অতএব আপনি তাঁহাকে সংহার করিলে আমার শোক শাস্ত হইতে পারে। জামদগ্ন্য অনেক ইতস্তুত করিয়া অবশেষে অম্বার অভিলাষ পূর্ণ করিতে প্রতিশ্রুতি দান করিয়াছেন বলিয়া অগত্যা ভীষ্মের সহিত যুদ্ধ করিতে সম্মত

হইলেন। সেই উপলক্ষ্যে তিনি অম্বাকে সঙ্গে লইয়া হস্তিনাপুরের নিকটস্থ

কুরুক্ষেত্রতীর্থে উপস্থিত হইয়া ভীষ্মকে সংবাদ প্রেরণ করিলেন। ভীষ্ম গুরুর

আগমনে অতিমাত্র প্রীত হইলেন এবং সংবাদ-দাতা ব্রাহ্মণদিগকে গো-দানে পুরস্কৃত

করিয়া সত্বর পরশুরাম সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে যথাবিধি পূজা করিলেন।

পরশুরাম পূজা গ্রহণপূর্বক কহিলেন— হে ভীষ্ম! তুমি এই কন্যাকে বলপূর্বক হরণ করিয়া অশেষ ক্লেশ দিয়াছ সেই নিমিত্ত ইহাকে আর কেহ গ্রহণ করিতে চাহিতেছে না। অতএব ইহাকে পত্নীরূপে বরণ করিয়া ইহার অবমাননার প্রতিকার করা তোমারই কর্তব্য।

ভীষ্ম মহর্ষিকে রুষ্ট দেখিয়া বিনীত বচনে নিবেদন করিলেন

হে ব্ৰহ্মর্ষে! আমি ব্রহ্মচর্য পালনার্থে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছি। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়া কি প্রকারে ক্ষত্রিয় ধর্ম নষ্ট করিব? কিন্তু জামদগ্ন্য কোন যুক্তি না শুনিয়া রোষ-কষায়িত লোচনে বারম্বার বলিতে লাগিলেন

তুমি যদি আমার কথা রক্ষা না কর, তাহা হইলে আমি তোমায় যুদ্ধে সংহার করিব।

ভীষ্ম অনুনয় বিনয় দ্বারা গুরুকে শান্ত করিবার অনেক চেষ্টা করিলেন—চরণে নিপতিত হইয়া বলিলেন হে ভগবন্! আপনি গুরু হইয়া কি নিমিত্ত শিষ্যের সহিত যুদ্ধ ইচ্ছা করিতেছেন?

তথাপি পরশুরাম কিছুতেই বুঝিলেন না। তিনি বলিলেন

আমাকে যদি গুরু বলিয়াই মান্য কর, তবে আমার বাক্য লঙ্ঘন করিতেছ কেন? কিন্তু গুরুর আদেশেও ভীষ্ম মিথ্যাচরণ করিতে সম্মত হইলেন না। তিনি বলিলেন

হে গুরো! যদি আপনি নিতান্তই যুদ্ধ করিবেন, তবে আমি প্রস্তুত আছি। আপনি স্বয়ং আমাকে আহ্বান করিতেছেন; সুতরাং আপনি ব্রাহ্মণ এবং আমার গুরু হইলেও আমাতে কোন দোষ স্পর্শ করিবে না।

ভীষ্ম এইরূপ কহিলে পর পরশুরামের সহিত কুরুক্ষেত্রে তাঁহার বহুদিনব্যাপী তুমুল যুদ্ধ চলিতে লাগিল। মহাবল ভীষ্ম শ্রেষ্ঠ অস্ত্রবিদ আচার্যসকলের নিকট বংশাবলী

তাঁহাদের বিদ্যার সারাংশ শিক্ষা করিয়াছিলেন, সেই শিক্ষাপ্রভাবে তিনি বারবার জামদগ্ন্যকে রণক্ষেত্রে পরাজিত করিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ ও গুরু বোধে প্রাণনাশ করিলেন না। পরশুরাম শিষ্যের এরূপ যুদ্ধকৌশল ও ক্ষমাশীলতা সন্দর্শনে প্রীত হইয়া তাঁহার নিকট পরাজয় স্বীকারপূর্বক যুদ্ধে ক্ষান্ত হইলেন।

