ব্ৰহ্মপুরাণের সৃষ্টির কথা – ব্রহ্ম পুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

হিন্দুধর্মের আঠারোটি মহাপুরাণের মধ্যে ব্রহ্মপুরাণ (Brahma Purana) প্রথম এবং আদি হিসেবে স্বীকৃত। একে ‘রাজসিক’ পুরাণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সৃষ্টির আদি রহস্য এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিবর্তনের এক অপূর্ব দলিল এই পুরাণটি।

সৃষ্টির পটভূমি: মুনিগণের জিজ্ঞাসা

পুরাকালে যখন সৃষ্টির রহস্য নিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা ছিল, তখন প্রজাপতি দক্ষসহ বহু জ্ঞানপিপাসু মুনি-ঋষি একত্রিত হয়ে পরমপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। তাঁদের মনে তখন হাজারো প্রশ্ন:

  • সৃষ্টিতত্ত্ব: এই বিশাল পৃথিবীর শুরু কীভাবে হলো? শূন্য থেকে কীভাবে এই জল, স্থল আর অন্তরীক্ষের জন্ম হলো?
  • জীবকুলের বিকাশ: প্রাণহীন পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন এল কীভাবে? মানুষ, পশুপাখি আর কীটপতঙ্গের বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির পেছনের রহস্য কী?
  • তীর্থ মাহাত্ম্য: পৃথিবীর কোন কোন পুণ্যভূমি কীভাবে পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হলো?

 

ব্রহ্মার বয়ানে সৃষ্টির রহস্য

ভগবান বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে উদ্ভূত সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজেই যখন বক্তা, তখন সেই বর্ণনায় কোনো খামতি থাকে না। ব্রহ্মপুরাণে ব্রহ্মদেব তাঁর দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে মুনিদের জানান:

  • রাজবংশ ও প্রতাপ: প্রাচীন ভারতের শক্তিশালী রাজাদের উত্থান-পতন এবং তাঁদের বীরত্বগাথা।
  • ধর্ম ও ন্যায়বিচার: কীভাবে প্রতাপশালী রাজারা নিজেদের ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণ করতেন এবং কোন কৌশলে পৃথিবী থেকে অত্যাচারী ও অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটত।

 

৩. জ্ঞানের পরম্পরা: ব্যাসদেব থেকে লোমহর্ষণ

ব্রহ্মপুরাণের এই অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার কীভাবে আমাদের কাছে পৌঁছাল, তার একটি সুন্দর পর্যায়ক্রম রয়েছে:

  • বেদব্যাস: সর্বপ্রথম মহামুনি বেদব্যাস এই বিশাল জ্ঞানকে সংকলিত করে ব্রহ্মপুরাণ রচনা করেন।
  • লোমহর্ষণ: ব্যাসদেব তাঁর প্রিয় শিষ্য লোমহর্ষণকে এই পুরাণ শিক্ষা দেন।
  • নৈমিষারণ্য: পরবর্তীকালে লোমহর্ষণ সূত নৈমিষারণ্যের পবিত্র যজ্ঞক্ষেত্রে সমবেত ঋষিদের সামনে এই আদিপুরাণের কাহিনীসমূহ প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেন।

 

কেন ব্রহ্মপুরাণ ‘আদিপুরাণ’ হিসেবে শ্রেষ্ঠ?

ব্রহ্মপুরাণকে কেবল সৃষ্টির কাহিনী বলা ভুল হবে; এটি একটি বিশ্বকোষতুল্য গ্রন্থ। এতে আলোচিত হয়েছে:

  • ভৌগোলিক জ্ঞান: ভারতের নদনদী, বিশেষ করে গোদাবরী অববাহিকার তীর্থস্থানসমূহের বিশদ বর্ণনা।
  • ধর্মীয় বিধান: মানুষের প্রাত্যহিক আচার-আচরণ, শ্রাদ্ধ বিধি এবং দানকর্মের মাহাত্ম্য।
  • সমন্বয়: যদিও এটি ব্রহ্মার নামে নামাঙ্কিত, তবুও এতে বিষ্ণু ও শিবের মহিমাও সমানভাবে বর্ণিত হয়েছে।

সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্মের যে ধারা প্রবাহিত, তার মূল উৎস হলো ব্রহ্মপুরাণ। পৃথ্বীরাজ সেনের সাবলীল লেখনীতে এই প্রাচীন জ্ঞানসমুদ্র বর্তমান পাঠকদের কাছে এক স্বচ্ছ আয়নার মতো ধরা দেয়, যেখানে আমরা আমাদের শিকড়ের সন্ধান খুঁজে পাই।

Leave a Comment