বাংলা আধ্যাত্মিক সাধনা-ঐতিহ্যের ইতিহাসে যে ক’জন নারী মহাপুরুষ তাঁদের অলৌকিক জীবনযাপন, গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং সর্বজনীন মাতৃভাবের মাধ্যমে যুগযুগান্তর ধরে ভক্তহৃদয়ে আসন করে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন মা আনন্দময়ী। তিনি শুধু একজন সাধিকা নন; বহু ভক্তের কাছে তিনি জগৎজননী, ঈশ্বরপ্রেমের জীবন্ত প্রতিমা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক দিব্যচেতনার আধার।
Table of Contents
মা আনন্দময়ী


কৈশোর, সাধনাজীবনের সূচনা ও গার্হস্থ্য জীবনের অন্তরালে আধ্যাত্মিক জাগরণ
শৈশব অতিক্রম করে নির্মলা যখন কৈশোরে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর অন্তর্জগতে আধ্যাত্মিক অনুভূতির জাগরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরভাব, ভক্তি ও ধ্যানের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ গভীরতর হতে থাকে। সাধারণ কিশোরীদের মতো খেলাধুলা বা পার্থিব চাঞ্চল্যের চেয়ে তাঁর মন বেশি টান অনুভব করত নামস্মরণ, কীর্তন এবং অন্তর্মুখী ভাবচিন্তায়।
এগারো বছর বয়সে নির্মলার সরল বিশ্বাস ও ভক্তিভাব আরও দৃঢ় হয়। তিনি পিতার কাছে জানতে চান—
“হরিকে কেমন করে ডাকতে হয়?”
পিতা তাঁকে ভক্তির নিয়ম শেখালেন—শুদ্ধ মন, একাগ্র চিত্ত এবং আন্তরিক প্রার্থনাই ভগবানের কাছে পৌঁছানোর পথ। সেই নির্দেশ অনুসারে নির্মলা নিষ্ঠাভরে ইষ্টমূর্তির ধ্যান, নামজপ এবং উপাসনায় আত্মনিয়োগ করেন। দিন-রাত তাঁর মন যেন এক অন্তর্লীন সাধনায় নিমগ্ন থাকত। এই সাধনাভাবের ফলস্বরূপ অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। কখনও গভীর ধ্যানাবস্থা, কখনও অকারণ আনন্দোচ্ছ্বাস, কখনও আবার আত্মবিস্মৃত তন্ময়তা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন ক্রমে সাধারণতার সীমা অতিক্রম করছিল।
তেরো বছর পূর্ণ করে চৌদ্দ বছরে পদার্পণের সময় নির্মলার জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঢাকার বিক্রমপুরের আটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহোত্তর জীবনে নির্মলা স্বামীর নতুন নাম রাখেন—‘ভোলানাথ’। এই নামকরণ তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক অনুভবেরই প্রতিফলন বলে ভক্তরা মনে করেন।

বিবাহের পর নির্মলা প্রবেশ করেন গার্হস্থ্য জীবনে। তবে তাঁর গার্হস্থ্য জীবন ছিল সাধারণ অর্থে সংসারধর্ম পালন, কিন্তু অন্তরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে অবস্থানকারী। স্বামীর গৃহে তিনি আদর্শ কুলবধূর ভূমিকা পালন করেন। সংসারের কাজকর্ম, গুরুজনের সেবা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব—সবকিছুই তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতেন। ভাসুর রেবতীমোহনের অন্তঃপুরে থেকে বড় জায়ের কাছ থেকে তিনি সংসারের নানা খুঁটিনাটি কাজ শেখেন। তাঁর বিনয়, ভদ্রতা ও সেবাপরায়ণতা সকলের মন জয় করে।
তবে বাহ্যিকভাবে সংসারী জীবনযাপন করলেও অন্তর্জগতে তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তা ক্রমেই বিকশিত হতে থাকে। স্বামীর কর্মস্থল বাজিতপুরে এসে এই আধ্যাত্মিক ভাবের প্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোলানাথ সেখানে সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকরি করতেন। বাজিতপুরে অবস্থানকালে নির্মলার মধ্যে এক অদ্ভুত দিব্যভাব প্রকাশ পেতে থাকে। যেখানে কৃষ্ণকীর্তন বা ভক্তিসঙ্গীত হতো, সেখানেই তাঁর মন গভীরভাবে আকৃষ্ট হতো।
একবার ভূদেবচন্দ্র বসুর বাড়িতে কীর্তনের আসর বসেছে। নির্মলাও সেখানে উপস্থিত। কীর্তন শুরু হলো—
“হরিহরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ
যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ”
নামসংকীর্তনের সুর, তাল ও ভক্তিভাবের আবহে নির্মলা গভীর ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কৃষ্ণনামের ধ্বনি তাঁর অন্তরকে এমনভাবে আলোড়িত করে যে তিনি আত্মবিস্মৃত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছু সময়ের জন্য চৈতন্যশূন্য হয়ে থাকেন। উপস্থিত সবাই ভীত ও বিস্মিত হয়ে পড়েন। তবে কীর্তনের ধ্বনি ক্রমে তাঁর চেতনা ফিরিয়ে আনে।
