বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন – কালিকা পুরাণ

পঞ্চাশীতিতম অধ্যায় – বিশেষ বিশেষ সদাচার কথনঃ ঔৰ্ব বলিলেন,–হে নৃপতে! নৃপতিগণের অবশ্য কর্তব্য বিশেষ বিশেষ সদাচার সম্প্রতি বর্ণন করিতেছি শ্রবণ কর। ১

নির্দোষ সাধুসকল সৎ শব্দে বোধ হয়। তাহাদের আচার-তত্ত্বই সদাচার শব্দের প্রতিপাদ্য। ২

আগম, পুরাণ এবং মনু প্রভৃতি সংহিতা-সমূহে যে সকল সদাচার নির্ণীত হইয়াছে; রাজা, গৃহস্থের ন্যায় সেই সদাচার সমূহ পালন করিবেন। ৩

ঋষিগণকে বেদ পাঠ দ্বারা ষজন করিবেন। হোম দ্বারা দেবগণের পূজা করিবেন। শ্রাদ্ধ এবং দান দ্বারা পিতৃগণকে এবং বলিদানে ভূতগণকে সন্তোষিত করিবেন। ৪

রাজা–মলত্যাগ, ভূষণ, স্নান, দন্তধাবন, অঞ্জন প্রভৃতি সকল কর্মই গৃহস্থবৎ আচরণ করিবেন। ৫

 বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন - কালিকা পুরাণ

বিশেষ এবং নিত্যকৃত্য কৰ্ম্ম সকলও করিবেন, রাজা ব্রাহ্মণাদি সকলকে উত্তমরূপে ষটকর্মে নিযুক্ত করবেন। এবং ক্ষত্রিয়গণকেও স্ব স্ব ধৰ্ম্মে নিযুক্ত করিবেন। ৬

বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন – কালিকা পুরাণ

যে ব্যক্তি স্বধৰ্ম পরিত্যাগ করিয়া পরধর্ম আশ্রয় করে, রাজা তাহার যথোচিত দণ্ড করিয়া পুনর্বার তাহাকে স্বধর্মে সংস্থাপিত করিবেন। ৭

মহীপতি সংবৎসর-কর্তব্য-বিশেষ কৰ্ম্মসমূহ অবশ্যই আচরণ করিবেন। অবশ্যকর্তব্য বিশেষ বর্ণসকল শ্রবণ কর। ৮

শরৎকালীন মহাষ্টমী তিথিতে দুর্গার পূজা করিবেন এবং বলবৃদ্ধির নিমিত্ত দশমী তিথিতে নীরাজনাদি করিবেন। ৯

পৌষমাসের তৃতীয়া তিথিতে পুষ্পদি দ্বারা লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করিবেন। হে ভূপতে! রাজা শ্রীপঞ্চমী তিথিতে লক্ষ্মীপূজানন্তর জল এবং শষ্যবৃদ্ধির নিমিত্ত শ্ৰীযজ্ঞ আচরণ করিবেন। ১০

জ্যৈষ্ঠমাসের দশহরায় বিষ্ণুর যজ্ঞ করিবেন। সূর্যদেব সিংহরাশিতে অবস্থান করিলে দ্বাদশী তিথিতে ইন্দ্রদেবের পূজা আচরণ করিবেন। ১১

নৃপতি, এই যজ্ঞ সকলকে বহু ব্যয়ে নিষ্পন্ন করিবেন। ১২

এই সকল যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলে বল, রাজ্য এবং ধনাগার পরিপূর্ণ হয় এবং ইহাদের অনুষ্ঠান না করিলে দুর্ভিক্ষ, মরক প্রভৃতি বহু উপদ্রব উৎপন্ন হয়। ১৩

অতিবৃষ্টি প্রভৃতি শস্য-বিঘ্নকর ছয় প্রকায় ঈতিও (উপদ্রব) উৎপন্ন হয়। অতএব বিশেষরূপে উক্ত যজ্ঞসমূহ আচরণ করবেন। শরৎকালীন মহাষ্টমীতে দুর্গাপূজার বিধি। ১৪

যাহা পূৰ্বে বর্ণন করিয়াছি, সেই বিধিতেই পূজা করিবেন। হে পৃথিবীপতে! নীরাজনের বিধি শ্রবণ কর। ১৫

ইহার দ্বারা অশ্ব, গজ প্রভৃতি সৈন্য বর্ধিত হয়। আশ্বিন-মাসের স্বাতিযুক্তা শুক্লা তৃতীয়াতে নিজপুরের ঈশানভাগে উত্তম স্থান সংস্কার করিবেন। ১৬

