শিব মহাপুরাণ কেবল একটি শাস্ত্র নয়, এটি পরমেশ্বরের স্বরূপ সন্ধানের এক অবিরাম যাত্রা। এই পুরাণের প্রথম খণ্ড অর্থাৎ ‘বিদ্যেশ্বর সংহিতা’ বা মতভেদে ‘জ্ঞানসংহিতা’-র প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই নৈমিষারণ্যের পবিত্র যজ্ঞক্ষেত্রে সমবেত ঋষিদের ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।
Table of Contents
মঙ্গলাচরণ ও পরম বন্দনা
পুরাণ পাঠের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, যে কোনো আধ্যাত্মিক আলোচনার শুরুতে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করা হয়।
- পঞ্চদেবতা ও ব্যাস বন্দনা: নারায়ণ, নরোত্তম নর, জ্ঞানদাত্রী সরস্বতী এবং পুরাণ-সংকলক মহর্ষি বেদব্যাসকে প্রণাম জানিয়ে ‘জয়’ ধ্বনি (পুরাণ পাঠের সংকেত) উচ্চারণ করা হয়।
- নৃসিংহদেব ও শিব-পরিবার: সৃষ্টির আদি পিতা-মাতা হর-পার্বতী এবং বিঘ্নবিনাশক গণপতিকে প্রণাম করার পাশাপাশি, যাঁর হৃদয়ে পরম জ্ঞান বিদ্যমান—সেই ভগবান নৃসিংহদেবের ভজনা করা হয়।
নৈমিষারণ্যের সভা ও সূত মুনির প্রতি আরজি
একদা পবিত্র নৈমিষারণ্য তীর্থে শৌনকাদি মুনিগণ এক মহতী যজ্ঞে মিলিত হন। সেখানে তাঁরা ব্যাসদেবের সুযোগ্য শিষ্য মহামুনি সূত-কে দর্শন করেন। সূত মুনি গুরুর কৃপায় ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান—অর্থাৎ ত্রিকালদর্শী হয়ে উঠেছেন।
ঋষিগণ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাঁকে বলেন—
“হে মহাভাগ সূত! আপনার মুখ-নিঃসৃত জ্ঞানামৃত পান করে আমাদের তৃষ্ণা মিটছে না। আপনার গুরু মহর্ষি ব্যাসদেবের প্রসাদে আপনি সর্বজ্ঞ। আমরা পুনরায় সেই পরমেশ্বরের কথা শুনতে ইচ্ছুক।”
ঋষিগণের গূঢ় জিজ্ঞাসাসমূহ
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ সূত মুনিকে এমন কিছু প্রশ্ন করেন, যা সমগ্র শিব পুরাণের ভিত্তি তৈরি করে:
- সগুণ ও নির্গুণ তত্ত্ব: যিনি আদি ও অন্তহীন নিরাকার বা নির্গুণ মহেশ্বর, তিনি কেন এবং কীভাবে জগতে ‘সগুণ’ (আকারধারী) রূপ ধারণ করেন?
- সৃষ্টি-স্থিতি-লয়: জগত সৃষ্টির পূর্বে শিব কোথায় ছিলেন? জগত যখন বিদ্যমান থাকে, তখন তাঁর ভূমিকা কী? আর মহাপ্রলয়ের পরে তিনি কোন অবস্থায় বিরাজ করেন?
- প্রসন্নতা ও আশীর্বাদ: পরম করুণাময় শঙ্কর কীভাবে সন্তুষ্ট হন? তাঁকে সন্তুষ্ট করলে ভক্ত কী ফল লাভ করেন? ভগবান যে ‘আশুতোষ’ (খুব দ্রুত প্রসন্ন হন)—এই কথাটির সত্যতা কতটুকু?
জ্ঞানসংহিতার বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য
শিব পুরাণের এই অংশটি ‘জ্ঞানসংহিতা’ নামে পরিচিত কারণ এখানে ভক্তির চেয়েও জ্ঞানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সূত মুনি ঋষিদের এই জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর এমনভাবে দিয়েছেন যা কেবল ধর্মীয় কাহিনী নয়, বরং উন্নত দর্শনের পরিচয় দেয়।
সারাংশ: প্রথম অধ্যায় (১-১২ শ্লোক)
এই অধ্যায়ে প্রমাণিত হয় যে, মহাদেব শিব কেবল সংহারকর্তা নন, তিনি পরম দয়ালু এবং নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের আদি উৎস। ঋষিগণের এই ব্যাকুলতাই আমাদের জন্য পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে শিবতত্ত্বের রহস্য উন্মোচন করেছে।
