সৌভরি মুনির উপাখ্যান – বিষ্ণুপুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

 সৌভরি মুনির উপাখ্যানঃ মান্ধাতার তিন পুত্র-পুরুকুৎস, অম্বরীষ ও মুচুকন্দ আর পঞ্চাশজন কন্যা, তারা সবাই রুপে গুণে অতুলনীয়।

তাপসের আর এক নাম সৌভরি, জলের ভেতরে ধ্যান করে হয়েছেন দিবা-বিভাবরী, অদ্ভুত সেই মুনি। বাইরের কোলাহল থেকে মুক্ত জলের ভিতর। কোনো বিঘ্ন নেই, তাই তিনি তপস্যার জন্য বেছে নিলেন, এমন নিরাপদ জায়গা।

দীর্ঘকাল সাধনা করতে করতে মহান যোগী হলেন তিনি। বহুদিন জলের তলায় থাকার জন্য গায়ে শ্যাওলা ভাসছে। বহুকাল পৃথিবীর মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা প্রভৃতির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই নেই, একটানা দীর্ঘ বারো বছর বসে আছেন জলের তলায়।

সৌভরি মুনির উপাখ্যান - বিষ্ণুপুরাণ - পৃথ্বীরাজ সেন

মুনি সৌভরি যেখানে বসে তপস্যা করতেন সেখানে থাকত একটা বিরাট মাছ, আর তার স্ত্রী। অনেক ছেলেপুলে, নাতি-নাতনীরও অভাব নেই, সুখে ভেসে বেড়ায়, কখন মুনির মাথায় গায়ে পিঠেও ঘুরে বেড়ায়। পুত্র, পৌত্র, দৌহিত্রাদি নিয়ে মীনবর, সুখেতে কাটায় জলের ভিতর।

সৌভরি মুনির উপাখ্যান – বিষ্ণুপুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

মুনিবর মাছের এমন সুখের সংসার দেখে মনে মনে ভাবতেন-সংসার সুখের গৃহ বুঝলাম এখন। মনে জাগল সংসারী হবার বাসনা। জল থেকে উঠে পড়লেন বিশাল জটা, গোঁফ, দাড়ি, গায়ে শ্যাওলা, ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে, চললেন মান্ধাতা রাজার কাছে।

মুনিকে দেখে রাজা তো অবাক। বসতে আসন দিলেন, পাদ্য-অর্ঘ্যে পূজা করলেন– ভক্তিভরে, অতঃপর জোড়হস্তে নিবেদন করলেন, আপনার আগমনের কারণ কী?

মুনি বললেন– আমি সংসারী হবো মনস্থ করে এখানে এসেছি। তোমার এক কন্যা আমায় দান করো, কুৎসের বংশে জন্ম তোমার। তোমার কাছ থেকে কেউ ভগ্ন মনোরথ হয়ে ফিরে যায় না। তাই তুমি আমার অভিলাষ পূর্ণ কর। পৃথিবীতে অনেক রাজা আছে। অনেকের বহু সুন্দরী কন্যাও আছে।

সৌভরি মুনির উপাখ্যান - বিষ্ণুপুরাণ - পৃথ্বীরাজ সেন

মুনির মুখে এমন কথা শুনে রাজা ভেবে পাচ্ছেন না কি বলবেন। জরাজীর্ণ দেহ তার। বিশাল জটাভার, শেওলাপূর্ণ দেহ, তাকে কে করবে? শাপভয়ে রাজা কিছু বললেন–না, কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন।

রাজার এমন ভাব দেখে সৌভরি মুনি তাকে বললেন– এত চিন্তাতুর তুমি কিসের জন্য? অনুচিত কি কিছু বলেছি? কন্যাদের একদিন তো বিয়ে দিতেই হবে। তাহলে আমায় এক কন্যা দান করতে আপত্তি কোথায়?

মুনির কথা শুনে রাজা শাপভয়ে বললেন, আপনি অপেক্ষা করুন।

রাজার দ্বিধাগ্রস্ত কথা শুনে মুনি ভাবলেন, আমাকে জরাগ্রস্ত দেখে রাজা কন্যা সম্প্রদানে অসম্মত বলে মনে হচ্ছে। রাজার যে পঞ্চাশজন কন্যা আছে অন্দরমহলে, তারা কেউই আমাকে মনোনীত করবে না, কাজেই আমি যে উপায়ে বিয়ে করতে পারি, সেই চেষ্টা করব।

তখন তিনি নৃপতিকে সম্বোধন করে বললেন– হে রাজন, আমার কিছু বক্তব্য আছে, শোনো। তোমার অন্তঃপুরে আমায় যাবার অনুমতি দাও।