তদনন্তর অষ্টম দিবস উপস্থিত হইলে নীরাজন করিবেন। নীরাজনের উপযুক্ত কাল তোমাকে পূৰ্বে বলিয়াছি, সম্প্রতি নীরাজনার বিধি বর্ণন করিতেছি। ১৭

শ্রবণ কর; ইহা শ্রবণে তুমি কৃতকার্য হইবে। মহাবল মনোহর এক অশ্বকে সপ্তদিন পর্যন্ত গন্ধপুষ্প এবং বস্ত্রাদিদ্বারা আরাধনা করিবেন। তৃতীয়াদিতে পূজা করিয়া উক্ত অশ্বকে যজ্ঞস্থানে উপস্থাপিত করিবেন। ১৮-১৯

 বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন - কালিকা পুরাণ

তাহার চেষ্টানুসারে শুভাশুভ পরিজ্ঞান হইবে। অশ্ব ঐ স্থানে উপস্থিত হইয়া যদি পলায়ন করে, তাহা হইলে রাজার ক্ষয় হয়। ২০

অশ্ব যদি নয়নজল মোচন করে, তাহা হইলে রাজপুত্রের মৃত্যু হয় এবং অশ্ব যদি ভূমিগমনে প্রতিকূলতাচরণ করে, তাহা হইলে রাজমহিষীর মৃত্যু হয়। ২১

অশ্ব যদি মুখ, নাসা, চক্ষু প্রভৃতিতে শব্দ করে, তাহা হইলে যেদিকে সম্মুখীন হইয়া ঐ শব্দ করে, সেই দিকে শত্ৰুসকল বিনষ্ট হয়। ২২

উক্ত অশ্ব যদি দক্ষিণপাদের অগ্রভাগ উত্তোলন করিয়া রাজার অগ্রে অবস্থান করে, তাহা হইলে ভূপতি সকল শত্রুকেই পরাজয় করেন। ২৩

হে নৃপমণে! দশমী তিথিতে প্রাতঃকালে নীরাজন করিবেন। দৈববশতঃ উক্ত তিথিতে অসমর্থ হইলে, উক্ত দশমীর পর দ্বাদশীতে নীরাজন করিবেন। ২৪

অথবা কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে উক্ত নীরজন-সম্পাদন করিবেন। ইহাতেও যদি কোন বিঘ্ন উপস্থিত হয়, তাহা হইলে নিজপুরের ঈশানকোণে ষোড়শ হস্ত-পরিমিত তোরণ নির্মাণ করিবে। ২৫

দশহস্ত-পরিমিত বিপুল তোরণ নিৰ্মাণ করিবে। ২৬

দ্বাস্ত্রিংশৎ হস্ত দীর্ঘ এবং ঘোড়শ হস্ত পরিমাণে বিস্তৃত যজ্ঞমণ্ডপ নির্মাণ করিবেন। সেই মণ্ডপের মধ্যে বেদী নিৰ্মাণ করিবেন। ২৭

বেদীর উত্তর ভাগে অত্যুত্তম বেদী নিৰ্মাণ করিবেন, এই স্থানে পুরোহিতগণ ভাগ-সংস্থাপন করিয়া পূজা করিবেন। ২৮

হে নৃপ! শাল উড়ুম্বর অথবা অৰ্জ্জুনবৃক্ষের শাখাকে মৎস্যসমূহাঙ্কিত চক্র এবং ধ্বজদ্বারা বিভূষিত করিবেন। ২৯

নানাপ্রকার বহুমূল্য কনক এবং রত্নদ্বারা তোরণকে উপশোভিত করিবেন। যজ্ঞশান্তিদ্বারা স্বকাৰ্য-সাধনের নিমিত্ত ঘোটকের কণ্ঠদেশ শালিকুণ্ঠ এবং তল্লাতকবৃক্ষে বন্ধন করিবে। ৩০-৩১

রাজা, বৈষ্ণবমণ্ডল নিৰ্মাণ করিয়া দিকপাল, নবগ্রহ, বিষ্ণু প্রভৃতি বিশ্বদেব সকলের পূজা করিবেন। ৩২

পুরোহিত সপ্তাহকাল ঘৃত, তিল এবং পুষ্প একত্রিত করিয়া সূৰ্য, বরুণ, ব্ৰহ্মা, ইন্দ্র এবং বিষ্ণুর উদ্দেশে হোম করিবেন। ৩৩

ধৰ্মার্থ-কামাদি চতুৰ্ব্বর্গসিদ্ধির নিমিত্ত প্রত্যেক দেবের উদ্দেশে সহস্র বার অথবা অষ্টোত্তর এক শতবার প্রতিদিন হোম করিবেন। ৩৪

