পরঞ্জয়ের কাহিনী – বিষ্ণুপুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

বিষ্ণুপুরাণের চতুর্থ অংশে রাজবংশের বর্ণনায় আমরা ইক্ষ্বাকু বংশীয় রাজা পরঞ্জয়ের এই অদ্ভুত বীরত্বগাথা খুঁজে পাই। এটি কেবল একটি যুদ্ধের গল্প নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে যখন স্বর্গীয় শক্তি ও মর্ত্যের বীরত্ব একীভূত হয়, তখন অশুভের বিনাশ অনিবার্য।

দেবগণের সংকট ও বিষ্ণুর পরম পরামর্শ

ত্রেতাযুগের শুরুর দিকের কথা। দেবতারা অমর হওয়া সত্ত্বেও অসুরদের প্রবল বিক্রমে বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। একসময় দানবরা স্বর্গরাজ্য দখল করে নিলে দেবতারা শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন হন।

  • বিষ্ণুর বিধান: ভগবান বিষ্ণু দেবতাদের জানালেন, সরাসরি যুদ্ধের বদলে মর্ত্যের বীরত্বের সহায়তা নিতে হবে। তিনি ইক্ষ্বাকু বংশীয় রাজা বিকুক্ষির পুত্র পরঞ্জয়কে সাহায্যের জন্য মনোনীত করলেন। শ্রীবিষ্ণু প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তিনি পরঞ্জয়ের দেহে নিজের তেজ আধান (প্রবেশ) করবেন, যাতে অসুর বিনাশ সহজ হয়।

পরঞ্জয়ের অদ্ভুত শর্ত ও ইন্দ্রের আত্মত্যাগ

দেবতারা যখন মর্ত্যে এসে পরঞ্জয়ের কাছে করজোড়ে সাহায্য চাইলেন, তখন রাজা এক কঠিন ও কিছুটা অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দিলেন।

  • শর্তের সারকথা: পরঞ্জয় বললেন, তিনি তখনই যুদ্ধে যাবেন যদি দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং তাঁর বাহন হন। অর্থাৎ, তিনি ইন্দ্রের কাঁধে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন।
  • দেবতাদের নিরুপায় সম্মতি: ইন্দ্র প্রথমে এই প্রস্তাবে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজি হন। কারণ শত্রু বিনাশের জন্য দম্ভ ত্যাগ করে এক হওয়া ছাড়া তাঁদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

ককুৎস্থ ও পরঞ্জয়ের অসুর বিজয়

শর্তানুসারে ইন্দ্র এক বিশাল বৃষের (ষাঁড়) রূপ ধারণ করলেন। পরঞ্জয় সেই বৃষের ককুদ্ বা পিঠের কুঁজের ওপর চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন।

  • বিষ্ণুর তেজে বলীয়ান: পরঞ্জয়ের শরীরে তখন শ্রীবিষ্ণুর অপরাজেয় তেজ প্রদীপ্ত। সেই অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তিনি দানব বাহিনীকে তছনছ করে দিলেন।
  • নামকরণ রহস্য: যেহেতু তিনি ইন্দ্রের পিঠের কুঁজের ওপর (সংস্কৃতে যাকে ‘ককুদ্’ বলা হয়) বসে যুদ্ধ করেছিলেন, তাই তাঁর নাম হলো ‘ককুৎস্থ’। এই ঘটনার পর থেকেই ইক্ষ্বাকু বংশের রাজাদের সম্মানসূচক উপাধি হিসেবে ‘ককুৎস্থ’ শব্দটি যুক্ত হয়।

কাহিনীর নৈতিক শিক্ষা

এই উপাখ্যানটি আমাদের দুটি বিশেষ শিক্ষা দেয়: ১. একতা ও বিনয়: দেবরাজ ইন্দ্রের মতো প্রতাপশালী শক্তিকেও মঙ্গলের জন্য নিজের অহং ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের বাহন হতে হয়েছে। ২. ঐশ্বরিক ও মানব শক্তির মিলন: মর্ত্যের মানুষের প্রচেষ্টা এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ এক হলে ত্রিভুবনে কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না।

বিষ্ণুপুরাণ

রাজা পরঞ্জয় বা ককুৎস্থের এই বীরত্বগাথা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের যুদ্ধে জয় নিশ্চিত। পৃথ্বীরাজ সেনের সাবলীল লেখনীতে এই প্রাচীন আখ্যানটি আধুনিক পাঠকের কাছে বীরত্ব ও ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment