স্বর্গ খণ্ড – পদ্মপুরাণ

পদ্মপুরাণ
স্বর্গ খণ্ড (পদ্মপুরাণ)
প্রথম অধ্যায়

সূত-শৌনক-সংবাদ, সৃষ্টির পূর্ব্বাবস্থা ও ব্রহ্মাণ্ডোৎপত্তিপ্রক্রিয়া বর্ণনঃ একদা হিমাচলবাসী জ্বলদগ্নিকল্প বেদপারগ ত্রিকালজ্ঞ মহাত্মা মুনিগণ এবং মহেন্দ্রাচল, বিন্ধ্যশৈল, অর্ব্বুদারণ্য, পুষ্করারণ্য, জম্বুমার্গ, কুরুক্ষেত্র প্রভৃতি নানাপুণ্যাশ্রমবাসী অমলাত্মা মুনিগণ শৌনক ঋষির দর্শনাভিলাষে সোৎসুকচিত্তে শিষ্যগণ সহ নৈমিষারণ্যে সমাগত হইলে।

তাঁহারা শৌনক ঋষির যথাযোগ্য পূজা করিলে শৌনকও তাঁহাদিগকে যথাযোগ্য পূজা করিয়া বৃষী প্রভৃতি নানাবিধ বিচিত্র আসন প্রদান করিলেন। তপোধন মুনিগণ সেই সকল আসনে আসীন হইয়া পরস্পর কৃষ্ণ বিষয়ক পবিত্র কথোপকথন করিতে লাগিলেন।

স্বর্গ খণ্ড - পদ্মপুরাণ

সেই ভ্যবিতাত্মা মুনিগণের কথাবসারে মহাদ্যুতি মহাতেজা সূত আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ব্যাসশিষ্য পুরাণজ্ঞ রোমহর্ষণ নামক সেই সূত সেই মুনিগণকে যথাযোগ্য প্রণাম করিলেন এবং সেই মুনিগণ কর্ত্তৃক যোগ্যরূপে সৎকৃত হইলেন।

স্বর্গ খণ্ড – পদ্মপুরাণ

তিনি উপবিষ্ট হইলে শৌনকাদি মহাভাগ তপোধন মহর্ষিগণ সেই ব্যাসশিষ্য রোমহ সূতকে প্রশ্ন করিলেন। ১-১০

ঋষিগণ বলিলেন,–হে সুব্রত মহাবুদ্ধে পৌরাণিক রোমহর্ষণ! আমরা পূর্ব্বে তোমার নিকট মহাপুণ্যা পৌরিণিকী কথা শুনিয়াছি। সম্প্রতি আমাদের অবকাশ আছে, এ নিমিত্ত হরিকথা শুনিবার জন্য উৎসুক হইয়াছি।

মানবগণের তাহাই পরম ধর্ম্ম, যাহা দ্বারা অধোক্ষজ হরির প্রতি ভক্তি জন্মে। অতএব তুমি পুনরায় হরিবার্ত্তাসমাম্বিত পুরাণ কীর্ত্তন কর। হে সূত! হরিকথা ব্যতীত অন্যকথা শ্মশান সদৃশ। হরিই স্বয়ং তীর্থরূপে অবস্থান করেন। ইহা আমরা শুনিয়াছি। তুমি পুণ্যপ্রদ তীর্থ সকলের নাম কীর্ত্তন কর। এই চরাচর জগৎ কোথা হইতে উৎপন্ন হইয়াছে?

কাহা দ্বারা পরিপালিত হয়? কোথায়ই বা লয় প্রাপ্ত হয়? কোন্‌ কোন্‌ ক্ষেত্র পুণ্যজনক? কোন্‌ কোন্‌ পর্ব্বত পূজ্য? কোন্‌ কোন্‌ নদী মানবগণের শুভ পুণ্যপ্রদ এবং পাপনাশক? হে মহাভাগ! এই সকল বৃত্তান্ত যথাক্রমে কীর্ত্তন কর। ১১-১৭

