পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রদের জন্মবৃত্তান্ত | মহাভারত

পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রদের জন্মবৃত্তান্ত : কুরুবংশে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডু ও বিদুর এই তিন কুমার জন্মগ্রহণ করিলে তাহাদের রাজ্যান্তর্গত কুরুজাঙ্গল কুরব এবং কুরুক্ষেত্র এই কয়টি প্রদেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া উঠিল। এই সময়ে নিয়মিত জলবর্ষণ হওয়ায় পৃথিবী শস্যে পরিপূর্ণ হইল। নগর ব্যবসায়ী ও শিল্পিসমূহে পরিব্যাপ্ত হইল। প্রজামণ্ডলী ধর্মনিরত কর্মশীল ও পরস্পর প্রণয়পর হইয়া স্বচ্ছন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিল।

পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রদের জন্মবৃত্তান্ত

মহাত্মা ভীষ্ম কুমারত্রয়কে পুত্রনির্বিশেষে প্রতিপালন করিলেন। যথাক্রমে তিনি তাহাদিগকে জাতক্রিয়া প্রভৃতি সমস্ত সংস্কারে সংস্কৃত করিলেন। কুমারেরা তরুণাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া ধনুর্বেদ গদাযুদ্ধ অসিচর্মপ্রয়োগ গজশিক্ষা নীতিশাস্ত্র ইতিহাস পুরাণ বেদাঙ্গ প্রভৃতি সকল প্রকার বিদ্যা ও ব্যায়ামে পারদর্শী হইয়া উঠিলেন। পাণ্ডু ধনুর্বিদ্যায় শ্রেষ্ঠ ও ধৃতরাষ্ট্র অসাধারণ বলবান হইলেন। বিদুরের ন্যায় ধার্মিক ত্রিভুবনে দৃষ্ট হইত না। নষ্টপ্রায় কুরুবংশ এমন সুচারুরূপে পুনরুদ্ধৃত হইলে, সকলের বিশেষ আনন্দবর্ধন হইল।

[ পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রদের জন্মবৃত্তান্ত ]

ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ এবং বিদুর দাসীপুত্র বলিয়া, কুমারগণ যৌবনপ্রাপ্ত হইলে পাণ্ডুই সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন। অনন্তর একদা ভীষ্ম বিদুরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন —

বৎস! আমাদের এই সুমহান বংশ একবার লুপ্তপ্রায় হইয়া মহর্ষি দ্বৈপায়নের কৃপায় রক্ষিত হইয়াছে। অধুনা আর সেরূপ দুর্গতি না হয়, বরং যাহাতে আমাদের বংশের ক্রমে উন্নতি হইতে থাকে, সেইজন্য সুকুলীনা সৎপাত্রীর সহিত তোমাদের সকলের বিবাহ দেওয়া নিতান্ত কর্তব্য বিবেচনা করিতেছি। তোমার এ বিষয়ে অভিপ্রায় কি?

বিদুর বলিলেন—মহাশয়। আপনি আমাদের পিতৃতুল্য ও পরম গুরু; অতএব আপনিই যাহা উচিত হয়, স্বয়ং বিবেচনাপূর্বক অনুষ্ঠান করুন।

Bheeshma
Bheeshma

অনন্তর কুরুশ্রেষ্ঠ ভীষ্ম উপযুক্ত পাত্রীর অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া বিপ্ৰগণপ্রমুখাৎ শ্রবণ করিলেন যে গান্ধাররাজ সুবলের গান্ধারীনাম্নী নবযৌবনা ও লক্ষ্মীযুক্তা এক যশস্বিনী কন্যা আছে। ধৃতরাষ্ট্রের জন্য এই কন্যা প্রার্থনা করিয়া গান্ধাররাজের নিকট দূত প্রেরণ করা হইল। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ বলিয়া রাজা সুবল প্রথমত কিয়ৎক্ষণ ইতস্তত করিলেন।

পরিশেষে সুবিখ্যাত কুরুকুলের সহিত সম্বন্ধ ও সদ্বৃত্ত জামাতা প্রাপ্তির অভিলাষে তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে কন্যাদান করিতে সম্মত হইলেন। গান্ধারী যখন শ্রবণ করিলেন যে তাঁহাকে অন্ধ পাত্রে সমর্পণ করা হইবে, তখন মনে মনে সংকল্প করিলেন যে পতিকে তিনি কখনও অতিক্রম করিবেন না। এই নিমিত্ত সেই মুহূর্ত হইতে সেই সাধ্বী স্বীয় নেত্রযুগল

বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত করিলেন। সে বন্ধন ইহজীবনে তিনি আর মোচন করেন নাই।

গান্ধার-রাজতনয় শকুনি পিতৃ-আজ্ঞায় ভগিনীকে লইয়া কৌরবসমীপে উপনীত হইলেন এবং ভীষ্মের অনুমতিক্রমে তাঁহাকে যথাবিধি ধৃতরাষ্ট্রের হস্তে সম্প্রদান করিলেন। সুশীলা গান্ধারী সদাচার ও সদ্ব্যবহারে কৌরবগণের পরম সন্তোষ উৎপাদন করিতে লাগিলেন। তিনি গুরুজনকে সেবা ও সকলকে প্রীতি করিতেন এবং কাহারও প্রতি দ্বেষ বা হিংসা করিতেন না।

অনন্তর যদুকুলতিলক শুরনামা নৃপতির পৃথানাম্নী পরমাসুন্দরী কন্যা স্বয়ম্বরা হইবেন, এই সংবাদ ভীষ্মের নিকট প্রেরিত হইল। রাজা শূরসেন অনপত্য পিতৃস্বসৃপুত্র ভোজরাজ কুন্তিকে অপত্যরূপে প্রথম সন্তান দিবেন বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।