পলাশ, খদির, উড়ুম্বর, অশ্বথ প্রভৃতি কাষ্ঠদ্বারা পুরোহিত হোমকাৰ্য সম্পন্ন করিবেন। ৩৫

সুবৰ্ণ রজত অথবা যথেচ্ছাক্রমে মৃত্তিকাদি নির্মিত–নানাপ্রকার পল্লব শোভিত আটটী ঘট সংস্থাপন করিবেন। ৩৬

পুরোহিত উক্ত ঘটসমূহে মঞ্জিষ্ঠা হরিতাল, চন্দন, কুষ্ট, প্রিয়ঙ্গু, মনঃশিলা, অঞ্জন, হরিদ্রা, শ্বেতদন্তি প্রভৃতি এবং ভল্লাতক, পূর্ণকোষ, সহদেবী, শতাবরী, বচা, নাগকেশর, সোমলতা, সুগুন্ঠীকা, মঞ্চা, করবীর, তুলসীদল প্রভৃতি দ্রব্য নিক্ষেপ করিবে। ৩৭-৪০

হে নৃপ! কলস, অম্বুজ এবং যজ্ঞকাষ্ঠ-সমূহ দ্বারা নীরাজনাবিধিতে শান্তিকামনায় স্রুকস্রুব নিৰ্মাণ করিবেন। ৪১

এইরূপে সপ্তাহ পর্যন্ত পূজা এবং হোম দ্বারা পূর্বোক্ত দেবসকল আরাধ্যমান হইলে, যে পর্যন্ত নীরাজনা না হয়, রাজা সেইকাল পর্যন্ত রাত্রিকালে গৃহে অবস্থান করিবেন। শান্তিবাঞ্ছায় যজ্ঞভূমিতে থাকিবেন না। ৪২-৪৩

সেইকালে অশ্ব, গজ প্রভৃতি কোন যানেই আরোহণ করিবেন না। ৪৪

পূর্বোক্ত দেবগণকে মধু, পায়স, যাবক, মোদক, নূতন ব্যঞ্জন প্রভৃতি নানা প্রকার উত্তম ভোজ্য দ্রব্যে সপ্তাহকাল বলিদান করিবেন। ৪৫-৪৬

সপ্তম দিনে মহাবাহু, দ্বিভুজ, কবচশালী, জাজ্বল্যমান বামকরে শুদ্ধবস্ত্রে সংযত কেশসমূহ ধারণকারী এবং দক্ষিণকরে খড়্গের সহিত মুখ-রজ্জু ধারণ করিয়া শুভ্রঅশ্বে উপবিষ্ট-সূৰ্যপুত্ৰ রেমন্তকে তোরণপ্রান্তে প্রতিমায় অথবা ঘটে সূৰ্য্যপূজাবিধানে পূজা করিবে। ৪৭-৪৯

রেমন্তের পূজা শেষ হইলে অশ্বপাল এবং গজপাল পৃথক পৃথকভাবে ঈশান কোণে পূৰ্বনির্মিত বেদিকায় অশ্ব এবং গজকে উপস্থাপিত করিবে। ৫০

গজ এবং অশ্ব উক্ত স্থানে উপস্থাপিত হইলে, রাজা যত্নপূৰ্ব্বক পূর্বোক্ত নিমিত্ত দর্শনানুসারে ফল নিশ্চয় করিবে। ৫১

রাজা হোমকুণ্ডের উত্তরভাগে বেদবিৎ এবং অশ্ববিৎ পণ্ডিতের সহিত ব্যাঘ্রচৰ্ম্মে উপবিষ্ট হইয়া অশ্বকে দর্শন করিবেন। ৫২

পুরোহিত উক্ত সময়ে শীঘ্রই সুগন্ধি অন্নপিণ্ড শান্তিমন্ত্র উচ্চারণপূর্বক সম্মুখে সংস্থাপিত করিবেন। ৫৩।

যদি ঐ অন্নের ভোজন অথবা ঘ্রাণ গ্রহণ করে, তাহা হইলে সৰ্ব্বকৰ্ম্ম সিদ্ধ হয়। অন্যথা বিপরীত ফল উৎপন্ন হয়। ৫৪

পুরোহিত উড়ুম্বর, আম্র অথবা বকুলের শাখা ঘটজলে আপ্লাবিত করিয়া অশ্ব, গজ, রাজা, সৈনিক, রেখা প্রভৃতিকে পুষ্টিকর শান্তিমন্ত্রে স্পর্শ করিবে এবং বিপ্রগণের সহিত পূর্বোক্ত অশ্ব প্রভৃতিকেও সেচন করিবে। ৫৫-৫৬

