লক্ষ্মীপূজা ও ব্রত

হিন্দু ধর্মে শ্রী-ঐশ্বর্যের প্রতীক লক্ষ্মীদেবী সর্বত্র পূজিত। সংসারজীবনে সুখ-সমৃদ্ধি, ধন-ধান্য ও সৌভাগ্যের কামনায় ভক্তরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁকে আরাধনা করে আসছেন। শাস্ত্রসম্মত লক্ষ্মীপূজার মধ্যে যেমন নিয়ম-কানুন, মন্ত্র ও আচারের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, তেমনি আছে লোকাচার, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং গৃহস্থালি বিশ্বাস। ‘ঈশ্বরের ঐশ্বর্য’ যে দেবীর রূপে প্রকাশ পেয়েছেন, তাঁর নামই লক্ষ্মী। ভক্তের অন্তরে ভক্তি ও পবিত্রতা থাকলেই লক্ষ্মীপ্রসাদ লাভ সম্ভব।

লক্ষ্মীপূজা ও ব্রত

 

লক্ষ্মীপূজা ও ব্রত

 

কোজাগরী পূর্ণিমা ও লক্ষ্মীপূজা

সাধারণ দিনে বা সাপ্তাহিক পূজার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীকে আহ্বান করলেও আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এদিনের পূজা পরিচিত কোজাগরী পূর্ণিমার লক্ষ্মীপূজা নামে। পুরাণে উল্লেখ আছে—এই রাতে দেবী লক্ষ্মী ভক্তের গৃহে এসে প্রশ্ন করেন, “কো জাগরতি?” অর্থাৎ, “কে জেগে আছে?” যিনি জেগে থেকে ভক্তিভরে পূজা করেন, দেবী তাঁর ঘরে সৌভাগ্য ও ধনসম্পদ বর্ষণ করেন। এজন্য এ পূর্ণিমাকে ‘কোজাগরী’ বলা হয়।

কোজাগরী পূর্ণিমায় গ্রামে-গঞ্জে কিংবা শহরে প্রতিটি গৃহেই আলপনা, দীপ, ধূপ, ধান, দুধ, ফল-মিষ্টি ও নানা উপচারে দেবীর আরাধনা হয়। গৃহিণীরা ভক্তি ভরে ধান-চাল ছড়িয়ে প্রতীকীভাবে দেবীকে আহ্বান করেন। এই পূজা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক নয়, সাংসারিক জীবনেও সৌভাগ্য কামনার অন্যতম আচার।

পূজার প্রাথমিক প্রস্তুতি

শাস্ত্রমতে, লক্ষ্মীপূজার আগে নিত্যকর্ম ও প্রাথমিক আচার সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • আচমন – মন্ত্র উচ্চারণ করে শরীর-মন শুদ্ধ করা।
  • বিষ্ণুস্মরণ – নারায়ণের নাম জপ করে পূজার সূচনা।
  • সূর্য প্রণাম ও সূর্যার্ঘ্য – সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন।
  • স্বস্তিবাচন – আশীর্বাদ প্রার্থনা।
  • দ্বারদেবতার পূজা – গৃহদ্বারে বিরাজমান দেবতার পূজা।
  • বিঘ্ননাশ – গণেশ পূজা করে পূজার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ।
  • আসনশুদ্ধি ও পুষ্পশুদ্ধি – উপকরণ পবিত্রকরণ।
  • প্রাণায়াম – মনকে স্থির করে ধ্যানমগ্ন হওয়া।

এই প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে মূল পূজায় প্রবেশ করতে হয়।

সংকল্প ও ধ্যান

পূজার সূচনায় সংকল্প অত্যন্ত জরুরি। এখানে যজমান নিজের নাম, গোত্র, তিথি, মাস, পক্ষ ইত্যাদি উল্লেখ করে বলেন যে তিনি লক্ষ্মীদেবীর পূজা করছেন এবং দেবীর কৃপা কামনা করছেন।

তারপর ধ্যান করতে হয়—লক্ষ্মীদেবীর রূপ কল্পনা করে তাঁর পদ্মাসন, পদ্মহস্ত, করুণাময় দৃষ্টি ও স্বর্ণময় আভা চিন্তা করতে হয়। এই ধ্যান ভক্তকে অন্তর্নিহিত ভক্তির সঙ্গে দেবীর ঐশ্বর্যে একাত্ম করে।

প্রতিমায় পূজা ও আবাহন

যদি প্রতিমা বা ঘট স্থাপন করে পূজা করা হয়, তবে করতে হবে—

  • চক্ষুদান
  • প্রাণপ্রতিষ্ঠা
  • ঘটস্থাপন

তারপর দেবীকে আবাহন করতে হয় মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে।

আবাহন মন্ত্র :