এই হেতু তিনি এই জ্যেষ্ঠা কন্যাকে মিত্র কুত্তির আশ্রয়ে সমর্পণ করিয়াছিলেন। তাঁহার গৃহে পৃথা দিনে দিনে চন্দ্রকলার ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন এবং কুন্তিভোজের পালিত বলিয়া কুন্তীনামে অভিহিত হইলেন।

একদা মহাতেজস্বী মহর্ষি দুর্বাসা ভোজরাজের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করিলেন। আতিথেয়ী কুন্তী ভক্তিভরে ও পরম সমাদরে তাঁহার সেবা যথাবিধি নির্বাহ করিলে, মহর্ষি পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে এক মহামন্ত্র প্রদানপূর্বক বলিলেন—বৎসে! আমি তোমার পরিচর্যায় সন্তুষ্ট হইয়া তোমায় এই মন্ত্র প্রদান করিলাম, ইহা প্রয়োগ পূর্বক তুমি যখন যে দেবতাকে আহ্বান করিবে, তিনিই তোমাকে একটি পুত্র প্রদান করিবেন।

মুনিবর প্রস্থান করিতে না করিতেই, বালস্বভাবসুলভ কৌতূহলপরবশ হইয়া কুন্তী পরীক্ষাস্বরূপ সূর্যদেবের উদ্দেশে মহর্ষিদত্ত মন্ত্র উচ্চারণ করিলেন। মন্ত্রবলে অশেষ-ভুবনদীপক বিভাকর চতুর্দিক সমুজ্জ্বল করিয়া কুম্ভীর সম্মুখে ধরাতলে অবতীর্ণ হইলেন। এই আশ্চর্য ব্যাপার দর্শনে কুন্তী ক্ষণকাল স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন। পরে অকারণে সূর্যদেবকে ডাকিয়াছেন অনুভব করিয়া লজ্জিতভাবে কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন—

বিভো! অনবধানতাবশত এক ব্রাহ্মণদত্ত মন্ত্র প্রয়োগ করিয়া আপনাকে অনর্থক বিরক্ত করিয়া আমি অতি মূঢ়তার কার্য করিয়াছি, অপরাধিনীকে ক্ষমা করুন। বালিকার কাতরোক্তি শুনিয়া সূর্যদেব মধুর বচনে তাহাকে আশ্বাস দিলেন সুন্দরী! তোমার ভয়ের কোন কারণ নাই। মহর্ষি দুর্বাসাদত্ত যে মন্ত্র তুমি উচ্চারণ করিয়াছ, তাহার প্রভাবে তোমার এক পরম রূপবান পুত্র জন্মিবে।

Duryodhana showing his army to Drona, দূর্যোধন
Duryodhana showing his army to Drona, দূর্যোধন

পুত্রের সম্ভাবনায় কুমারী কুন্তীকে নিতান্ত কুণ্ঠিত দেখিয়া সূর্যদেব পুনরায় সান্ত্বনাবাক্যে কহিলেন হে ভীরু! মপ্রদত্ত এই পুত্রলাভে তোমার সঙ্কোচের কোনই কারণ নাই। ইহাতে তোমার কন্যাবস্থার কোন হানি হইবে না। আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া বর দিতেছি যে তোমার এই পুত্র দিব্য কুণ্ডল ও অভেদ্য কবচধারী হইয়া জন্মগ্রহণ করিবে।

এই বলিয়া ভগবান ভাস্কর অম্বরতলে আরোহণ করিলেন।

অনন্তর কুন্তীর এক সহজাত-কবচকুণ্ডলধারী পুত্র হইল। কুন্তী এই পুত্র লইয়া কি করিবেন কিছুই ভাবিয়া স্থির করিতে পারিলেন না। অবশেষে অনেক দ্বিধা করিয়া তিনি সদ্যোজাত শিশুকে নদীতে ভাসাইয়া দিলেন। নদীতীরবাসী কুরুরাজসারথি অধিরথ এই দিব্য নবকুমারকে জলে ভাসমান দেখিয়া দয়াদ্রচিত্তে তাহাকে উদ্ধারপূর্বক পত্নী রাধাকে দান করিলেন এবং তাহাকে বসুসেন নাম দিয়া নিজপুত্রবৎ পালন করিতে লাগিলেন।

এই ঘটনার কিয়ৎকাল পরে কুত্তী নবযৌবনাবস্থা প্রাপ্ত হইলেন। তাঁহার অসামান্য রূপের কথা চতুর্দিকে রটনা হওয়ায় নানাদেশস্থ ভূপতিগণ তাঁহার হস্তপ্রার্থী হইলেন। কুন্তিভোজ অনেকের মধ্যে কাহাকে কন্যাদান করিবেন স্থির করিতে না পারায় স্বয়ম্বর অনুষ্ঠানই বিধেয় বিবেচনা করিয়া সেই উপলক্ষ্যে রাজগণকে নিমন্ত্রণ করিলেন।

নিরূপিত দিবসে অন্যান্য বিবিধ মনোহর-বেশভূষণধারী নৃপতির সহিত মহারাজ পাণ্ডু ভীষ্মের অনুমতিক্রমে তথায় উপস্থিত হইলেন। মনস্বিনী কুন্তী কম্পিত পদরিক্ষেপে পুষ্পমাল্য-হস্তে রঙ্গস্থলে অবতীর্ণ হইয়া চতুর্দিকে একবার চকিত দৃষ্টিপাত করিবামাত্র অনুভব করিলেন যে, ভরতবংশাবতংস মহাবল পাণ্ডু সূর্যসদৃশ প্রভার দ্বারা অন্যান্য ভূপতিগণের তেজ ম্লান করিতেছেন। অন্য কোন দিকে দৃপাত না করিয়াই কুত্তী লজ্জানম্রবদনে তাঁহার গলে বরমাল্য প্রদান করিলেন।

