মা আনন্দময়ী

বাংলা আধ্যাত্মিক সাধনা-ঐতিহ্যের ইতিহাসে যে ক’জন নারী মহাপুরুষ তাঁদের অলৌকিক জীবনযাপন, গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং সর্বজনীন মাতৃভাবের মাধ্যমে যুগযুগান্তর ধরে ভক্তহৃদয়ে আসন করে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন মা আনন্দময়ী। তিনি শুধু একজন সাধিকা নন; বহু ভক্তের কাছে তিনি জগৎজননী, ঈশ্বরপ্রেমের জীবন্ত প্রতিমা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক দিব্যচেতনার আধার।

মা আনন্দময়ী

 

মা আনন্দময়ী ১

 

জন্ম, পারিবারিক পরিবেশ ও আধ্যাত্মিক শৈশব

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত শান্ত-স্নিগ্ধ খেওড়া গ্রামে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। পিতা বিপিন বিহারী ভট্টাচার্য ছিলেন ধার্মিক, সৎ ও আদর্শপরায়ণ ব্রাহ্মণ; মাতা মোক্ষদা সুন্দরী ছিলেন ভক্তিমতী, স্বপ্নদ্রষ্টা এবং ঈশ্বরবিশ্বাসে পরিপূর্ণ এক সরল হৃদয়ের গৃহিণী। পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় অনুশাসন, শুদ্ধ আচরণ এবং ভক্তিমূলক চর্চায় সমৃদ্ধ। বিপিন বিহারীর পৈতৃক নিবাস ছিল বিদ্যাকূট গ্রামে, আর খেওড়া ছিল মাতুলালয়—যেখানে জন্ম নেন ভবিষ্যতের এই মহাসাধিকা।

মায়ের জন্মের পূর্ব থেকেই মোক্ষদা সুন্দরীর জীবনে নানা অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। তিনি স্বপ্নে দেবদেবীর দর্শন পেতেন—যা পরবর্তীকালে ভক্তদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যে এই শিশু কন্যা সাধারণ কেউ নন; তিনি যেন স্বর্গলোক থেকে মানবকল্যাণে অবতীর্ণ এক দিব্য আত্মা।

শিশুকন্যার নামকরণ করা হয় “নির্মলা”—অর্থাৎ নিষ্কলুষ, নির্মল, পবিত্র। নামের মধ্যেই যেন ভবিষ্যৎ জীবনের আভাস লুকিয়ে ছিল। পিতা বিপিন বিহারী কন্যাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি শুধু আদরেই নয়, চরিত্রগঠনে, শিষ্টাচারে এবং ধর্মীয় শিক্ষায় কন্যাকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিশুকালেই যদি শ্রদ্ধা, ভক্তি, দয়া, মমতা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মতো মহৎ গুণের বীজ রোপণ করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ জীবন স্বয়ং আলোকিত হয়ে উঠবে।

মা আনন্দময়ী

এই আদর্শিক পরিবেশেই বড় হতে থাকেন নির্মলা। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক সংযম, কোমলতা এবং ঈশ্বরভাব লক্ষ করা যেত। তিনি প্রায়ই গভীর মনোযোগ দিয়ে পিতার কথা শুনতেন এবং আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতেন।

একদিন ছোট্ট নির্মলা পিতাকে জিজ্ঞেস করেন—
“বাবা, কী কী সৎগুণ থাকলে মানুষ বড় হয়?”

পিতা স্নেহভরে উত্তর দেন—
“যে সত্য কথা বলে, অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ করে না, গুরুজনকে শ্রদ্ধা করে, দীন-দুঃখীর সেবা করে এবং সর্বোপরি ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাস রাখে—তাকেই মানুষ মহৎ বলে। ভগবানও তাদের প্রতি প্রসন্ন থাকেন।”

এই শিক্ষাগুলো নির্মলার কোমল মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়। পরবর্তী জীবনে তাঁর চরিত্র, আচরণ ও আধ্যাত্মিক বিকাশে এই পিতৃশিক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

শিশু নির্মলা পিতার কাছ থেকে হরিনাম শিখেছিলেন। পিতাকে নিয়মিত হরিনাম জপ করতে দেখে তাঁর মনেও ঈশ্বরচিন্তার আকর্ষণ জন্মায়। একদিন তিনি প্রশ্ন করলেন—

“বাবা, তুমি হরিকে ডাকো কেন? ডাকলে কী হয়?”

পিতা বললেন—
“হরিকে ডাকলে মঙ্গল হয়, কল্যাণ হয়। যেমন তোমাকে ডাকলে তুমি দৌড়ে আসো, তেমনি ভগবানও ডাকলে সাড়া দেন। তখন তাঁর কাছে যা চাইবে, তাই পাওয়া যায়।”

এই সহজ অথচ গভীর ব্যাখ্যা নির্মলার মনে ঈশ্বরের প্রতি নিবিড় আস্থা তৈরি করে। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি নামস্মরণ ও ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হতে শুরু করেন।

গ্রামের পাঠশালায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। একদিন বিদ্যালয়ে একজন পরিদর্শক এসে হঠাৎ নির্মলাকে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে বলেন। নির্মলা অনর্গল, নির্ভুল ও সুমধুর কণ্ঠে কবিতাটি আবৃত্তি করে সকলকে মুগ্ধ করেন। শিক্ষক ও পরিদর্শক তাঁর স্মৃতিশক্তি ও উচ্চারণশৈলীর প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক।

শৈশব থেকেই নির্মলার মধ্যে এক অনাবিল আনন্দভাব প্রকাশ পেতে থাকে। তিনি প্রায়ই কীর্তনের সুরে বিভোর হয়ে পড়তেন, নামসংকীর্তনে ডুবে যেতেন, এবং কখনও কখনও গভীর ভাবাবেশে তন্ময় হয়ে থাকতেন। পরিবার ও প্রতিবেশীরা লক্ষ্য করতেন—এই বালিকা যেন এক অনির্বচনীয় শান্তি ও আনন্দের জগতে অবস্থান করছে।

এভাবেই সবার স্নেহ, ভালোবাসা ও আশীর্বাদের মধ্যে দিয়ে নির্মলার শৈশব অতিক্রান্ত হয়—যেখানে সাধারণ জীবনের আড়ালে ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছিল এক মহৎ আধ্যাত্মিক জীবনের পূর্বাভাস।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

কৈশোর, সাধনাজীবনের সূচনা ও গার্হস্থ্য জীবনের অন্তরালে আধ্যাত্মিক জাগরণ

শৈশব অতিক্রম করে নির্মলা যখন কৈশোরে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর অন্তর্জগতে আধ্যাত্মিক অনুভূতির জাগরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরভাব, ভক্তি ও ধ্যানের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ গভীরতর হতে থাকে। সাধারণ কিশোরীদের মতো খেলাধুলা বা পার্থিব চাঞ্চল্যের চেয়ে তাঁর মন বেশি টান অনুভব করত নামস্মরণ, কীর্তন এবং অন্তর্মুখী ভাবচিন্তায়।

এগারো বছর বয়সে নির্মলার সরল বিশ্বাস ও ভক্তিভাব আরও দৃঢ় হয়। তিনি পিতার কাছে জানতে চান—
“হরিকে কেমন করে ডাকতে হয়?”

পিতা তাঁকে ভক্তির নিয়ম শেখালেন—শুদ্ধ মন, একাগ্র চিত্ত এবং আন্তরিক প্রার্থনাই ভগবানের কাছে পৌঁছানোর পথ। সেই নির্দেশ অনুসারে নির্মলা নিষ্ঠাভরে ইষ্টমূর্তির ধ্যান, নামজপ এবং উপাসনায় আত্মনিয়োগ করেন। দিন-রাত তাঁর মন যেন এক অন্তর্লীন সাধনায় নিমগ্ন থাকত। এই সাধনাভাবের ফলস্বরূপ অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। কখনও গভীর ধ্যানাবস্থা, কখনও অকারণ আনন্দোচ্ছ্বাস, কখনও আবার আত্মবিস্মৃত তন্ময়তা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন ক্রমে সাধারণতার সীমা অতিক্রম করছিল।

তেরো বছর পূর্ণ করে চৌদ্দ বছরে পদার্পণের সময় নির্মলার জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঢাকার বিক্রমপুরের আটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহোত্তর জীবনে নির্মলা স্বামীর নতুন নাম রাখেন—‘ভোলানাথ’। এই নামকরণ তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক অনুভবেরই প্রতিফলন বলে ভক্তরা মনে করেন।

