হিন্দুধর্মের আঠারোটি মহাপুরাণের মধ্যে লিঙ্গ পুরাণ (Linga Purana) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শৈব ধর্মগ্রন্থ। এই পুরাণের মূল উপজীব্য হলো দেবাদিদেব মহাদেব শিবের ‘লিঙ্গ’ রূপের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা এবং মহিমা কীর্তন। ‘লিঙ্গ’ শব্দটি এখানে কেবল একটি চিহ্ন নয়, বরং এটি সৃষ্টির আদি ও অন্তহীন নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক।
Table of Contents
পুরাণের পটভূমি ও জ্ঞান-পরম্পরা
লিঙ্গ পুরাণের উৎপত্তি ও প্রচারের একটি নির্দিষ্ট পরম্পরা রয়েছে:
- ব্রহ্মার ভাষণ: সৃষ্টির আদিতে প্রজাপতি ব্রহ্মা মহাদেবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এই পুরাণটি প্রথম বর্ণনা করেন।
- ব্যাসদেব ও লোমহর্ষণ: কালক্রমে এই জ্ঞান মহর্ষি বেদব্যাসের কাছে পৌঁছায়। তাঁর সুযোগ্য শিষ্য মহামুনি লোমহর্ষণ সূত এই গভীর তত্ত্ব হৃদয়াঙ্গম করেন।
- নৈমিষারণ্যের সভা: অবশেষে নৈমিষারণ্যের পবিত্র যজ্ঞক্ষেত্রে শৌনকাদি মুনিগণের কৌতূহল নিরসনে সূত মুনি এই দিব্য পুরাণটি ব্যক্ত করেন।
লিঙ্গ পুরাণের মূল দর্শন
এই পুরাণে শিবকে ‘অলিঙ্গ’ (লিঙ্গহীন বা নিরাকার) এবং ‘লিঙ্গ’ (সাকার রূপের উৎস) উভয় হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে, জগত প্রলয়ের সময় যে চিহ্নে বা প্রতীকে লীন হয় এবং সৃষ্টিলগ্নে যা থেকে পুনরায় প্রকট হয়, তাই হলো শিবলিঙ্গ।
উল্লেখযোগ্য উপাখ্যান ও কাহিনীসমূহ
পৃথ্বীরাজ সেন তাঁর সংকলনে লিঙ্গ পুরাণের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অলৌকিক কাহিনীগুলো তুলে ধরেছেন:
| ক্রমিক | উপাখ্যানের নাম | কাহিনীর মূল সারাংশ ও শিক্ষা |
| ০১ | দধীচি মুনির প্রতাপ | মহর্ষি দধীচির অমোঘ শিবভক্তি এবং তাঁর হাড় দিয়ে বজ্র তৈরির মাধ্যমে শিবের অপরাজেয় শক্তির প্রকাশ। |
| ০২ | নন্দীশ্বরের কাহিনী | মহাদেবের পরম বাহন ও প্রধান অনুচর নন্দীর জন্ম এবং কঠোর তপস্যার মাধ্যমে শিবের প্রিয়পাত্র হওয়ার ইতিহাস। |
| ০৩ | শরভ রূপে শিব | ভগবান নৃসিংহদেবের উগ্র তেজ প্রশমিত করতে শিবের ভয়ংকর ‘শরভ’ (অর্ধ-সিংহ ও অর্ধ-পক্ষী) রূপ ধারণ। |
| ০৪ | সুদর্শন চক্র দান | বিষ্ণু কীভাবে পরম ভক্ত হিসেবে শিবের আরাধনা করে তাঁর কাছ থেকে অজেয় ‘সুদর্শন চক্র’ লাভ করেছিলেন। |
| ০৫ | গায়ক কৌশিকের কাহিনী | বিষ্ণুভক্ত কৌশিকের সঙ্গীতের মাধ্যমে ভক্তির শক্তি এবং শিব-বিষ্ণুর অভিন্নতা প্রদর্শন। |
| ০৬ | অম্বরীষ ও নারদ সংবাদ | মহারাজ অম্বরীষের কন্যার স্বয়ংবর সভায় দেবর্ষি নারদ ও পর্বত মুনির অহংকার চূর্ণ হওয়ার কৌতুকময় অথচ শিক্ষণীয় উপাখ্যান। |
কেন লিঙ্গ পুরাণ পাঠ করবেন?
লিঙ্গ পুরাণ পাঠ করলে মানুষের জাগতিক অহংকার দূর হয় এবং পরমেশ্বরের প্রতি অচল ভক্তি জন্মায়। এটি আমাদের শেখায় যে শিব ও বিষ্ণু পৃথক নন, বরং একে অপরের পরিপূরক। বিশেষ করে শরভ অবতার এবং সুদর্শন চক্র দান-এর কাহিনীগুলো হরি-হরের একত্ববাদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
লিঙ্গ পুরাণ কেবল একটি আচারসর্বস্ব শাস্ত্র নয়, এটি আত্মিক জাগরণের এক মহাকাব্য। পৃথ্বীরাজ সেনের এই সুবিন্যস্ত সূচিটি পাঠকদের জন্য শিবতত্ত্বের জটিল রহস্যগুলোকে সহজ ও আনন্দময় করে তুলেছে। যারা শৈব সাধনার গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাঁদের জন্য এই পুরাণটি এক অমূল্য সম্পদ।