পাণ্ডুকে বরণ করা হইয়াছে দেখিয়া অন্যান্য রাজগণ দ্বিরুক্তি না করিয়া স্ব স্ব ভবনে প্রত্যাগমন করিলেন।

শুভলগ্নে পাণ্ডুর সহিত পৃথার বিবাহকার্য নির্বাহ হইয়া গেল। কুন্তিভোজ বহু ধনসম্পত্তি প্রদানপূর্বক বরকন্যাকে স্বনগরে পাঠাইয়া দিলেন। দ্বিজগণের আশীর্বচন শ্রবণ করিতে করিতে নবদম্পতি পুরীপ্রবেশ করিয়া সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন।

অনস্তর ভীষ্ম মদ্ররাজ শল্যের এক অনুপমা রূপবতী ভগিনীর কথা শ্রবণ করিয়া এবং মদ্ররাজবংশকে স্বীয় বংশের যোগ্য বিবেচনা করিয়া কুটুম্বিতা-বর্ধনার্থ পাণ্ডুর আর এক বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিলেন। এই অভিপ্রায়ে তিনি মহাসমারোহে মদ্ররাজ্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন।

Shikhandi
Shikhandi

মদ্রাধিপতি সে সংবাদে পরম সমাদরসহকারে স্বয়ং প্রত্যুগমন করিয়া সাদরসম্ভাষণে ভীষ্মকে পুরপ্রবেশ করাইলেন। ভীষ্ম শিষ্টতা প্রদর্শনপূর্বক রথ-গজ-তুরগ বসনভূষণ মণিমাণিক্য প্রদানে মদ্ররাজকে প্রীত করিয়া তাঁহার ভগিনী মাদ্রীকে লইয়া প্রত্যাগমন করিলেন। যথালগ্নে ইঁহারও পাণ্ডুর সহিত বিবাহ হইল। অনন্তর মহীপতি দেবকের পরমাসুন্দরী পারশবী কন্যাকে আনয়নপূর্বক ভীষ্ম বিদুরের সহিত তাহার বিবাহ দিলেন।

এইরূপে একে একে ভ্রাতুষ্পুত্রত্রয়ের বিবাহকার্য সুসম্পন্ন হওয়ায় বংশলোপের আর কোন আশঙ্কা রহিল না। ভীষ্ম নিশ্চিন্ত হইলেন।

প্রণয়িনীদ্বয়কে লইয়া পাণ্ডু কিছুকাল অন্তঃপুরে পরম রমণীয় হমমধ্যে অবস্থান করিলেন। কিন্তু অধিক দিন অলসভাবে থাকিতে তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। তিনি ভীষ্মের অনুমতি লইয়া বৃদ্ধগণকে ও জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্রকে অভিবাদন এবং অন্যান্য সকলের নিকট যথোপযুক্ত সম্ভাষণে বিদায় গ্রহণপূর্বক নগরাঙ্গনাদের মঙ্গলাচরণে ও ব্রাহ্মণগণের আশীর্বচনে উৎসাহিত হইয়া চতুরঙ্গসৈন্য সমভিব্যাহারে দিগ্বিজয়ার্থ বহির্গত হইলেন।

পূর্বে যে সকল রাজগণ কুরুরাজ্যের বিভিন্ন অংশ সকল অপহরণ করিয়াছিলেন, মহবীর পাণ্ডু তাঁহাদিগকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া সেইগুলি পুনরুদ্ধার করিলেন। চতুর্দিকস্থিত বলবান নৃপতিসকলকে পরাজয় করিয়া মিত্রতা স্থাপনপূর্বক তাঁহাদের নিকট করগ্রহণ করিলেন। এইরূপে মগধ মিথিলা কাশী প্রভৃতি বহু দেশ বশীভূত এবং অশেষ ধনরত্ন সংগ্রহ করিয়া কুরুরাজ্যের অপূর্ব বিস্তৃতি ও শ্রীবৃদ্ধিসাধনে তিনি ভরত ও কুরুর নির্বাপিতপ্রায় কীর্তি উজ্জ্বলতররূপে স্থাপন করিলেন।

পরাভূত রাজগণবেষ্টিত পাণ্ডু ধন্যবাদ শ্রবণ করিতে করিতে পরিতুষ্ট মনে হস্তিনাপুরাভিমুখে প্রত্যাগমন করিলেন। নির্বিঘ্নে মহৎ কার্যসকল সম্পাদন করিয়া বিজয়ী পাণ্ডু ফিরিতেছেন শুনিয়া ভীষ্ম মহা আনন্দে অগ্রসর হইয়া আসিলেন।

পাণ্ডু ভীষ্মের পাদবন্দনপূর্বক পৌর ও জানপদদিগকে যথোচিত সম্ভাষণ করিলে ভীষ্ম তাঁহাকে সস্নেহে আলিঙ্গন করিয়া আনন্দাশ্রু মোচন করিতে লাগিলেন। তুর্য শঙ্খ দুন্দুভি প্রভৃতি ধ্বনিত হইতে লাগিল। পৌরগণের আনন্দের আর সীমা রহিল না। পুরপ্রবেশ করিয়া পাণ্ডু গুরুজনসকলকে বলবিজিত ধন প্রদান করিয়া কৃতার্থ হইলেন।

Mahabharat - Devdutt
Mahabharat – Devdutt

কিছুকাল পৌরসুখ সম্ভোগ করিয়া পাণ্ডুর মৃগয়া উপলক্ষ্যে ভ্রমণের ইচ্ছা হইল। তিনি হিমালয়ের দক্ষিণপার্শ্ববর্তী রমণীয় উপত্যকায় অবস্থান করিয়া কখনও পত্নীদ্বয় সমভিব্যাহারে গিরিপৃষ্ঠে বিচরণপূর্বক কখনও বা মহাশালবনমধ্যে মৃগয়ানুষ্ঠানে সুখসম্ভোগ করিতেন। ভ্রাতার যাহাতে কোনরূপ কষ্টবোধ না হয়, এই নিমিত্ত স্নেহপরায়ণ ধৃতরাষ্ট্র নিয়মিত তাঁহার সন্নিধানে সকল প্রকার ভোগ্যবস্তু প্রেরণ করিতেন। বনবাসিগণও পাণ্ডুর প্রভা অবলোকনে তাঁহাকে দেববিশেষ জ্ঞান করিয়া যথেষ্ট সেবা করিত।

একদা মৃগয়াবিহারী পাণ্ডু মৃগব্যালসেবিত এক মহারণ্যমধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে ক্রীড়ামত্ত মৃগযুগল দেখিতে পাইলেন। সুযোগ অবলম্বনপূর্বক পাণ্ডু মৃগকে সহজেই বহুবাণে বিদ্ধ করিয়া ধরাশায়ী করিলেন।

কিন্তু এই মৃগযুগল প্রকৃতপক্ষে মৃগ নহে। এক ঋষিপুত্র ক্রীড়া উপলক্ষে পত্নীসহ এই আকার ধারণ করিয়া বনবিহার করিতেছিলেন। কঠিন শরাঘাতে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া ঋষিতনয় মৃত্যুযন্ত্রণায় আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। তখন মৃগভ্রমে ব্রাহ্মণকুমারের প্রাণনাশ করিয়াছেন বুঝিয়া পাণ্ডু অত্যন্ত ব্যাকুল ও ভীত হইয়া সকাতরে মুনিকুমারের নিকট মার্জনা-ভিক্ষা করিলে তিনি বলিলেন

মহারাজ! আমাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া চিনিতে পার নাই, এজন্য তোমাকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু অকলঙ্ককুলে জন্মগ্রহণ করিয়া কিরূপে সুখক্রীড়াশীল মৃগের উপর তীক্ষ্ণ বাণ প্রয়োগ করিতে তোমার প্রবৃত্তি হইল?

রাজা লজ্জিত হইয়া বলিলেন

হে ঋষিপুত্র! মৃগয়াকালীন অভ্যাসবশত আমি মৃগ দেখিবামাত্র বিশেষরূপ বিবেচনা না করিয়াই বাণ ত্যাগ করিয়াছি। মৃগয়ার নিয়মই এইরূপ, সুতরাং আমাকে অপরাধী করিতেছেন কেন?

ঋষিকুমার বলিলেন—রাজন! তুমি ধর্মজ্ঞ হইয়াও কেন এরূপ বৃথা তর্ক করিতেছ? যাহাহউক তুমি যখন মৃগবোধে আমাকে হত্যা করিয়াছ, তখন ব্রহ্মহত্যার পাপ তোমার হইবে না; কিন্তু যখন নিষ্ঠুরভাবে নিরপরাধ মৃগকে পত্নীসহ সুখসঞ্চরণকালে বধ করিয়াছ, তখন তাহার ফল অবশ্যই তোমাকে ভোগ করিতে হইবে। হে নৃশংস! তুমিও পত্নীসহ সুখে বিচরণকালেই কালগ্রাসে পতিত হইবে।

Krishna
Krishna

এই শাপ প্রদান করিয়া মুনিকুমার প্রাণত্যাগ করিলেন। পাণ্ডু অতিশয় দুঃখিতান্তঃকরণে পত্নীদের নিকট গিয়া সমস্ত বৃত্তান্ত জানাইলেন।

সুগভীর বৈরাগ্যভরে তিনি বলিলেন –

হায়! চিরকাল প্রমোদে ব্যাপৃত থাকায় মনোবিকার উপস্থিত হওয়াতেই আমি এই গর্হিত কার্য করিয়া শাপগ্রস্ত হইলাম। অদ্যাবধি আমি কঠোর তপস্যায় কালযাপন করিব।

এই বলিয়া তিনি পত্নীদ্বয়ের নিকট বিদায় লইতে প্রবৃত্ত হইলে তাঁহারা বলিলেন

মহারাজ! আমরাও তোমার সহিত তপস্যা করিব। ইন্দ্রিয়সংযমনপূর্বক আমরা বহুল ধারণ ও ফলমূল ভক্ষণ করিয়া তোমার সহিত একত্র পবিত্র সুখে দিনপাত করিয়া ভবলীলা সাঙ্গ হইলে একসঙ্গেই পরলোকে গমন করিব। তুমি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিলে আমরা কিছুতেই প্রাণধারণ করিতে পারিব না। অনন্তর পাণ্ডু স্বকীয় মহামূল্য বসনভূষণ ও পত্নীদ্বয়ের বস্ত্রালঙ্কার বিপ্রগণকে প্রদানপূর্বক বলিলেন –

আপনারা হস্তিনাপুরে প্রতিগমন করিয়া আমার মাতা ও আর্যা সত্যবতী এবং রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও পিতৃতুল্য ভীষ্মকে জানাইবেন যে আমরা অদ্য হইতে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিলাম, আর হস্তিনাপুরে প্রত্যাগমন করিব না। রাজার এই করুণবাক্য শ্রবণে অনুচরবর্গ হাহাকার করিতে করিতে বিদায় গ্রহণপূর্বক হস্তিনাপুরে ধৃতরাষ্ট্রসমীপে উপস্থিত হইয়া সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিল।

প্রিয় ভ্রাতার দুঃখের কথা শ্রবণ করিয়া ধৃতরাষ্ট্র বহুদিন বিষণ্ণ চিত্তে কালযাপন করিলেন।

পাণ্ডু সংযতাত্মা ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া সুদীর্ঘ তপশ্চরণ করিলে তাঁহার পাপসকল ক্ষয় হইয়া গেল এবং তিনি মহাপ্রভাবশালী ব্রহ্মর্ষির তুল্য হইয়া উঠিলেন।