দিকপাল এবং গ্রহগণকে বৈষ্ণব মন্ত্রে অনেকবার সেচন করিয়া রাজা, মন্ত্রী, রাজপুত্র, অমাত্য এবং অন্যান্য সৈনিক সকলকে সুবর্ণের ন্যায় দর্শন করাইয়া কল্পনাতে অন্য লোক সকলকে দর্শন করাইবেন। ৫৭-৫৮

 বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন - কালিকা পুরাণ

শান্তিজলে চতুরঙ্গ বল এবং মৃন্ময়শত্ৰু নিৰ্মাণ করিয়া অভিচারকের বক্ষে শূলবেধপূৰ্ব্বক খড়্গ দ্বারা মস্তকচ্ছেদন করিবে। ৫৯

আচার্য্য, ভয়ানক ইন্দ্রপ্রতিপাদ্য এবং সূৰ্য্য-প্রতিপাদ্য অভিচারক মন্ত্রে অশ্বমুখরজ্জুকে বক্র করিবেন। ৬০

রাজা এই মন্ত্রে অশ্বে আরোহণ করত উত্তর-পূৰ্ব্বদিকে সকল জাতির সহিত গমন করিবে। ৬১

ঋত্বিক, পুরোহিত, আচাৰ্য প্রভৃতি সকলে–সাবধানে নিমিত্ত সকলের শুভাশুভ দর্শন করিতে করিতে তাঁহার সহিত গমন করিবেন। ৬২

নানাপ্রকার বাদ্যসমূহের তুমুল শব্দে দিক্‌ আবৃত হইবে এবং ছত্ৰমণ্ডল তাঁহার আতপবারণ করিবে। এইরূপে নীরাজনার্থ গমন বেগে পৃথিবী কম্পমানা হইবেন। ৬৩

মণি-বিদ্রুম-মুক্তা-স্বর্ণাদিতে বিভূষিত হইয়া এক ক্রোশ পৰ্য্যন্ত গমন করিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইবেন। পূৰ্ব্ব দ্বারে নিজপুরে প্রবিষ্ট হইবেন। ৬৪

রাজা, পুরোহিত, বিপ্রগণের সহিত যজ্ঞভূমিতে গমন করিয়া যথাশক্তি হিরণ্য, গো, তিল, দক্ষিণ দ্বিজগণকে দান করিবে। ৬৫

এই প্রকারে রাজা সৈন্যগণের নীরাজন করিয়া প্রতিদিন অচলা লক্ষ্মী লাভ করেন। ৬৬

হে অমৃতসঞ্জাত সাগরোদ্ভব অশ্ব! তুমি যে সত্যে শত্রুকে বহন করিতেছ, সেই সত্যে আমাকেও বহন কর। ৬৭

ষে সত্যে দিবাকর এবং তৎপুত্র রেমন্তকে বহন করিতেছ, বিজয়াভিলাষী আমাকেও সেই সত্যে বহন কর। ৬৮

নৃপ এবং মন্ত্রী অশ্বে আরোহণ করিবেন, আরূঢ় হইয়া মহিষীর অন্তঃপুরে গমন করিবেন। ৬৯

মহিষী রাজাকে উত্তম পর্য্যঙ্কে উপবেশন করাইয়া অন্যান্য স্ত্রীগণের সহিত দূর্বা অক্ষত প্রভৃতি উপহারে অর্চনা করিবেন। ৭০

তৃতীয়া তিথিতে নীরাজন করিলে যদি ভূপতির জাতাশৌচ হয়, তাহা হইলে কাৰ্য্যহানির আশঙ্কা থাকে না। ৭১

জাতাশৌচ এবং মৃতাশৌচ উভয় যদি হয়, রাজা যথাযথরূপে বিশেষ প্রকারে সৈন্যাদি নীরাজন করিবেন। ৭২

 বিশেষ বিশেষ সদাচার কথন - কালিকা পুরাণ

ব্যবহারানুসারে সদ্যই অশৌচ হইতে মুক্ত হইবেন। পররাষ্ট্রের অনিষ্ট উৎপাদনার্থ যজ্ঞ অধিষ্ঠিত করিবে। ৭৩

হে রাজন! নীরাজন-বিধি তোমার নিকটে বিশেষরূপে বর্ণন করিলাম, পূর্বোক্ত পুষ্যস্নান-বিধি শ্রবণ কর। ৭৪

পঞ্চাশীতিতম অধ্যায় সমাপ্ত। ৮৫

আরও পড়ুনঃ

রাজনীতি – কালিকা পুরাণ
পরশুরামের উপাখ্যান – কালিকা পুরাণ
ব্ৰহ্মপুত্রের উৎপত্তিবিবরণ – কালিকা পুরাণ
বসিষ্ঠ শাপ – কালিকা পুরাণ
নদী বিবরণের উপসংহার – কালিকা পুরাণ

মন্তব্য করুন