স্বর্গ খণ্ড - পদ্মপুরাণ

সূত বলিলেন,–হে দ্বিজোত্তমগণ! আমি অদ্য স্বর্গ (স্বর্গখণ্ড) বলিব; যাহা দ্বারা সনাতন পরমাত্মা ভগবানকে জানিতে পারা যায়। হে দ্বিজোত্তমগণ! সৃষ্টি-প্রলয়ের পূর্ব্বে কিছুই ছিল না। পরে ব্রহ্ম নামক সর্ব্বাকারক এক জ্যোতি হইল।

উহা নিত্য, নিরঞ্জন, শান্ত, নির্গুণ, নিত্যনির্ম্মল, আনন্দনিকেতন, স্বচ্ছ, সর্ব্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ, অনন্ত, অজ, অব্যয়, অবিনাশী, সদাস্বচ্ছ, অচ্যুত, ব্যাপক ও মহৎ। মুমূক্ষুগণ উহাই আকাঙ্খা করিয়া থাকেন। সৃষ্টিকাল উপস্থিত হইলে সেই ব্রহ্ম নিজকে নিজে জ্ঞানস্বরূপ এবং বিকারগর্ভ জানিয়া সৃষ্টি করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সেই ব্রহ্ম হইতে প্রধান (প্রকৃতি) উদ্ভূতা হইলেন।

তিনি মহত্তত্ত্ব সাত্বিক, রাজস, তামস এই তিন প্রকার। উহা প্রধান তত্ত্বের দ্বারা ত্বক্‌ দ্বারা বীজের ন্যায় আবৃত। মহত্তত্ত্ব হইতে বৈকারিক, তৈজস, ভূতাদি–তামস, এইতিন প্রকার অহঙ্কার উৎপন্ন হয়। মহত্তত্ত্ব যেমন প্রধান দ্বারা আবৃত, তদ্রুপ অহঙ্কারতত্ত্বো মহত্তত্ত্ব দ্বারা আবৃত।

উক্তি ভূতাদি অহঙ্কার বিকৃত হইয়া শব্দতন্মাত্র উৎপাদন করিল; উহা হইতে শব্দগুণ আকাশ উৎপন্ন হইল। উক্ত শব্দতন্মাত্র হইতে স্পর্শতন্মাত্র জন্মিল, উহা হইতে স্পর্শগুণ বলবান্‌ বায়ু উদ্ভূত হইল।

উক্ত শব্দ তন্মাত্র আকাশ স্পর্শতন্মাত্রকে আবরণ করিল। অনন্তর বায়ু বিকৃত হইয়া রূপতন্মাত্র উৎপাদন করিল। উহা হইতে রূপগুণ জ্যোতিঃ উৎপন্ন হইল। স্পর্শ তন্মাত্র বায়ু উক্ত রূপতন্মাত্রকে আবরণ করিল। উক্তি জ্যোতিঃ বিকৃত হইয়া রসতন্মাত্র সৃষ্টি করিল।

উহা হইতে রসগুণ জল উৎপন্ন হইল। উক্তি জল বিকৃত হইয়া গন্ধতন্মাত্র সৃষ্টি করিল। উহা হইতে সর্ব্বভূতাপেক্ষা অধিকগুণবিশিষ্টা এই পৃথিবী জন্মিল। সঙ্গতবশতঃ উৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া উহার গুন গন্ধ।

সেই ভূতে (সূক্ষ্মরূপে) কিঞ্চিত কিঞ্চিত আছে, এ নিমিত্র তন্মাত্র নাম হইল। তন্মাত্র সকল অবিশেষ; উহা হইতে উৎপন্ন বিশেষ সকল পরে বলিতেছি। হে তপোধন মুনিবর্য্যগণ! তামস অহঙ্কার হইতে উৎপন্ন এই ভূততন্মাত্র-সর্গ সংক্ষেপে কীর্ত্তিত হইল। ১৮-৩

তৈজস অহঙ্কার হইতে দশ ইন্দ্রিয় এবং বৈকারিক অহঙ্কার হইতে (ইন্দ্রিয়াদিত্ব) ইন্দ্রাদি দশ দেবতা (উভয়াত্মক) মন উৎপন্ন হইল। ইহা তত্ত্বজ্ঞগণ কীর্ত্তন করিয়াছেন। হে কূলপাবনগণ! (এক্ষণে) পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় এবং তাহাদের কর্ম বলিতেছি।