মা আনন্দময়ী

বিবাহের পর নির্মলা প্রবেশ করেন গার্হস্থ্য জীবনে। তবে তাঁর গার্হস্থ্য জীবন ছিল সাধারণ অর্থে সংসারধর্ম পালন, কিন্তু অন্তরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে অবস্থানকারী। স্বামীর গৃহে তিনি আদর্শ কুলবধূর ভূমিকা পালন করেন। সংসারের কাজকর্ম, গুরুজনের সেবা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব—সবকিছুই তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতেন। ভাসুর রেবতীমোহনের অন্তঃপুরে থেকে বড় জায়ের কাছ থেকে তিনি সংসারের নানা খুঁটিনাটি কাজ শেখেন। তাঁর বিনয়, ভদ্রতা ও সেবাপরায়ণতা সকলের মন জয় করে।

তবে বাহ্যিকভাবে সংসারী জীবনযাপন করলেও অন্তর্জগতে তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তা ক্রমেই বিকশিত হতে থাকে। স্বামীর কর্মস্থল বাজিতপুরে এসে এই আধ্যাত্মিক ভাবের প্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোলানাথ সেখানে সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকরি করতেন। বাজিতপুরে অবস্থানকালে নির্মলার মধ্যে এক অদ্ভুত দিব্যভাব প্রকাশ পেতে থাকে। যেখানে কৃষ্ণকীর্তন বা ভক্তিসঙ্গীত হতো, সেখানেই তাঁর মন গভীরভাবে আকৃষ্ট হতো।

একবার ভূদেবচন্দ্র বসুর বাড়িতে কীর্তনের আসর বসেছে। নির্মলাও সেখানে উপস্থিত। কীর্তন শুরু হলো—

“হরিহরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ
যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ”

নামসংকীর্তনের সুর, তাল ও ভক্তিভাবের আবহে নির্মলা গভীর ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কৃষ্ণনামের ধ্বনি তাঁর অন্তরকে এমনভাবে আলোড়িত করে যে তিনি আত্মবিস্মৃত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছু সময়ের জন্য চৈতন্যশূন্য হয়ে থাকেন। উপস্থিত সবাই ভীত ও বিস্মিত হয়ে পড়েন। তবে কীর্তনের ধ্বনি ক্রমে তাঁর চেতনা ফিরিয়ে আনে।

ঘটনাটি দ্রুত বাজিতপুরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এটিকে অসুস্থতা মনে করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন। স্বামী রমণীমোহন একজন ওঝাকে ডেকে আনেন। কিন্তু ওঝা নির্মলার অলৌকিক ভাবাবেশ প্রত্যক্ষ করে নিজেই বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি পরে জানান—এ কোনো সাধারণ অসুখ নয়; এ এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ।

ডাক্তার মহেন্দ্র নন্দীও পরীক্ষা করে একই মত দেন—
“এ কোনো রোগ নয়, এটি অত্যন্ত উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক অবস্থা।”

এরপর থেকে নির্মলার মধ্যে মহাভাবের প্রকাশ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কখনও তিনি গভীর ধ্যানমগ্ন, কখনও দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত, কখনও বা অদ্ভুত মুদ্রা ও আসনে অবস্থান করতেন। সাধারণ মানুষের চোখে এসব রহস্যময় মনে হলেও ভক্তদের কাছে তা ছিল ঈশ্বরচেতনার প্রকাশ।

ঝুলন পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। প্রচলিত নিয়মে কোনো গুরু বা আচার্য ছাড়াই নির্মলার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দীক্ষা সম্পন্ন হয়। দৈব প্রভাবে কিছু সময়ের জন্য তাঁর বাকশক্তি লুপ্ত হয়ে যায়। তিনি এক অপ্রাকৃত ভাবাবেশে নিমগ্ন থাকেন, যেন পার্থিব জগতের সীমা অতিক্রম করে অন্য এক দিব্য জগতে প্রবেশ করেছেন।