ঘটনাটি দ্রুত বাজিতপুরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এটিকে অসুস্থতা মনে করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন। স্বামী রমণীমোহন একজন ওঝাকে ডেকে আনেন। কিন্তু ওঝা নির্মলার অলৌকিক ভাবাবেশ প্রত্যক্ষ করে নিজেই বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি পরে জানান—এ কোনো সাধারণ অসুখ নয়; এ এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ।
ডাক্তার মহেন্দ্র নন্দীও পরীক্ষা করে একই মত দেন—
“এ কোনো রোগ নয়, এটি অত্যন্ত উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক অবস্থা।”
এরপর থেকে নির্মলার মধ্যে মহাভাবের প্রকাশ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কখনও তিনি গভীর ধ্যানমগ্ন, কখনও দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত, কখনও বা অদ্ভুত মুদ্রা ও আসনে অবস্থান করতেন। সাধারণ মানুষের চোখে এসব রহস্যময় মনে হলেও ভক্তদের কাছে তা ছিল ঈশ্বরচেতনার প্রকাশ।
ঝুলন পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। প্রচলিত নিয়মে কোনো গুরু বা আচার্য ছাড়াই নির্মলার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দীক্ষা সম্পন্ন হয়। দৈব প্রভাবে কিছু সময়ের জন্য তাঁর বাকশক্তি লুপ্ত হয়ে যায়। তিনি এক অপ্রাকৃত ভাবাবেশে নিমগ্ন থাকেন, যেন পার্থিব জগতের সীমা অতিক্রম করে অন্য এক দিব্য জগতে প্রবেশ করেছেন।
এই সময় থেকেই নির্মলা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকেন এক নতুন রূপে—সচ্চিদানন্দময়ী সত্তা হিসেবে। তাঁর আচরণ, বাক্য, ভাবভঙ্গি এবং আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ সকলকে বিস্মিত করতে থাকে। তিনি আর কেবল গৃহবধূ নন; তিনি ক্রমে পরিণত হচ্ছেন এক মহাসাধিকা, এক দিব্য মাতৃসত্তায়।

শাহবাগে আবির্ভাব, ‘আনন্দময়ী মা’ নামকরণ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠার সূচনা
ইংরেজি ১৯২৪ সাল। এই সময়ে নির্মলার জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। স্বামী ভোলানাথ ঢাকার নবাববাগানের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব লাভ করলে তাঁরা ঢাকার শাহবাগে বসবাস শুরু করেন। এই শাহবাগেই নির্মলার আধ্যাত্মিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্রমে তিনি সাধারণ গৃহবধূর সীমা অতিক্রম করে ভক্তসমাজের কাছে এক মহাসাধিকা রূপে পরিচিত হতে থাকেন।
শাহবাগ ছিল তৎকালীন ঢাকার এক শান্ত ও সবুজ পরিবেশে ঘেরা এলাকা। এখানকার সিদ্ধেশ্বরী মা কালীর পীঠস্থান আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছিল। নির্মলার মধ্যে দিব্যভাবের প্রকাশ দিন দিন তীব্রতর হতে থাকে। তিনি কখনও দীর্ঘক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকতেন, কখনও অদ্ভুত যোগমুদ্রায় অবস্থান করতেন, কখনও বা কীর্তনের সুরে আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়তেন। তাঁর চারপাশে যেন এক অপার্থিব প্রশান্তি ও পবিত্রতার আবহ সৃষ্টি হতো।
বাজিতপুরে থাকাকালীন নির্মলা একবার ধ্যানাবস্থায় ‘সিদ্ধেশ্বরী গাছ’-এর দর্শন লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে শাহবাগে এসে তিনি বাস্তবেই সেই স্থানটি চিনে ফেলেন। প্রচলিত জনশ্রুতি ছিল—ঐ অশ্বত্থ বৃক্ষ থেকে একসময় জ্যোতি নির্গত হয়ে কালীমূর্তির সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। ফলে স্থানটি বহু আগে থেকেই পবিত্র বলে বিবেচিত ছিল।
প্রথমদিকে সেই স্থানটি ছিল নির্জন ও জনমানবশূন্য। এক রাতে নির্মলা ও ভোলানাথ লণ্ঠন হাতে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির দর্শনে যান। সেখানে কোনো স্থায়ী বসতি ছিল না, কেবল একটি প্রাচীন কালীমন্দির ও পঞ্চমুণ্ডীর আসন ছিল। মন্দিরের উত্তর পার্শ্বে নির্মলা একটি কুণ্ডস্থল আবিষ্কার করেন এবং দক্ষিণমুখে বসে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন।
ধ্যানাবস্থায় তাঁর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্তোত্রধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে। তাঁর সারা দেহ দিব্য ভাবাবেশে আন্দোলিত হয়। উপস্থিত ভক্তরা অনুভব করেন—এ যেন মানবদেহে দিব্য মাতৃশক্তির প্রকাশ।
সেই সময় উপস্থিত ছিলেন ‘ভাইজী’ নামে পরিচিত এক সাধক। নির্মলার দিব্য রূপ প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীর আবেগে উচ্চারণ করেন—
“এ শুধু মা নন, এ হলেন আনন্দময়ী মা!”
