পাঁচশ বছর আগে, যখন সমাজে বিভেদ, অসাম্য ও অন্যায়ের অন্ধকার চিরকাল বিরাজ করত, তখন নবদ্বীপে আবির্ভূত হলেন শ্রীগৌরাঙ্গ, যিনি ছিলেন হিন্দু সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর প্রভু নিত্যানন্দ ও ভক্ত হরিদাসের মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে হরিনাম—কৃষ্ণনামের মাধ্যমে মানুষের প্রাণ উদ্ধার ও হৃদয় পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
এই উপাখ্যানটি আমাদের সামনে তুলে ধরে কিভাবে নিত্যানন্দ ও হরিদাস, বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতেও পাপী ও অসৎ জীবনযাপনকারীদের উদ্ধার করতে কাজ করেছেন। জগাই-মাধাইয়ের মতো দুর্বৃত্তদের মধ্যেও হরিনামের আলো পৌঁছে, তাদের অন্তরে প্রেম ও ভক্তির বীজ বোনা হয়। এই জীবোদ্ধারের কাহিনী আজও আমাদের শেখায়—পাপকে ঘৃণা করব, কিন্তু পাপীকে নয়; করুণা ও প্রেমের মাধ্যমে মানুষের আত্মা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
জীবোদ্ধার

পাঁচশ বছর আগের কথা। সে সময়ে জাতিভেদ, বর্ণভেদ আমাদের সমাজে বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছিল। মানুষে মানুষে বৈষম্যে সমাজ ও জীবনে দুঃখ-গ্লানি দেখা দিয়েছিল। অর্থের অহঙ্কার, ক্ষমতার দম্ভ অনেক মানুষকে অনেক নিচে নামিয়ে ফেলেছিল। ধর্মের নামে অনাচার এবং কুসংস্কারে দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে নবদ্বীপে আবির্ভূত হলেন শ্রীগৌরাঙ্গ।
শ্রীগৌরাঙ্গই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তিনি বিভেদ- বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও সহজ করে দিলেন। শ্রীনিত্যানন্দ ছিলেন এ সকল কাজে শ্রীগৌরাঙ্গের অন্যতম প্রধান সহচর। একদিন শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভু ও ভক্ত হরিদাসকে ডেকে বললেন,
– জীবের উদ্ধারের জন্য তোমরা ঘরে ঘরে গিয়ে হরিনাম প্রচার কর। কৃষ্ণ নামকীর্তন কর।
‘প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া এই কর ভিক্ষা।
কৃষ্ণ ভজ, কৃষ্ণ বল, কর কৃষ্ণ শিক্ষা।’
শ্রীচৈতন্যের উপদেশ অনুসারে নিত্যানন্দ ও হরিদাস নবদ্বীপের পাড়ায়-পাড়ায় কৃষ্ণ নাম গান করেন। সকলকে কৃষ্ণ নামের কথা বলেন, কৃষ্ণ ভজনের পরামর্শ দেন। কেউ আনন্দিত হয়ে নামপ্রচারে উৎসাহ দেয়, আবার কেউ পাগল বলে তাদের তাড়া করে । সে সময় নবদ্বীপে বাস করত দু-ভাই। জগাই আর মাধাই। তারা ছিল স্থানীয় কাজীর কর্মচারী।
শাসকদের সাথে সংযুক্ত ছিল বলে জগাই-মাধাইয়ের ক্ষমতার প্রচণ্ড অহংকার ছিল। ক্ষমতাশালী বলে কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না—এই ছিল তাদের ধারণা। তারা মদ খেয়ে নেশা করত। মানুষের ওপর নানা রকম অত্যাচার করে বেড়াত। যদি কেউ তাদের বাধা দিত, তাহলে ওরা তাদের মার-ধর করত। এমনকি বাড়ি-ঘর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিত। তাদের অত্যাচার আর সন্ত্রাসে নবদ্বীপের সাধারণ লোকেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

এই জগাই-মাধাইয়ের কথা শুনে নিত্যানন্দের প্রাণ কেঁদে উঠল। তিনি হরিদাসকে বললেন,
– হরিনাম দিয়ে, মমতা দিয়ে এদের উদ্ধার করতে হবে।
– হরিদাস নিত্যানন্দের কথা সমর্থন করলেন। জগাই-মাধাইয়ের কাছাকাছি গিয়ে তাঁরা কীর্তন শুরু করলেন-
“বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কহ কৃষ্ণ নাম।”
– কে, রে, আমাদের কানের কাছে হরিনাম করে? কৃষ্ণনাম করে ? জগাই জিজ্ঞেস করল মাধাইকে ।
মাধাই বলল—
কি জানি?
