ভবিষ্য পুরাণের সৃষ্টির কথা – ভবিষ্য পুরাণ – পৃথ্বীরাজ সেন

ইতিহাস ও সাধারণ পুরাণগুলো সাধারণত অতীতের কাহিনী বর্ণনা করে। কিন্তু মানুষের চিরন্তন কৌতূহল হলো—আগামীতে কী ঘটবে? এই কৌতূহল মেটাতেই মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচনা করেছেন ভবিষ্য পুরাণ। এটি অষ্টাদশ মহাপুরাণের মধ্যে অন্যতম এক রহস্যময় ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা গ্রন্থ।

পুরাণের প্রেক্ষাপট: নৈমিষারণ্যের জিজ্ঞাসা

নৈমিষারণ্যের পবিত্র ভূমিতে শৌনকাদি ষাট হাজার মুনি সমবেত হয়ে জ্ঞানচর্চায় মগ্ন ছিলেন। সেখানে মহামুনি লোমহর্ষণ সূত অতীতের বহু কাহিনী ও পৃথিবীর আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। কিন্তু মুনিগণের মনে এক নতুন জিজ্ঞাসা জাগল—তাঁরা জানতে চাইলেন অনাগত সময়ের কথা।

  • মুনিগণের প্রশ্ন: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা সংবরণ, পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থান, রাজা পরীক্ষিতের সর্পদংশনে মৃত্যু এবং জন্মেজয়ের সর্পসত্র যজ্ঞ—এইসব ঘটনার পর পৃথিবী কোন পথে এগোবে?
  • ত্রিকালজ্ঞ ব্যাসদেব: পরাশর নন্দন বেদব্যাস ছিলেন দিব্যদৃষ্টির অধিকারী। তিনি তাঁর দিব্যজ্ঞানে আগামী হাজার বছরের ঘটনাবলী দর্শন করে তা শিষ্য লোমহর্ষণকে জানিয়েছিলেন। সেই ভবিষ্যৎবাণীগুলোই এই পুরাণের মূল উপজীব্য।

ভবিষ্য পুরাণের বিষয়বস্তু ও বিভাগ

ভবিষ্য পুরাণ মূলত চারটি পর্বে বিভক্ত: ব্রাহ্ম, বৈষ্ণব, শৈব ও প্রতিসর্গ পর্ব

পর্বের নামমূল আলোচনার বিষয়
ব্রাহ্ম পর্বসৃষ্টিতত্ত্ব, সূর্যদেবের মহিমা এবং সামাজিক সংস্কার ও উৎসবের বর্ণনা।
বৈষ্ণব ও শৈব পর্ববিষ্ণু ও শিবের উপাসনা এবং বিভিন্ন ব্রত-পার্বণের ভবিষ্যৎ ফল।
প্রতিসর্গ পর্বএটি সবচেয়ে আলোচিত অংশ। এখানে কলিযুগের রাজবংশ, বিভিন্ন বিদেশি আক্রমণ এবং আধুনিক ইতিহাসের নানা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সৃষ্টির কথা ও চতুর্দশ ভুবন

ভবিষ্য পুরাণে কেবল ভবিষ্যতের কথা নয়, সৃষ্টির এক বিশাল মানচিত্রও দেওয়া হয়েছে। এখানে চতুর্দশ ভুবনের (সাতটি ঊর্ধ্বলোক এবং সাতটি অধোলোক) বর্ণনা পাওয়া যায়।

  • সৃষ্টির প্রবাহ: প্রলয়ের পর কীভাবে আবার সৃষ্টি শুরু হয় এবং ব্রহ্মার মানসপুত্রদের মাধ্যমে কীভাবে জীবকুলের বিস্তার ঘটে, তা এখানে বিস্তারিত আলোচিত।
  • কলিযুগের লক্ষণ: এই পুরাণে কলিযুগের মানুষের আচরণ, ধর্মের গ্লানি এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের যে নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান সময়ের সাথে আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায়।

কেন এই পুরাণ অনন্য?

ভবিষ্য পুরাণকে বলা হয় ‘ইতিহাসের ভবিষ্যৎ রূপ’। এতে কেবল রাজবংশ নয়, বরং পৃথিবীর ভৌগোলিক পরিবর্তন ও মানবসভ্যতার বিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। পৃথ্বীরাজ সেনের সহজবোধ্য উপস্থাপনায় এই জটিল ভবিষ্যৎবাণীগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়াই হলো ভবিষ্য পুরাণের মূল শিক্ষা। শৌনকাদি মুনিগণের কৌতূহল মেটাতে লোমহর্ষণ মুনি যে অমৃতকথা পরিবেশন করেছিলেন, তা আজও আমাদের জীবনের অনিশ্চয়তা দূর করতে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।

Leave a Comment