হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম পুরাণগুলোর মধ্যে মৎস্য পুরাণ অন্যতম। এই পুরাণের মূল উপজীব্য হলো প্রলয়কালে জগতকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণুর প্রথম অবতার ‘মৎস্য’ রূপে আবির্ভূত হওয়ার কাহিনী।
Table of Contents
১. প্রলয়কাল ও মৎস্য অবতারের আবির্ভাব
যখন মহাপ্রলয় আসন্ন হলো, তখন ভগবান শ্রীহরি সূর্যপুত্র রাজর্ষি সত্যব্রত মনুর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে তাঁকে মৎস্যরূপে দর্শন দিলেন। জগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শ্রীহরি মনুকে এক বিশাল নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। সেই নৌকায় মনু সপ্তর্ষি (সাতজন প্রধান ঋষি) এবং জগতের যাবতীয় উদ্ভিদের বীজ ও প্রাণীকুলকে সংগ্রহ করে আরোহণ করলেন।
২. উত্তাল সমুদ্র ও বাসুকীর বন্ধন
প্রলয়কালে যখন প্রলয়পয়োধিজলে নৌকাটি ভীষণভাবে দুলতে শুরু করল, তখন মনুর প্রার্থনায় ভগবান মৎস্য পুনরায় আবির্ভূত হলেন—যার আকার ছিল নিযুত যোজন বিস্তৃত।
- দৈব বন্ধন: নৌকার বন্ধন রজ্জু (দড়ি) হিসেবে উপস্থিত হলেন নাগরাজ বাসুকী।
- নিরাপদ যাত্রা: সত্যব্রত মনু বাসুকীর লেজ নৌকার সাথে এবং মুখটি মৎস্যরূপী ভগবানের বিশাল শিং-এর সাথে বেঁধে দিলেন।
৩. মৎস্য পুরাণের প্রচার ও বিস্তার
এই সমুদ্রযাত্রার মাঝেই মৎস্যরূপী ভগবান রাজা সত্যব্রতকে যে গূঢ় তত্ত্ব ও সৃষ্টিরহস্যের উপদেশ দেন, তাই মৎস্য পুরাণ নামে অভিহিত। পরবর্তীতে পরাশর নন্দন ব্যাসদেব এই কাহিনীগুলো সংকলন করেন। ব্যাসদেবের শিষ্য সূত মুনি নৈমিষারণ্যে সমবেত ঋষিদের কাছে এই পবিত্র পুরাণ কীর্তন করেন।
৪. উল্লেখযোগ্য উপাখ্যানসমূহ (সংক্ষিপ্ত পরিচিতি)
পৃথ্বীরাজ সেনের এই সংকলনে মৎস্য পুরাণের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় কাহিনী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে:
| ক্রমিক | উপাখ্যানের নাম | মূল বিষয়বস্তু |
| ০১ | কচের সঞ্জীবনী বিদ্যালাভ | শুক্রাচার্য ও তাঁর কন্যা দেবযানীর ট্র্যাজেডি এবং কচের নিষ্ঠার কাহিনী। |
| ০২ | দেবগুরু বৃহস্পতির ছলনায় দানবদের পরাভব | দেবতাদের জয়ের জন্য বৃহস্পতির বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের বিবরণ। |
| ০৩ | মিত্রবরুণ ও অগস্ত্যের কাহিনী | অগস্ত্য মুনির জন্ম ও তাঁর অলৌকিক শক্তির উৎস। |
| ০৪ | মহারাজা পুষ্পবাহনের কাহিনী | ধর্মপরায়ণ রাজার রাজ্যশাসন ও আধ্যাত্মিক উত্তরণ। |
| ০৫ | তারকাসুর বধ | কার্তিকেয় বা স্কন্দ কর্তৃক অপরাজেয় তারকাসুর দমনের বীরত্বগাথা। |
মৎস্য পুরাণ আমাদের শেখায় যে, বিনাশের মাঝেও সৃষ্টির বীজ সুপ্ত থাকে এবং পরমেশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখলে কঠিন প্রলয়ও অতিক্রম করা সম্ভব। পৃথ্বীরাজ সেনের সহজ ও সাবলীল বর্ণনায় এই প্রাচীন পুরাণটি বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে।
