মহিষাসুর বধ

মহিষাসুর বধ ভারতীয় পুরাণ সাহিত্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ কাহিনি। শক্তিরূপিণী দেবী দুর্গার আবির্ভাব ও অসুর দমন কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই পৌরাণিক ঘটনা। মহিষাসুর, এক দুর্ধর্ষ অসুর, যিনি ব্রহ্মার বরপ্রাপ্তির ফলে অদম্য শক্তির অধিকারী হয়ে দেবতা ও মানবকুলকে ত্রাসের মধ্যে ফেলেছিলেন। তার দমন ছিল দেবসমাজের কাছে এক অনিবার্য প্রয়োজন। তাই দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে জন্ম নেন দেবী দুর্গা, মহাশক্তির প্রতীক। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে তিনি মহিষাসুরকে বধ করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন ধর্ম, ন্যায় ও শান্তি।

এই কাহিনি শুধু পুরাণকথা নয়, বরং শক্তির জয়, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং নারীশক্তির অবিস্মরণীয় প্রতীক। যুগে যুগে মহিষাসুর বধ কাহিনি শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যে অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

মহিষাসুর বধ

 

মহিষাসুর বধ ১

 

অনেক অনেক কাল আগের কথা ।

একবার দেবরাজ ইন্দ্র আর অসুরা-রাজ মহিষাসুরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। উভয়পক্ষে প্রচুর সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র। দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলল। অবশেষে দেবতারা পরাজিত হলেন। অসুরেরা স্বর্গরাজ্য অধিকার করে নিল । অসুর-রাজ মহিষাসুর স্বর্গের রাজা হয়ে বসল। দেবতাদের তাড়িয়ে দিল স্বর্গ থেকে। দেবতারা রাজ্যহারা হয়ে মর্ত্যের পার্বত্য এলাকায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

কিন্তু এভাবে তো চলে না। স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করতে হবে। দেবগণ একত্র হয়ে ব্রহ্মার নেতৃত্বে গেলেন মহাদেব ও বিষ্ণুর কাছে। অসুরদের অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করা হল। সে ভয়ঙ্কর কাহিনী শুনে মহাদেব ও বিষ্ণু ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। তাদের শরীর থেকে তেজ বের হতে লাগল। ব্রহ্মা এবং অন্যান্য দেবতাদের শরীর থেকেও আগুনের মত তেজ নির্গত হল।

সেই তেজোরাশি একটি বিশাল তোজোদীপ্ত আলোর পুঞ্জে পরিণত হল । মনে হল যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি সেই আলোকপুঞ্জ থেকে আবির্ভূত হলেন এক মহাশক্তিময়ী দেবী মূর্তি। দেবতারা নিজ নিজ অস্ত্র থেকে একটি করে অস্ত্র সৃষ্টি করে দেবীর হাতে দিলেন। দেবতাদের অস্ত্র- শস্ত্র নিয়ে দেবী দুর্গা যুদ্ধের জন্য সুসজ্জিত হলেন। হিমালয় দেবীর বাহনের জন্য একটি সিংহ দিলেন। দিলেন অনেক মূল্যবান রত্ন। দীপ্ত অলংকার। এই দেবীই হলেন দুর্গা।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেবী দুর্গার মুহুর্মুহু অট্টহাস্য করলেন। তাঁর অট্টহাস্যে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল প্রকম্পিত হল। দেবতারা দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি করতে লাগলেন। মুনিগণ দেবীর স্তব করতে লাগলেন । দেবী দুর্গার অট্টহাস্যের ধ্বনি আর দেবতাদের জয়ধ্বনি মিলে যে প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হল, তা শুনে অসুরেরা ক্ষিপ্ত হল ।

মহিষাসুর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ছুটে গেল সেই শব্দের দিকে। দূর থেকেই দেখা গেল, এক অপূর্ব নারীমূর্তি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অট্টহাস্য করছেন। মহিষাসুরের আদেশে অসুরেরা দেবী দুর্গাকে সম্মিলিতভাবে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করল। দেবী তখন বাণ নিক্ষেপ করে অসুরদের অস্ত্রগুলো কেটে ফেললেন। তাঁর দিব্যাস্ত্র অসুরদের ওপর পড়তে লাগল অবিরল জলধারার মত।

পুরাকালে দেবরাজ ইন্দ্র ও মহিষাসুরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র পরাজিত হন এবং অসুরেরা স্বর্গরাজ্য অধিকার করে নেয়। দেবতারা ব্রহ্মার নেতৃত্বে শিব ও বিষ্ণুর কাছে যান। শিব ও বিষ্ণু অসুরদের অত্যাচারের কথা শুনে ক্রুদ্ধ হন।

দেবতারাও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের সম্মিলিত তেজ থেকে সৃষ্ট হন দেবী দুর্গা। দেবতারা তাঁদের অস্ত্র থেকে এক-একটা অস্ত্র নির্মাণ করে দেবী দুর্গাকে দেন। অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়।

 

মহিষাসুর বধ ২

 

অসুরদের সঙ্গে দেবী দুর্গার ভীষণ যুদ্ধ চলছে। এই সময়ে তাঁর নিঃশ্বাস থেকে গণদেবতা নামে এক প্রকার দেবতার সৃষ্টি হল। এই গণদেবতারাও অসুরদের হত্যা করতে লাগলেন। সেকালে যুদ্ধের সময় নানা রকম বাদ্যযন্ত্র বাজানো হত। এতে সৈন্যরা উৎসাহ পেত। গণদেবতাদের কেউ কেউ স্বপক্ষের যোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্য যুদ্ধের বাজনা বাজাতে লাগলেন।

কেউ বাজালেন শঙ্খ, কেউ ঢাক, কেউ বাজালেন মৃদঙ্গ, কেউ রণশিঙ্গা। দেবীর বাহন সিংহও উত্তেজিত হল। সে অসুরদের ওপর লাফিয়ে পড়ল। দেবী দুর্গা, গণদেবতা ও সিংহের আক্রমণে অসুর সৈন্যদের প্রায় সবাই নিহত হল । দেবগণ আনন্দে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন। অসুর সৈন্যদের নিহত হতে দেখে এগিয়ে এলেন মহিষাসুরের এক সেনাপতি। নাম তার চিক্ষু ।

চিক্ষুর সাথেও দেবী দুর্গার ভীষণ যুদ্ধ হল। চিক্ষু বাণ নিক্ষেপ করেন, আর নিমিষের মধ্যে দেবী চিক্ষুর বাণ কেটে দেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে দেবী চিক্ষুর ধনুকের ছিলা বাণ দিয়ে কেটে ফেললেন । চিক্ষু তখন ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কিন্তু দেবী দুর্গার প্রচণ্ড আক্রমণের কাছে ব্যর্থ হল তার সকল প্রচেষ্টা। দেবী দুর্গা শূলের আঘাতে চিক্ষুকে বধ করলেন।

এমনিভাবে অসুরদের আরও অনেক বড় বড় বীর দেবী দুর্গার হাতে নিহত হল । অবশেষে যুদ্ধে এল মহিষাসুর নিজেই। ক্রোধে ক্ষোভে জ্বলে উঠল সে। মহিষের রূপ ধরে সে যুদ্ধ করতে লাগল। দেবী প্রচণ্ড অট্টহাস্য করে আক্রমণ করলেন মহিষাসুরকে। কিন্তু মহিষাসুর অসাধারণ বিক্রমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। দেবী মহিষাসুর পাশে আবদ্ধ করলেন।

অসুরেরা নানা রকম মায়া ও জাদুবিদ্যা জানত। নানা প্রকার রূপও ধারণ করতে পারত। মহিষাসুরও জানত নানা প্রকার মায়া। দেবী পাশে আবদ্ধ করার সাথে সাথে সে ধরল এক সিংহের রূপ। দেবী সিংহটিকে কেটে ফেললেন। তখন মহিষাসুর মানুষের রূপ ধারণ করল। মানুষটির প্রতি বাণ নিক্ষেপ করলেন দেবী নিহত হল সে। মহিষাসুর তখন এল হাতির রূপ ধরে।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

দেবী দুর্গা তলোয়ার দিয়ে হাতির শুঁড়টা দ্বিখণ্ডিত করলেন। সাথে সাথেই মহিষাসুর আবার ধরল মহিষের রূপ। দেবী দুর্গা তখন খড়্গা নিয়ে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে গেলেন। সেই খঙ্গের আঘাতে মহিষাসুরকে দ্বিখণ্ডিত করলেন। তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। নিহত হল মহিষাসুর। অবশিষ্ট অসুরেরা এই ভীষণ দৃশ্য দেখে ভয়ে পালিয়ে গেল ।

যুদ্ধে দেবতাদের জয় হল। দেবতারা ফিরে পেলেন তাঁদের স্বর্গরাজ্য। আর এর প্রধান কৃতিত্ব দেবী দুর্গার। কৃতজ্ঞচিত্তে দেবতারা দেবী দুর্গার স্তব করতে লাগলেন। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হল :

‘সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥’ (-শ্রীশ্রীচণ্ডী)

– হে নারায়ণী, তুমি সর্বপ্রকার মঙ্গলকারিণী, তুমি মঙ্গলময়ী, তুমি সকল প্রকার অভীষ্টপূরণকারিণী, তুমি আশ্রয়স্বরূপা, তুমি ত্রিনয়না, তুমি গৌরী, তোমাকে প্রণাম করি ।

অসুরদের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধের এক পর্যায়ে দেবীর নিঃশ্বাস থেকে গণদেবতা নামে এক প্রকার দেবতার সৃষ্টি হল । তাঁরাও প্রচণ্ড যুদ্ধে অসুরদের নিধন করতে লাগলেন। অসুরদের নিহত হতে দেখে এগিয়ে এলেন মহিষাসুরের সেনাপতি চিক্ষু । প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দেবী দুর্গার শূলাঘাতে নিহত হল চিক্ষু। তখন স্বয়ং মহিষাসুর যুদ্ধে অবতীর্ণ হল।

প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দেবীর খড়্গা ঘাতে নিহত হল মহিষাসুর। এভাবে দেবী দুর্গার সহায়তায় দেবতারা জয়লাভ করলেন এবং স্বর্গরাজ্য ফিরে পেলেন। কৃতজ্ঞচিত্তে দেবতারা দেবী দুর্গার স্তব করলেন।

Leave a Comment