স্বর্গ খণ্ড - পদ্মপুরাণ

শ্রোত্র, ত্বক্‌, চক্ষু, জিহ্বা, নাসিক, এই পাঁচটি দ্বারা শব্দাদি (পঞ্চ বিষয়ের) জ্ঞান সিদ্ধ হয়। পায়ু, উপস্থ, হস্ত, পদ, বাক্য, এই পাঁচটী দ্বারা বিসর্গ (মলত্যাগ), আনন্দ, সিদ্ধি (আদন), গতি, উক্তি–এই পাঁচ কর্ম্ম সিদ্ধ হয়।

আকাশ, বায়ু, তেজ, জল, পৃথিবী, ইহারা উত্তরোত্তর শব্দাদি গুণে সংযুক্ত। বিভিন্নগুণযুক্ত ও পৃথক্‌ ভাবে অবস্থিত উক্ত ভূত সকল পরস্পর মিলিত না হইয়া কিছুই সৃষ্টি করিতে সক্ষম হয়িল না। পরে পরস্পর আশ্র-আশ্রিত ভাবে ক্রমে মিলিত হইয়া একীভূত হইল; কিন্তু তাহাদের পরস্পরের কিঞ্চিত কিঞ্চিত বৈলক্ষণ্যও রহিল।

পুরুষের অধিষ্ঠান বশতঃ ও প্রধানের অনুগ্রহে উক্ত মহদাদি (অবিশেষ সূক্ষ্ম ভূত) বিশেষ (স্থূল ভূত) দ্বারা একটী অণ্ড উৎপাদন করিল। হে মহাপ্রাজ্ঞগণ! উক্ত অণ্ড ক্রমে ঐ সকল ভূত হইতে বৃদ্ধি লাভ করত জলবুদ্‌বুদ্‌বৎ জলে ভাসিতে লাগিল। উক্ত অণ্ডই প্রাকৃত ব্রহ্মরূপধারী বিষ্ণুর অনুত্তম স্থান।

অব্যক্ত স্বরূপ বিশ্বেশ্বর প্রভু সেই বিষ্ণু স্বয়ংই ব্রহ্মা রূপে উহাতে অবস্থিত হইলেন। উক্ত মহাত্মা হইতে স্বেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ, মহীধর, গর্ভোদক, সমুদ্র, এই সকল উৎপন্ন হইল। উক্ত অণ্ডমধ্যে অদ্রি, দ্বীপ, সমুদ্র, জ্যোতিঃ দেবতা, অসুর, ও মানুষাদি সহিত সমস্ত লোক উদ্ভূত হইল।

শ্রীকেশবের ইচ্ছায় অনাদি-নিধন বিষ্ণুর নাভি হইতে যে একটি পদ্ম জন্মিল, উহাই একটী স্বর্ণ-অণ্ডস্বরূপ। উহাতে পরম দেব হরি স্বয়ংই ব্রহ্মা রূপে অবস্থান করত জগৎসৃষ্টি করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি এই জগৎ (কল্পিত) যুগে যুগে সৃষ্টি করেন এবং কল্পে কল্পে নরসিংহাদি রূপে বা রুদ্ররূপে সংহার করিয়া থাকেন।

স্বর্গ খণ্ড - পদ্মপুরাণ

তিনি ব্রহ্মা রূপে এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করত পালনেচ্ছায় রামাদিরূপে ধারণপূর্ব্বক পালন করেন এবং সংহার কামনায় রুদ্ররূপ হইয়া থাকেন। ৩৭-৫৩

প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত ।১।

আরও পড়ুনঃ

শিবের প্রসন্নতা – কালিকা পুরাণ

মদন-ভস্ম – কালিকা পুরাণ

পাৰ্বতীর জন্ম – কালিকা পুরাণ

নরকের পুত্রোৎপত্তি – কালিকা পুরাণ

নরকের চরিত্র – কালিকা পুরাণ

পদ্মপুরাণ

মন্তব্য করুন