প্রভু নিত্যানন্দ ও হরিদাস তখনও গভীর ভাবের আবেগে গেয়ে চলেছেন
‘বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কহ কৃষ্ণ নাম।’
এ কথা শোনামাত্র জগাই-মাধাই দুভাই ক্ষেপে গিয়ে নিত্যানন্দ ও হরিদাসকে তাড়া করল নিত্যানন্দ আর হরিদাস তখন দৌড়ে গেলেন শ্রীগৌরাঙ্গের আবাসস্থলে। জগাই-মাধাই সেদিনের মত ফিরে গেল।
পাঁচশ বছর আগের কথা। হিন্দু সমাজের সংস্কারকরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীগৌরাঙ্গ (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন প্রভু নিত্যানন্দ। শ্রীগৌরাঙ্গের উপদেশ অনুসারে নিত্যানন্দ প্রভু ও ভক্ত হরিদাস ঘরে ঘরে গিয়ে হরিনাম প্রচার করতে থাকেন। নবদ্বীপের দুই রাজকর্মচারী জগাই-মাধাই। তারা ছিল অত্যাচারী।
এই দুই পাপী জীবকে উদ্ধারের সংকল্প নিয়ে নিত্যানন্দ আর হরিদাস তাদের হরিনাম—কৃষ্ণনাম শোনাতে থাকেন। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঁদের তাড়া করে। তখন নিত্যানন্দ আর হরিদাস দৌড়ে আত্নরক্ষা করেন।

প্রভু নিত্যানন্দ আর হরিদাম গিয়ে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে সব বললেন কৃষ্ণ ভক্তদের এ দুর্দশার কথা শুনে খুবই কষ্ট পেলেন শ্রীগৌরাঙ্গ ।
তিনি বললেন,
– দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন। সুতরাং যারা দুষ্ট, তাঁদের শাস্তি দিতে হবে। প্রভু নিত্যানন্দ বললেন
– না প্রভু, শাস্তি নয়। ওরা পাপী জীব। ওদের উদ্ধার করতে হবে। এরপর একদিন সন্ধ্যার পর নিত্যানন্দ হরিনাম করতে করতে ফিরছেন। শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর গৃহের দিকে ।
জগাই-মাধাই পথে তাঁকে ধরে ফেলল। নিত্যানন্দের মুখে হরিনাম শুনে জগাই-মাধাই খুব ক্ষেপে গিয়েছিল। তারা নিত্যানন্দ প্রভুকে কটু কথা বলতে লাগল। কিন্তু জীবের এই ধর্মবিমুখতা দেখে, নির্দয় আচরণ দেখে, নিত্যানন্দ প্রভু চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি তাদের ধর্মের পথে চলতে বললেন। আবারও তাদের হরিনাম করতে বললেন-
‘মেরেছিস, বেশ করেছিস, তবু মুখে হরি বল, ভাই ।’
নিত্যানন্দ প্রভু হরিনাম বলতে বলায় মাধাই আরও রেগে গেল। সে নিত্যানন্দ প্রভুকে কলসির কানা দিয়ে আঘাত করল। কপাল কেটে ক্ষত স্থান থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। তবু তিনি জগাই-মাধাইকে হরিনাম করতে বললেন। তখন মাধাই আবার নিত্যানন্দ প্রভুকে মারতে উদ্যত হল। তখন জগাই তাকে বাধা দিয়ে বলল-
আঃ মাধাই, করছিস কি? হাজার হলেও সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীকে কি মারতে আছে? তুই বড় নিষ্ঠুর রে!