তোমার কন্যাগণের মধ্যে যে কেউ আমাকে দেখে যদি পতিত্বে বরণ করতে চায়, তাহলে আমি তাকেই গ্রহণ করব। তা হলে কেন বৃথা সময় নষ্ট করছ? অগত্যা রাজা অনুমতি দিলেন।

রাজা মনে মনে ভাবছেন এখুনি কোনও বিপদ ঘটে যাবে। কোনও কন্যাই যখন মুনিকে মনোনীত করবে না, তখন তিনি নিশ্চয়ই অভিশাপ দেবেন।

এদিকে মুনি তপোবলে দিব্যরূপ ধারণ করলেন। তারপর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন, কন্যাগণকে সম্বোধন করে বললেন– হে রাজকন্যাগণ, আমি বিবাহে ইচ্ছুক হয়ে এখানে এসেছি।

তোমাদের মধ্যে যদি কেউ আমাকে পতিত্বে বরণ করতে চাও তো বল। তাকেই রাজা আমার হাতে তুলে দেবে।

মুনির কথা শুনে পঞ্চাশজন কন্যাই তার রূপে মুগ্ধ হয়ে বললো, আমি বিবাহ করবো। তাতে ভীষণ কলহের সৃষ্টি হল। প্রত্যেকে মুনির হাত চেপে ধরে নিজের দাবী জানাতে থাকল।

অন্তঃপুরের সকল কথা শুনে রাজা কি করবেন বুঝতে পারছেন না। অন্তঃপুরে এসে কন্যাদের এমন অবস্থা দেখে সকল কন্যাকেই মুনির হাতে সম্প্রদান করলেন।

মহানন্দে সৌভরি ঋষি ফিরে এলেন আশ্রমে। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে আহ্বান করে প্রত্যেকটি কন্যার জন্য একটি করে প্রাসাদ তৈরি করে দিলেন।

বিশাল সরোবরও তৈরি করে দিলেন। সেই সব জলাশয়ে পদ্ম, শালুক, আদি ফুল, হংসাদি জলচর পক্ষী কলতান করতে লাগল। প্রত্যেক জলাশয়ের পাশে ছিল সুন্দর সুন্দর উপবন যা স্বর্গের নন্দনকাননকেও হার মানায়।

বিশ্বকর্মা মুনিবরের আদেশে সব তৈরি করে দিলেন। ভোগ্য রাজকন্যাগণ প্রত্যেকেই এক একটি প্রাসাদে মুনিকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করছেন, জপ-তপ বিসর্জন দিয়ে সৌভরি মুনি পুরোপুরি এখন সংসারী।

সৌভরি মুনির উপাখ্যান - বিষ্ণুপুরাণ - পৃথ্বীরাজ সেন

দূত মারফত রাজা খবর পেলেন তাঁর কন্যারা সুখেই আছেন। কারুর কোনো অভিযোগ নেই। মুনিবর সকলকে মহাসুখেই রেখেছেন।

রাজা ভাবলেন মুনিবর কেমন করে সকল কন্যাকে সুখী করছেন একবার দেখে আসি। এই কথা ভেবে গেলেন মুনির আশ্রমে। সেখানে দেখলেন অপূর্ব প্রাসাদমালা ও উপবন।

রাজা প্রবেশ করলেন– একটি প্রাসাদে, দেখলেন এক কন্যা সুখেই বসে আছে। পিতার আগমনে রাজকন্যা আনন্দিত হৃদয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক রত্নখচিত সিংহাসন দিল বসতে। রাজা আসনে বসে কন্যাকে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার মনে কোনও অসুখ নেইতো? মনে হয় সুখেই আছ।

কন্যা বলল–ওই দেখুন পিতা দিব্য উপবন, ও নুতন প্রাসাদ, সুদর্শন পুষ্পে শোভিত পূর্ণ জলাশয়, ভূষণাদির কোনো চিহ্ন নেই, কোন কিছুর অভাব নেই।

সদাই মুনিবর আমার ওপর অনুরক্ত। আমার গৃহেই সব সময় থাকেন। অন্য কোনও ভগ্নীর কাছে যান না, তাই আমার ভগ্নীগণ সর্বদা দুঃখে কাল কাটাচ্ছে।

কন্যার মুখে এমন কথা শুনে রাজা অন্যান্য কন্যার ভবনে গেলেন। পূর্বের কন্যার মতো এইকন্যাও সুখে আছে, এবং যা চায় তাই পায় এবং আশ্চৰ্য্য, মুনিবর সদাই তার কাছে থাকে, অন্য ভগিনীদের কাছে যান না।