একদা শতশৃঙ্গবাসী মুনিগণ সমবেত হইয়া ভগবান ব্রহ্মাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত ব্রহ্মলোকে যাত্রার উদ্যোগ করিতেছেন, এমন সময় পাণ্ডু তথায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের অনুগমন করিবার ইচ্ছা ব্যক্ত করিলেন। তাঁহার মনে পাছে আঘাত লাগে, এই জন্য ঋষিগণ প্রকৃত কারণ নির্দেশ না করিয়া পথক্লেশ প্রভৃতির উল্লেখে তাঁহাকে নিবারণ করিলেন; কিন্তু পাণ্ডু ভাবে বুঝিলেন যে প্রকৃতপক্ষে অনপত্য থাকা প্রযুক্ত তিনি সশরীরে স্বর্গর্গমনের অধিকারী নহেন।

বিমর্ষ মনে পত্নীদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া তিনি এই হেতু অশেষ বিলাপ ও পরিতাপ করিলেন। স্বামীর দুঃখে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া কুন্তী পাণ্ডুকে নির্জনে মহামুনি দুর্বাসাপ্রদত্ত মন্ত্রের কথা জ্ঞাপনপূর্বক বলিলেন –

হে নাথ। ব্রাহ্মণের বাক্য অব্যর্থ। এক্ষণে এই মন্ত্রের সাহায্য লওয়া আবশ্যক হইয়াছে, অতএব আজ্ঞা কর–কোন্ দেবকে আহ্বান করিয়া তোমার জন্য সন্তান প্রার্থনা করিব।

Karna
Karna

রাজর্ষি পাণ্ডু কুম্ভীর এই বাক্যে সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া কহিলেন প্রিয়ে। দেবতাদের মধ্যে ধর্মই অধিক পূজ্য। ধর্মদত্ত পুত্র নিশ্চয়ই ধর্মজ্ঞ হইবে; অতএব বিশেষ সমাদরপূর্বক দেবাগ্রগণ্য ধর্মকেই আহ্বান কর।

স্বামীর এই উপদেশানুসারে কুত্তী ধর্মের উদ্দেশে মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া এক পরমধার্মিক পুত্র প্রাপ্ত হইলেন। তাহার নাম রাখা হইল যুধিষ্ঠির। এই পুত্র লইয়া কিয়ৎকাল সুখে অতিবাহিত হইলে পাণ্ডু একদা কুন্তীকে কহিলেন—

প্রিয়ে। ক্ষত্রিয়কুলে বলেরই অধিক প্রশংসা এবং প্রয়োজন; অতএব তুমি মহর্ষিদত্ত মন্ত্র দ্বারা বায়ুকে আহ্বান করিয়া আর এক অমিতবলশালী পুত্র যাচ্ঞা কর।

কুন্তী স্বামীর আজ্ঞায় তাহাই করিলেন এবং ভগবান বায়ুর প্রসাদে এক মহাবল পরাক্রান্ত পুত্র প্রাপ্ত হইলেন। তাহার নাম হইল ভীমসেন।

এই দুই গুণবান পুত্র লাভ করিয়া পাণ্ডুর পুত্রকামনা ক্রমেই বর্ধিত হইতে লাগিল। তিনি ভাবিতে লাগিলেন যে, সকল বিষয়ে শ্রেষ্ঠ এক পুত্র কোন্ দেবতার দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায়। সর্বদেবশ্রেষ্ঠ দেবরাজ ইন্দ্রের কথা মনে উদয় হওয়ায় তিনি ইন্দ্রদেবের প্রসন্নতা সাধনের জন্য প্রথমে কুম্ভীকে ব্রত অনুষ্ঠান করিতে বলিলেন, নিজেও তদুপলক্ষ্যে তপস্যা আরম্ভ করিলেন।

সম্বৎসরকালাস্তে ইন্দ্রদেব প্রসন্ন হইলে কুন্তী দুর্বাসাদত্ত মন্ত্র তাঁহার প্রতি প্রয়োগ করিয়া পুত্রকামনা জ্ঞাপন করিলেন। দেবরাজের কৃপায় পাণ্ডুর এক মহাযশস্বী সর্বগুণধর পুত্র জন্মগ্রহণ করিল। ইহার নাম রাখা হইল অর্জুন।

ইন্দ্ৰদত্ত এই পুত্রকে দেখিবার জন্য বহুসংখ্যক দেব ও গন্ধর্ব তথায় সমবেত হইলেন ও অন্যান্য নানাবিধ শুভলক্ষণ দেখা যাইতে লাগিল। ইহাতে কুন্তীদেবী বিশেষ তৃপ্তিলাভ করিলেন, কিন্তু পাণ্ডুর পুত্রলালসা ইহাতেও মিটিল না। তিনি কিছুকাল পরে পুনরায় পুত্রলাভের নিমিত্ত কুন্তীর নিকট উপস্থিত হইলেন। কিন্তু বার বার দেবতাদিগকে বিরক্ত করিতে কুণ্ঠিত হওয়ায় কুত্তী এবার আর সে মন্ত্র উচ্চারণে সম্মত হইলেন না। এই সময়ে মাদ্রী একদিন নির্জনে পাণ্ডুকে বলিলেন –

মহারাজ! আমি রাজপত্নী হইয়াও হীনাবস্থায় রহিয়াছি, ইহাতে আমার কোন সত্তাপ নাই। তোমার অন্যান্য ভ্রাতৃবধূরী সন্তানবতী হইয়াছেন, তাহাতেও আমার কোনও ঈর্ষা নাই, কিন্তু আমি ও কুন্তী দুইজনে তোমার নিকট সমান হইলেও কুত্তী পুত্রবর্তী হইলেন আর আমি পুত্রমুখ দর্শনে বঞ্চিত রহিলাম, ইহা আমার পক্ষে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়।