এই সময় থেকেই নির্মলা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকেন এক নতুন রূপে—সচ্চিদানন্দময়ী সত্তা হিসেবে। তাঁর আচরণ, বাক্য, ভাবভঙ্গি এবং আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ সকলকে বিস্মিত করতে থাকে। তিনি আর কেবল গৃহবধূ নন; তিনি ক্রমে পরিণত হচ্ছেন এক মহাসাধিকা, এক দিব্য মাতৃসত্তায়।

 

মা আনন্দময়ী ২

 

শাহবাগে আবির্ভাব, ‘আনন্দময়ী মা’ নামকরণ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠার সূচনা

ইংরেজি ১৯২৪ সাল। এই সময়ে নির্মলার জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। স্বামী ভোলানাথ ঢাকার নবাববাগানের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব লাভ করলে তাঁরা ঢাকার শাহবাগে বসবাস শুরু করেন। এই শাহবাগেই নির্মলার আধ্যাত্মিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্রমে তিনি সাধারণ গৃহবধূর সীমা অতিক্রম করে ভক্তসমাজের কাছে এক মহাসাধিকা রূপে পরিচিত হতে থাকেন।

শাহবাগ ছিল তৎকালীন ঢাকার এক শান্ত ও সবুজ পরিবেশে ঘেরা এলাকা। এখানকার সিদ্ধেশ্বরী মা কালীর পীঠস্থান আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছিল। নির্মলার মধ্যে দিব্যভাবের প্রকাশ দিন দিন তীব্রতর হতে থাকে। তিনি কখনও দীর্ঘক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকতেন, কখনও অদ্ভুত যোগমুদ্রায় অবস্থান করতেন, কখনও বা কীর্তনের সুরে আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়তেন। তাঁর চারপাশে যেন এক অপার্থিব প্রশান্তি ও পবিত্রতার আবহ সৃষ্টি হতো।

বাজিতপুরে থাকাকালীন নির্মলা একবার ধ্যানাবস্থায় ‘সিদ্ধেশ্বরী গাছ’-এর দর্শন লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে শাহবাগে এসে তিনি বাস্তবেই সেই স্থানটি চিনে ফেলেন। প্রচলিত জনশ্রুতি ছিল—ঐ অশ্বত্থ বৃক্ষ থেকে একসময় জ্যোতি নির্গত হয়ে কালীমূর্তির সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। ফলে স্থানটি বহু আগে থেকেই পবিত্র বলে বিবেচিত ছিল।

প্রথমদিকে সেই স্থানটি ছিল নির্জন ও জনমানবশূন্য। এক রাতে নির্মলা ও ভোলানাথ লণ্ঠন হাতে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির দর্শনে যান। সেখানে কোনো স্থায়ী বসতি ছিল না, কেবল একটি প্রাচীন কালীমন্দির ও পঞ্চমুণ্ডীর আসন ছিল। মন্দিরের উত্তর পার্শ্বে নির্মলা একটি কুণ্ডস্থল আবিষ্কার করেন এবং দক্ষিণমুখে বসে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন।

ধ্যানাবস্থায় তাঁর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্তোত্রধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে। তাঁর সারা দেহ দিব্য ভাবাবেশে আন্দোলিত হয়। উপস্থিত ভক্তরা অনুভব করেন—এ যেন মানবদেহে দিব্য মাতৃশক্তির প্রকাশ।

সেই সময় উপস্থিত ছিলেন ‘ভাইজী’ নামে পরিচিত এক সাধক। নির্মলার দিব্য রূপ প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীর আবেগে উচ্চারণ করেন—
“এ শুধু মা নন, এ হলেন আনন্দময়ী মা!”

এই নামকরণই পরবর্তীকালে স্থায়ী হয়ে যায়। নির্মলা সুন্দরী হয়ে ওঠেন ‘মা আনন্দময়ী’—এক অনন্ত আনন্দের উৎস, এক সর্বজনীন মাতৃসত্তা।

ভাইজী ভোলানাথকে উদ্দেশ করে বলেন—
“আজ থেকে আমরা তাঁকে কেবল ‘মা’ বলে ডাকব না; বলব ‘আনন্দময়ী মা’।”

এই নামের মধ্যেই যেন তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তার সারমর্ম নিহিত ছিল—যিনি আনন্দের মধ্যেই বিরাজমান, যিনি অন্যের হৃদয়ে আনন্দ সঞ্চার করেন।

