হিন্দুধর্মের আঠারোটি মহাপুরাণের মধ্যে বরাহ পুরাণ (Varaha Purana) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ। এই পুরাণের নামটির উৎস হলো ভগবান বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার ‘বরাহ’ (বন্য বরাহ)। মহাপ্লাবনের অতল গহ্বর থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করার সেই পৌরাণিক বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করেই এই পুরাণের ভিত্তি রচিত।
Table of Contents
বরাহ পুরাণ
পুরাণের গঠন ও দার্শনিক বৈশিষ্ট্য
বরাহ পুরাণ প্রধানত ভগবান বিষ্ণু বা নারায়ণের মাহাত্ম্য প্রচার করলেও এটি একটি উদার ও সমন্বয়ধর্মী গ্রন্থ।
- ত্রিশক্তির মাহাত্ম্য: কেবল বৈষ্ণবীয় আখ্যান নয়, এতে মহাদেব শিব এবং আদিশক্তির তিন রূপ— ব্রাহ্মী, বৈষ্ণবী ও রৌদ্রীর মহিমা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে।
- ধর্মসংহিতা: এই পুরাণের একটি বিশেষ অংশ হলো ‘ধর্মসংহিতা’। এখানে কর্মফল, পুনর্জন্ম এবং ধর্মের সূক্ষ্ম দার্শনিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
- শ্লোক সংখ্যা: প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী এই পুরাণে প্রায় ২৪,০০০ শ্লোক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রাপ্ত সংস্করণগুলোতে ১০,০০০ এর মতো শ্লোক পাওয়া যায়।
মূল উপজীব্য: ধরিত্রী উদ্ধার
মহাপ্লাবনের সময় হিরণ্যাক্ষ নামক দানব যখন পৃথিবীকে সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে ফেলেছিল, তখন ভগবান বিষ্ণু বরাহ রূপ ধারণ করে তাকে বিনাশ করেন এবং দাঁতের অগ্রভাগে করে ধরিত্রীকে উদ্ধার করেন। উদ্ধারপ্রাপ্ত ধরিত্রী বা পৃথিবী দেবীর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীহরি যে সকল তত্ত্ব ও কাহিনী বর্ণনা করেন, তা-ই এই পুরাণের মূল নির্যাস।
বরাহ পুরাণের উল্লেখযোগ্য খণ্ডসমূহ
পৃথ্বীরাজ সেনের সংকলনে এই পুরাণের সূচনা ও আদি কাহিনীগুলো অত্যন্ত সহজভাবে ফুটে উঠেছে:
| বিভাগ | আলোচনার মূল বিষয়বস্তু |
| পুরাণের পটভূমি, বক্তা ও শ্রোতার পরিচয় এবং বরাহ অবতারের আবির্ভাবের কারণ। | |
| ০২. | সৃষ্টির আদিতে পঞ্চভূতের উৎপত্তি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠন প্রক্রিয়া। |
বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু
বরাহ পুরাণ কেবল ধর্মীয় কাহিনী নয়, বরং এটি একটি জীবনমুখী নির্দেশিকা। এতে আলোচিত হয়েছে:
- তীর্থ মাহাত্ম্য: মথুরা ও কোকা-মুখ নামক পবিত্র তীর্থস্থানগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা।
- দান ও ব্রত: বিভিন্ন তিথিতে দান করার সুফল এবং একাদশীসহ অন্যান্য ব্রত পালনের নিয়ম।
- পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত: অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য শাস্ত্রীয় সমাধান বা প্রায়শ্চিত্তের বিধান।
বরাহ পুরাণ আমাদের শেখায় যে, যখনই পৃথিবী অধর্মের ভারে নুয়ে পড়ে, তখনই ভগবান শ্রীহরি ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। পৃথ্বীরাজ সেনের এই সংস্করণটি পাঠ করলে পাঠক কেবল অলৌকিক কাহিনীই জানবেন না, বরং সৃষ্টির আদি ইতিহাস ও ধর্মের প্রকৃত মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারবেন।