সপত্নীর নিকট আমার কোন প্রকার যাজ্ঞা করিতে প্রবৃত্তি হয় না, তুমি যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়া কুন্তীকে আমার নিমিত্ত মুনিদত্ত মহামন্ত্র প্রয়োগ করিতে আদেশ কর, তাহা হইলে চরিতার্থ হই। পাণ্ডু ইহা শুনিয়া কহিলেন—

প্রিয়ে! অনেক দিবসাবধি তোমার পুত্রের মুখ দেখিতে আমার নিতান্তই বাসনা, কুম্ভীকেও এ বিষয়ে বলিব মনে করিয়াছিলাম, কিন্তু তুমি সম্মত হইবে কি না, না জানায় কিছুই করিতে পারি নাই। এক্ষণে তোমার মনোভাব জ্ঞাত হইলাম, তোমার এ দুঃখ যাহাতে অপনীত হয়, আমি সত্বর তাহার ব্যবস্থা করিব।

Duryodhana
Duryodhana

এই বলিয়া রাজা কুম্ভীর নিকট গিয়া কহিলেন

পৃথে! দেখ, ত্রিদশাধিপত্য লাভ করিয়াও ইন্দ্রের আকাঙ্ক্ষা মিটে নাই, তিনি পুনশ্চ যশোলিপ্সায় যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তুমি আমার প্রীতিসাধনের ও বংশরক্ষার নিমিত্ত অনেক করিয়াছ, তথাপি তোমাকে আর এক বিষয়ে অনুরোধ করিব। তুমি মাদ্রীর প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্বক উহাকে পুত্রবর্তী কর। ইহাতে মাদ্রীরও পরিত্রাণ হইবে, আমারও প্রিয়ানুষ্ঠান হইবে, তোমারও যশোবর্ধন হইবে।

কুন্তী সম্মত হইয়া মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক মাদ্রীকে কহিলেন— তুমি অভিলষিত কোন দেবকে আহ্বান কর, তাহা হইলেই পুত্র লাভ করিবে।

মাদ্রী কিয়ৎক্ষণ বিচার করিয়া অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে স্মরণ করিলেন। এই দেবযুগলের বরে মাদ্রীর নকুল সহদেব-নামক পরম রূপবান যমজপুত্র উৎপন্ন হইল। কিয়দ্দিনানন্তর পাণ্ডু মাদ্রীর হইয়া পুনর্বার কুন্তীকে অনুরোধ করায় কুম্ভী বলিলেন –

মহারাজ! মাদ্রী অতিশয় ধূর্ত। সে যুগলদেবতা আহ্বানে একবারেই দুই পুত্র লাভ করিল। এইরূপ হইতে পারে তাহা পূর্বে না জানায় আমি এই ফল হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। আমি আর মাদ্রীর জন্য মন্ত্র উচ্চারণ করিতে পারিব না, আমায় আর এ বিষয়ে অনুরোধ করিও না।

পাণ্ডুকে অগত্যা এই পঞ্চপুত্র লইয়া সন্তুষ্ট থাকিতে হইল। এই প্রিয়দর্শন ও সর্বসুলক্ষণসম্পন্ন দেবদত্ত পঞ্চকুমার মুনি ও মুনিপত্নীদের বিশেষ প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিলেন।

এদিকে হস্তিনাপুরে পাণ্ডুবিয়োগে ধৃতরাষ্ট্র অতি বিষণ্ণচিত্তে রাজ্যচালনা করিতেছিলেন।

পাণ্ডুর বনগমনের কিছুকাল পরে একদা মহর্ষি দ্বৈপায়ন ক্ষুৎপিপাসায় ক্লিষ্ট হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের ভবনে উপস্থিত হইলে, গান্ধারী সযত্নে তাঁহার শুশ্রূষা করিলেন। ব্যাসদের সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া বর প্রদান করিতে চাহিলে গান্ধারী কহিলেন— মহর্ষে! যদি অনুকূল হইয়া থাকেন, তবে এই বর প্রদান করুন যেন আমার ভর্তার সমান গুণশালী শতপুত্র জন্মে।

ব্যাসদেব—–‘তথাস্তু!’ বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

যথা সময়ে গান্ধারী গর্ভবতী হইলেন। কিন্তু গর্ভধারণের পর দুই বৎসর অতীত হইলেও সন্তান প্রসব হইল না। ইতিমধ্যে পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্র যুধিষ্ঠিরের জন্মসংবাদ হস্তিনাপুরে পৌঁছিল। কুম্ভীর পুত্র জ্যেষ্ঠ হওয়ায় রাজ্যের অধিকারী হইল, ইহা অনুভব করিয়া গান্ধারী ক্ষোভে নিজ দেহে কঠিন আঘাত করিলেন, তাহাতে তাঁহার অপরিণত সন্তান অকালে মাংসপিণ্ড অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হইল।

সন্তান নষ্ট হইয়াছে বোধ করিয়া অতিশয় দুঃখিত মনে গান্ধারী তাহাকে পরিত্যাগ করিবার উপক্রম করিতেছেন এমন সময়ে ব্যাসদেব আসিয়া উপস্থিত। তাঁহার নিকট কোন বৃত্তান্ত গোপন না রাখিয়া কুত্তীর প্রতি ঈর্ষাবশতই যে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা স্বীকার করিয়া গান্ধারী কাতরকণ্ঠে মহর্ষিকে বলিলেন

হে দেব! আপনার বরপ্রভাবে আমার শতপুত্র হইবার কথা, অতএব আপনি এই সন্তানকে রক্ষা করুন। ব্যাসদেব গান্ধারীকে আশ্বাস প্রদানপূর্বক বলিলেন—

বৎস! তুমি শোক করিও না। তোমার এই অপরিণত সন্তান নষ্ট হইবে না। আমার কথা মিথ্যা হইবার নহে, এই মাংসপিণ্ড হইতেই তোমার একশত পুত্র জন্মিবে।