মা আনন্দময়ী

ইংরেজি ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে সিদ্ধেশ্বরীতে মা আনন্দময়ীর প্রথম মন্দির নির্মিত হয়। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠিত হয় মা আনন্দময়ী আশ্রমের সূচনা। এটিই ছিল তাঁর আদি আশ্রম। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পশ্চাৎভাগে অবস্থিত এই আশ্রম পরবর্তীকালে অসংখ্য ভক্তের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

এই আশ্রমে প্রথমবারের মতো বাসন্তী পূজার আয়োজন করা হয়। পূজা, কীর্তন, সৎসঙ্গ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানটি এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেন মায়ের সান্নিধ্য লাভের আশায়।

শাহবাগে অবস্থানকালে মা আনন্দময়ীর অলৌকিক শক্তির আরও বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটতে থাকে। তাঁর আশেপাশে থাকা মানুষজন প্রত্যক্ষ করতেন—মা কখনও গভীর সমাধিস্থ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিস্তব্ধ হয়ে থাকেন, কখনও ভক্তদের উদ্দেশ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আধ্যাত্মিক বাণী প্রদান করেন, আবার কখনও শিশুসম হাসিতে চারপাশের পরিবেশকে মধুময় করে তোলেন।

ঢাকায় দীর্ঘদিন অতিবাহিত করার পর একদিন মা হঠাৎ ভক্তদের বললেন—
“তোমরা এ শরীরটাকে ছেড়ে দাও। এ শরীর আজই ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে।”

ভক্তরা বিস্মিত হলেও মায়ের সিদ্ধান্ত ছিল অটল। তিনি কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই, মাত্র একটি পরিধেয় বস্ত্র সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। তাঁর গন্তব্য কোথায়—তা তিনি নিজেও প্রকাশ করেননি। যেন এক দিব্য নির্দেশেই তিনি যাত্রা শুরু করেন।

ইংরেজি ১৯৩২ সালের জুন মাসে মা আনন্দময়ী, ভোলানাথ ও ভাইজীসহ বহু পথ অতিক্রম করে দেরাদুনে পৌঁছান। এই যাত্রার মাধ্যমে তাঁর লীলাক্ষেত্র ঢাকা থেকে উত্তর ভারতে স্থানান্তরিত হয়।

এ সময় থেকেই মা আনন্দময়ীর আধ্যাত্মিক প্রভাব সর্বভারতীয় পরিসরে বিস্তৃত হতে শুরু করে।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

ভারতব্যাপী পরিভ্রমণ, তীর্থস্থান পুনরুজ্জীবন ও মানবকল্যাণে আধ্যাত্মিক প্রভাব

দেরাদুনে পৌঁছানোর পর মা আনন্দময়ীর আধ্যাত্মিক জীবন এক সর্বভারতীয় বিস্তৃতি লাভ করে। উত্তর ভারতের শান্ত পাহাড়ি পরিবেশ, গঙ্গাতীরবর্তী পবিত্র অঞ্চল এবং প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রগুলো তাঁর সাধনজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মায়ের উপস্থিতি যেন যেখানে পড়ত, সেই স্থানই ধীরে ধীরে এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত হতো।

দেরাদুন, হরিদ্বার, কণখল, ঋষিকেশ—একটির পর একটি পবিত্র স্থানে ভক্তদের আহ্বানে মা উপস্থিত হতে থাকেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট ভ্রমণ পরিকল্পনা ছিল না; ভক্তদের আকুল আহ্বানই ছিল তাঁর পথনির্দেশ। তিনি নিজেকে কখনও কোনো সম্প্রদায় বা বিশেষ ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ—সকল ধর্মের মানুষই তাঁর সান্নিধ্যে এসে এক অনির্বচনীয় শান্তি অনুভব করতেন।

মা আনন্দময়ীর উপস্থিতিতে অনেক প্রাচীন তীর্থস্থান নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায়। বিশেষ করে নৈমিষারণ্য তীর্থক্ষেত্রে তাঁর আগমন ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থে নৈমিষারণ্যকে অসংখ্য ঋষি-মুনির তপস্যাভূমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকার ফলে স্থানটি জঙ্গলাকীর্ণ ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।