এই নামকরণই পরবর্তীকালে স্থায়ী হয়ে যায়। নির্মলা সুন্দরী হয়ে ওঠেন ‘মা আনন্দময়ী’—এক অনন্ত আনন্দের উৎস, এক সর্বজনীন মাতৃসত্তা।
ভাইজী ভোলানাথকে উদ্দেশ করে বলেন—
“আজ থেকে আমরা তাঁকে কেবল ‘মা’ বলে ডাকব না; বলব ‘আনন্দময়ী মা’।”
এই নামের মধ্যেই যেন তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তার সারমর্ম নিহিত ছিল—যিনি আনন্দের মধ্যেই বিরাজমান, যিনি অন্যের হৃদয়ে আনন্দ সঞ্চার করেন।

ইংরেজি ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে সিদ্ধেশ্বরীতে মা আনন্দময়ীর প্রথম মন্দির নির্মিত হয়। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠিত হয় মা আনন্দময়ী আশ্রমের সূচনা। এটিই ছিল তাঁর আদি আশ্রম। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পশ্চাৎভাগে অবস্থিত এই আশ্রম পরবর্তীকালে অসংখ্য ভক্তের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
এই আশ্রমে প্রথমবারের মতো বাসন্তী পূজার আয়োজন করা হয়। পূজা, কীর্তন, সৎসঙ্গ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানটি এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেন মায়ের সান্নিধ্য লাভের আশায়।
শাহবাগে অবস্থানকালে মা আনন্দময়ীর অলৌকিক শক্তির আরও বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটতে থাকে। তাঁর আশেপাশে থাকা মানুষজন প্রত্যক্ষ করতেন—মা কখনও গভীর সমাধিস্থ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিস্তব্ধ হয়ে থাকেন, কখনও ভক্তদের উদ্দেশ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আধ্যাত্মিক বাণী প্রদান করেন, আবার কখনও শিশুসম হাসিতে চারপাশের পরিবেশকে মধুময় করে তোলেন।
ঢাকায় দীর্ঘদিন অতিবাহিত করার পর একদিন মা হঠাৎ ভক্তদের বললেন—
“তোমরা এ শরীরটাকে ছেড়ে দাও। এ শরীর আজই ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে।”
ভক্তরা বিস্মিত হলেও মায়ের সিদ্ধান্ত ছিল অটল। তিনি কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই, মাত্র একটি পরিধেয় বস্ত্র সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। তাঁর গন্তব্য কোথায়—তা তিনি নিজেও প্রকাশ করেননি। যেন এক দিব্য নির্দেশেই তিনি যাত্রা শুরু করেন।
ইংরেজি ১৯৩২ সালের জুন মাসে মা আনন্দময়ী, ভোলানাথ ও ভাইজীসহ বহু পথ অতিক্রম করে দেরাদুনে পৌঁছান। এই যাত্রার মাধ্যমে তাঁর লীলাক্ষেত্র ঢাকা থেকে উত্তর ভারতে স্থানান্তরিত হয়।
এ সময় থেকেই মা আনন্দময়ীর আধ্যাত্মিক প্রভাব সর্বভারতীয় পরিসরে বিস্তৃত হতে শুরু করে।