পরে সকল কন্যার কাছে এই একই বাক্য শুনতে পেলেন।

সকল কন্যার একই উত্তরে বিস্মিত হয়ে রাজা মুনিকে বললেন–আপনার তপোবন দেখলাম, এত ঐশ্বর্য জগতে কারও নেই।

তারপর রাজা মুনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে গেলেন।

এইভাবে মুনি পঞ্চাশজন কন্যাকে নিয়ে সুখেই সংসার পেতেছেন। ক্রমে দেড়শো পুত্র উৎপাদন করলেন। ক্রমে ক্রমে মুনির সংসারের প্রতি আসক্তি বাড়ল। স্নেহ ভীষণ বস্তু! মুনিবর ভাবেন কি মধুর কথা বলে শিশু পুত্রগণ। কেমন সুন্দর হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যাচ্ছে এইসব শিশুরা।

যখন যৌবনপ্রাপ্ত হবে, তখন এক একজন সুন্দরী কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেব, পুত্র, পৌত্রগণে আমি বেষ্টিত হব, সুখেতে কাল কাটাব। এইভাবেই যতই বংশ বৃদ্ধি হবে ততই বাড়বে সুখ।

একদিন মুনিবরের অন্তরে দিব্যজ্ঞান জন্মায়, তখন আক্ষেপ করে বলতে লাগলেন–হায়, এ আমি কি করলাম, ভয়ানক মোহে আমি মগ্ন হয়েছি। অনেক বছরের বাঞ্ছা হল না পূরণ।

এইভাবে বিষয় বাসনায় মানুষ সমাসক্ত হলে, কখনও পরম সিদ্ধিলাভ হবে না, হায় হায় আমি কি নির্বোধ। মাছেদের মধ্যে আমার বাস ছিল, সহসা এমন মোহ জন্মাল, পঞ্চাশজন কন্যার পাণিগ্রহণ করে আমি কত কুকর্ম করেছি, অনন্ত বাসনার উদয় হল তা কখনই পূরণ হবে না, ক্রমে অভাববোধ হবে, দুঃখ বাড়বে। অতএব সংসারী হতে গিয়ে নারী গ্রহণ করে দুঃখকেই আলিঙ্গন করলাম, ক্রমে ক্রমে মায়াজালে বদ্ধ হলাম।

পূর্বে কঠোর তপে মগ্ন ছিলাম। এইসব ঐশ্বৰ্য্য তপস্যায় অতি বিঘ্নকর অতএব এখন আমি বুছেছি –নিঃসঙ্গ যদ্যপি হয়না নরগণ মুক্তিলাভ কখন করবে, কুসঙ্গ দোষেতে নর অধঃপাতে যায়, অতএব এ কি উপায় হবে?

আমি পুনরায় তপস্যাই করব কঠোরভাবে। সেই শ্রীহরির আরাধনাই করব। আদি অন্তহীন সেই বিষ্ণু ভগবান, অতুল তেজস্বী তিনি বিশ্বের নিদান।

সৌভরি মুনির উপাখ্যান - বিষ্ণুপুরাণ - পৃথ্বীরাজ সেন

যতদিন সংসারে থাকবেন, বাসনার জালে আরও জড়িয়ে পড়বেন। তাই সঙ্কল্প মাত্রেই বেরিয়ে পড়লেন সকল ঐশ্বৰ্য্য ত্যাগ করে।

কিন্তু এত সখ করে যাদের বিয়ে করে নিয়ে এলেন তারা যাবে কোথায়? তখন তারাও স্বামীর সঙ্গে বিবাগী হয়ে বেরিয়ে নির্জন তপোবনে।

উপস্থিত হয়ে যাবতীয় পাপমোচন করে আকুল প্রার্থনায় শ্রীবিষ্ণুর চরণে নিজেদের ধ্যান-জ্ঞান, পাপ-পুণ্য সকলই দিল অঞ্জলি।

আরও পড়ুনঃ

বেতাল-ভৈরবের সিদ্ধিলাভ – কালিকা পুরাণ

ত্রিপুরার মন্ত্র রহস্য – কালিকা পুরাণ

অষ্টবিধ যোনিমুদ্রা ও মন্ত্ররহস্য – কালিকা পুরাণ

মাতৃকা-ন্যাস – কালিকা পুরাণ

কামাখ্যা-কবচ – কালিকা পুরাণ

বিষ্ণুপুরাণ

মন্তব্য করুন