মা সেখানে উপস্থিত হয়ে গভীর আবেগে ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেন—
“দেখ, কত যুগ ধরে এই স্থান অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। মানুষ জানে না এর মাহাত্ম্য, তাই অজ্ঞতার কারণে অপবিত্র করছে।”

মায়ের আহ্বানে ভক্তরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। শুরু হয় তীর্থস্থানের পুনর্গঠন। কীর্তন, যজ্ঞ, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, সৎসঙ্গ—সব মিলিয়ে নৈমিষারণ্য আবারও এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মায়ের প্রেরণায় বহু প্রাচীন তীর্থস্থান নতুনভাবে জাগ্রত হয়।

মা আনন্দময়ী

তিনি বিশ্বাস করতেন—ধর্ম কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি ও ঈশ্বরচেতনার জাগরণ। তাই তিনি মানুষকে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতার ওপর গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছেন।

মা আনন্দময়ীর জীবন ছিল এক অবিরাম পরিভ্রমণ। উপমহাদেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ—প্রায় সর্বত্র তিনি ভ্রমণ করেছেন। গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে সমতল—সব জায়গাতেই তাঁর পদচারণায় ভক্তসমাজ এক নতুন আধ্যাত্মিক উন্মেষ অনুভব করেছে।

তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আশ্রম, মন্দির ও সাধনকেন্দ্র। তাঁর উপস্থিতিতে অনেক স্থান আধ্যাত্মিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়। ভক্তদের অনুরোধে বিভিন্ন স্থানে যজ্ঞ, পূজা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় বহু মানুষ সংসার জীবনের মধ্যেই আধ্যাত্মিক সাধনার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

মা কখনও নিজেকে ‘গুরু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি বলতেন—
“আমি যা, তোমরাও তাই। প্রত্যেকের মধ্যেই সেই চৈতন্য বিরাজমান।”

এই সার্বজনীন দর্শন তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আপন করে তোলে। তিনি কোনো জটিল দর্শন প্রচার করেননি; বরং সহজ ভাষায় ঈশ্বরচেতনা, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা দিয়েছেন।

মায়ের আশ্রমগুলো কেবল পূজাস্থল ছিল না; ছিল আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন কীর্তন, ভজন, ধর্মীয় আলোচনা ও সৎসঙ্গ অনুষ্ঠিত হতো। বহু মানুষ সংসারের দুঃখ-কষ্ট, মানসিক অশান্তি ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেতেন তাঁর সান্নিধ্যে।

মা আনন্দময়ী

বাংলাদেশের রমনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খেওড়ায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রম দুটি আজও ভক্তদের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রায় পঁচিশটিরও বেশি আশ্রম আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

মা আনন্দময়ীর আধ্যাত্মিক প্রভাব কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর জীবন মানুষকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও অন্তরের শান্তির পথ দেখিয়েছে। তিনি মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরচেতনার প্রদীপ প্রজ্বলিত করতে চেয়েছেন।

ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘জগজ্জননী’—সকলের মা। তাঁর সান্নিধ্যে এসে মানুষ অনুভব করত এক অনির্বচনীয় মাতৃস্নেহ ও আশ্রয়ের অনুভূতি। তিনি কারও ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান বিচার করতেন না; সকলকেই সমান স্নেহে গ্রহণ করতেন।

দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার পর ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট মা আনন্দময়ী দেহত্যাগ করেন। হরিদ্বারের কণখল আশ্রমে গঙ্গার পবিত্র তীরে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয়। সেই স্থান আজও ভক্তদের তীর্থধাম।

মা আনন্দময়ীর জীবন আমাদের শিখিয়ে যায়—
আধ্যাত্মিকতা মানে সংসার ত্যাগ নয়; বরং ঈশ্বরচেতনা নিয়ে জীবনকে পবিত্র করে তোলা।

তিনি সুপ্ত ধর্মচেতনাকে জাগ্রত করেছেন, লুপ্ত তীর্থস্থান পুনর্জীবিত করেছেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে ভক্তি, শান্তি ও আনন্দের বীজ বপন করেছেন।

প্রতিটি মানুষের অন্তরে যে আনন্দময় চৈতন্য বিরাজমান—মা আনন্দময়ী সেই চৈতন্যেরই জীবন্ত প্রতিমূর্তি হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

Leave a Comment