এই বলিয়া তিনি প্রথমত একশত ঘৃতপূর্ণ ভাণ্ড আনিতে বলিলেন, পরে সেই মাংসপিণ্ডের উপর জলসেচনপূর্বক উহাকে শতখণ্ডে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক ভাণ্ডে এক এক খণ্ড স্থাপন করিলেন। সমস্ত ভাণ্ড পূর্ণ হইবার পর দেখা গেল যে অনবধানতাবশত একটি অতিরিক্ত মাংসখণ্ড রহিয়া গিয়াছে। ইহা দেখিয়া গান্ধারীর একটি কন্যালাভের বিশেষ ইচ্ছা হইল। ব্যাসদেব তাহা বুঝিতে পারিয়া আর একটি ঘৃতপূর্ণ ভাণ্ড আনয়ন করাইয়া তাহাতে এই অতিরিক্ত মাংসখণ্ড স্থাপনপূর্বক কহিলেন—

Dhrishtadyumna
Dhrishtadyumna

এই ভাণ্ডগুলি উপযুক্ত স্থানে রাখিয়া দেও, দুই বৎসর পরে খুলিয়া দেখিও, এই ভাণ্ডগুলি হইতেই তোমার একশত পুত্র ও একটি কন্যা হইবে। অনন্তর যে সময়ে পাণ্ডুর দ্বিতীয়পুত্র ভীমসেন জন্মগ্রহণ করিলেন সেই সময় প্রথম ভাণ্ড হইতে ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধন উৎপন্ন হইলেন। এই পুত্র জন্মিবার সময়ে নানাবিধ দুর্নিমিত্ত দৃষ্ট হইতে লাগিল। তাহাতে অমাত্যবর্গ ও রাজপুরুষগণ অমঙ্গলসূচনায় বিশেষ ভীত ও চিন্তাকুল হইয়া পড়িলেন।

ধীমান বিদুর বলিলেন মহারাজ! যেরূপ দেখা যাইতেছে তাহাতে এই পুত্রের দ্বারা রাজ্যের বিশেষ অনিষ্ট হইবে, অতএব ইহাকে ত্যাগ করিয়া আর সকলকে রক্ষা করা কর্তব্য। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহবশত ইহাতে সম্মত হইতে পারিলেন না। দুর্যোধনের জন্মের পর যথাক্রমে দুঃশাসন, বিকর্ণ প্রভৃতি একশত পুত্র ও দুঃশলা নাম্নী এক কন্যা জন্মগ্রহণ করিলেন।

ইহা ব্যতীত এক বৈশ্যা-পত্নীর গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের আর এক পুত্র জন্মিয়াছিলেন, তাঁহার নাম যুযুৎসু। ওদিকে কালক্রমে ঋষিকুমারের শাপের কথা বিস্মৃতপ্রায় হইয়া পাণ্ডু পত্নীদ্বয় ও দেবকুমারসদৃশ পঞ্চপুত্র লইয়া হিমাচলে সুখশান্তিতে অবস্থিতি করিতেছিলেন।

একদা মোহন-বসন্তকাল-সমাগমে তিনি মাদ্রীর সহিত বনভ্রমণে বাহির হইলেন। তৎকালে পলাশ তিলক আম্র চম্পক প্রভৃতি ফলফুলে পরিপূর্ণ এবং পদ্ম-কুমুদ শোভিত জলাশয়ে ব্যাপ্ত বনসকল অতি মনোহর শোভা ধারণ করিয়াছিল। প্রকৃতির এই অলৌকিক সৌন্দর্য উপভোগে এবং প্রিয়পত্নীর সঙ্গসুখে পাণ্ডুর মনে অতীব আনন্দের সঞ্চার হইল। ঋষিপুত্রের শাপে পত্নীর সহিত এরূপ সুখানুভবকালেই মৃত্যু সহসা তাঁহাকে আক্রমণ করিল।

মাদ্রী পতিকে প্রাণশূন্য দেখিয়া তাঁহার মৃতদেহ আলিঙ্গনপূর্বক উচ্চৈঃস্বরে আর্তনাদ করিতে লাগিলেন, সেই শব্দ শুনিয়া স্বীয় পুত্র ও মাদ্রীতনয়সহ কুত্তী দ্রুতপদবিক্ষেপে সেখানে উপস্থিত হইলেন। মাদ্রী তাঁহাকে দেখিয়া কাতরস্বরে কহিলেন

আর্যে! তুমি কুমারগণকে দূরে রাখিয়া একাকিনী এই স্থানে অগ্রসর হও। কুন্তী আসিয়া স্বামীর মৃতদেহ অবলোকন করিয়া শিরে করাঘাতপূর্বক বহুক্ষণ মাদ্রীর সহিত বিলাপ করিলেন। অনন্তর মাদ্রীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন ভদ্রে! যাহা হইবার হইয়াছে। আমি রাজর্ষির জ্যেষ্ঠ পত্নী, অতএব আমি ইহার সহিত পরলোক গমনের অধিকারিণী। তুমি গাত্রোত্থান কর। আমার অবর্তমানে সাবধানে সত্তানগণকে পালন করিও। তদুত্তরে মাদ্রী কহিলেন—

আর্যে। স্বামী আমারই সাহচর্যে থাকিয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, সুতরাং আমিই ইহার অনুগমন করিব, বিশেষত সন্তানগণকে তুমি যেরূপ উপযুক্ত ভাবে লালনপালন করিতে পারিবে, আমার দ্বারা তাহা সম্ভব হইবে না। অতএব আমাকে পতির সহগমনের অনুমতি দেও।