ওঁ ভূর্ভুবস্বঃ লক্ষ্মী দেবী ইহাগচ্ছ, ইহ তিষ্ঠ, অত্রাধিষ্ঠানং কুরু, মম পূজাং গৃহাণ ।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

উপচার ও বীজমন্ত্র

সাধারণ পূজায় পঞ্চোপচার বা দশোপচার প্রচলিত, তবে কোজাগরী পূর্ণিমায় পূর্ণ আচারানুষ্ঠানে ষোড়শোপচার অনুসৃত হয়।
লক্ষ্মীদেবীর বীজমন্ত্র হল “শ্রীং”। জপ করতে হয়—

ওঁ শ্রীং লক্ষ্ম্যৈ নমঃ

এই জপ তিনবার উচ্চারণ করে ভক্ত পুষ্পাঞ্জলি দেন।

পুষ্পাঞ্জলি

পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র :

ওঁ নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।
যা গতিত্ত্বৎ প্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্ত্বদর্চনা৷

অর্থ : হে দেবতাদের বরদাত্রী, হে হরিপ্রিয়া! তোমার পূজার মাধ্যমে অন্যরা যেমন কল্যাণ পেয়েছে, আমিও যেন সেই কল্যাণ লাভ করি।

প্রণাম মন্ত্র

লক্ষ্মী প্রণাম মন্ত্র :

ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।
সর্বতঃ পাহি মাং দেবি মহালক্ষ্মী নমোস্তুতে।।

অর্থ : হে বিশ্বরূপ নারায়ণের পত্নী, পদ্মাসনা, পদ্মালয়ে বিরাজমান শুভলক্ষ্মী! তুমি সর্বতোভাবে আমাকে রক্ষা করো। হে মহালক্ষ্মী, তোমাকে প্রণাম।

পূজা-পরবর্তী কর্ম

লক্ষ্মীদেবীর পূজা সমাপ্ত হলে আরও কিছু আচার সম্পন্ন করতে হয়—

  • ইন্দ্র ও কুবের পূজা – সম্পদের রক্ষক ও ঐশ্বর্যের প্রতীক দেবতার পূজা।

  • লক্ষ্মীস্তোত্র পাঠ – ভক্তিভরে স্তোত্র উচ্চারণ।

  • দক্ষিণা দান – ব্রাহ্মণ বা পূজারি পুরুষকে দক্ষিণা প্রদান।

  • যজ্ঞ বা হোম – অনেকে পূজার শেষে হোম সম্পন্ন করেন।

  • পূজা শেষে দেবী-নারায়ণকে প্রণাম করে সমাপন করতে হয়।

  • প্রতিমায় পূজা হলে বিসর্জন মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রতিমা বিসর্জন করতে হয়।

 

নিষিদ্ধ উপকরণ

শাস্ত্রে কিছু উপকরণ লক্ষ্মীপূজায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে—

  • তুলসীপত্র

  • ঝিন্টিকা ফুল

  • কাঞ্চন ফুল

  • ঘণ্টাবাদ্য

বিশ্বাস করা হয়, এসব উপকরণ ব্যবহার করলে দেবী সন্তুষ্ট হন না।

লোকাচার ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

শাস্ত্রীয় নিয়ম ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজার ভিন্ন ভিন্ন রীতি প্রচলিত।

  • গ্রামে ধান-ধান্য ও শস্যভাণ্ডারের সামনে পূজা হয়।

  • গৃহিণীরা চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকেন।

  • শহরে প্রতিমা ও ঘট উভয়ভাবেই পূজা প্রচলিত।

  • কোথাও আবার মহালক্ষ্মী ব্রত বা “আলকাপ ব্রত” আকারে পূজা করা হয়, যেখানে মেয়েরা দীর্ঘ সময় ধরে দেবীর পূজা করেন।

 

তাৎপর্য

লক্ষ্মীপূজা শুধু ধনসম্পদ প্রার্থনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই পূজায় ভক্ত বুঝতে শেখেন—

  • সত্যিকারের সম্পদ হল ভক্তি, সততা ও সৎকর্ম।

  • দেবীর কৃপা ভক্তকে সংসারে ধন-সম্পদের পাশাপাশি শান্তি ও কল্যাণও দেয়।

  • কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী আগমন করে যিনি জেগে থেকে পূজা করেন, তাঁকে দেবী আশীর্বাদ করেন—এই বিশ্বাস ভক্তদের মানসিক ভরসা জোগায়।

 

লক্ষ্মীদেবীর পূজা ভক্তের অন্তরে ভক্তি, শুদ্ধতা ও ঈশ্বরচেতনা জাগিয়ে তোলে। নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে ভক্তি ও নিষ্ঠাই আসল সাধনা। ধনসম্পদ, সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার মাধ্যমে ভক্ত সংসারের পাশাপাশি আত্মার মুক্তির পথেও অগ্রসর হয়।

Leave a Comment