হিন্দুধর্মের আঠারোটি মহাপুরাণের মধ্যে পদ্মপুরাণ (Padma Purana) আয়তন এবং বিষয়ের বৈচিত্র্যে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের প্রধান আকর গ্রন্থ হলেও এতে শৈব ও শাক্ত দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
Table of Contents
পদ্ম পুরাণ
নামকরণ ও প্রেক্ষাপট
পুরাণের নামকরণ হয়েছে সেই ‘পদ্ম’ থেকে, যা সৃষ্টির শুরুতে ভগবান বিষ্ণুর নাভি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং যার ওপর আসীন হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন।
- শ্লোক সংখ্যা: প্রাচীন বর্ণনা অনুযায়ী এর শ্লোকসংখ্যা ৫৫,০০০। তবে বর্তমানে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলিতে প্রায় ৫০,০০০ শ্লোক পাওয়া যায়, যা একে মহাভারতের পরেই অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থে পরিণত করেছে।
- ধর্মীয় অবস্থান: পদ্মপুরাণকে ‘সাত্ত্বিক’ পুরাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর প্রধান উপজীব্য বিষয় ভগবান বিষ্ণুর মাহাত্ম্য হলেও শিব ও শক্তির উপাখ্যানগুলো এখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে।
বিশ্বকোষতুল্য বিষয়বস্তু
পদ্মপুরাণকে প্রাচীন ভারতের একটি ‘লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া’ বা বিশ্বকোষ বলা যেতে পারে। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো হলো:
- ভূগোল ও তীর্থ: ভারতের নদনদী, পর্বত এবং অসংখ্য মন্দিরের নিখুঁত বিবরণ। বিশেষ করে রাজস্থানের পুষ্করে অবস্থিত বিশ্বের একমাত্র প্রধান ব্রহ্মা মন্দিরের মাহাত্ম্য এই পুরাণের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
- রাজবংশ ও ইতিহাস: সূর্যবংশ ও চন্দ্রবংশের রাজাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও বংশলতিকা।
- ঋতু ও প্রকৃতি: বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক।
পদ্মপুরাণের প্রধান খণ্ডসমূহ
পদ্মপুরাণ মূলত পাঁচটি (মতভেদে ছয়টি) বড় খণ্ডে বা ভাগে বিভক্ত। আপনার সংকলনের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো হলো:
| খণ্ডের নাম | মূল আলোচনার বিষয় |
| সৃষ্টি খণ্ড | বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি এবং পুষ্কর তীর্থের মাহাত্ম্য। |
| পৃথিবী বা ভূমির ভৌগোলিক বর্ণনা এবং বিভিন্ন রাজাদের উপাখ্যান। | |
| বিশ্বসৃষ্টির বর্ণনা, বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং দেবতাদের মাহাত্ম্য। | |
| পাতাল খণ্ড | শ্রীরামচন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞ, রাবণ বধ এবং রামরাজ্যের বর্ণনা। |
| উত্তরা খণ্ড | ভক্তিযোগের চরম পরাকাষ্ঠা এবং পরমপদ লাভের উপায়। |
কেন পদ্মপুরাণ অনন্য?
এই পুরাণে ‘ভাগবত মাহাত্ম্য’ এবং ‘একাদশী মাহাত্ম্য’ অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আচার-আচরণ, শ্রাদ্ধ বিধি এবং দানকর্মের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। নৈতিক জীবন যাপনের মাধ্যমে কীভাবে মোক্ষ লাভ করা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন এই পুরাণে পাওয়া যায়।

পদ্মপুরাণ কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী সংকলন নয়, বরং এটি আত্মিক শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলার এক অমর দর্শন। পৃথ্বীরাজ সেনের সহজবোধ্য লেখনীতে এই সুবিশাল পুরাণের নির্যাস সাধারণ পাঠকদের জন্য অত্যন্ত সহজলভ্য হয়েছে।