অনন্তর কাশিরাজ দুহিতা অম্বাকে আহ্বান করিয়া তিনি দীনভাবে বলিলেন বৎসে! আমি তোমাকে যে কথা দিয়াছিলাম, তাহা রক্ষা করিতে সবিশেষ যত্ন করিলাম; শ্রেষ্ঠ দিব্যাস্ত্র সকল প্রয়োগ করিলাম এবং সাধ্যমত বল ও কৌশল প্রদর্শন করিলাম; কিন্তু মহাবীর ভীষ্মকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হইলাম না। এক্ষণে তুমি অন্য কাহারও সাহায্যে মনস্কামনা পূর্ণ কর।

অন্বা বলিলেন-হে ভগবন! আপনি যখন ভীষ্মকে পরাস্ত করিতে সক্ষম হন নাই, তখন তিনি স্বয়ং দেবগণেরও অজেয়। আমি যাহাতে নিজেই তাঁহার বিনাশ সাধন করিতে পারি, সেই উপায় অবলম্বন করিব।

এই বলিয়া অম্বা ক্রোধ-পরিপূর্ণ হৃদয়ে ভীষ্মের বধোপায় প্রাপ্তিনিমিত্ত তপস্যা আরম্ভ করিলেন। বহুদিন অনাহারে অশেষ ক্লেশ সহ্য করিয়া অতি ঘোর তপস্যা সাধিত হইলে, ভগবান শূলপাণি প্রসন্ন হইলেন। রুদ্র স্বয়ং অন্বার নেত্রপথে উপস্থিত হইয়া বলিলেন—

ভদ্রে! তুমি অভিলষিত বর যাচ্ঞা কর।

অম্বা কহিলেন-হে মহাদেব! আমি ভীষ্মের বধসাধনের ক্ষমতা প্রাপ্ত হইবার

প্রার্থনা করি।

মহাদেব—তথাস্তু! বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন।

এই বর প্রাপ্ত হইয়া অম্বা এক চিতা প্রস্তুত করিয়া নিজ শরীর ভস্মসাৎ করিলেন। পরজন্মে তিনি দ্রুপদরাজের কন্যা শিখণ্ডিণী হইয়া জন্মগ্রহণ করেন, ও পরে এক দানবের বর প্রভাবে পুরুষত্ব প্রাপ্ত হইয়া ভীষ্মের বধসাধনে কৃতকার্য হন।

এদিকে বিচিত্রবীর্য পরমাসুন্দরী অম্বিকা ও অম্বালিকাকে লইয়া সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। সাত আট বৎসর নির্বিঘ্নে উত্তীর্ণ হইবার পর বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হইয়া তরুণাবস্থাতেই কালগ্রাসে পতিত হইলেন। মাতা সত্যবতী পুত্রশোকে অধীর হইয়া উঠিলেন। বিশেষত তাঁহার কোন পুত্রই সন্তান রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, ভীষ্মও ব্রহ্মচর্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ; কাজেই রাজবংশ রক্ষার উপায় ভাবিয়া সকলেই অস্থির হইয়া পড়িল।

অবশেষে ভীষ্মকে অত্যন্ত চিত্তাকূল দেখিয়া সত্যবর্তী একদিন তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন –

বৎস! এতদিন তোমার নিকট একটা বৃত্তান্ত গোপন রাখিয়াছিলাম, তাহা বলি শ্রবণ কর। তোমার পিতার সহিত আমার বিবাহ হইবার পূর্বে আমি যমুনা নদীতে পিতার তরণী বাহন করিতাম। পিতা ধর্মার্থী হইয়া বিনা শুল্কে যাত্রী পার করিতে আদেশ করিয়াছিলেন। একদিন আমি মহর্ষি পরাশরকে এইরূপে পার করিলে, তিনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমায় একটি পুত্র প্রদান করিয়াছিলেন এবং তৎকালে আমার অঙ্গে যে মৎস্যগন্ধ ছিল, তাহার পরিবর্তে তিনিই আমার দেহে এই রমণীয় সৌগন্ধ্য সঞ্চারিত করিয়া দেন।

মহর্ষিপ্রদত্ত এই পুত্র যমুনাদ্বীপে জন্মগ্রহণ করায় তাঁহার এক নাম দ্বৈপায়ন। অসিতবর্ণ প্রযুক্ত তাঁহাকে কৃষ্ণ বলিয়াও উল্লেখ করা হইয়া থাকে। পরে তোমার এই অসাধারণ ধীসম্পন্ন ভ্রাতা চতুর্বেদের বিভাগ করেন, তজ্জন্য তাঁহার আর এক নাম বেদব্যাস। আমার সহিত বিদায় লইবার কালে তিনি বলিয়াছিলেন—মাতঃ! সঙ্কটে পড়িলে আমাকে স্মরণ করিও অতএব উপস্থিত বিপদে তিনিই আমাদের সাহায্য করিবার উপযুক্ত পাত্র।