এদিকে শ্রীগৌরাঙ্গ এ সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এলেন। সঙ্গে এলেন তার কয়েকজন শিষ্য। নিত্যানন্দের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে তিনি মাধাইয়ের ওপর খুব ক্রুদ্ধ হলেন। নিত্যানন্দ তাঁকে থামালেন। তিনি বললেন—
আমরা পাপকে ঘৃণা করব, পাপীকে নয়। পাপী-তাপীদের উদ্ধার করাই যে আমাদের ব্রত, প্রভু। আমার কপালে সামান্য আঘাত লেগেছে, ও নিয়ে তুমি কোন চিন্তা করো না। তাছাড়া জগাই আমাকে মারেনি। ও বরং মাধাইকে থামিয়েছে। শ্রীগৌরাঙ্গ বললেন,
জগাইকে আমি ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু মাধাই তো নিত্যানন্দের কাছে অপরাধী। আমার ভক্তকে যারা কষ্ট দেয়, আমি তাদের ক্ষমা করতে পারি না।

তখন নিত্যানন্দ তাঁকে বললেন,
– প্রভু, দুষ্ট জীব বধ করলে তুমি উদ্ধার করবে কাকে? আমি মাধাইকে ক্ষমা করলাম। আরও বলছি, আমি যদি কোন জন্মে কোন সৎকর্ম করে থাকি, তার পুণ্যফল আমি মাধাইকে দিলাম । তুমি অনুতপ্ত মাধাইকে চরণে স্থান দাও । প্রেম ও করুণার আবেগে গদগদ ও মধুর নিত্যানন্দ প্রভুর কণ্ঠস্বর। তিনি মাধাইকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুও জগাইকে আলিঙ্গন করলেন।
অপরাধী জগাই-মাধাই শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কৃপা পেয়ে নতুন মানুষ হয়ে গেলেন । প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করে ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ বলে নাম জপ করেন। কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলার সময় ভক্তির আবেগে তাঁদের চোখ থেকে ঝরে পড়ে অশ্রুধারা। সাধক হয়ে গেলেন জগাই-মাধাই।
নিত্যানন্দ প্রভুর জীবোদ্ধারের এই উপাখ্যান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
এ উপাখ্যান থেকে আমরা শিখি : পাপকে ঘৃণা করব, পাপীকে নয়। আমরা জানতে পারি, নিজেদের জীবন বিপন্ন করেও মহাপুরুষেরা পাপী-তাপী জীবদের উদ্ধার করেন।
হরিনাম করতে বলায় মাধাই আবার নিত্যানন্দ প্রভুকে মারতে উদ্যত হল। জগাই তাকে থামাল। এ-কথা শুনে শ্রীগৌরাঙ্গ শিষ্যগণসহ মহাপ্রভু ছুটে এলেন। নিত্যানন্দকে রক্তাক্ত দেখে তিনি মাধাইয়ের ওপর খুব রেগে গেলেন। নিত্যানন্দ তাঁকে থামালেন। তিনি বললেন যে শ্রীগৌরাঙ্গ যদি দুষ্ট জীবদের বধ করেন, তা হলে উদ্ধার করবেন কাকে।
তিনি মাধাইকে ক্ষমা করে দিলেন। অপরাধী জগাই-মাধাই শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কৃপা পেয়ে সাধকে পরিণত হল। এ উপাখ্যান থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, পাপকে ঘৃণা করব, পাপীকে নয় এবং মহাপুরুষেরা বিপন্ন হয়েও পাপী-তাপী জীবদের উদ্ধার করেন।