Amba
Amba

এই বলিয়া স্বামীর মৃতদেহ পুনরায় আলিঙ্গনপূর্বক মাদ্রী দেহত্যাগ করিলেন। রাজর্ষি পাণ্ডু ও মাদ্রী এইরূপে একত্র লোকান্তরে গমন করিলে, সেই বনবাসী ঋষিগণ বিবেচনা করিলেন যে, পাণ্ডু যখন তাঁহাদের আশ্রয়ে ছিলেন, তখন তাঁহার পুত্র-কলত্র ও মৃতদেহ হস্তিনাপুরে লইয়া যাওয়া তাঁহাদেরই কর্তব্য।

এই উদ্দেশ্যে তাঁহারা পাণ্ডুর দেহ ও পঞ্চপাণ্ডব সমভিব্যাহারে যাত্রা করিলেন। পুত্রবৎসলা কুন্তী পতিবিহীনা হইলেও পুত্রমুখ নিরীক্ষণে ও বহুকাল পরে আত্মীয়-স্বজনের দর্শনসম্ভাবনায় হৃষ্টচিত্তে সর্বাগ্রে গমন করিতে লাগিলেন।

মহাভারত

ইঁহাদের আগমনবার্তায় পৌর ও জানপদগণ, ভীষ্ম প্রভৃতি কুরুবৃদ্ধগণ, সত্যবতী-প্রমুখ মাতৃগণ ও দুর্যোধনাদি বালকগণ ব্যগ্রচিত্তে মহর্ষিদের নিকটে অগ্রসর হইয়া আসিলেন। ঋষিগণ পাদ্য-অর্ঘ্যদ্বারা ভীষ্মকর্তৃক পূজিত হইয়া সকলের নিকট পাণ্ডুর বনবাস, পুত্র-উৎপত্তি ও মৃত্যুসংক্রান্ত ঘটনাবলী আনুপূর্বিক বর্ণনা করিয়া পাণ্ডুর মৃতদেহ ও পঞ্চপুত্রকে ভীষ্মের হস্তে সমর্পণপূর্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞানুসারে পাণ্ডু ও মাদ্রীর সৎকারের ব্যবস্থা করিলেন।

তদুপলক্ষ্যে একটি পবিত্র স্থান নির্ধারণ করিয়া তথায় অগ্নিসংস্কারের আয়োজন

করা হইল।

সকল জ্ঞাতি বান্ধব ও অমাত্য একত্র হইয়া বিবিধ পুষ্পবিভূষিত পাণ্ডু ও মাদ্রীর কলেবর মহার্য-বস্ত্রাচ্ছাদিত শিবিকার মধ্যে স্থাপনপূর্বক স্কন্ধে করিয়া দাহক্ষেত্রে লইয়া চলিলেন। কেহ বা শ্বেত চর্মধারণ করিল, কেহ বা চামর ব্যজন করিতে লাগিল। শুক্লাম্বরধারী যাজকবৃন্দ প্রদীপ্ত জাতাগ্নিতে আহুতি দিতে দিতে অগ্রে চলিলেন। বহুসংখ্যক প্রজা পশ্চাতে অনুগমন করিতে লাগিল। ভাগীরথীতীরে নিরূপিত স্থানে পৌঁছিয়া শিবিকা অবতারণপূর্বক মৃতদেহে শ্বেতবস্ত্র পরিধান করাইয়া কালাগুরুচন্দন প্রভৃতি সুগন্ধি দ্রব্য লেপন করা হইলে প্রেতকার্য সমাপনান্তে তাঁহাদের ঘৃতাভিষিক্ত দেহদ্বয় চন্দনকাষ্ঠের চিতায় একত্র দাহ করা হইল।

পুত্রশোকার্তা অম্বালিকা চিতাগ্নিস্থ পুত্র ও পুত্রবধূকে দেখিয়া শোকে ভূবিলুণ্ঠিত হইয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। কুন্তীও অধীরা হইয়া কাতরস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া কেহই অশ্রুসম্বরণ করিতে পারেন নাই।

উদকক্রিয়া সমাপন হইলে পিতৃশোকবিমূঢ় পাণ্ডবদিগকে সকলে অশেষ প্রকারে সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিলেন। চতুর্দিকে নিরানন্দ বিরাজমান, সকলেই ধরাশায়ী হইয়া শোকসাগরে নিমগ্ন রহিলেন।

দশ দিবস অতীত হইলে ভীষ্ম-ধৃতরাষ্ট্র প্রমুখ সমবেত হইয়া ঔর্ধ্বদেহিক ক্রিয়া সম্পাদনপূর্বক কৃতশৌচ পাণ্ডবদিগকে লইয়া হস্তিনাপুরে প্রত্যাগমন করিলেন। অনন্তর পাণ্ডুর শ্রাদ্ধকার্য সম্পন্ন হইলে, সত্যবর্তী অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্বক স্বীয় পুত্রবধূকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন

অম্বিকে! বৎস দ্বৈপায়নের নিকট শুনিলাম যে, তোমার জ্যেষ্ঠ পৌত্রের জন্মমুহূর্তে বহুবিধ দুর্নিমিত্ত দেখিয়াও যখন তাহাকে ত্যাগ করা হয় নাই, তখন আমাদের বংশ শীঘ্রই ঘোর বিপদার্ণবে পতিত হইবে; তবে আর আমরা কি সুখে সংসারে অবস্থান করিব? চল আমরা পুত্র শোকার্তা অম্বালিকাকে লইয়া বনে গমন করি।

অম্বিকা সম্মত হওয়ায় সত্যবর্তী বধূদ্বয়কে লইয়া অরণ্যে গমনপূর্বক কঠোর তপস্যা করিতে করিতে প্রাণত্যাগ করিয়া অভিলষিত লোকপ্রাপ্ত হইলেন।

আরও দেখুন:

মহাভারত [ Mahabharata ] – বিষয়সূচী

“পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রদের জন্মবৃত্তান্ত | মহাভারত”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন