ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার পুণ্যভূমিতে যে কজন মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁদের মধ্যে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে যুগপুরুষোত্তম, চিকিৎসক, সমাজ সংস্কারক এবং সৎসঙ্গ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর জীবন ছিল কর্ম ও ধর্মের এক অপূর্ব সমন্বয়। “মানুষ তৈরি” করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত।

Table of Contents
১. জন্ম ও বংশপরিচয়
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বাংলা ১২৯৫ সালের ৩০শে ভাদ্র (ইংরেজি ১৮৮৮ সাল) তালনবমীর পুণ্য তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান ছিল পাবনা জেলার পদ্মাতীরবর্তী হিমাইতপুর গ্রামে, যা ছিল তাঁর মাতুলালয়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার শুয়াখাড়া গ্রামে।
- পিতা: শিবচন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ এবং অত্যন্ত উচ্চমনা ব্যক্তি।
- মাতা: মনোমোহিনী দেবী ছিলেন এক অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিক গুণের অধিকারিণী। তিনি ছিলেন সুদূর আগ্রার সন্ত সদ্গুরু শ্রীশ্রী হুজুর মহারাজের শিষ্যা। অনুকূলচন্দ্রের জীবনে তাঁর মায়ের প্রভাব ছিল অপরিসীম। অনুকূলচন্দ্রের জন্মের এক বছর পর তাঁর শাশুড়ির অনুরোধে শিবচন্দ্র সপরিবারে হিমাইতপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
২. শৈশব ও অলৌকিক প্রতিভা
শৈশব থেকেই অনুকূলচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল এবং তেজস্বী। উত্তাল পদ্মার বিশালতার মতোই তাঁর প্রাণশক্তি ছিল অফুরন্ত। তাঁর দুষ্টুমি ও চপলতা প্রতিবেশীদের অতিষ্ঠ করলেও তাঁর নিষ্পাপ হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারতেন না। তবে মা মনোমোহিনী দেবী ছেলের শাসনের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। অনুকূলচন্দ্রের চরিত্রের দৃঢ়তা ও মাতৃভক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই শৈশবেই। তিনি বলতেন:
“মাতৃভক্তি অটুটু যত, সেই ছেলে হয় কৃতী তত।
পিতায় শ্রদ্ধা মায়ে টান, সেই ছেলে হয় সাম্য প্রাণ।”
৩. শিক্ষাজীবন ও মহানুভবতার পরিচয়
অনুকূলচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় হিমাইতপুরে। এরপর তিনি পাবনা ইনস্টিটিউটে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি নৈহাটী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন। কিন্তু এই পরীক্ষার সময়েই তাঁর চরিত্রের এক মহান দিক উন্মোচিত হয়। পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার সময় তিনি জানতে পারেন তাঁর এক দরিদ্র সহপাঠী অর্থের অভাবে পরীক্ষা দিতে পারছে না। সহপাঠীর চোখের জল সহ্য করতে না পেরে অনুকূলচন্দ্র নিজের পরীক্ষার টাকাটা তাকে দিয়ে দেন। ফলে সে বছর তাঁর আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, শৈশব থেকেই তিনি পরের সুখের জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে জানতেন।
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবনালোচনার দ্বিতীয় অংশ নিচে দেওয়া হলো। এই অংশে তাঁর কলকাতার কঠোর সংগ্রাম, চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন এবং ‘ঠাকুর’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের অলৌকিক অধ্যায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
৪. কলকাতার জীবন ও কঠোর সংগ্রাম
মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে অনুকূলচন্দ্র কলকাতার ‘ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল’-এ (বর্তমানে যা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ) ভর্তি হন। কিন্তু এই সময় তাঁর পারিবারিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। পিতা অসুস্থ, সংসারে তীব্র অভাব। প্রতি মাসে বাড়ি থেকে যে সামান্য টাকা আসত, তা দিয়ে কলকাতার মতো শহরে থাকা ও পড়াশোনা চালানো ছিল দুঃসাধ্য।
পরিবেশ: আবাসন সংকটের কারণে তিনি কয়লার গুদামের কুলিদের সাথে একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকতেন। ধুলোবালি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাটত তাঁর দিন।
অনাহার: অনেক দিনই তাঁর অন্নের সংস্থান হতো না। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জরাজীর্ণ হয়েও তিনি কখনও কারও কাছে হাত পাতেননি। পেটের ক্ষুধা মেটাতে কখনও কখনও রাস্তার পাশের কল থেকে পেটভরে জল খেয়ে কাটিয়ে দিতেন। তবুও তাঁর অমায়িক ব্যবহার এবং মিষ্টভাষিতা সকলকে মুগ্ধ করত।
৫. চিকিৎসাবৃত্তিতে মানবসেবা ও সাফল্য
অনুকূলচন্দ্রের অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবেশী ডাক্তার হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ওষুধসহ একটি ডাক্তারি বাক্স উপহার দেন। সেই সামান্য সম্বল নিয়েই অনুকূলচন্দ্র শুরু করলেন বস্তির কুলি-মজুরদের সেবা।
সেবার আনন্দ: তিনি অর্থের দিকে না তাকিয়ে আন্তরিকতার সাথে রোগীদের সেবা করতেন। ধীরে ধীরে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং সামান্য কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটতে থাকে, যা তাঁর আর্থিক কষ্ট দূর করে।
চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি: ডাক্তারি পাস করার পর তিনি কলকাতায় না থেকে নিজ গ্রাম হিমাইতপুরে ফিরে আসেন। গ্রামীণ মানুষের সেবাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সাফল্য ছিল অভাবনীয়। তিনি কেবল ওষুধ দিতেন না, বরং নিজের মমতা দিয়ে রোগীর অর্ধেক রোগ সারিয়ে তুলতেন। তিনি বলতেন—
“চিকিৎসাতে চাস যদি তুই, আত্মপ্রাসাদ টাকা।
টাকার পানে না তাকিয়ে, রোগীর পানে তাকা।”

৬. ভাব-সমাধি ও ‘ঠাকুর’ উপাধি লাভ
চিকিৎসা করতে গিয়ে অনুকূলচন্দ্র অনুভব করলেন যে, মানুষের রোগ কেবল শরীরে নয়, মনে এবং আত্মাতেও থাকে। এই আত্মিক উন্নতির লক্ষে তিনি সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে কীর্তনের দল গড়ে তোলেন। কীর্তনের এই জোয়ারে হিমাইতপুর প্লাবিত হলো।
- অলৌকিক অবস্থা: কীর্তনের পরমানন্দে মগ্ন হয়ে অনুকূলচন্দ্র মাঝে মাঝে ভাব-সমাধিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন। সেই সময় তাঁর দেহ স্থির হয়ে যেত, মুখমণ্ডলে এক দিব্যজ্যোতি ফুটে উঠত এবং তাঁর মুখ থেকে অবিরল ধারায় বিভিন্ন ভাষায় উচ্চতর জীবনদর্শন ও বাণী উচ্চারিত হতো।
- পুণ্যপুঁথি: তাঁর এই সমাধি অবস্থায় মুখনিঃসৃত বাণীগুলো লিপিবদ্ধ করে সংকলিত হয়েছে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পুণ্যপুঁথি’। টানা একাত্তর দিন ধরে এই বাণীগুলো উচ্চারিত হয়েছিল।
- ঠাকুর সম্বোধন: এই অভাবনীয় আধ্যাত্মিক মহিমা দেখে সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘ডাক্তার বাবু’র পরিবর্তে শ্রদ্ধাভরে ‘ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিসেবে আপামর জনতার হৃদয়ে স্থান করে নেন।
৭. ‘সৎসঙ্গ’ প্রতিষ্ঠা ও মানুষ তৈরির আবাদ
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আধ্যাত্মিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল ‘সৎসঙ্গ’। তাঁর বাল্যসাথী অনন্তনাথ রায়, কিশোরীমোহন দাস এবং সতীশচন্দ্র গোস্বামী ছিলেন তাঁর এই পথচলার প্রথম সারথি।
- সৎসঙ্গের সংজ্ঞা: ঠাকুর বলতেন, “সৎ-এ সংযুক্তির সহিত তদ্গতি সম্পন্ন যাঁরা— তাঁরাই সৎসঙ্গী।” অর্থাৎ যারা সত্যের পথে চলে এবং উন্নত জীবন লাভের চেষ্টা করে, তাদের মিলনক্ষেত্রই হলো সৎসঙ্গ।
- প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ‘সৎসঙ্গ’ সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়। এর প্রথম সভানেত্রী ছিলেন ঠাকুরের পরমারাধ্য জননী মনোমোহিনী দেবী।
- হিমাইতপুর আশ্রম: হিমাইতপুর গ্রামটি ক্রমে একটি আধুনিক তপোবনে পরিণত হয়। সেখানে কেবল জপ-তপ নয়, বরং কৃষি, শিল্প, শিক্ষা এবং সুবিবাহ—এই চারটির সমন্বয়ে মানুষের অস্তিত্বের বিকাশের পথ দেখানো হয়। ঠাকুর বিশ্বাস করতেন, কর্মহীন ধর্ম পঙ্গু। তাই আশ্রমে নানা কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগার গড়ে তোলা হয়।
৮. ঠাকুরের ধর্মদর্শন: বাঁচা-বাড়ার বিজ্ঞান
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ধর্মকে কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁর মতে, যা মানুষকে বাঁচায় এবং বাড়ায়, তাই ধর্ম। তিনি সহজ ভাষায় বলেছেন:
“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম ব’লে জানিস তাকে।
বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা ঠিকই জেনো ধর্ম তা।”
- একত্ববাদ: তিনি প্রচার করতেন যে ঈশ্বর এক, ধর্ম এক এবং যুগে যুগে প্রেরিত পুরুষগণ একই পরম পিতার বার্তাবাহী।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: তিনি বলতেন, “ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে, সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।” তাঁর কাছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবই ছিল এক শাশ্বত মানবতার অংশ। তিনি চাইতেন এমন একটি সমাজ যেখানে প্রত্যেকে একে অপরের সহযোগিতায় সার্থক হতে পারে।
৯. সাহিত্য ও অমূল্য গ্রন্থাবলি
ঠাকুরের মুখনিঃসৃত বাণীসমূহ এবং তাঁর দর্শন অসংখ্য গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে, যা আজও কোটি কোটি মানুষকে পথ দেখায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো:
- সত্যানুসরণ: এটি তাঁর দর্শনের মূল আকর গ্রন্থ।
- পুণ্যপুঁথি: তাঁর ভাব-সমাধি অবস্থায় উচ্চারিত বাণীর সংকলন।
- চলার সাথী, নানা প্রসঙ্গে, বিবাহ বিধায়না, ইসলাম প্রসঙ্গে, আর্য কৃষ্টি ইত্যাদি।
তাঁর রচিত বাণীগুলো ছোট ছোট ছড়ার মতো হলেও তার গভীরতা ছিল অপরিসীম। যেমন:
“মানুষ যদি চাস রে তুই, মানুষ হতে শেখ।
নিজের ভেতর পরের তরে, দরদটুকু রাখ।”
১০. মহাপ্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘ ৮১ বছরব্যাপী এক কর্মময় ও আধ্যাত্মিক জীবনের পর ১৩৭৬ সনের ১২ই মাঘ (ইংরেজি ১৯৬৯ সাল) শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মহাপ্রয়াণ করেন।
যদিও তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সৎসঙ্গ’ আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ভারতের দেওঘরে এবং বাংলাদেশের পাবনাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ সৎ ও সুন্দর জীবন যাপনের প্রেরণা পাচ্ছে। তাঁর জীবনের মূল শিক্ষা ছিল— নিজেকে উন্নত করো এবং অন্যকেও উন্নত হতে সাহায্য করো।

শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ছিলেন এক আধুনিক ঋষি। তিনি কেবল আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন না, বরং এক মহান বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টি দিয়ে মানবসভ্যতার সংকট সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর ‘সৎসঙ্গ’ কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আসলে মানুষ তৈরির এক কারখানা। আজও তাঁর বাণী আমাদের সংকীর্ণতা ভুলে প্রকৃত ‘মানুষ’ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