মাতার নিকট পরম গুণবান ভ্রাতার কথা শুনিয়া ভীষ্ম আনন্দে উৎফুল্ল হইলেন এবং অবিলম্বে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করিবার জন্য মাতাকে অনুরোধ করিলেন। সত্যবতী দ্বৈপায়নকে স্মরণ করিবামাত্র তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মাতার বিপদের কথা অবগত হইয়া পরলোকগত বিচিত্রবীর্যের পত্নীদ্বয়কে তিনি পুত্রদান করিতে সম্মত হইলেন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বলিলেন যে ভ্রাতৃবধূরা যদি তাঁহার উৎকট আকৃতি ও ভয়ানক বেশ সহ্য করিয়া প্রসন্নচিত্তে তাঁহাকে সেবা করিতে পারেন, তাহা হইলে অবিলম্বে তাঁহাদের পুত্র জন্মিবে।

সত্যবতী পুত্রের আশ্বাসবাক্য পাইয়া হৃষ্টমনে প্রথমে জ্যেষ্ঠা বধূ অম্বিকার নিকট উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে সমস্ত বৃত্তান্ত বলিয়া দেবর বেদব্যাসের যথোপযুক্ত সেবা করিতে আদেশ করিলেন। দেবরের আকৃতি ভীষ্ম বা অন্যান্য রাজপুরুষগণের ন্যায় কল্পনা করিয়া অম্বিকা আনন্দসহকারে তাঁহার সেবার আয়োজন করিলেন। কিন্তু যখন সহসা ব্যাসদেব ঘোর কৃষ্ণবর্ণ তপঃক্লিষ্ট শরীর ও জাকীর্ণ শীর্ণমুখশ্রী লইয়া উপস্থিত হইলেন, তখন অম্বিকা নিতান্ত চমকিত হইয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ফেলিলেন।

ইহাতে ব্যাসদেব কিছু রুষ্ট হইলেন; সুতরাং যদিও তিনি অম্বিকার পরিচর্যায় সন্তুষ্ট এবং মাতার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিলেন বলিয়া অম্বিকাকে পুত্র প্রদান করিলেন; কিন্তু সেই সঙ্গে বলিলেন যে সে জন্মান্ধ হইবে। যথাসময়ে অম্বিকার এই অন্ধ পুত্র জন্মগ্রহণ করিল এবং উহার নাম হইল ধৃতরাষ্ট্র।

পরে সত্যবতী কনিষ্ঠা বধূ অম্বালিকাকে অনুরূপ উপদেশ দিয়া বাসদেবের সেবায় নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু অম্বালিকাও সহসা দেবরের বিকট-মূর্তি দেখিয়া ভীতি সম্বরণ করিতে পারেন নাই—তাঁহার মুখ ক্ষণকালের জন্য পাণ্ডুবর্ণ হইয়া উঠিল। এই হেতু ইহাকেও ব্যাসদের সম্পূর্ণ প্রসন্নচিত্তে পুত্র প্রদান করিলেন না—বলিলেন সে পাণ্ডুবর্ণ হইবে। অম্বালিকার এই পুত্র যথাকাল জন্মগ্রহণ করিলে, উহার বর্ণ অনুসারে উহাকে পাণ্ডু নাম দেওয়া হইল।

কোন পুত্রই সর্বাঙ্গসুন্দর না হওয়ায় সত্যবতীর পূর্ণ মনস্তুষ্টি হইল না—তিনি পুনরায় জ্যেষ্ঠা বধূকে মহর্ষির নিকট পুত্রভিক্ষা করিতে বলিলেন, কিন্তু অম্বিকার তাহাতে কিছুতেই প্রবৃত্তি হইল না। তিনি এক দাসীকে নিজ বস্ত্র ও অলঙ্কারে ভূষিত করিয়া ব্যসদেবের নিকট প্রেরণ করিলেন। এই দাসীর বিনীত শুশ্রূষায় প্রীত হইয়া মহর্ষি ইহাকে বিদুরনামক এক পূর্ণাবয়ব পুত্র প্রদান করিয়া বলিলেন, সে পরম ধীসম্পন্ন ও ধার্মিকশ্রেষ্ঠ হইবে।

বিদুর ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর ভ্রাতার ন্যায় একত্র লালিতপালিত হইয়া রাজভবনে বাস করিতে লাগিলেন।

আরও পড়ুন:

মহাভারত [ Mahabharata ] – বিষয়সূচী

“মহাভারতের বংশাবলীর পরিচয় | মহাভারত”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন