হিন্দু পুরাণে ভক্ত প্রহলাদ ভক্তির অটল প্রতীক। অসুররাজ হিরণ্যকশিপুর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর অনন্য উপাসক। পিতার ভয়ঙ্কর নিষেধাজ্ঞা, অমানবিক নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুর হুমকিও তাঁর অটল ভক্তিকে টলাতে পারেনি। তাঁর অবিচল বিশ্বাস ও ভক্তি চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে—সত্যিকারের ভক্তির শক্তির কাছে দুষ্টশক্তি কখনও স্থায়ী হতে পারে না। ভক্ত প্রহলাদের কাহিনি আজও মানুষকে শিক্ষা দেয়, বিপদের মুখেও বিশ্বাস ও ন্যায়ে অবিচল থাকা কতটা মহৎ গুণ।
Table of Contents
ভক্ত প্রহলাদ

ভক্ত প্রহলাদ ১
শ্রীমদ্ভাগবত থেকে সত্যযুগের একটি উপাখ্যান বলছি।
তখন দৈত্যদের রাজা ছিলেন হিরণ্যকশিপু। দেবতা আর দৈত্যদের মধ্যে কখনও সম্প্রীতি ছিল না । তিনিও হরি বিদ্বেষী ছিলেন।
তাঁর রাজ্যে কেউ হরিনাম করতে পারত না। শ্রী বিষ্ণুর পূজা করতে পারত না। কেউ হরিনাম করলে তিনি সেই হরিভক্তকে কষ্ট দিতেন। অনেক সময় হত্যা করতেও দ্বিধা করতেন না। কিন্তু দৈত্যকুলে জন্ম হয়েছিল এক হরিভক্তের। নাম তার প্রহলাদ। আর আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রহলাদ দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর পুত্র।
প্রহলাদ তখন বালক । অন্যান্য বালকদের সাথে তাকে গুরুর কাছে বিদ্যাশিক্ষার জন্য পাঠান হল। কিন্তু পাঠে প্রহলাদের মন বসে না। প্রহলাদ হরিভক্ত। পাঠশালায় তার হরিভক্ত হৃদয় তৃপ্তি খুঁজে পায় না । রাজা হিরণ্যকশিপু পুত্রের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। একদিন তিনি প্রহলাদকে কোলে বসিয়ে আদর করে তাকে বললেন
– বাবা প্রহলাদ, তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কি বল তো? প্রহলাদ উত্তর দিলেন,
– পৃথিবীর কোন জিনিসই আমার প্রিয় নয়, বাবা। আমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে হরিভক্তি। যদি নির্জন বনে গিয়ে শান্ত মনে একাগ্র হয়ে শ্রীহরির আশ্রয় নিতে পারতাম, যদি শ্রীহরির শ্রীচরণ ধ্যান করতে পারতাম
– থাম্, ওরে থাম ।
উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু। দৈত্যকুলের চিরশত্রু হরি দৈত্যরাজ পুত্রের প্রিয়! নিশ্চয়ই কেউ তার কিশোর পুত্রের কানে এই হরিনাম দিয়েছে। প্রহলাদকে আবার গুরুগৃহে পাঠান হল। বলে দেয়া হল, গুরুদের যেন প্রহলাদের সুশিক্ষার জন্য যত্নবান হন। গুরু প্রহলাদকে শিক্ষা দিতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করলেন না। প্রহলাদ নিজ প্রতিভা বলে পরম জ্ঞানী হলেন।
কিন্তু তাঁর হরিভক্ত শুধু রয়েই গেল না, জ্ঞানের দ্বারা তা আরও শানিত হল । ব্যর্থ হল দৈত্যরাজের সকল প্রচেষ্টা। শত চেষ্টাতেও প্রহলাদের কোন পরিবর্তনই হল না। বরং ক্রমে ক্রমে তার হরিভক্তি আর বেড়ে গেল, আরও দৃঢ় হল । তখন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ঠিক করলেন, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবেন। রাজার আদেশে ছুটে এল ঘাতক অসুরেরা।

বিকট তাদের চেহারা। হাতে তাদের তীক্ষ্ণ শূল। বুকে বসিয়ে দিলে মৃত্যু সুনিশ্চিত । শক্তিশালী সেই অসুরেরা প্রহলাদের বক্ষ লক্ষ করে শূল নিক্ষেপ করল। কিন্তু শূল প্রহলাদের বক্ষে বিদ্ধ হল না । কি করে হবে? হরিনামে যে তার বক্ষ পবিত্র হয়ে আছে!
শূলে কাজ হল না দেখে প্রহলাদকে দেওয়া হল বিষমিশ্রিত অন্ন। কিন্তু তা খেয়ে মরল না প্রহলাদ ।
তখন তাকে বিষধর সাপের কুঠুরীতে ছুঁড়ে ফেলা হল। সাপগুলো প্রথমে ফণা তুলল, তারপর ফণা নত করে দুলতে থাকল। উঁচু পর্বতের চূড়ো থেকে তাকে ভূমিতে নিক্ষেপ করা হল। নিক্ষেপ করা হল সমুদ্রে। সমুদ্র থেকে হাসতে হাসতে উপরে উঠে এল প্রহলাদ ।
আরও কত রকমের শাস্তি যে তাকে দেওয়া হল! না খাইয়ে রাখা, দারুণ ঠাণ্ডার মধ্যে বেঁধে রাখা, গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া— এ ধরনের অনেক রকমের শাস্তি প্রহলাদকে দেওয়া হল। কিন্তু কিছুতেই ঘাতকেরা প্রহলাদকে বধ করতে পারল না। তখন তারা দৈত্যরাজকে জানাল,
– কোন উপায়েই প্রহলাদকে বধ করা যাচ্ছে না, মহারাজ। ঘাতকদের কথা শুনে ক্রোধে জ্বলতে লাগলেন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু। তিনি নিজে প্রহলাদকে হত্যা করার জন্য ছুটে গেলেন ।
সারাংশ
সত্যযুগের কথা। দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহলাদ ছিল হরিভক্ত। দৈত্যকুলে হরিভক্ত। হরি যে দৈত্যদের চিরশত্রু! প্রহলাদকে সুশিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠান হল। কিন্তু তার হরিভক্তি দূর হল না। ক্রমে তা আরও দৃঢ় হল। কোনভাবেই প্রহলাদ হরিভক্তি ছাড়লনা দেখে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু তাকে মেরে ফেলতে চাইলেন।

কিন্তু শূলের আঘাত, বিষ মিশ্রিত অন্ন কিংবা পর্বত থেকে বা সমুদ্রে নিক্ষেপ কোন উপায়েই হরিভক্ত প্রহলাদকে বধ করা গেল না। তখন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু নিজেই প্রহলাদকে হত্যা করার জন্য ছুটে গেলেন ।

ভক্ত প্রহলাদ ২
প্রহলাদের কাছে গিয়ে হিরণ্যকশিপু তীব্র কণ্ঠে বললেন,
– রে দুর্বিনীত, রে নির্বোধ, আমার শত্রুর ভজনা করে তুই আমার আদেশ অমান্য করছিস! আমি নিজেই তোকে হত্যা করব। আমি ক্রুদ্ধ হলে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালের অধিপতিরা, সেখানকার সর্বসাধারণ ভয়ে কম্পিত হয়। তুই কার বলে নির্ভীক হয়ে আমার বাক্য লঙ্ঘন করেছিস? কেন অমান্য করছিস আমার আদেশ? শান্তমধুর কণ্ঠে প্রহলাদ বললেন,শত্রু বলছ কেন, বাবা?
যাকে তুমি শত্রু বলছ, তিনি কারও সাথে শত্রুতা করেন না। তিনি – সকলের বন্ধু, সকলের প্রাণ, সকলের ত্রাণকর্তা প্রভু। তিনি পরমেশ্বর। তিনি ভগবান। এই ভগবানই আমার বল, বাবা। শুধু আমার একার নয়, আপনার এবং অন্যান্য সকলের বল শ্রীহরি । সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা ।
– প্রহলাদ ! গর্জে উঠলেন হিরণ্যকশিপু
– রাগ করছ কেন, বাবা? শ্রীহরি ত্রাণ না করলে, আমি এত বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম কি করে? শ্রীহরি সর্বত্র আছেন, সর্বত্র থাকেন। সর্বত্র থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করেন, বাবা।
– সর্বত্র থাকেন? – রাগে ফুঁসে উঠলেন হিরণ্যকশিপু। –আছে? এই স্ফটিকস্তম্ভে তোর হরি আছে? প্রহলাদ ধীর শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
– আছেন, বাবা।
– তাই নাকি! হিরণ্যকশিপু আসন থেকে উঠে দ্রুত বেগে ধেয়ে গেলেন স্ফটিক স্তম্ভের দিকে। স্তম্ভের ওপর মুষ্টির আঘাত করলেন তিনি।

প্রচণ্ড শব্দ হল সেই স্তম্ভের ভেতর থেকে।
সেই শব্দে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল প্রকম্পিত হল।
স্ফটিক স্তম্ভ থেকে বেরিয়ে এলেন শ্রীহরি। নৃসিংহ মূর্তিতে। অর্থাৎ তাঁর মুখটা সিংহের মত, শরীরটা মানুষের মত। হাতে বড় বড় নখ। হিরণ্যকশিপু তাঁকে খড়্গেঙ্গর আঘাতে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তখন নৃসিংহ মূর্তি হুংকার দিয়ে হিরণ্যকশিপুকে কোলের ওপর ফেলে হাতের বড় বড় নখ দিয়ে হত্যা করলেন। এই নৃসিংহ হলেন স্বয়ং শ্রীহরি। এখানে একটা কথা বলা দরকার।
হিরণ্যকশিপু বর পেয়েছিলেন, দেব, নর, যক্ষ, রক্ষ—কেউ কোন অস্ত্র দিয়ে স্বর্গ, মর্ত্য বা পাতাল কোন স্থানে তাকে হত্যা করতে পারবে না। তাই শ্রীহরি মানুষ এবং সিংহের মিলিত রূপ ধারণ করেছিলেন। নৃসিংহ-রূপে শ্রীহরি কোন অস্ত্র ব্যবহার না করে নখ দিয়ে নিজের কোলের ওপর ফেলে হিরণ্যকশিপুকে বধ করলেন। শ্রীহরি তখন নিজরূপে প্রহলাদকে দেখা দিলেন। শ্রীহরি প্রহলাদকে বর দিতে চাইলেন ।
ভক্ত প্রহলাদ করজোড়ে বলল,
– হে হরি, তোমার প্রতি যেন অটুট থাকে আমার ভক্তি। আমার আর কিছু চাই না, প্রভু!
সারাংশ
প্রহলাদের কাছে গিয়ে হিরণ্যকশিপু তাঁর আদেশ অমান্য করার এবং তাঁর শত্রু হরিকে পূজা করার জন্য প্রহলাদকে বকলেন। প্রহলাদ জানালেন, শ্রীহরি কারও শত্রু নন। তিনি সকলের বন্ধু ও ত্রাণকর্তা। শ্রীহরি সর্বত্র আছেন, সর্বত্র থাকেন। তখন তাচ্ছিল্য ও উপহাস করে হিরণ্যকশিপু প্রহলাদকে জিজ্ঞেস করলেন যে নিকটস্থ স্ফটিক স্তম্ভে হরি আছে কিনা।
প্রহলাদ জানাল যে শ্রীহরি স্ফটিক স্তম্ভেও আছেন। হিরণ্যকশিপু উঠে গিয়ে মুষ্টাঘাতে স্ফটিকস্তম্ভ ভেঙে ফেললেন । ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নৃসিংহরূপী শ্রীহরি। তিনি হিরণ্যকশিপুকে বধ করলেন। শ্রীহরি নিজরূপে দেখা দিয়ে প্রহলাদকে বর দিতে চাইলেন। কিন্তু ভক্ত প্রহলাদ কোন পার্থিব সুখের জন্য কোন কিছু চাইল না। প্রহলাদ চেয়ে নিল শ্রীহরির প্রতি অটুট ভক্তি।
