শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থ পরিচিতি

শ্রীশ্রীচণ্ডী হিন্দুধর্মের এক অত্যন্ত প্রাচীন ও শ্রদ্ধেয় ধর্মগ্রন্থ। এটি মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রাচীন ঋষি মার্কণ্ডেয় ঋষি-এর নামে পরিচিত। শ্রীশ্রীচণ্ডী মূলত দেবীশক্তির মাহাত্ম্য বর্ণনাকারী এক অনন্য গ্রন্থ। এতে মোট ১৩টি অধ্যায় এবং ৭০০টি শ্লোক রয়েছে। এই কারণে একে অনেক সময় সপ্তশতী নামেও অভিহিত করা হয়। দেবী দুর্গার শক্তি, মহিমা ও অসুরবিনাশী রূপ এই গ্রন্থের প্রধান বিষয়।

হিন্দু দর্শনে আদ্যাশক্তি মহামায়া সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত। তিনি মায়া ও শক্তির দেবী, যিনি সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করেন এবং অন্যায় ও অসুর শক্তির বিনাশ ঘটান। জীবের দুঃখ ও দুর্দশা দূর করেন বলে তাঁর আরেক নাম দুর্গা। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীর গুণকীর্তন ও স্তবগাথায় ভরপুর বহু সুন্দর স্তোত্র রয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি স্তোত্র হলো—

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥
যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥

অর্থাৎ—যে দেবী সকল প্রাণী ও সমগ্র সৃষ্টিতে শক্তিরূপে অবস্থান করেন, তাঁকে বারবার প্রণাম। যিনি সকলের মধ্যে শান্তিরূপে বিরাজমান, তাঁকেও বারবার প্রণাম।

শ্রীশ্রীচণ্ডীর মূল কাহিনী

এই গ্রন্থের কাহিনির সূচনায় দেখা যায় রাজা সুরথ নামে এক রাজা শত্রুর হাতে রাজ্য হারিয়ে দুঃখে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একসময় তিনি এসে উপস্থিত হন মেধা মুনি নামে এক মহর্ষির আশ্রমে। অন্যদিকে সমাধি নামে এক বৈশ্যও পারিবারিক অবহেলা ও দুঃখে গৃহত্যাগ করে সেই আশ্রমে এসে পৌঁছান।

রাজা সুরথ রাজ্য হারিয়েও রাজ্যের প্রতি গভীর টান অনুভব করছিলেন। সমাধি বৈশ্যও পরিবার ত্যাগ করলেও স্ত্রী-পুত্রের কথা ভুলতে পারছিলেন না। এই অদ্ভুত মানসিক আকর্ষণের কারণ জানতে তারা দুজনেই মেধা মুনির কাছে যান। তখন মুনি তাদের ব্যাখ্যা করেন যে এই আকর্ষণের নাম মায়া, আর এই মায়া হলো মহামায়া দেবীর প্রভাব। দেবী সন্তুষ্ট হলে মানুষকে কল্যাণ ও মুক্তি দান করেন।

মহিষাসুর বধ

শ্রীশ্রীচণ্ডীর অন্যতম প্রধান কাহিনী হলো মহিষাসুর বধ। প্রাচীন কালে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র এবং অসুররাজ মহিষাসুর-এর মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে দেবতারা পরাজিত হয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন এবং পৃথিবীতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

এই দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব-এর শরণাপন্ন হন। তখন সকল দেবতার দেহ থেকে তেজ বা শক্তির অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হয়ে একত্রিত হয়ে এক মহাশক্তির সৃষ্টি করে। সেই তেজোরাশি থেকেই আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দেবতারা তাঁদের অস্ত্রসম্ভার দেবীর হাতে অর্পণ করেন। ফলে দেবী দশভুজা রূপে দিব্য অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী রূপে আবির্ভূত হন।

দেবী তখন অট্টহাস্য করলে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—ত্রিভুবন কেঁপে ওঠে। দেবতারা আনন্দে দেবীর জয়ধ্বনি করতে থাকেন। অন্যদিকে মহিষাসুর বিশাল অসুরবাহিনী নিয়ে দেবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। শুরু হয় ভয়াবহ যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত দেবী দুর্গা অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করেন এবং দেবতারা পুনরায় তাঁদের স্বর্গরাজ্য ফিরে পান।

এই বিজয়ের আনন্দে দেবতারা দেবীর উদ্দেশ্যে স্তব করেন—

সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোস্তুতে॥

অর্থাৎ—হে দেবী, তুমি সকল মঙ্গলের উৎস, সকল ইচ্ছা পূরণকারী ও আশ্রয়দাত্রী। তোমাকে বারবার প্রণাম।

সারাংশ

শ্রীশ্রীচণ্ডী হিন্দু ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ। এতে দেবীশক্তির মাহাত্ম্য, অসুরবিনাশ এবং ধর্ম ও ন্যায়ের বিজয়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনী এই গ্রন্থের অন্যতম প্রধান অংশ। এই গ্রন্থ ভক্তদের কাছে দেবীশক্তির প্রতীক, যা মানবজীবনে সাহস, শক্তি ও ন্যায়ের পথ অনুসরণের শিক্ষা দেয়।

Leave a Comment