ব্রহ্ম পুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

হিন্দুধর্মের আঠারোটি মহাপুরাণের তালিকায় ব্রহ্মপুরাণ (Brahma Purana) অগ্রগণ্য। এই পুরাণকে সকল সংকলনে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে বলে এর অপর নাম ‘আদিপুরাণ’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং প্রাচীন ভারতের ভূগোল, রাজবংশ এবং সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল।

ব্রহ্মপুরাণের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

ব্রহ্মপুরাণকে এর বিষয়বস্তু এবং দর্শন অনুযায়ী বিভিন্ন নামে ও শ্রেণিতে অভিহিত করা হয়:

  • আদিপুরাণ: পুরাণ সাহিত্যের সূচনা এই গ্রন্থ দিয়ে বলে একে আদিপুরাণ বলা হয়।
  • সৌরপুরাণ: এই পুরাণের একটি বিশাল অংশ জুড়ে সূর্যদেবের স্তুতি এবং কোনার্কের সূর্য মন্দিরের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, তাই একে সৌরপুরাণও বলা হয়।
  • রাজসিক পুরাণ: পদ্মপুরাণের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ব্রহ্মপুরাণকে ‘রাজসিক’ গুণের অন্তর্গত করা হয়েছে এবং একে সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মা-র সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
  • ভৌগোলিক গুরুত্ব: এই পুরাণের প্রায় ৬০ শতাংশ অধ্যায়ে দক্ষিণ ভারতের গোদাবরী নদী অববাহিকার তীর্থস্থানগুলোর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এজন্য একে ‘গৌতমি মাহাত্ম্য’ হিসেবেও চেনা হয়।

ব্রহ্মপুরাণের উল্লেখযোগ্য উপাখ্যানসমূহ

পৃথ্বীরাজ সেন তাঁর সংকলনে ব্রহ্মপুরাণের জটিল কাহিনীগুলোকে তেরোটি প্রধান অংশে ভাগ করেছেন। প্রতিটি কাহিনী কোনো না কোনো নৈতিক শিক্ষা বহন করে:

ক্রমিকউপাখ্যানের নামমূল বিষয়বস্তু
০১সৃষ্টির কথাব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি এবং আদি মানব-মানবীর সৃষ্টিরহস্য।
০২ধুন্ধুমার কাহিনীরাজা কুবলাশ্ব কর্তৃক ধুলোর নিচে লুকানো অসুর ‘ধুন্ধু’-কে বিনাশ করে ‘ধুন্ধুমার’ উপাধি লাভ।
০৩ত্রিশঙ্কুর কাহিনীসত্যব্রতর অপরাধ এবং কীভাবে তিনি শাপগ্রস্ত হয়ে ‘ত্রিশঙ্কু’ নামে স্বর্গের মাঝামাঝি ঝুলে রইলেন।
০৪সগর রাজার দুঃখষাট হাজার পুত্রের পিতা হওয়া সত্ত্বেও সগর রাজার বিড়ম্বনা ও দুঃখের ইতিহাস।
০৫কপোত-কপোতীর আখ্যানদুই পাখির আত্মত্যাগের মাধ্যমে ব্যাধের মনে দিব্যজ্ঞান ও বৈরাগ্য উদয়।
০৬শূরসেনের সর্পপুত্রঅভিশপ্ত সর্পপুত্রের সঙ্গে ভোগবতীর বিবাহ এবং গোদাবরী স্নানে শাপমুক্তির অলৌকিক ঘটনা।
০৭শুনঃশেফের কাহিনীরাজা হরিশচন্দ্রের যজ্ঞে শুনঃশেফকে বলি দেওয়ার উপক্রম এবং বিশ্বামিত্রের হস্তক্ষেপে প্রাণরক্ষা।
০৮রাজা শ্বেতের পুনর্জীবনযমের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাজা শ্বেতের শিবভক্তি ও পুনরায় জীবন লাভ।
০৯মহাশনির কাহিনীদম্ভ ও শক্তির পরিণাম এবং মহাশনি নামক রাক্ষসের পতন।
১০যথা ধর্ম তথা জয়ধর্মের পথে থাকলে জয় অবধারিত—এই চিরন্তন সত্যের ব্যাখ্যা।
১১ভক্তিযুক্ত পূজাই শ্রেষ্ঠবাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে মনের আন্তরিক ভক্তি যে ঈশ্বরের কাছে প্রিয়, তার উদাহরণ।
১২ইন্দ্র প্রমতি চিত্রসেন সংবাদক্ষমতা ও বিনয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ইন্দ্র ও চিত্রসেনের কথোপকথন।
১৩একাদশীর মাহাত্ম্যএকাদশী ব্রত পালনের নিয়ম এবং এর আধ্যাত্মিক ও শারীরিক সুফলের বর্ণনা।

 

 

কেন ব্রহ্মপুরাণ পাঠ জরুরি?

ব্রহ্মপুরাণ আমাদের শেখায় যে, মানুষের কর্মফলই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে। গোদাবরী তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে শুরু করে মহান রাজাদের উত্থান-পতনের কাহিনীর মাধ্যমে এটি ত্যাগের মহিমা প্রচার করে। পৃথ্বীরাজ সেনের সহজবোধ্য লেখনীতে এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার বর্তমান পাঠকদের কাছে অত্যন্ত প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে।

সৃষ্টির আদি রহস্য থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের আচার-আচরণ—সবকিছুর এক পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা হলো ব্রহ্মপুরাণ। যারা সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি এবং প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যকে জানতে চান, তাঁদের জন্য এই আদিপুরাণটি একটি অপরিহার্য পাঠ্য।

Leave a Comment